বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এস্টেটস জেনারেল ও টেনিস কোর্ট শপথ: ১৭৮৯ সালে রাজক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ

সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব

এস্টেটস জেনারেল ও টেনিস কোর্ট শপথ: ১৭৮৯ সালে রাজক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ
সংবিধান প্রতিষ্ঠার শপথে রাজক্ষমতার সামনে দাঁড়াল জাতীয় প্রতিনিধিত্ব।

ফ্রান্সের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কে—রাজা, বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত গোষ্ঠী, নাকি জাতির প্রতিনিধিরা? রাজকোষের সংকট থেকে উঠে আসা এই প্রশ্নই ১৭৮৯ সালের বসন্তে ভার্সাইয়ের রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছেছিল। ষোড়শ লুই এস্টেটস জেনারেল ডেকেছিলেন আর্থিক অচলাবস্থা কাটানোর আশায়। কিন্তু প্রতিনিধিরা যখন সমবেত হলেন, তখন আলোচনার বিষয় শুধু নতুন কর ছিল না। কর অনুমোদনের অধিকার নির্ধারণ করতে গিয়েই ফ্রান্সে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের উৎস নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।

প্রায় ১৭৫ বছর পর, ১৭৮৯ সালের ৫ মে ভার্সাইয়ে এস্টেটস জেনারেলের উদ্বোধন হয়। যাজকসমাজের প্রথম এস্টেট, অভিজাতদের দ্বিতীয় এস্টেট এবং সাধারণ জনগণের তৃতীয় এস্টেট এতে প্রতিনিধিত্ব করছিল। তৃতীয় এস্টেটকে প্রায়ই ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলা হলেও এটি একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণি ছিল না। ধনী ব্যবসায়ী থেকে দরিদ্র কৃষক পর্যন্ত জন্মগতভাবে অভিজাত নন এমন বিপুল জনগোষ্ঠী এই এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

তবে তৃতীয় এস্টেটের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিকাংশ সরাসরি কৃষক বা মজুর ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে আইনজীবী, প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও সম্পত্তিশালী শিক্ষিত মানুষ প্রাধান্য পেয়েছিলেন। নির্বাচনের প্রক্রিয়াও ছিল পরোক্ষ ও বিভিন্ন শর্তে সীমিত। ফলে তাঁরা সাধারণ জনগণের অভিযোগ বহন করলেও সমাজের সব অংশের সরাসরি প্রতিচ্ছবি ছিলেন না। তাঁদের শক্তি ছিল যুক্তিতর্ক, আইন ও প্রশাসনিক পদ্ধতি বোঝার দক্ষতা।

প্রতিনিধিদের সঙ্গে এসেছিল কাইয়ে দ্য দোলেয়াঁস—অভিযোগ ও প্রত্যাশার লিখিত বিবরণ। এতে করের বৈষম্য, সামন্তীয় পাওনা, বিচারব্যবস্থার সমস্যা এবং প্রশাসনিক অনিয়ম উঠে আসে। অনেক অভিযোগপত্রেই রাজাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়নি; বরং তাঁর কাছেই সংস্কারের প্রত্যাশা জানানো হয়েছিল। বিপ্লবের এই পর্যায়ে লক্ষ্য প্রধানত রাজতন্ত্র ধ্বংস করা নয়, রাজক্ষমতাকে আইন ও প্রতিনিধিত্বের সীমার মধ্যে আনা। কিন্তু সেই সীমা নির্ধারণ করবেন কারা, তা নিয়েই বিরোধ বাঁধে।

১৭৮৮ সালের ডিসেম্বরে রাজকীয় সরকার তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিসংখ্যা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে তাঁদের সংখ্যা অন্য দুই এস্টেটের সম্মিলিত সংখ্যার কাছাকাছি হয়। এটি বড় অর্জন মনে হলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন অমীমাংসিত ছিল: ভোট কি প্রতিনিধি অনুযায়ী হবে, নাকি এস্টেট অনুযায়ী? পুরোনো পদ্ধতিতে প্রতিটি এস্টেট একটি ভোট পেলে যাজক ও অভিজাতরা একজোট হয়ে তৃতীয় এস্টেটকে দুই-এক ব্যবধানে হারিয়ে দিতে পারতেন।

তৃতীয় এস্টেট তাই একত্রে অধিবেশন এবং মাথাপিছু ভোটের দাবি তোলে। এই দাবি গৃহীত হলে সংখ্যার সুবিধার পাশাপাশি সংস্কারপন্থী যাজক ও অভিজাতদের সমর্থনও কাজে লাগানো যেত। বিপরীতে পৃথক অধিবেশন বজায় থাকলে বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত গোষ্ঠীগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অক্ষুণ্ণ থাকত। ভোটের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক আসলে নির্ধারণ করছিল, জন্মভিত্তিক গোষ্ঠীর অধিকার বড়, নাকি জাতীয় প্রতিনিধিত্ব। প্রতিনিধিসংখ্যা বাড়লেও ভোটের নিয়ম অপরিবর্তিত থাকলে বাস্তব ক্ষমতা বদলাত না।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজা আনুগত্য ও সহযোগিতার প্রত্যাশা জানান; অর্থমন্ত্রী নেকার আর্থিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ভোটের প্রশ্নে পরিষ্কার সমাধান আসে না। এরপর প্রতিনিধিদের নির্বাচনী বৈধতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও অচলাবস্থা তৈরি হয়। যাজক ও অভিজাতদের অধিকাংশ আলাদাভাবে যাচাই করতে চাইলেও তৃতীয় এস্টেট যৌথ যাচাইয়ের ওপর জোর দেয়। আপাতদৃষ্টিতে আনুষ্ঠানিক এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল: একসঙ্গে যাচাই মানে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক সভার ভিত্তি স্বীকার করা।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ আলোচনা চলতে থাকে। তৃতীয় এস্টেট নিজেদের ‘কমিউন’ বা সাধারণ প্রতিনিধিদের সমাবেশ হিসেবে উপস্থাপন করে অন্য দুই এস্টেটকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। এ সময় আব্বে ইমানুয়েল-জোসেফ সিয়েসের চিন্তা বিশেষ প্রভাব ফেলে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল, জাতির উৎপাদনশীল কাজ ও সামাজিক জীবন যাঁরা পরিচালনা করেন, সেই তৃতীয় এস্টেটকে রাজনৈতিকভাবে অধস্তন রাখা অযৌক্তিক। যাজক হয়েও তিনি তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জুন মাসে অচলাবস্থা ভাঙতে শুরু করে। ১৩ জুন কয়েকজন গ্রামীণ যাজক তৃতীয় এস্টেটের সঙ্গে যোগ দেন; পরে আরও অনেকে আসেন। এটি দেখায়, প্রথম এস্টেটের ভেতরেও বিভাজন গভীর ছিল। সাধারণ যাজকদের অনেকে অভিজাত বিশপদের তুলনায় নিজ এলাকার মানুষের সমস্যার সঙ্গে বেশি পরিচিত ছিলেন। তাঁদের যোগদান তৃতীয় এস্টেটের দাবিকে শক্তিশালী করে: এই সমাবেশ কেবল একটি গোষ্ঠীর সভা নয়, বৃহত্তর জাতীয় প্রতিনিধিত্বের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

১৭ জুন প্রতিনিধিরা নিজেদের ‘জাতীয় পরিষদ’ ঘোষণা করেন। নামের এই পরিবর্তন ছিল সার্বভৌম কর্তৃত্বের দাবি। তাঁরা বোঝালেন, তাঁদের বৈধতা কেবল রাজার আহ্বান থেকে আসেনি; জাতির প্রতিনিধিত্ব থেকেও এসেছে। পরিষদ করের বৈধতা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানায় এবং সরকারি ঋণদাতাদের আশ্বস্ত করার উদ্যোগ নেয়। অর্থাৎ রাজতন্ত্রের আর্থিক সংকট সমাধানের জন্য ডাকা সভাই রাষ্ট্রের আয় ও দায়ের ওপর নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করল।

এরপর ২০ জুন প্রতিনিধিরা তাঁদের নিয়মিত সভাকক্ষ বন্ধ দেখতে পান। রাজকীয় অধিবেশনের প্রস্তুতির জন্য সেখানে প্রবেশ বন্ধ ছিল, কিন্তু উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাঁরা এটিকে সভা ভেঙে দেওয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন। বাইরে অপেক্ষা করে ছত্রভঙ্গ হওয়ার পরিবর্তে তাঁরা কাছের একটি ছাদযুক্ত জ্যু দ্য পোম খেলার ঘরে সমবেত হন। আধুনিক টেনিস কোর্টের সঙ্গে এই ঘরের সরাসরি মিল ছিল না; এটি ছিল পুরোনো ধরনের বলখেলার স্থান।

সেখানে পরিষদের সভাপতি জ্যঁ-সিলভাঁ বাইয়ির নেতৃত্বে প্রতিনিধিরা অঙ্গীকার করেন, ফ্রান্সের সংবিধান প্রতিষ্ঠিত ও সুদৃঢ় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা বিচ্ছিন্ন হবেন না এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যেখানে সম্ভব মিলিত হবেন। এই টেনিস কোর্ট শপথের মূল কথা ছিল: সভাকক্ষ বন্ধ করে জাতীয় প্রতিনিধিত্ব বন্ধ করা যাবে না। প্রায় সর্বসম্মত সমর্থনের বিপরীতে জোসেফ মার্ত্যাঁ-দোশ স্পষ্ট আপত্তি জানান। শপথের রাজনৈতিক গুরুত্ব ঐক্যের পাশাপাশি এই দৃঢ়তায়ও নিহিত ছিল।

শপথটি কোনো প্রস্তুত সংবিধান ছিল না। এতে ক্ষমতার পূর্ণ কাঠামো, ভোটাধিকার কিংবা রাজার ভবিষ্যৎ ভূমিকার বিস্তারিত নির্ধারণ করা হয়নি। কিন্তু প্রতিনিধিরা নিজেদের অস্তিত্বকে রাজার অনুমতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল রাখতে অস্বীকার করেছিলেন। রাজা সভা ডাকতে পারেন বলে ইচ্ছামতো জাতির প্রতিনিধিত্ব শেষও করতে পারবেন—এই প্রচলিত ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সংবিধান রচনার অধিকার এভাবে রাজকীয় কর্তৃত্বের ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে সামনে আসে।

২৩ জুন রাজকীয় অধিবেশনে ষোড়শ লুই কিছু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ১৭ জুনের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করেন এবং পৃথক এস্টেটে আলোচনার নির্দেশ দেন। রাজা চলে যাওয়ার পর তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা নিজেদের আসনে থেকে যান। বাইয়ি ও মিরাবোর মতো নেতারা পরিষদের অবস্থান সমর্থন করেন। মিরাবোর প্রতিবাদ ঘিরে বিখ্যাত উক্তির বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও ঘটনাটির নিশ্চিত রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল পরিষ্কার: প্রতিনিধিরা রাজকীয় নির্দেশের মুখেও সভা ত্যাগ করতে অস্বীকার করেছিলেন।

অবশেষে ২৭ জুন রাজা অবশিষ্ট যাজক ও অভিজাত প্রতিনিধিদের যৌথ পরিষদে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। এটি জাতীয় পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ বিজয়, তবে সংকটের চূড়ান্ত সমাধান ছিল না। ৯ জুলাই পরিষদ সংবিধান প্রণয়নকারী জাতীয় পরিষদ হিসেবে কাজ শুরু করে। একই সময়ে প্যারিস ও ভার্সাইয়ের আশপাশে সৈন্যসমাবেশ সন্দেহ বাড়াচ্ছিল। প্রতিনিধিরা যুক্তি ও শপথ দিয়ে জাতীয় কর্তৃত্ব দাবি করেছিলেন; এখন প্রশ্ন উঠল, রাজদরবার শক্তি প্রয়োগ করলে তাঁদের রক্ষা করবে কে? সেই আশঙ্কাই শিগগির প্যারিসের জনতাকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসবে।