বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি: স্বৈরশাসন, বৈষম্য, অর্থনৈতিক সংকট ও আলোকায়ন

সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব

ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি: স্বৈরশাসন, বৈষম্য, অর্থনৈতিক সংকট ও আলোকায়ন
প্রাসাদের ঐশ্বর্য আর রুটির অভাবের মাঝেই জমছিল বিপ্লবের বারুদ।

১৭৮৯ সালের শুরুতে ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাজ্য। তার বিপুল জনসংখ্যা, সমৃদ্ধ কৃষিভূমি, ব্যস্ত বন্দর এবং প্রভাবশালী সংস্কৃতি ছিল। অথচ এই শক্তিশালী রাষ্ট্রের রাজকোষ প্রায় অচল, শহরে রুটির দাম বাড়ছিল, আর গ্রামে কৃষকের আয়ের ওপর বসে ছিল নানান দাবির বোঝা। ফরাসি বিপ্লব কেবল ক্ষুধার বিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের অর্থসংকট, বিশেষাধিকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন চিন্তার সম্মিলিত ফল। দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে বিপ্লবে পরিণত করেছিল এসব সংকটের একই সময়ে তীব্র হয়ে ওঠা।

বিপ্লবের আগের ফরাসি ব্যবস্থাকে বলা হয় আঁসিয়াঁ রেজিম বা পুরোনো শাসনব্যবস্থা। এর কেন্দ্রে ছিল বুরবোঁ রাজতন্ত্র। রাজা ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকারে শাসন করেন—এই ধারণা রাজক্ষমতাকে নৈতিক বৈধতা দিত। মন্ত্রী নিয়োগ, বৈদেশিক নীতি এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাজাই ছিলেন প্রধান কর্তৃপক্ষ। জনগণের নির্বাচিত কোনো স্থায়ী জাতীয় আইনসভা তাকে নিয়মিত জবাবদিহির মধ্যে রাখত না। ১৬১৪ সালের পর জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান এস্টেটস-জেনারেলও আর ডাকা হয়নি।

তবে রাজা ইচ্ছামতো সবকিছু করতে পারতেন—এমন ধারণাও অসম্পূর্ণ। প্রাদেশিক অধিকার, প্রচলিত আইন, পদ কেনার মাধ্যমে গড়ে ওঠা কর্মকর্তাগোষ্ঠী এবং পার্লেমাঁ নামের উচ্চ আদালতগুলো রাজকীয় উদ্যোগে বাধা দিতে পারত। এগুলো আধুনিক সংসদ ছিল না। ফলে ব্যবস্থাটিতে অদ্ভুত দ্বন্দ্ব ছিল: রাজক্ষমতা জনসাধারণের কাছে জবাবদিহিহীন, অথচ জরুরি সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও প্রায়ই অক্ষম। ষোড়শ লুইয়ের সিদ্ধান্তহীনতা ও নীতির পরিবর্তন এই দুর্বলতাকে আরও প্রকাশ্য করে তোলে।

ফরাসি সমাজ আইনগতভাবে তিনটি এস্টেটে বিভক্ত ছিল। প্রথম এস্টেট যাজকসমাজ, দ্বিতীয়টি অভিজাত সম্প্রদায় এবং তৃতীয়টি বাকি বিপুল জনগোষ্ঠী। তৃতীয় এস্টেটের মধ্যে ছিলেন কৃষক, দিনমজুর, কারিগর, দোকানদার, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও ধনী অর্থলগ্নিকারী। অর্থাৎ এটি কোনো একক দরিদ্র শ্রেণি ছিল না। জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হয়েও এই মানুষেরা জন্মগত মর্যাদার কাঠামোয় যাজক ও অভিজাতদের নিচে অবস্থান করতেন।

ক্যাথলিক চার্চ ছিল বড় জমির মালিক এবং শিক্ষা, দাতব্যসেবা ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। কৃষিজ উৎপাদনের ওপর চার্চ দিম নামে ধর্মীয় পাওনা আদায় করত, যার হার অঞ্চল ও ফসলভেদে পরিবর্তিত হতো। সাধারণ রাজকীয় করের বদলে চার্চ দর-কষাকষির ভিত্তিতে বিশেষ অনুদান দিত। তবে প্রথম এস্টেটও ঐক্যবদ্ধ ছিল না: ধনী বিশপের জীবনযাত্রা এবং গ্রামের স্বল্প আয়ের যাজকের বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান ছিল।

অভিজাতদের সুবিধার মধ্যে ছিল মর্যাদাপূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় পদে প্রবেশের সুযোগ, বিভিন্ন করছাড় এবং জমির সঙ্গে যুক্ত সামন্তীয় পাওনা। সব অভিজাত সমান ধনী ছিলেন না, সবাই সব কর থেকেও মুক্ত ছিলেন না। তবু একই রাষ্ট্রে জন্মপরিচয়ের কারণে মানুষের দায় ও সুযোগ আলাদা হওয়াই ছিল বৈষম্যের মূল সমস্যা। কোনো ধনী ব্যবসায়ী অর্থনৈতিকভাবে সফল হয়েও অভিজাতের সামাজিক সম্মান কিংবা নির্দিষ্ট উচ্চপদে প্রবেশের সুবিধা সহজে পেতেন না।

গ্রামের কৃষকদের জন্য এই বৈষম্য ছিল দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। জমির খাজনা ও রাষ্ট্রীয় করের পাশাপাশি চার্চের পাওনা এবং জমিদারি অধিকারের বিভিন্ন দাবি মেটাতে হতো। কোথাও নির্দিষ্ট চুল্লি বা কল ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে হতো; কোথাও জমি হস্তান্তরে অতিরিক্ত পাওনা ছিল। শিকারের বিশেষাধিকারের কারণে ফসলের ক্ষতি হলেও কৃষকের প্রতিকার সীমিত হতে পারত। ফলে জমির মালিক কৃষকও সম্পূর্ণ স্বাধীন অর্থনৈতিক অবস্থানে ছিলেন না।

করব্যবস্থাও ছিল জটিল ও অসম। তাইয়, মাথাপিছু কর, আয়ভিত্তিক কর এবং লবণের ওপর গাবেল—বিভিন্ন ব্যবস্থার বোঝা অঞ্চল ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী বদলাত। পরোক্ষ করের একটি অংশ ইজারাদারদের মাধ্যমে আদায় করা হতো। প্রদেশগুলোর মধ্যে শুল্ক ও আলাদা নিয়ম বাণিজ্যকেও বাধাগ্রস্ত করত। দরিদ্র মানুষের ক্ষোভ তাই শুধু করের পরিমাণ নিয়ে ছিল না; কেন তুলনামূলক সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী সমানভাবে দায় বহন করবে না, সেই প্রশ্নও ক্রমে তীব্র হচ্ছিল।

এদিকে রাষ্ট্রের অর্থসংকটের প্রধান উৎস ছিল দীর্ঘ যুদ্ধ ও ঋণ। সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ব্যয় এবং পরাজয়ের পর ফ্রান্স ব্রিটেনকে দুর্বল করতে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করে। এতে কূটনৈতিক সাফল্য এলেও ঋণের বোঝা বেড়ে যায়। রাজদরবারের বিলাসিতা মানুষের ক্ষোভের দৃশ্যমান প্রতীক ছিল, কিন্তু কেবল প্রাসাদের খরচ দিয়ে সংকট ব্যাখ্যা করা যায় না। ঋণের সুদ ও পুরোনো দেনা মেটাতেই রাজস্বের বিরাট অংশ চলে যাচ্ছিল।

সমাধানের জন্য দরকার ছিল করের ভিত্তি বিস্তৃত করা এবং সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকেও আরও নিয়মিতভাবে করের আওতায় আনা। তুর্গো, নেকার ও কালোনের মতো অর্থব্যবস্থাপকের উদ্যোগ বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ১৭৮৭ সালে কালোনের প্রস্তাবিত সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সভা বসে, কিন্তু প্রত্যাশিত সমর্থন মেলেনি। অভিজাত ও উচ্চ আদালতগুলোর প্রতিরোধে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: নতুন কর অনুমোদনের বৈধ অধিকার কার?

এই বিরোধে অভিজাতদের অবস্থান দ্বিমুখী ছিল। তারা রাজকীয় স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে আইন ও সম্মতির কথা বলছিলেন, কিন্তু নিজেদের বিশেষাধিকারও রক্ষা করতে চাইছিলেন। রাজতন্ত্রকে ঠেকানোর জন্য এস্টেটস-জেনারেলের দাবি তোলা হলে জাতীয় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন বৃহত্তর আলোচনায় আসে। বিশেষাধিকার রক্ষার সংঘাতই অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই বিশেষাধিকারকে চ্যালেঞ্জ করার রাজনৈতিক দরজা খুলে দেয়। অর্থসংকট এভাবেই শাসনের বৈধতা নিয়ে সংকটে রূপ নিচ্ছিল।

এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে ১৭৮৮ সালের খারাপ ফসল এবং পরবর্তী কঠোর শীত পরিস্থিতি বিপজ্জনক করে তোলে। শস্যের সরবরাহে চাপ পড়ে, রুটির দাম বাড়ে। শ্রমজীবী পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় হওয়ায় অন্য পণ্যের চাহিদা কমে যায়; কারিগর ও উৎপাদনশ্রমিকের কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুধা এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা একে অন্যকে বাড়িয়ে তুলছিল। বাজারে শস্য থাকলেও কেনার সামর্থ্য না থাকা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল গভীর অন্যায়।

রুটি তখন কেবল খাদ্য ছিল না, সুশাসনেরও পরীক্ষা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, রাজা ন্যায্যমূল্যে খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন। মূল্যবৃদ্ধির সময় মজুতদার ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সন্দেহ ছড়াত; প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাও ষড়যন্ত্রের প্রমাণ বলে মনে হতে পারত। রাজপরিবারকে ঘিরে কুৎসা ও রাজনৈতিক পুস্তিকা এই অবিশ্বাস বাড়িয়েছিল। মেরি আঁতোয়ানেতের নামে প্রচলিত কেক খাওয়ার মন্তব্যটির নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, কিন্তু এমন গল্প জনপ্রিয় হওয়াই রাজদরবারের ভাবমূর্তির পতন বোঝায়।

অন্যদিকে আলোকায়নের চিন্তা মানুষকে ক্ষমতা বিচার করার নতুন ভাষা দিয়েছিল। মঁতেস্কিয়ো ক্ষমতার বিভাজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন; ভলতেয়ার ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও বিচারিক অন্যায়ের সমালোচনা করেন; রুশো রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা বিকশিত করেন। তাদের মত এক ছিল না, সবাই গণতান্ত্রিক বিপ্লবও চাননি। তবু শাসনকে জন্মগত অধিকার হিসেবে মেনে নেওয়ার বদলে যুক্তি, আইন ও জনস্বার্থের মানদণ্ডে বিচার করার অভ্যাস পুরোনো ব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করেছিল।

বই, সংবাদপত্র, পুস্তিকা, পাঠচক্র, সেলুন ও কফিহাউস এসব চিন্তার প্রসার ঘটায়। সেন্সরশিপ থাকলেও নিষিদ্ধ লেখা ছড়াত। আইনজীবী ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা নিজেদের দক্ষতার সঙ্গে সামাজিক অবস্থানের অসামঞ্জস্য দেখতে পাচ্ছিলেন। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘটনাও দেখিয়েছিল, প্রতিনিধিত্ব ও অধিকারের দাবি বাস্তব রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠনের ভিত্তি হতে পারে। যদিও বিপ্লবের আগে অধিকাংশ ফরাসি সরাসরি রাজতন্ত্র বিলোপ চাইছিলেন না; অনেকেই প্রত্যাশা করছিলেন ন্যায্য কর, আইনের সমতা এবং সীমাবদ্ধ রাজক্ষমতা।

১৭৮৮ সালের আগস্টে সরকার এস্টেটস-জেনারেল আহ্বানের ঘোষণা দিলে এই বিচ্ছিন্ন প্রত্যাশাগুলো একটি জাতীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করে। অভিযোগপত্রে মানুষ কর, সামন্তীয় দাবি, প্রশাসনিক অন্যায় ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নিজেদের বক্তব্য জানাতে শুরু করে। কিন্তু পুরোনো নিয়মে প্রতিটি এস্টেট একটি করে ভোট পেলে প্রথম দুই এস্টেট মিলেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিদের হারিয়ে দিতে পারত। ১৭৮৯ সালের মে মাসে প্রতিনিধিরা ভার্সাইয়ে সমবেত হওয়ার আগেই প্রশ্নটি বদলে গিয়েছিল: রাজকোষ কীভাবে বাঁচবে থেকে ফ্রান্সের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সংস্কারের প্রত্যাশা বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাবে।