কাহামার্কার যুদ্ধ: আতাহুয়ালপার বন্দিত্ব, মুক্তিপণ ও হত্যার ইতিহাস
সিরিজ: ইনকা সাম্রাজ্যের পতন
কাহামার্কায় সম্রাটের বন্দিত্ব বদলে দিয়েছিল ইনকা সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ।
১৫৩২ সালের ১৫ নভেম্বর কাহামার্কায় পৌঁছে পিজারোর বাহিনী বুঝতে পারে, তারা কতটা বিপজ্জনক অবস্থানে এসেছে। শহরের কাছে আতাহুয়ালপার বিশাল সামরিক শক্তি উপস্থিত, অথচ স্প্যানিশদের সংখ্যা প্রচলিত হিসাবে মাত্র ১৬৮। উপকূলের ঘাঁটি অনেক দূরে; পাহাড়ি পথে পশ্চাদপসরণও নিরাপদ নয়। আগের নিবন্ধের শেষে যে সাক্ষাতের প্রস্তুতি চলছিল, সেটিই এখন অভিযানের ভাগ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছিল। পিজারোর সামনে সুযোগ ছিল ইনকা সম্রাটের সঙ্গে যোগাযোগকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া, যেখানে সংখ্যার বদলে আকস্মিকতা সিদ্ধান্ত দেবে।
আতাহুয়ালপা তখন কাছাকাছি উষ্ণ প্রস্রবণসংলগ্ন স্থানে অবস্থান করছিলেন। পিজারো তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এরনান্দো দে সোতোকে পাঠান; পরে এরনান্দো পিজারোও আলোচনায় যুক্ত হন। সম্রাট পরদিন শহরে আসতে সম্মত হন। স্প্যানিশদের ঘোড়া প্রদর্শন এবং সম্রাটের স্থির থাকার নাটকীয় বিবরণ পাওয়া যায়। তবে তাঁর মনে ঠিক কী চলছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। বিদেশিদের তিনি সম্পূর্ণ নিরীহ ভেবেছিলেন—এমন সরল ব্যাখ্যা তাঁর রাজনৈতিক হিসাবকে অতিরিক্ত ছোট করে দেখায়।
১৬ নভেম্বর পিজারো কাহামার্কার প্রধান প্রাঙ্গণের চারপাশের ভবনে সৈন্যদের লুকিয়ে রাখেন। অশ্বারোহীদের আলাদা দলে প্রস্তুত রাখা হয়; অল্প কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র ও ছোট কামানও হামলার অংশ ছিল। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল সম্রাটকে জীবিত দখল করা। খোলা ময়দানে বৃহৎ ইনকা বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার পরিবর্তে সীমাবদ্ধ প্রাঙ্গণে রাজকীয় শোভাযাত্রাকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছিল। ফলে পরবর্তী ঘটনাকে শুধু দুটি প্রস্তুত বাহিনীর সমানতালের যুদ্ধ বলা বিভ্রান্তিকর।
বিকেলের দিকে আতাহুয়ালপা পালকিতে চড়ে অনুচর, অভিজাত এবং পরিচারকদের সঙ্গে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। শোভাযাত্রার মানুষের সংখ্যা ও অস্ত্রের উপস্থিতি নিয়ে বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের অনেকেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না; প্রধান সেনাশক্তি বাইরে ছিল। সম্রাটের মর্যাদা রক্ষার আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রকাশ্য সাক্ষাতের পরিবেশ তাঁর নিরাপত্তার হিসাবকে প্রভাবিত করেছিল। স্প্যানিশরা সেই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগায়। প্রাঙ্গণে প্রবেশের পর আতাহুয়ালপার অনুসারীদের সংখ্যাধিক্য আর সহজে সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারেনি।
ডোমিনিকান ধর্মযাজক ভিসেন্তে দে ভালভের্দে একজন দোভাষীর সাহায্যে সম্রাটের সঙ্গে কথা বলেন। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ এবং স্প্যানিশ রাজমুকুটের কর্তৃত্ব স্বীকারের দাবি এই কথোপকথনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ভালভের্দের ধর্মীয় বই আতাহুয়ালপার হাতে দেওয়া এবং পরে সেটি মাটিতে ফেলার ঘটনাটি বহুল পরিচিত। কিন্তু বইটি কী ছিল, কী বলা হয়েছিল এবং সম্রাট কেন সেটি সরিয়ে দিয়েছিলেন—এসব বিষয়ে বর্ণনাগুলো এক নয়। অনুবাদ ও সম্পূর্ণ অপরিচিত ধর্মীয় ধারণাও যোগাযোগকে জটিল করেছিল।
বইয়ের ঘটনাকে হামলার ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। অথচ সৈন্যদের অবস্থানই দেখায়, সশস্ত্র অতর্কিত আক্রমণের প্রস্তুতি কথোপকথনের আগেই নেওয়া ছিল। সংকেতের পর লুকিয়ে থাকা স্প্যানিশরা বেরিয়ে আসে। ঘোড়ার আক্রমণ, গুলির শব্দ, ধোঁয়া এবং ইস্পাতের অস্ত্র শোভাযাত্রায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বেরিয়ে যাওয়ার পথ সীমিত হওয়ায় ভিড়ের চাপ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কেউ অস্ত্রের আঘাতে, কেউ পিষ্ট হয়ে মারা যায়। এটি ছিল স্বল্পসময়ের মধ্যে সংঘটিত অত্যন্ত অসম হত্যাকাণ্ড।
নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। স্প্যানিশ বিবরণে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা আছে, কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যাকে নির্ভুল গণনা ধরে নেওয়া উচিত নয়। তাদের কোনো সৈন্য নিহত হয়নি বলে সাধারণভাবে জানানো হয়। আতাহুয়ালপার পালকিবাহকেরা নিহত হলেও অন্যরা পালকিটি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত সম্রাটকে নামিয়ে বন্দি করা হয়। তাঁকে জীবিত রাখার প্রচেষ্টায় পিজারোর হাতে আঘাত লাগার বিবরণও আছে। এই বন্দিত্বই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফল।
ইনকা শাসক শুধু সামরিক অধিনায়ক ছিলেন না; তাঁর ব্যক্তির সঙ্গে রাজবংশীয় মর্যাদা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং প্রশাসনিক নির্দেশ জড়িয়ে ছিল। তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে। ফলে বাইরে বৃহৎ বাহিনী থাকলেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সহজ ছিল না। তবে সম্রাট বন্দি হওয়ামাত্র সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছিল, এমন নয়। স্প্যানিশরা পুরো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পায়নি; তারা সাম্রাজ্যের শীর্ষ ব্যক্তিকে নিজেদের হাতে পেয়েছিল।
বন্দিত্বের মধ্যেও আতাহুয়ালপা অনুচরদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ পান। এই সময় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হুয়াসকার নিহত হন। সাধারণ ব্যাখ্যায় আতাহুয়ালপার আদেশে হত্যাটি ঘটেছিল, যাতে স্প্যানিশরা তাঁকে বিকল্প শাসক হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। তবে উদ্দেশ্যের বিস্তারিত বিবরণ সতর্কভাবে গ্রহণ করতে হয়। নিশ্চিত ফল হলো, রাজবংশের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর একজন নিহত এবং অন্যজন বিদেশিদের হাতে বন্দি হওয়ায় ক্ষমতার সংকট আরও গভীর হয়।
স্প্যানিশদের মূল্যবান ধাতুর প্রতি আগ্রহ বুঝে আতাহুয়ালপা মুক্তিপণের প্রস্তাব দেন। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, একটি ঘরে নিজের হাত পৌঁছায় এমন উচ্চতা পর্যন্ত একবার সোনা এবং দুবার রুপা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। বিষয়টি ছাদ পর্যন্ত গলিত ধাতু ঢেলে ঘর ভরার পরিকল্পনা ছিল না; সংগ্রহ করা হচ্ছিল নানা আকৃতির বস্তু। সম্রাটের কাছে এটি ছিল বিপুল সম্পদ দিয়ে নিজের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। স্প্যানিশদের কাছে তা অভাবনীয় ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ হয়ে ওঠে।
পরবর্তী মাসগুলোতে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে সোনার পাত্র, অলংকার, মন্দিরের সামগ্রী এবং রুপার শিল্পবস্তু কাহামার্কায় আসে। স্প্যানিশ দলও সম্পদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্রে যায়। এই প্রক্রিয়ায় বন্দি সম্রাটের আদেশ এবং বিদেশিদের চাপ পাশাপাশি কাজ করছিল। যেসব বস্তু ইনকা সমাজে ধর্মীয় মর্যাদা ও কারিগরি উৎকর্ষের প্রতীক ছিল, সেগুলো বিজেতাদের হিসাবে ধাতুর ওজনে পরিণত হয়। বহু শিল্পবস্তু গলিয়ে ফেলায় অপূরণীয় সাংস্কৃতিক ক্ষতি ঘটে।
১৫৩৩ সালের জুন নাগাদ সংগৃহীত ধাতুর বড় অংশ হিসাব করে ভাগ করা হয়। স্প্যানিশ রাজমুকুটের নির্ধারিত পঞ্চমাংশ আলাদা রাখা হয়; বাকি সম্পদ পদমর্যাদা ও অংশগ্রহণ অনুযায়ী বণ্টিত হয়। কিন্তু অর্থ সংগ্রহ এবং বণ্টন সম্রাটের মুক্তি নিশ্চিত করেনি। পিজারো আতাহুয়ালপার মুক্তিপণের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়েছে বলে স্বীকার করলেও তাঁকে আটক রাখেন। মুক্তিপণ আদায়ের পর বন্দিত্ব বজায় রাখাই দেখায়, তাঁর স্বাধীনতা আর শুধু অর্থের প্রশ্ন ছিল না।
এর মধ্যে আলমাগ্রো নতুন লোক নিয়ে পৌঁছান। স্প্যানিশদের শক্তি বাড়লেও বন্দিকে নিয়ে মতভেদ এবং সম্ভাব্য ইনকা আক্রমণের ভয় ছিল। আতাহুয়ালপা মুক্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে পারেন—এই আশঙ্কাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর সেনা সমবেত হওয়ার সংবাদ ছড়ায়, কিন্তু সেগুলো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না। পরিস্থিতি যাচাই করতে সোতোকে বাইরে পাঠানো হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতেই আতাহুয়ালপার ভাগ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়।
সম্রাটের বিরুদ্ধে সংক্ষিপ্ত বিচার পরিচালিত হয়। হুয়াসকারের মৃত্যু, বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র এবং ধর্মীয় আচরণসহ বিভিন্ন অভিযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়, যদিও পূর্ণাঙ্গ বিচারনথি সংরক্ষিত নেই। নিজেদের হাতে বন্দি এক স্বাধীন শাসকের বিচার করার অধিকার স্প্যানিশরা নিজেরাই দাবি করেছিল। সাক্ষ্য, অনুবাদ এবং প্রতিরক্ষার সুযোগ নিয়ে গুরুতর সমস্যা ছিল। এই বিচারকে নিরপেক্ষ আইনি নিষ্পত্তি হিসেবে দেখা যায় না; এটি বন্দিকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল।
প্রথমে আতাহুয়ালপাকে জীবন্ত পোড়ানোর শাস্তি দেওয়া হয়। পরে খ্রিস্টীয় বাপ্তিস্ম গ্রহণের পর শাস্তি বদলে গারোতে যন্ত্রে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। দেহ সংরক্ষণের আন্দীয় বিশ্বাস তাঁর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছিল বলে বিবরণ আছে। সাধারণভাবে তাঁর মৃত্যুর তারিখ ২৬ জুলাই ১৫৩৩ গ্রহণ করা হয়; পুরোনো লেখায় প্রচলিত ২৯ আগস্ট তারিখটি নিয়ে ঐতিহাসিক আপত্তি রয়েছে। ফলে ১৫৩২ সালে বন্দিত্ব এবং পরের বছর মুক্তিপণ সংগ্রহের পর মৃত্যুদণ্ড—এই ঘটনাক্রম আলাদা করে মনে রাখা জরুরি।
আতাহুয়ালপার মৃত্যু ইনকা প্রতিরোধের অবসান ঘটায়নি, কিন্তু সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বিরাট শূন্যতা তৈরি করে। সোনা–রুপা স্প্যানিশদের হাতে গেছে, অথচ তার বিনিময়ে স্বাধীনতা ফেরেনি। পিজারো এবার বিকল্প ইনকা শাসককে সামনে রেখে দক্ষিণের দিকে এগোনোর সুযোগ খুঁজবেন। কাহামার্কায় একজন সম্রাটকে বন্দি ও হত্যা করা হয়েছিল; কুসকো দখল এবং সমগ্র আন্দিজকে অধীন করার লড়াই তখনো বাকি। পরবর্তী অধ্যায়ে সেই অগ্রযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হবে সহযোগিতা, লুণ্ঠন এবং নতুন প্রতিরোধের সূচনা।
পিকিং কনভেনশন ও আফিম যুদ্ধের উত্তরাধিকার: আধুনিক চীন কীভাবে বদলে গেল?
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান