বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইতালির একটি ঝর্ণা থেকে সত্যিই কি ওয়াইন বের হয়? অর্তোনার বিস্ময়কর গল্প

ইতালির একটি ঝর্ণা থেকে সত্যিই কি ওয়াইন বের হয়? অর্তোনার বিস্ময়কর গল্প
ঝর্ণার কল থেকে ওয়াইন—অর্তোনার অভিনব আতিথেয়তা

ইতালির একটি ঝর্ণার কল খুললে পানির বদলে লাল ওয়াইন বের হয়—কথাটি শুনলে প্রথমে রূপকথা মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কোনো আশ্চর্য উৎস থেকে ওয়াইন উঠে আসছে। বাস্তব ঘটনা অবশ্য আরও আকর্ষণীয়। ইতালির আব্রুজ্জো অঞ্চলের অর্তোনা শহরের কাছে এমন একটি ঝর্ণা স্থাপন করা হয়েছে, যার কল দিয়ে সত্যিই ওয়াইন নেওয়া যায়। কিন্তু সেই ওয়াইন মাটির নিচে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় না। কাছের ওয়াইন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিজেদের উৎপাদিত পানীয় একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝর্ণাটিতে সরবরাহ করে। ফলে বিস্ময়কর দাবিটির উত্তর ‘হ্যাঁ’—তবে ঝর্ণাটি কীভাবে কাজ করে, তা বুঝলে গল্পটি আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

ঝর্ণাটির অবস্থান আব্রুজ্জোর কিয়েতি প্রদেশে, অর্তোনার অন্তর্গত কালদারি এলাকায়। এটি বড় কোনো শহরের মাঝখানে সাজানো বিশাল জলাধার নয়। আঙুরের বাগান ও গ্রামীণ পথের পরিবেশে তৈরি একটি তুলনামূলক ছোট ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দোরা সারকেজে নামের স্থানীয় ওয়াইন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। ঝর্ণাটিকে ঘিরে প্রচারিত ছবিতে একটি কলের নিচে গ্লাস ধরতে দেখা যায়। সেই দৃশ্যের সত্যতা আছে; ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয় যখন ছবির সঙ্গে ‘ইতালিতে ওয়াইনের নদী বইছে’ ধরনের অতিরঞ্জিত বর্ণনা যোগ করা হয়।

এই স্থানটি বোঝার জন্য অর্তোনার সঙ্গে একটি দীর্ঘ পদযাত্রাপথের সম্পর্ক জানা দরকার। রোম থেকে অর্তোনা পর্যন্ত বিস্তৃত সান তোম্মাসোর পথ ধরে মানুষ ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জন্য হাঁটেন। অর্তোনায় প্রেরিত সন্ত থমাসের স্মৃতিবিজড়িত একটি গির্জা রয়েছে; সেই কারণেও শহরটি পথিকদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসা মানুষের জন্য কোনো এলাকার পক্ষ থেকে সামান্য পানীয় এগিয়ে দেওয়া ইতালীয় আতিথেয়তার একটি পরিচিত ভাবনা। ওয়াইনের ঝর্ণা সেই ভাবনাকেই ব্যতিক্রমী রূপ দিয়েছে। এটি কেবল দেখার জিনিস নয়; পথ চলতে চলতে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ।

দোরা সারকেজে এবং পথটির সঙ্গে যুক্ত একটি স্থানীয় সংগঠনের উদ্যোগে ঝর্ণাটি চালু হয় ২০১৬ সালে। উদ্যোক্তারা স্পেনের একটি তীর্থপথে ওয়াইন দেওয়ার অনুরূপ ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রেরণা পান। অর্থাৎ অর্তোনার ঝর্ণাটির উদ্দেশ্য ছিল না অলৌকিক কোনো ঘটনার দাবি করা। পথিককে স্বাগত জানানো, আব্রুজ্জোর ওয়াইন তৈরির ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং পদযাত্রাপথটিকে মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলা—এই কয়েকটি উদ্দেশ্য এখানে একসঙ্গে কাজ করেছে। একটি সাধারণ পানীয় পরিবেশনের ব্যবস্থা এভাবেই স্থানীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

‘ঝর্ণা’ শব্দটি শুনে অনেকের চোখে যে দৃশ্য ভেসে ওঠে, বাস্তবটি তার চেয়ে আলাদা। সাধারণ প্রাকৃতিক ঝরনায় ভূগর্ভস্থ পানি নিজস্ব চাপে বা ভূমির ঢাল বেয়ে বেরিয়ে আসে। অর্তোনার ক্ষেত্রে পানীয়টি আগে আঙুর থেকে তৈরি হয়, তারপর সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা পেরিয়ে কল পর্যন্ত পৌঁছায়। কল খুললে গ্লাসে ওয়াইন পড়ে বলেই একে ওয়াইনের ঝর্ণা বলা হয়। এটি প্রকৃতির তৈরি ওয়াইনের উৎস নয়; মানুষের পরিকল্পনায় তৈরি একটি পানীয় সরবরাহব্যবস্থা। এই পার্থক্যটি ছোট মনে হলেও ঘটনাটির সবচেয়ে জরুরি তথ্য এখানেই।

ওয়াইন তৈরি হওয়ার পেছনেও রয়েছে ধাপে ধাপে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়া। আঙুর সংগ্রহের পর তা থেকে রস বের করা হয়। আঙুরের রসে থাকা শর্করা অণুজীবের ক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে পানীয়টিতে অ্যালকোহল তৈরি করে। লাল ওয়াইনের রং, স্বাদ ও গঠনে আঙুরের খোসার সংস্পর্শ বিশেষ ভূমিকা রাখে। এরপর প্রস্তুতকারক কাঙ্ক্ষিত মান অনুযায়ী পানীয়টি সংরক্ষণ ও পরিবেশন করেন। তাই কলের নিচে গ্লাস ধরার মুহূর্তটি যত সহজই দেখাক, তার আগে আছে আঙুরচাষ, উৎপাদন ও যত্নের দীর্ঘ কাজ। ঝর্ণাটি সেই কাজের শেষ ধাপটিকে পথিকের সামনে দৃশ্যমান করে।

আব্রুজ্জোর সঙ্গে লাল ওয়াইনের সম্পর্কও এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পাহাড়, ঢালু জমি এবং আঙুরচাষের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলে ওয়াইন স্থানীয় কৃষি ও খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। অর্তোনার ঝর্ণায় লাল ওয়াইন দেওয়া তাই কেবল দর্শকদের চমকে দেওয়ার কৌশল নয়; এলাকাটির নিজস্ব উৎপাদনের পরিচয় দেওয়ার উপায়ও। কেউ একটি ছোট গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আঙুরের বাগানের দিকে তাকালে একই সঙ্গে পানীয়টি এবং তার উৎপত্তিস্থলের সম্পর্ক দেখতে পান। বোতলের গায়ে লেখা এলাকার নাম এখানে বাস্তব ভূদৃশ্য হয়ে সামনে আসে।

ঝর্ণাটি নিয়ে প্রচারিত আরেকটি আকর্ষণীয় তথ্য হলো, সেখানে বিনামূল্যে ওয়াইন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর পেছনের ভাবনা ছিল পথিককে আপ্যায়ন করা। তবে ‘বিনামূল্যে’ কথাটির অর্থ এই নয় যে একজন ব্যক্তি যত খুশি সংগ্রহ করে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। পথিকের জন্য সামান্য পানীয় দেওয়া আর ব্যক্তিগত মজুতের জন্য পাত্র ভরে নেওয়া এক জিনিস নয়। উদ্যোক্তাদের প্রকাশিত বক্তব্যেও অসংযত আচরণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে ঝর্ণাটির সামাজিক নিয়ম বুঝতে হলে কলের পাশে দাঁড়ানো অন্য পথিক, প্রতিষ্ঠানের শ্রম এবং এই উপহারের উদ্দেশ্য—সবকিছুর প্রতি সম্মান দেখাতে হয়।

সংবাদ প্রকাশের সময় ঝর্ণাটি দিনরাত ওয়াইন দেওয়ার জন্য পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু বহু বছর আগের একটি সংবাদ দেখে আজও প্রতিটি মুহূর্তে একইভাবে ওয়াইন পাওয়া যাবে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সরবরাহ, পরিচর্যা, স্থানের ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্য বাস্তব কারণে প্রাপ্যতা বদলাতে পারে। কেউ শুধু এই ঝর্ণা দেখার জন্য অর্তোনায় যাওয়ার পরিকল্পনা করলে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বর্তমান অবস্থা জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাতে পুরোনো প্রচারচিত্রের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার অমিল হওয়ার আশঙ্কা কমে।

এখানে ‘ওয়াইন বের হয়’ কথাটির মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। ঝর্ণাটি এমন নয় যে আঙুরের ফসল যত খারাপই হোক, কল থেকে নিজে নিজে একই পানীয় বেরোতে থাকবে। এর পেছনে একটি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ওয়াইন উৎপাদন করে এবং সরবরাহের দায় নেয়। সাধারণ পানির ঝর্ণায় আমরা সচরাচর পানির উৎপাদক কে, তা ভাবি না। কিন্তু এই ঝর্ণার ক্ষেত্রে উৎপাদকই পুরো অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। ঝর্ণাটি তাই একই সঙ্গে আতিথেয়তার স্থান এবং স্থানীয় উৎপাদকের কাজ দেখানোর একটি অভিনব মাধ্যম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি এত জনপ্রিয় হওয়ার কারণও বোঝা কঠিন নয়। একটি ছবিতেই গল্পটি বলা যায়: পাথরের কল, নিচে ধরা গ্লাস এবং তার ভেতর পড়তে থাকা লাল তরল। ছবিটি দেখামাত্র মানুষ চমকে ওঠেন। তবে শুধু ছবি দেখলে ঝর্ণাটির সঙ্গে পদযাত্রাপথের সম্পর্ক, স্থানীয় মানুষের উদ্যোগ কিংবা উৎপাদিত ওয়াইন কীভাবে কল পর্যন্ত পৌঁছায়, তার কিছুই বোঝা যায় না। ফলে একই ছবি কাউকে সঠিক তথ্য জানাতে পারে, আবার ভুল ব্যাখ্যায় অলৌকিক ‘ওয়াইনের উৎস’-এর গল্পও তৈরি করতে পারে।

ইতালিতে প্রকাশ্য স্থানে পানীয় জল পাওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। বহু শহরে পথচারীরা কল থেকে পানি পান করতে পারেন। অর্তোনার উদ্যোগ সেই পরিচিত অভিজ্ঞতাকে অন্যভাবে ব্যবহার করেছে: এখানে পানির কলের চেনা ভঙ্গিতে এলাকার নিজস্ব পানীয় পরিবেশন করা হচ্ছে। আশ্চর্যের অনুভূতি জন্মায় মূলত এই প্রত্যাশা বদলে যাওয়ায়। মানুষ কল দেখলে পানি আশা করেন; সেখানে ওয়াইন পেলে স্থানটি মনে গেঁথে যায়। পর্যটনের ভাষায় এটি প্রচারের শক্তিশালী উপায় হলেও পথিকের কাছে এর তাৎপর্য আরও সরল—দীর্ঘ হাঁটার মধ্যে অপ্রত্যাশিত এক স্বাগত।

এই উদ্যোগকে বুঝতে গিয়ে ওয়াইন পানের বিষয়টিও দায়িত্বের সঙ্গে দেখতে হয়। এটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়; তাই সবার জন্য উপযুক্ত নয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, যাঁরা অ্যালকোহল এড়িয়ে চলেন, অথবা যাঁদের এরপর গাড়ি চালাতে হবে, তাঁদের জন্য ঝর্ণাটি দেখাই যথেষ্ট হতে পারে। যে স্থান পথিকের প্রতি সৌজন্য দেখাতে তৈরি হয়েছে, সেটিকে অতিরিক্ত পান বা বিশৃঙ্খলার জায়গায় পরিণত করলে তার মূল উদ্দেশ্যই হারিয়ে যায়। এখানে ছোট্ট এক গ্লাসের মূল্য পানীয়ের পরিমাণে নয়, স্থানীয় মানুষের অভ্যর্থনায়।

অর্তোনার ঝর্ণাটি কেন এত আলোচিত, তার উত্তর কেবল ‘বিনামূল্যের ওয়াইন’ নয়। এর মধ্যে একটি এলাকার কৃষি, একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, বহু মানুষের হাঁটার পথ এবং অতিথিকে স্বাগত জানানোর সংস্কৃতি মিলেছে। একজন পথিক হয়তো কয়েক মিনিট সেখানে থাকেন, কিন্তু সেই কয়েক মিনিটে তিনি আব্রুজ্জো সম্পর্কে এমন একটি অভিজ্ঞতা পান, যা প্রচারপত্রের দীর্ঘ বর্ণনার চেয়েও সহজে মনে থাকে। স্থানীয় কোনো পণ্যকে তার উৎপত্তিস্থলেই মানুষের সামনে তুলে ধরার এই পদ্ধতি ঝর্ণাটিকে সাধারণ পর্যটন আকর্ষণের বাইরে নিয়ে গেছে।

তাহলে মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক: ইতালির একটি ঝর্ণা থেকে সত্যিই কি ওয়াইন বের হয়? হ্যাঁ, অর্তোনার কাছে স্থাপিত একটি ঝর্ণার কল থেকে ওয়াইন নেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে প্রকৃতি অলৌকিকভাবে পানি বদলে ওয়াইন বানায় না। আঙুর থেকে মানুষের তৈরি ওয়াইন একটি পরিকল্পিত সরবরাহব্যবস্থায় কল পর্যন্ত আসে। সত্যিটা রূপকথার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়। বরং এর পেছনে যে পথিক, আঙুরচাষি, ওয়াইন প্রস্তুতকারক এবং স্থানীয় আতিথেয়তার গল্প রয়েছে, সেটিই ঝর্ণাটিকে মনে রাখার আসল কারণ।


আপনার পছন্দ হতে পারে