বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

একটি দেশ কি আরেকটি দেশের ভেতরে থাকতে পারে? এনক্লেভ ও এক্সক্লেভের অদ্ভুত ভূগোল

একটি দেশ কি আরেকটি দেশের ভেতরে থাকতে পারে? এনক্লেভ ও এক্সক্লেভের অদ্ভুত ভূগোল
মানচিত্রের রেখা কখনো একটি দেশকে ঘিরে ফেলে

মানচিত্রে একটি দেশের চারপাশে সাধারণত একাধিক প্রতিবেশী দেশ, সমুদ্র অথবা দুটোই থাকে। কিন্তু যদি একটি স্বাধীন দেশের প্রতিটি স্থলসীমান্ত একই দেশের সঙ্গে মিলে যায়? বাইরে বেরোতে হলে চারদিকের সেই এক দেশটির ভূখণ্ড দিয়েই যেতে হয়। এমন বিন্যাস কল্পনার বিষয় নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ভেতরে লেসোথো এবং ইতালির ভেতরে সান মারিনো ও ভ্যাটিকান সিটি তার বাস্তব উদাহরণ। আবার কোনো দেশের একটি ছোট ভূখণ্ড মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য দেশের মাঝখানে আটকে থাকতেও পারে। এই অদ্ভুত সীমান্তগুলো বোঝার জন্য ভূগোলে ব্যবহৃত দুটি শব্দ জানা দরকার: এনক্লেভ ও এক্সক্লেভ।

এনক্লেভ বলতে সাধারণভাবে এমন ভূখণ্ড বোঝায়, যা চারদিক থেকে অন্য একটি দেশের ভূখণ্ডে ঘেরা। চারপাশের দেশের দৃষ্টিতে সেটি তার ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা আলাদা রাজনৈতিক এলাকা। এক্সক্লেভ হলো কোনো দেশের নিজেরই এমন অংশ, যা দেশটির মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। পার্থক্যটি নির্ভর করে আমরা মানচিত্রের কোন দিক থেকে দেখছি তার ওপর। কল্পনা করুন, ‘ক’ দেশের একটি গ্রাম ‘খ’ দেশের ভেতরে সম্পূর্ণ ঘেরা। গ্রামটি ‘খ’ দেশের কাছে এনক্লেভ; আর নিজের দেশ ‘ক’-এর কাছে এক্সক্লেভ। তবে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশ নিজস্ব কোনো বৃহত্তর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ নয়। তাই লেসোথোকে এনক্লেভ রাষ্ট্র বলা যায়, এক্সক্লেভ নয়।

লেসোথো এই প্রশ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। আফ্রিকার দক্ষিণে অবস্থিত স্বাধীন দেশটির চারদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা। লেসোথোর কোনো স্থলসীমান্ত মোজাম্বিক, নামিবিয়া বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে নেই; সমুদ্রতীরও নেই। দেশটি থেকে স্থলপথে বাইরে যেতে হলে প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবেশ করতেই হবে। মানচিত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার সীমানার মধ্যে লেসোথোকে ছোট একটি পৃথক আকৃতি মনে হলেও বাস্তবে এটি নিজস্ব সরকার, জনসংখ্যা ও রাষ্ট্রপরিচয়সম্পন্ন দেশ। ‘অন্য দেশের ভেতরে’ কথাটি এখানে ভৌগোলিক অবস্থান বোঝায়, দক্ষিণ আফ্রিকার অধীন হওয়া বোঝায় না।

লেসোথোর ক্ষেত্রে পরিবেষ্টিত থাকার প্রভাব দৈনন্দিন অর্থনীতি ও যাতায়াতেও পড়ে। সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের প্রয়োজনে তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার পথ ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করতে হয়। স্থলপথে অন্য কোনো দেশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রেও দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্ত অতিক্রমের প্রশ্ন আসে। তবে চারদিকে একটি দেশ থাকার অর্থ এই নয় যে লেসোথোর মানুষ ইচ্ছামতো সীমান্ত পেরোতে পারেন, অথবা দক্ষিণ আফ্রিকা ইচ্ছামতো লেসোথো পরিচালনা করতে পারে। সীমান্ত পেরোনোর নিয়ম ও দুই দেশের পারস্পরিক ব্যবস্থা আলাদা বিষয়। মানচিত্রে সহজ একটি বৃত্তের মতো দেখালেও এর ভেতরে স্বাধীনতা, বাণিজ্য ও প্রতিবেশী সম্পর্কের বাস্তব জটিলতা রয়েছে।

ইউরোপের সান মারিনো আরেকটি পরিবেষ্টিত স্বাধীন রাষ্ট্র। এর চারদিকেই ইতালির ভূখণ্ড। সান মারিনো আয়তনে ছোট হলেও তার নিজস্ব রাষ্ট্রপরিচয় রয়েছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস এই দেশটিকে আলাদা করেছে। ইতালির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় কোনো পর্যটকের কাছে সীমান্ত পার হওয়ার অভিজ্ঞতা সব সময় নাটকীয় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু দৃশ্যমান কড়াকড়ি কম থাকলেই সীমান্তটি অদৃশ্য হয়ে যায় না। প্রশাসনিক মানচিত্রে সান মারিনো ইতালি থেকে পৃথক রাষ্ট্র।

ভ্যাটিকান সিটির অবস্থান আরও বিস্ময়কর। এটি ইতালির রাজধানী রোমের মধ্যেই অবস্থিত স্বাধীন রাষ্ট্র। একজন দর্শনার্থী রোমের রাস্তা দিয়ে হেঁটে ভ্যাটিকানের প্রবেশপথে পৌঁছাতে পারেন। বিশাল কোনো প্রাকৃতিক বাধা পেরোনোর প্রয়োজন হয় না, অথচ রাজনৈতিক সীমারেখা অতিক্রমের বিষয়টি বাস্তব। ভ্যাটিকান সিটি আয়তনে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তার চারদিকে ইতালি থাকলেও প্রশাসন ও রাষ্ট্রসত্তা পৃথক। ফলে ‘একটি দেশ অন্য দেশের শহরের মধ্যেও থাকতে পারে কি না’—এই প্রশ্নের উত্তরও ভ্যাটিকান দেখায়।

তবে ভ্যাটিকান, সান মারিনো ও লেসোথোকে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তের পুরোনো ছিটমহলের সঙ্গে এক করে দেখলে ভুল হবে। প্রথম তিনটি সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশ। অন্যদিকে ছিটমহল ছিল একটি দেশের বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড, যেখানে সেই দেশের মানুষ বাস করলেও চারপাশ ঘিরে ছিল অন্য দেশ। রাষ্ট্রের আকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা বদলে গেলে পরিবেষ্টিত ভূখণ্ডের বাস্তব সমস্যাও বদলে যায়। একটি স্বাধীন দেশ তার প্রতিবেশীর সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারে। কিন্তু সীমান্তে আটকে থাকা একটি ছোট গ্রামের বাসিন্দার জন্য কাছের থানা, বিদ্যালয় বা হাসপাতালে যাওয়াই বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত একসময় এই জটিলতার জন্য বিশ্বজুড়ে আলোচিত ছিল। ভারতের কিছু ছিটমহল বাংলাদেশের ভেতরে এবং বাংলাদেশের কিছু ছিটমহল ভারতের ভেতরে ছিল। মানচিত্রে এগুলো বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট দাগের মতো দেখা গেলেও সেখানে মানুষের বাড়িঘর, জমি ও দৈনন্দিন জীবন ছিল। নিজের দেশের মূল ভূখণ্ডে যেতে চারপাশের দেশের জমি পার হওয়ার প্রশ্ন উঠত। ফলে নাগরিক পরিচয় থাকলেও সরকারি সেবা পাওয়া, যাতায়াত করা এবং প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারত। কোনো ভৌগোলিক কৌতূহল যে মানুষের জীবনে কত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, এই সীমান্ত তার একটি বড় উদাহরণ।

সমস্যাটি আরও জটিল ছিল কারণ কিছু ভূখণ্ডের ভেতরেও অন্য দেশের ভূখণ্ড ছিল। কাগজে মানচিত্র আঁকার সময় একটি এলাকার মধ্যে আরেকটি ছোট এলাকা, তার মধ্যেও আরও একটি অংশ চিহ্নিত করতে হতো। কিন্তু সেখানে বসবাসকারীদের কাছে বিষয়টি ছিল বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোন দেশের আইন বা প্রশাসনের এলাকায় পা পড়ছে, সেই বাস্তব প্রশ্ন। সীমান্তরেখা যখন বারবার ঘুরে একই গ্রামের কাছে ফিরে আসে, তখন দূর থেকে দেখা মানচিত্রের নকশা আর মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের বহু পুরোনো ছিটমহল বিনিময় করা হয়। এর ফলে ঐতিহাসিক সেই জটিল সীমান্তব্যবস্থার বড় অংশের অবসান ঘটে এবং বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব ও প্রশাসনিক অন্তর্ভুক্তির পথ পরিষ্কার হয়। তাই আজকের বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত নিয়ে লিখতে গিয়ে পুরোনো ছিটমহলগুলোকে বর্তমানের সক্রিয় উদাহরণ হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। এগুলো এনক্লেভের ভূগোল বোঝার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ, পাশাপাশি সীমান্ত সরল করার একটি বাস্তব ঘটনার অংশ।

এনক্লেভের বিপরীতে এক্সক্লেভ বুঝতে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ অঞ্চলটি দেখা যেতে পারে। কালিনিনগ্রাদ রাশিয়ার অংশ, কিন্তু রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থলপথে সরাসরি যুক্ত নয়। অঞ্চলটির পাশে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়া এবং একদিকে বাল্টিক সাগর রয়েছে। রাশিয়ার দৃষ্টিতে এটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড বা এক্সক্লেভ। কিন্তু এটিকে কঠোর অর্থে এনক্লেভ বলা যায় না, কারণ এটি একটি মাত্র দেশের স্থলভূখণ্ডে চারদিক থেকে ঘেরা নয়; এর সমুদ্রতীরও আছে। এক্সক্লেভ দেখলেই এনক্লেভ ধরে নেওয়া কেন ভুল, কালিনিনগ্রাদ তার পরিষ্কার উদাহরণ।

আজারবাইজানের নাখচিভান অঞ্চলও মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। আজারবাইজানের মূল অংশ থেকে নাখচিভানে সরাসরি নিজের দেশের জমির ওপর দিয়ে স্থলপথে যাওয়া যায় না। অঞ্চলটি আর্মেনিয়া, ইরান ও তুরস্কের সীমান্তের কাছে অবস্থিত। এখানেও ‘বিচ্ছিন্ন’ হওয়ার বিষয়টি এক্সক্লেভ বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু নাখচিভান কোনো একক দেশের ভেতরে চারদিক থেকে ঘেরা নয়। ফলে এনক্লেভের সংজ্ঞা প্রয়োগের আগে চারপাশে ঠিক কী আছে—এক দেশ, একাধিক দেশ, না সমুদ্র—সেটি দেখা জরুরি।

ইউরোপে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের সীমান্তবর্তী বারলে অঞ্চল অন্য রকম এক বিস্ময়। সেখানে দুই দেশের ভূখণ্ডের সীমানা এত জটিলভাবে আঁকাবাঁকা যে শহরের আশপাশে এক দেশের জমির টুকরো অন্য দেশের এলাকার মধ্যে দেখা যায়। কোথাও রাস্তা ধরে হাঁটলে অল্প দূরত্বেই সীমান্ত পেরোনো সম্ভব। মানচিত্রে বিষয়টি ধাঁধার মতো দেখালেও স্থানীয় মানুষকে ঠিকানা, সম্পত্তি ও প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে কোন অংশ কোন দেশের, তা নির্দিষ্টভাবে জানতে হয়। এই উদাহরণ দেখায়, বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড সব সময় প্রত্যন্ত পাহাড় বা দূরের সীমান্তে থাকে না; জনবসতির মাঝেও থাকতে পারে।

তাহলে এত অদ্ভুত সীমানা তৈরি হয় কীভাবে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উত্তর লুকিয়ে আছে বহু পুরোনো ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে। শাসকের জমি, উত্তরাধিকার, যুদ্ধ, চুক্তি, ঔপনিবেশিক প্রশাসন কিংবা পরবর্তী সীমান্তনির্ধারণ—বিভিন্ন যুগের সিদ্ধান্ত এক মানচিত্রে এসে জমা হয়। সীমানা তৈরির সময় যে রেখাটি প্রশাসকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল, বহু বছর পরে সেখানে বসবাসকারী মানুষের চলাচলের জন্য সেটিই অসুবিধার কারণ হতে পারে। আবার কোনো দেশ কৌশলগত বা ঐতিহাসিক কারণে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডও ধরে রাখতে পারে। বর্তমান মানচিত্রের প্রতিটি অস্বাভাবিক বাঁকের পেছনে তাই একই কারণ খোঁজা যায় না।

মানচিত্র দেখার সময় আরেকটি সহজ ভুল হয়। কোনো দেশ চারদিকে অন্য দেশ দিয়ে ঘেরা থাকলেই সেটিকে নির্দিষ্ট একটি দেশের এনক্লেভ বলা যায় না। একাধিক ভিন্ন দেশ যদি তাকে ঘিরে রাখে, তবে ‘একটি দেশের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে থাকা’র শর্ত পূরণ হয় না। একইভাবে চারদিক স্থলভাগে ঘেরা রাষ্ট্র আর সমুদ্রতীর আছে এমন বিচ্ছিন্ন প্রদেশের অবস্থাও এক নয়। লেসোথো, ভ্যাটিকান ও সান মারিনো এক দেশের ভূখণ্ডে পরিবেষ্টিত স্বাধীন রাষ্ট্র; কালিনিনগ্রাদ ও নাখচিভান নিজ নিজ দেশের বিচ্ছিন্ন অংশ। এই শ্রেণিবিন্যাস মনে রাখলে জটিল মানচিত্র অনেক সহজ হয়ে যায়।

সবশেষে, প্রশ্নটির উত্তর সরাসরি দেওয়া যায়: হ্যাঁ, একটি স্বাধীন দেশ ভৌগোলিকভাবে আরেকটি দেশের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে থাকতে পারে। লেসোথো, সান মারিনো ও ভ্যাটিকান সিটি তার প্রমাণ। আবার একটি দেশের অংশ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে অবস্থান করলে তাকে এক্সক্লেভ বলা হয়; অন্য দেশের ভূখণ্ডে সম্পূর্ণ ঘেরা হলে একই অংশকে এনক্লেভও বলা যেতে পারে। সীমান্তের এই অদ্ভুত আকৃতিগুলো শুধু মানচিত্রের ধাঁধা নয়। রেখার এক পাশে বা অন্য পাশে বাস করা মানুষের নাগরিকত্ব, যাতায়াত ও সেবা পাওয়ার বাস্তব জীবনও এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।


আপনার পছন্দ হতে পারে