বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আটাকামা মরুভূমি: পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক স্থানে বছরের পর বছর বৃষ্টি হয় না কেন?

আটাকামা মরুভূমি: পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক স্থানে বছরের পর বছর বৃষ্টি হয় না কেন?
মেঘ আছে, অথচ বৃষ্টি নেই আটাকামায়

দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগর ও আন্দিজ পর্বতমালার মাঝখানে বিস্তৃত আটাকামা মরুভূমিকে দেখলে মনে হতে পারে, পৃথিবীর এই অংশ থেকে বৃষ্টি যেন ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে থাকে। কোথাও লালচে পাথরের উপত্যকা, কোথাও ধবধবে সাদা লবণের সমতল ভূমি, কোথাও আবার আগ্নেয়গিরির সারির নিচে ধুলোময় মালভূমি। কিছু অঞ্চলে বছরের পর বছর পরিমাপযোগ্য বৃষ্টিই হয় না। আটাকামার কেন্দ্রীয় অংশের কোনো কোনো আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ধরে এক ফোঁটা বৃষ্টিও নথিভুক্ত হয়নি। কিন্তু এই চরম শুষ্কতা শুধু কম মেঘ বা অতিরিক্ত তাপের ফল নয়। মহাসাগরীয় স্রোত, বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতা, উপকূলীয় পর্বত, আন্দিজের বিশাল প্রাচীর এবং উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ—সব মিলিয়ে এখানে এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা বৃষ্টি সৃষ্টির প্রায় প্রতিটি পথই বন্ধ করে দেয়।

আটাকামা মূলত উত্তর চিলিতে অবস্থিত, যদিও এর শুষ্ক পরিবেশ পেরুর দক্ষিণাঞ্চলের দিকেও প্রসারিত। পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, পূর্বে আন্দিজ পর্বতমালা এবং মাঝখানে চিলির উপকূলীয় পর্বতশ্রেণি একে ঘিরে রেখেছে। মরুভূমিটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার কিলোমিটার হলেও এর সব অংশ সমান শুষ্ক নয়। উপকূল, অন্তর্দেশীয় নিম্নভূমি, লবণাক্ত অববাহিকা এবং উঁচু মালভূমির জলবায়ুর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তাই সমগ্র আটাকামাকে বৃষ্টিহীন একটি অভিন্ন ভূমি ভাবা ঠিক হবে না। এর সবচেয়ে শুষ্ক কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে অনেক সময় অতিশুষ্ক কেন্দ্র বলা হয়, যেখানে গাছপালা প্রায় অনুপস্থিত এবং মাটিতে জীবনের চিহ্ন খুঁজে পাওয়াও কঠিন।

আটাকামার শুষ্কতার প্রথম বড় কারণ প্রশান্ত মহাসাগরের হামবোল্ট স্রোত। অ্যান্টার্কটিকার কাছাকাছি শীতল অঞ্চল থেকে আসা এই সাগরস্রোত দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ধরে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়। এর ঠান্ডা পানি উপকূলের ওপরের বাতাসকেও শীতল করে। সাধারণভাবে উষ্ণ সমুদ্র থেকে প্রচুর পানি বাষ্প হয়ে ওপরে উঠে, তারপর ঠান্ডা হয়ে মেঘ ও বৃষ্টি সৃষ্টি করে। কিন্তু আটাকামার উপকূলে সমুদ্রের উপরিভাগ তুলনামূলক ঠান্ডা হওয়ায় বাষ্পীভবনের হার কম থাকে। ফলে বৃষ্টি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুর শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ গড়ে উঠতে পারে না।

শীতল সাগরের ওপরের বাতাস ঠান্ডা হলেও তার ওপরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বায়ুর একটি স্তর থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় ভূমির কাছাকাছি উষ্ণ বাতাস হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। কিন্তু আটাকামার উপকূলে এই বিন্যাস উল্টে যায়—নিচে ঠান্ডা ও ভারী বায়ু, ওপরে উষ্ণ বায়ু। একে তাপমাত্রার বিপরীতক্রম বলা হয়। ওপরের উষ্ণ স্তরটি ঢাকনার মতো কাজ করে নিচের ঠান্ডা বাতাসকে আটকে রাখে। ফলে আর্দ্র বাতাস ওপরে উঠে বড় বৃষ্টিবাহী মেঘে পরিণত হতে পারে না। নিচু স্তরে কুয়াশা বা পাতলা মেঘ তৈরি হলেও তা থেকে সাধারণত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয় না।

এই উপকূলীয় কুয়াশা স্থানীয়ভাবে কামানচাকা নামে পরিচিত। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্রতা ঠান্ডা বাতাসে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়ে উপকূলের কাছে ঘন কুয়াশা সৃষ্টি করে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে বৃষ্টির মেঘ জমেছে, কিন্তু সেই মেঘের উল্লম্ব বিস্তার খুব কম। বড় বৃষ্টির ফোঁটা তৈরির জন্য মেঘের ভেতরে যে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ এবং পর্যাপ্ত গভীরতা দরকার, তা এখানে থাকে না। তাই আকাশ মেঘলা হলেও ভূমি শুষ্ক থেকে যায়। কোনো কোনো স্থানে এই কুয়াশাই উদ্ভিদ ও মানুষের জন্য পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

আটাকামার পশ্চিম দিকে চিলির উপকূলীয় পর্বতশ্রেণি আরেকটি বাধা তৈরি করেছে। সাগর থেকে আসা নিচু কুয়াশা ও আর্দ্র বাতাস অনেক ক্ষেত্রে এই পাহাড় অতিক্রম করে মরুভূমির অভ্যন্তরে পৌঁছাতে পারে না। পাহাড়ের সাগরমুখী ঢালে কুয়াশা আটকে যায়, কিন্তু পর্যাপ্ত উচ্চতায় উঠে ভারী বৃষ্টি ঘটানোর মতো শক্তি পায় না। এর ফলে উপকূলের কাছাকাছি কিছু পাহাড়ে কুয়াশানির্ভর ঝোপঝাড় জন্মালেও পাহাড়ের অপর পাশে ভূমি অত্যন্ত শুষ্ক থাকে। অর্থাৎ মহাসাগর খুব কাছে থাকা সত্ত্বেও তার আর্দ্রতা মরুভূমির কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে না।

পূর্ব দিক থেকে সম্ভাব্য আর্দ্রতা আসার পথ বন্ধ করেছে আন্দিজ পর্বতমালা। আটলান্টিক মহাসাগর ও আমাজন অববাহিকা থেকে আসা আর্দ্র বায়ু দক্ষিণ আমেরিকার ভেতর দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হলে আন্দিজের পূর্ব ঢালে বাধা পায়। পাহাড় বেয়ে ওঠার সময় বাতাস ঠান্ডা হয় এবং তার জলীয় বাষ্প বৃষ্টি বা তুষার হিসেবে পূর্ব দিকেই ঝরে পড়ে। বাতাস যখন পর্বত অতিক্রম করে পশ্চিম ঢালে নামে, তখন সেটি আগের তুলনায় অনেক শুষ্ক হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় আন্দিজের পশ্চিমে একটি বিশাল বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চল তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে আটাকামা।

ফলে আটাকামা একদিকে উপকূলীয় পর্বতমালা এবং অন্যদিকে আন্দিজের দ্বৈত বৃষ্টিচ্ছায়ার মধ্যে বন্দী। পশ্চিমের প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্রতা উপকূলীয় শৈলশ্রেণি ও স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডলে আটকা পড়ে, আর পূর্বের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে আসা আর্দ্রতা আন্দিজে বাধা পায়। পৃথিবীর খুব কম মরুভূমিই এমন দুটি শক্তিশালী ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকের মাঝখানে অবস্থিত। এই বিশেষ অবস্থানের কারণেই আটাকামার শুষ্কতা শুধু ঋতুভিত্তিক নয়; ভূতাত্ত্বিক সময় ধরে টিকে থাকা একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।

এখানকার শুষ্কতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়। এই অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশ থেকে বাতাস নিচের দিকে নেমে আসে। নিচে নামার সময় বায়ুর চাপ বাড়ে এবং তা উষ্ণ হয়ে ওঠে। উষ্ণ হওয়ায় বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে যায় এবং মেঘ তৈরির সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ঊর্ধ্বমুখী বাতাস মেঘ ও বৃষ্টিকে উৎসাহিত করে, কিন্তু নিম্নমুখী বাতাস সেই প্রক্রিয়াকে দমন করে। আটাকামার ওপর এই উচ্চচাপের প্রভাব দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকায় আকাশ অধিকাংশ সময় পরিষ্কার ও স্থিতিশীল থাকে।

মরুভূমি শুনলেই প্রচণ্ড গরমের কথা মনে হলেও আটাকামার সব স্থান সব সময় উত্তপ্ত থাকে না। উপকূলীয় এলাকায় শীতল হামবোল্ট স্রোতের কারণে তাপমাত্রা তুলনামূলক মৃদু হতে পারে। আবার উঁচু মালভূমিতে রাতে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়। দিনের বেলায় তীব্র সূর্যালোক ভূমিকে দ্রুত গরম করলেও বাতাসে জলীয় বাষ্প ও আকাশে মেঘের অভাবের কারণে রাতে তাপ দ্রুত মহাশূন্যে বিকিরিত হয়। ফলে একই দিনে তাপমাত্রার বড় পার্থক্য দেখা যেতে পারে। আটাকামার শুষ্কতা তাই শুধু তাপের কারণে সৃষ্টি হয়নি; ঠান্ডা পরিবেশেও যে চরম মরুভূমি গড়ে উঠতে পারে, এটি তার পরিষ্কার উদাহরণ।

আটাকামায় একেবারেই বৃষ্টি হয় না—এ কথাটিও পুরোপুরি সঠিক নয়। উপকূল, অতিশুষ্ক কেন্দ্র এবং পূর্বের উচ্চ মালভূমিতে বৃষ্টির ধরন ভিন্ন। মরুভূমির উচ্চ পূর্বাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে আন্দিজের দিকে কিছু আর্দ্রতা পৌঁছালে বজ্রঝড়, বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত হতে পারে। শীতকালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আবহাওয়াব্যবস্থার প্রভাবে কোনো কোনো অংশে অল্প বৃষ্টি আসে। আবার এল নিনোর মতো মহাসাগরীয় পরিবর্তনের সময় শীতল সাগরপৃষ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে গেলে বাষ্পীভবন ও মেঘ গঠনের পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তখন সাধারণত শুষ্ক অঞ্চলেও হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

দীর্ঘ শুষ্কতার পর অল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টি হলে আটাকামার শক্ত মাটি পানি শোষণ করতে পারে না। তখন শুকনো নদীখাত দিয়ে আকস্মিক বন্যা নেমে আসে। পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে জনবসতির দিকে ছুটে যেতে পারে। এমন বৃষ্টি মরুভূমির জন্য আশীর্বাদের পাশাপাশি বিপদও ডেকে আনে। শুষ্ক পরিবেশের উপযোগী রাস্তা, ঘরবাড়ি ও নিকাশিব্যবস্থা প্রায়ই প্রবল বর্ষণ সামলানোর জন্য তৈরি নয়। তাই কয়েক ঘণ্টার অস্বাভাবিক বৃষ্টি বহু বছরের স্বাভাবিক শুষ্কতার চেয়েও বেশি ক্ষতি করতে পারে।

বিরল বৃষ্টির পর আটাকামার কোনো কোনো অংশে সুপ্ত বীজ থেকে অসংখ্য ফুল ফুটে ওঠে। সাধারণ সময়ে যে ভূমি ধূসর বা বাদামি দেখায়, তা গোলাপি, বেগুনি, হলুদ ও সাদা ফুলের বিস্তীর্ণ বাগানে রূপ নিতে পারে। এই ঘটনাকে প্রস্ফুটিত মরুভূমি বলা হয়। মাটির নিচে বহু বছর অপেক্ষা করা বীজ পর্যাপ্ত আর্দ্রতা পেলে দ্রুত অঙ্কুরিত হয়, ফুল ফোটায় এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরবর্তী প্রজন্মের বীজ তৈরি করে। পানি শুকিয়ে গেলে গাছগুলো মারা যায়, কিন্তু নতুন বীজ আবার ভবিষ্যতের বৃষ্টির অপেক্ষায় মাটির নিচে সুপ্ত থাকে।

চরম শুষ্কতার কারণে আটাকামার বহু স্থানে জৈব পদার্থ খুব ধীরে পচে। মৃত উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহ ভাঙতে সাধারণত জীবাণু, আর্দ্রতা ও উপযোগী তাপমাত্রা দরকার। এখানে পানির অভাব অণুজীবের কার্যকলাপ সীমিত করে দেয়। কিছু স্থানে লবণের ঘনত্ব, অতিবেগুনি রশ্মি এবং রাসায়নিকভাবে সক্রিয় মাটিও জীবনের জন্য কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এ কারণে প্রাচীন বস্তু, কাপড়, চামড়া এবং মানবদেহের অবশেষ অন্য অনেক পরিবেশের তুলনায় দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত থাকতে পারে।

তবে আটাকামা প্রাণহীন নয়। উপকূলীয় কুয়াশার জলকণা সংগ্রহ করে বিভিন্ন শৈবাল, শৈবাকৃতি জীব, ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও ঝোপ টিকে থাকে। কিছু অণুজীব পাথরের ভেতর বা নিচে আশ্রয় নিয়ে তীব্র সূর্যালোক ও পানিশূন্যতা থেকে নিজেদের রক্ষা করে। লবণাক্ত মাটির জীবেরা অতি উচ্চ লবণঘনত্ব সহ্য করতে পারে। উঁচু এলাকার জলাভূমি ও লবণাক্ত হ্রদে অণুজীব, ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী এবং ফ্লেমিঙ্গো দেখা যায়। সেখানে বরফগলা পানি ও ভূগর্ভস্থ উৎস সীমিত জলভাণ্ডার তৈরি করে।

কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহের জন্য কিছু এলাকায় বিশেষ জাল ব্যবহার করা হয়। বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসা ক্ষুদ্র জলকণা জালের সূক্ষ্ম তন্তুতে আটকে একত্রিত হয়। বড় ফোঁটায় পরিণত হলে পানি নিচের সংগ্রাহক নালায় গড়িয়ে পড়ে। এই পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ পানি পাওয়া না গেলেও ছোট জনবসতি, চারাগাছ বা সীমিত কৃষিকাজে সহায়তা করা সম্ভব। এটি প্রমাণ করে, আটাকামায় বৃষ্টি না হলেও বাতাসে থাকা সামান্য আর্দ্রতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

মরুভূমির বিস্তীর্ণ সাদা অঞ্চলগুলো সাধারণ বালু নয়; অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো লবণ ও বিভিন্ন খনিজে গঠিত। অতি অল্প বৃষ্টিতে পাহাড় থেকে দ্রবীভূত খনিজ নিচু অববাহিকায় পৌঁছায়। কিন্তু সেখান থেকে সমুদ্রে যাওয়ার জন্য স্থায়ী নদীপথ না থাকায় পানি বাষ্প হয়ে যায় এবং খনিজ জমা থেকে যায়। লাখ লাখ বছর ধরে এই প্রক্রিয়ায় বিশাল লবণসমভূমি ও খনিজভাণ্ডার তৈরি হয়েছে। আটাকামায় তামা, লিথিয়াম, নাইট্রেট এবং অন্যান্য খনিজের গুরুত্বপূর্ণ মজুত রয়েছে। এগুলোর উত্তোলন চিলির অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করলেও সীমিত ভূগর্ভস্থ পানি ও ভঙ্গুর প্রতিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

বিশেষ করে লিথিয়ামসমৃদ্ধ লবণাক্ত জল উত্তোলন নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে। বৈদ্যুতিক যন্ত্র ও শক্তি সঞ্চয়কারী কোষ তৈরিতে লিথিয়ামের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু ভূগর্ভের লবণাক্ত জল ওপরে তুলে বাষ্পীভবন ঘটালে আশপাশের জলব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। মরুভূমিতে পানির পরিমাণ অতি সামান্য হওয়ায় ছোট পরিবর্তনও জলাভূমি, উদ্ভিদ, ফ্লেমিঙ্গো এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খনিজ সম্পদের ব্যবহার ও মরুভূমির জলব্যবস্থা সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত জরুরি।

আটাকামার শুষ্ক ও পরিষ্কার আকাশ পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প খুব কম থাকায় মহাকাশ থেকে আসা বিভিন্ন তরঙ্গ বায়ুমণ্ডলে তুলনামূলক কম শোষিত হয়। উঁচু ভূমি, মেঘহীন রাত, কম বৃষ্টিপাত এবং জনবসতি থেকে দূরের অন্ধকার আকাশ মহাকাশ পর্যবেক্ষণের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। এ কারণেই আটাকামার উঁচু মালভূমিতে বিশ্বের বহু শক্তিশালী দূরবীক্ষণযন্ত্র নির্মিত হয়েছে। সেখান থেকে নক্ষত্রের জন্ম, দূরবর্তী ছায়াপথ, কৃষ্ণগহ্বরের আশপাশ এবং মহাবিশ্বের প্রাচীন রাসায়নিক উপাদান পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এই মরুভূমির মাটি ও পরিবেশকে মঙ্গল গ্রহের সঙ্গে তুলনা করা হয়। উভয় স্থানেই অত্যন্ত কম আর্দ্রতা, তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণ, লবণাক্ত মাটি এবং জীবনের জন্য প্রতিকূল রাসায়নিক অবস্থা দেখা যায়। মহাকাশ গবেষকেরা আটাকামায় এমন যন্ত্র পরীক্ষা করেন, যেগুলো ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন খুঁজতে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে আটাকামা মঙ্গল গ্রহের হুবহু প্রতিরূপ নয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, অক্সিজেন, তাপমাত্রা এবং জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ আলাদা। তা সত্ত্বেও চরম পরিবেশে জীবন কীভাবে টিকে থাকে, তা বোঝার জন্য এটি একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার।

আটাকামা আজ এত শুষ্ক হলেও এর ইতিহাসের সব সময় একই রকম ছিল না। অতীতে জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো সময়ে বৃষ্টিপাত বেড়েছে, হ্রদ ও জলাভূমি তৈরি হয়েছে এবং মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাচীন জনগোষ্ঠী উপকূলীয় সামুদ্রিক সম্পদ, পাহাড়ি ঝরনা, ভূগর্ভস্থ পানি এবং বিরল নদীর ওপর নির্ভর করে জীবন গড়ে তুলেছিল। পরে ইনকা সাম্রাজ্যের পথ, ঔপনিবেশিক বাণিজ্য এবং খনিজ আহরণ এই মরুভূমিকে দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করে।

আটাকামার ভূপৃষ্ঠে নদীর পুরোনো পথ, শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের তলদেশ এবং প্রাচীন আর্দ্র সময়ের নানা চিহ্ন এখনও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা পলির স্তর, লবণের গঠন, জীবাশ্ম, ভূগর্ভস্থ পানি ও গুহার খনিজ বিশ্লেষণ করে অতীতের বৃষ্টিপাত সম্পর্কে ধারণা পান। এসব প্রমাণ দেখায় যে মরুভূমিটির শুষ্কতা অত্যন্ত প্রাচীন হলেও তার মাত্রা সব সময় এক ছিল না। দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের মধ্যে অপেক্ষাকৃত আর্দ্র পর্ব এসেছে, আবার তা শেষও হয়েছে।

কিছু প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, আটাকামার কোনো কোনো স্থানে কয়েকশ বছর বৃষ্টি হয়নি। এমন দাবির ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার, কারণ বহু শতাব্দী আগের নিরবচ্ছিন্ন আবহাওয়া পরিমাপ পাওয়া যায় না। জনবসতি ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্রভেদে তথ্যের সময়সীমাও আলাদা। তবে আধুনিক পরিমাপ, ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করে যে এর অতিশুষ্ক কেন্দ্রে দীর্ঘ বছর ধরে পরিমাপযোগ্য বৃষ্টি না হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোথাও সামান্য ফোঁটা পড়লেও তা মাটিকে গভীরভাবে ভেজানোর আগেই বাষ্প হয়ে যেতে পারে।

আটাকামায় পানির অভাবের অর্থ এই নয় যে এর নিচে কোনো পানি নেই। আন্দিজের তুষার ও বিরল বৃষ্টির পানি শিলার ফাটল দিয়ে নিচে নেমে ভূগর্ভস্থ জলাধারে জমতে পারে। কিছু পানি বহু প্রাচীন এবং আধুনিক বৃষ্টির মাধ্যমে দ্রুত পূরণ হয় না। জনবসতি, খনি ও কৃষিকাজে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করলে এই জলাধার নিঃশেষ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মরুভূমিতে একটি ঝরনা বা ক্ষুদ্র জলাভূমি হারিয়ে গেলে তার ওপর নির্ভরশীল সম্পূর্ণ জীবব্যবস্থাই বিলুপ্ত হতে পারে।

আটাকামার শুষ্কতার রহস্য তাই একটি মাত্র কারণে ব্যাখ্যা করা যায় না। শীতল হামবোল্ট স্রোত বাষ্পীভবন ও মেঘের উল্লম্ব বৃদ্ধি সীমিত করে। তাপমাত্রার বিপরীতক্রম নিচের আর্দ্র বাতাসকে আটকে রাখে। উপকূলীয় পর্বতমালা প্রশান্ত মহাসাগরের কুয়াশাকে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। আন্দিজ পূর্ব দিকের আর্দ্র বায়ু থেকে বৃষ্টি ঝরিয়ে ফেলে। উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ ওপর থেকে শুষ্ক বাতাস নামিয়ে মেঘ গঠন দমন করে। এই সব ব্যবস্থা একই সঙ্গে কাজ করায় আটাকামায় বৃষ্টি হওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি খুব কমই তৈরি হয়।

এই মরুভূমি দেখায়, পৃথিবীর জলবায়ু কেবল অক্ষাংশ বা সূর্যের তাপ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সমুদ্রস্রোত, বায়ুচাপ, পর্বতের অবস্থান, উচ্চতা ও বায়ুর গতিপথ একত্রে কোনো ভূখণ্ডের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগর একেবারে পাশে থাকা সত্ত্বেও আটাকামার কেন্দ্রে পানির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। কখনো সাগর থেকে কুয়াশা আসে কিন্তু বৃষ্টি আসে না, কখনো মেঘ আন্দিজের অন্য পাশে পানি ঝরিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, আবার কখনো উচ্চচাপ মেঘ তৈরির আগেই বাতাসকে শুষ্ক করে দেয়।

আটাকামার অসাধারণত্ব শুধু বছরের পর বছর বৃষ্টি না হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই শুষ্কতা লবণের সমভূমি তৈরি করেছে, খনিজ সম্পদ সংরক্ষণ করেছে, অণুজীবকে চরম অভিযোজন শিখিয়েছে, প্রাচীন নিদর্শন রক্ষা করেছে এবং মহাবিশ্ব দেখার জন্য পৃথিবীর অন্যতম পরিষ্কার জানালা খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিরল ফুলের বিস্ফোরণ, কুয়াশানির্ভর জীবন ও উচ্চভূমির জলাভূমি প্রমাণ করে যে প্রকৃতি সামান্য পানিকেও অসাধারণ দক্ষতায় কাজে লাগাতে পারে। পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক স্থান হয়েও আটাকামা তাই শূন্য কোনো ভূমি নয়; এটি পানি, বায়ু, পাথর ও জীবনের সীমা বোঝার এক বিশাল প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার।


আপনার পছন্দ হতে পারে