পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ ভ্যাটিকান সিটি সম্পর্কে বিস্ময়কর সব তথ্য
ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে ইতিহাস, ধর্ম, শিল্প ও রহস্যের বিস্ময়কর জগৎ
ইতালির রাজধানী রোমের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝখানে এমন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র রয়েছে, যেটি আয়তনে বাংলাদেশের একটি ছোট গ্রামের চেয়েও ছোট। মাত্র প্রায় ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত ভ্যাটিকান সিটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র। কিন্তু আয়তনের সঙ্গে এর গুরুত্বের তুলনা করলে বিস্মিত হতে হয়। ছোট্ট এই ভূখণ্ডের মধ্যেই রয়েছে বিশাল সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা, বিশ্ববিখ্যাত সিস্টিন চ্যাপেল, অমূল্য শিল্পকর্মে পূর্ণ ভ্যাটিকান জাদুঘর, পোপের বাসভবন, নিজস্ব ডাকব্যবস্থা, নিরাপত্তাবাহিনী এবং একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নানা প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গেও এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ভ্যাটিকান সিটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর আকার। প্রায় ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পুরো দেশটি চাইলে একজন সুস্থ মানুষ অল্প সময়ের মধ্যেই হেঁটে অতিক্রম করতে পারেন। এটি চারদিক থেকেই ইতালির রাজধানী রোম দ্বারা বেষ্টিত। অর্থাৎ এটি একটি সম্পূর্ণ স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র এবং একই সঙ্গে আরেকটি দেশের একটি শহরের ভেতরে অবস্থিত স্বাধীন দেশ। ভ্যাটিকানের সীমানার বড় অংশ ঐতিহাসিক প্রাচীর দ্বারা চিহ্নিত। তবে বিখ্যাত সেন্ট পিটার্স স্কয়ারের দিকটি তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত হওয়ায় দর্শনার্থীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না ঠিক কখন ইতালি থেকে ভ্যাটিকান সিটির ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন।
আকারে ক্ষুদ্র হলেও ভ্যাটিকান সিটির ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল। বর্তমান স্বাধীন ভ্যাটিকান সিটি রাষ্ট্রের জন্ম অবশ্য প্রাচীন যুগে নয়, ১৯২৯ সালে। ইতালীয় রাষ্ট্র ও পোপের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের অবসান ঘটাতে ল্যাটেরান চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ভ্যাটিকান সিটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর আগে পোপদের নিয়ন্ত্রণে মধ্য ইতালির বিশাল অঞ্চল নিয়ে পাপাল স্টেটস নামে একটি ভূখণ্ড ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইতালির একীকরণের সময় সেই ভূখণ্ডের অধিকাংশই নতুন ইতালীয় রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ১৮৭০ সালে রোমও ইতালির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে পোপ ও ইতালীয় রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কয়েক দশক স্থায়ী হয়। অবশেষে ১৯২৯ সালের সমঝোতা আধুনিক ভ্যাটিকান সিটির রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
ভ্যাটিকান সিটি এবং হলি সি বা পবিত্র আসনকে একই বিষয় মনে করা হলেও আইনগত ও কূটনৈতিক অর্থে দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভ্যাটিকান সিটি হলো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডসহ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। অন্যদিকে পবিত্র আসন হলো পোপ এবং ক্যাথলিক গির্জার কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা। বহু দেশের সঙ্গে যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, তা মূলত পবিত্র আসনের। এই পার্থক্যটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভ্যাটিকানের প্রভাব শুধু তার ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ডের ওপর নির্ভর করে না; এর পেছনে রয়েছে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ক্যাথলিক গির্জার ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
দেশটির জনসংখ্যাও অত্যন্ত কম। বিভিন্ন সময়ে বাসিন্দার সংখ্যা পরিবর্তিত হলেও এটি হাজারেরও নিচে থাকা একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ভ্যাটিকানের সবাই ভ্যাটিকানের নাগরিক নন এবং ভ্যাটিকানের সব নাগরিকও সব সময় এর সীমানার মধ্যে বসবাস করেন না। সাধারণ রাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া স্বাভাবিক হলেও ভ্যাটিকান সিটির নাগরিকত্বের ধারণা ভিন্ন। এখানে নাগরিকত্ব মূলত নির্দিষ্ট পদ, দায়িত্ব বা সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। পোপের সেবা, পবিত্র আসনের নির্দিষ্ট দায়িত্ব অথবা রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কাজের কারণে একজন ব্যক্তি নাগরিকত্ব পেতে পারেন। সেই দায়িত্ব শেষ হলে অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকত্বও শেষ হয়ে যেতে পারে। ফলে ভ্যাটিকানের নাগরিকত্বকে সাধারণ জন্মভিত্তিক নাগরিকত্বের তুলনায় অনেক বেশি কার্যভিত্তিক বলা যায়।
ভ্যাটিকান সিটির রাষ্ট্রপ্রধান হলেন পোপ। তিনি শুধু রোমান ক্যাথলিক গির্জার সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নন, ভ্যাটিকান সিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের কেন্দ্রেও অবস্থান করেন। পোপ নির্বাচনের পদ্ধতিও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কার্ডিনালদের একটি নির্দিষ্ট দল সিস্টিন চ্যাপেলে গোপন বৈঠকে নতুন পোপ নির্বাচন করেন। এই নির্বাচনকে কনক্লেভ বলা হয়। ভোটের পর ব্যালট পোড়ানো থেকে নির্গত ধোঁয়ার রং দেখে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে অপেক্ষমাণ মানুষ নির্বাচনের অগ্রগতি বুঝতে পারেন। কালো ধোঁয়া সাধারণত বোঝায় যে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি, আর সাদা ধোঁয়া জানায় নতুন পোপ নির্বাচিত হয়েছেন। আধুনিক পৃথিবীতে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের এমন দৃশ্যমান ঐতিহ্য সত্যিই বিরল।
ভ্যাটিকানের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপত্য নিঃসন্দেহে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা। বর্তমান বিশাল গির্জাটির নির্মাণ শুরু হয় ষোড়শ শতকের গোড়ায় এবং নির্মাণকাজে রেনেসাঁ ও বারোক যুগের বহু বিখ্যাত স্থপতি ও শিল্পী যুক্ত ছিলেন। মাইকেলেঞ্জেলো এর বিশাল গম্বুজের নকশা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ব্যাসিলিকার ভেতরে তাঁর বিখ্যাত ‘পিয়েতা’ ভাস্কর্য রয়েছে, যেখানে মৃত যিশুকে মাতা মেরির কোলে দেখানো হয়েছে। পাথরের একটি নির্জীব খণ্ড থেকে মানবদেহ, পোশাকের ভাঁজ এবং গভীর শোকের অনুভূতি যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা রেনেসাঁ শিল্পের অসাধারণ নিদর্শন।
সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার সামনে অবস্থিত বিশাল সেন্ট পিটার্স স্কয়ারও ভ্যাটিকানের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জিয়ান লোরেঞ্জো বের্নিনি নকশা করা এই চত্বরের চারপাশের স্তম্ভশ্রেণি এমনভাবে বিস্তৃত যে অনেকের কাছে তা যেন দর্শনার্থীদের আলিঙ্গন করে থাকা দুটি বিশাল বাহুর মতো মনে হয়। চত্বরের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রাচীন মিসরীয় ওবেলিস্ক। এটি মূলত রোমান যুগে মিসর থেকে রোমে আনা হয়েছিল এবং পরে বর্তমান অবস্থানে স্থাপন করা হয়। ফলে একই চত্বরে প্রাচীন মিসর, রোমান সাম্রাজ্য, খ্রিষ্টীয় ইতিহাস, রেনেসাঁ ও বারোক শিল্পের বিভিন্ন স্তরের ইতিহাস একসঙ্গে উপস্থিত।
ভ্যাটিকান জাদুঘর পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পোপদের সংগ্রহ করা ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, মানচিত্র, প্রত্নবস্তু, ধর্মীয় নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক বস্তু এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এর বিভিন্ন অংশ দিয়ে হাঁটলে প্রাচীন রোম ও গ্রিস থেকে শুরু করে রেনেসাঁ পর্যন্ত বহু যুগের শিল্পের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। বিখ্যাত রাফায়েল কক্ষগুলোও এই বিশাল জাদুঘর ব্যবস্থার অংশ। এসব কক্ষে রাফায়েল ও তাঁর কর্মশালার শিল্পীরা যে চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন, সেগুলো ইউরোপীয় শিল্পের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
তবে ভ্যাটিকানের শিল্পজগতের সবচেয়ে বিখ্যাত নাম সম্ভবত সিস্টিন চ্যাপেল। এর ছাদের চিত্রকর্ম মাইকেলেঞ্জেলোকে শিল্পের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। ছাদের বিশাল অংশজুড়ে বাইবেলের বিভিন্ন কাহিনি চিত্রিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম’ বা আদমের সৃষ্টি বিশেষভাবে পরিচিত। ঈশ্বর ও আদমের প্রায় স্পর্শ করতে যাওয়া দুই আঙুলের দৃশ্যটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পরিচিত শিল্পচিত্রগুলোর একটি। বহু বছর পরে মাইকেলেঞ্জেলো একই চ্যাপেলের বেদির দেয়ালে বিশাল ‘দ্য লাস্ট জাজমেন্ট’ আঁকেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়, নতুন পোপ নির্বাচনের গোপন কনক্লেভও এই অসাধারণ শিল্পকর্মে ঘেরা সিস্টিন চ্যাপেলেই অনুষ্ঠিত হয়।
ভ্যাটিকানের নিরাপত্তার কথা উঠলে রঙিন পোশাক পরা সুইস গার্ডের কথা না বললেই নয়। তাদের পোশাক দেখে অনেক পর্যটকের কাছে প্রথমে মনে হতে পারে তারা কোনো ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের অভিনয়শিল্পী। বাস্তবে তারা পোপের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রশিক্ষিত বাহিনী। সুইস গার্ডের ইতিহাস ষোড়শ শতকের গোড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক নিরাপত্তার সমন্বয়ে বাহিনীটি আজও কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের রঙিন আনুষ্ঠানিক পোশাক ভ্যাটিকানের অন্যতম পরিচিত দৃশ্য হলেও নিরাপত্তার দায়িত্বটি সম্পূর্ণ বাস্তব।
এত ছোট একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব ডাকব্যবস্থা থাকাও বিস্ময়কর। ভ্যাটিকান নিজস্ব ডাকটিকিট প্রকাশ করে এবং এগুলো সংগ্রাহকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। পর্যটকেরা ভ্যাটিকান থেকে পোস্টকার্ড পাঠানোর অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন। দেশটির নিজস্ব ডাক প্রশাসন থাকার কারণে ছোট্ট ভূখণ্ডটির রাষ্ট্রিক স্বাতন্ত্র্য দৈনন্দিন ব্যবস্থাতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। একইভাবে ভ্যাটিকানের নিজস্ব গাড়ির নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে।
ভ্যাটিকান সিটির নিজস্ব ইউরো মুদ্রাও দেখা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র না হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে ভ্যাটিকান ইউরো ব্যবহার করে এবং সীমিত পরিমাণে নিজস্ব নকশার ইউরো মুদ্রা প্রকাশ করতে পারে। সীমিত সংখ্যায় তৈরি হওয়ার কারণে এসব মুদ্রার অনেকগুলো সংগ্রাহকদের কাছে আকর্ষণীয়। অর্থাৎ একটি দেশ এত ছোট যে মানচিত্রে খুঁজে পেতে অনেকের কষ্ট হতে পারে, অথচ সেই দেশের নাম ও প্রতীক বহনকারী মুদ্রা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংগ্রাহকদের কাছে মূল্যবান সংগ্রহে পরিণত হয়।
দেশটির নিজস্ব গণমাধ্যম ব্যবস্থাও রয়েছে। ভ্যাটিকান রেডিও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বের নানা অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সংবাদ ও সরকারি যোগাযোগের জন্য ভ্যাটিকানের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে। লাতিন ভাষার সঙ্গেও ভ্যাটিকানের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তবে দৈনন্দিন কাজকর্মে ইতালীয় ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যে লাতিনের অবস্থান ভ্যাটিকানকে আধুনিক পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য দেয়।
ভ্যাটিকানের আরেকটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান হলো ভ্যাটিকান অ্যাপোস্টলিক আর্কাইভ। অতীতে এটি এমন একটি নামে পরিচিত ছিল যার অনুবাদের কারণে অনেকের মনে ‘গোপন আর্কাইভ’ সম্পর্কে রহস্যময় ধারণা তৈরি হয়েছিল। বাস্তবে এখানে শতাব্দীর পর শতাব্দীর পোপীয় প্রশাসন, চিঠিপত্র, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষিত রয়েছে। এর সংগ্রহ ইতিহাসবিদদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। সব নথি সাধারণ পর্যটকের জন্য উন্মুক্ত নয় এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও নিয়ম রয়েছে। এই সীমিত প্রবেশাধিকারকে ঘিরে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অসংখ্য রহস্য ও ষড়যন্ত্রের গল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর প্রকৃত গুরুত্ব রহস্যের চেয়েও বড়—ইউরোপ ও বিশ্বের বহু শতাব্দীর ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক ইতিহাসের অসাধারণ দলিলভান্ডার এটি।
ভ্যাটিকান অ্যাপোস্টলিক লাইব্রেরিও জ্ঞান সংরক্ষণের এক অসাধারণ কেন্দ্র। এখানে বিপুলসংখ্যক পাণ্ডুলিপি, প্রাচীন মুদ্রিত বই, মানচিত্র, মুদ্রা ও ঐতিহাসিক সংগ্রহ রয়েছে। ইউরোপীয় ইতিহাসের এমন অনেক মূল্যবান দলিল এখানে সংরক্ষিত, যেগুলোর গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় নয়; ভাষা, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, রাজনীতি ও সভ্যতার ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। শত শত বছরের পুরোনো পাণ্ডুলিপিকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সংরক্ষণ ও ডিজিটাল রূপ দেওয়ার কাজও জ্ঞানসম্পদকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষার প্রচেষ্টার অংশ।
ভ্যাটিকান সম্পর্কে আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, দেশটি শুধু গির্জা ও পাথরের ভবনে ভরা নয়। ভ্যাটিকান গার্ডেন বা উদ্যান তার ভূখণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে বিস্তৃত। এখানে সাজানো বাগান, গাছপালা, ফোয়ারা, ভাস্কর্য এবং ছোট ছোট স্থাপত্য রয়েছে। কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন পোপের সময়ে এই উদ্যানের রূপ পরিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়েছে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ রোমের মধ্যে এত ছোট একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য অংশ সবুজ উদ্যান হিসেবে সংরক্ষিত থাকা সত্যিই চমকপ্রদ।
ভ্যাটিকানের ভৌগোলিক ক্ষুদ্রতার কারণে এখানে সাধারণ দেশের মতো বিস্তৃত কৃষিজমি, মহাসড়ক, প্রদেশ, জেলা বা বড় শিল্পাঞ্চল নেই। কোনো সমুদ্রবন্দরও নেই। বিমানবন্দর নেই, যদিও হেলিকপ্টার ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। একটি ছোট রেলসংযোগও আছে, যা ইতালির রেলব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এই রেলপথের উপস্থিতি বিশেষভাবে কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রটিরও নিজস্ব রেল অবকাঠামোর অংশ রয়েছে।
ভ্যাটিকান সিটির দৈনন্দিন জীবনও সাধারণ দেশের তুলনায় আলাদা। এখানে জনসংখ্যার বড় অংশ ধর্মীয়, প্রশাসনিক বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। বিশাল আবাসিক শহর, সাধারণ শিল্পাঞ্চল বা বিস্তৃত বাণিজ্যিক এলাকা নেই। দিনের বেলায় পর্যটক, তীর্থযাত্রী, কর্মচারী এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের কারণে ছোট্ট রাষ্ট্রটি অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু এই বিপুল দর্শনার্থীর অধিকাংশই স্থায়ী বাসিন্দা নন। ফলে দিনে ভ্যাটিকানে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা এবং প্রকৃত বাসিন্দার সংখ্যার মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখা যায়।
ভ্যাটিকানের সঙ্গে রোমের সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ যে অনেক ব্যবহারিক ব্যবস্থা ইতালির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পানি, যোগাযোগ, পরিবহন এবং অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষেত্রে আশপাশের ইতালীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ অপরিহার্য। তবুও রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে ভ্যাটিকান একটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই বাস্তবতাই দেশটিকে বিশেষ করে তোলে—দৈনন্দিন জীবনে রোমের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, অথচ রাষ্ট্র হিসেবে সম্পূর্ণ পৃথক পরিচয়সম্পন্ন।
ভ্যাটিকান সিটির আরেকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো এখানে সাধারণ অর্থে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা নির্ভর করে না। অধিকাংশ দেশের নাগরিক সমাজ পরিবার, জন্ম ও বংশগত নাগরিকত্বের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে বিস্তৃত হয়। ভ্যাটিকানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উপস্থিতিই জনসংখ্যার কাঠামো নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। এই কারণে দেশটির জনমিতি পৃথিবীর অন্য প্রায় সব স্বাধীন রাষ্ট্রের তুলনায় অস্বাভাবিক।
ভ্যাটিকানের সাংস্কৃতিক সম্পদের ঘনত্বও বিস্ময়কর। পৃথিবীর অনেক বড় দেশে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম দেখতে এক শহর থেকে আরেক শহরে শত শত কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হয়। অথচ ভ্যাটিকানের ক্ষুদ্র সীমানার মধ্যেই রেনেসাঁ ও বারোক শিল্পের অসংখ্য বিশ্ববিখ্যাত নিদর্শন রয়েছে। মাইকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল, বের্নিনিসহ ইউরোপীয় শিল্পের বহু কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের কাজ এখানে উপস্থিত। ফলে ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় শিল্প ও স্থাপত্যের এমন ঘনত্ব পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ ভ্যাটিকান সিটিতে আসেন শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, ইতিহাস, শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির আকর্ষণেও। কেউ সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার বিশাল গম্বুজ দেখতে আসেন, কেউ মাইকেলেঞ্জেলোর শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়াতে চান, কেউ পোপের প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসেন, আবার কেউ বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশটিতে পা রাখার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান। কয়েকশ স্থায়ী বাসিন্দার একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বছরে বিপুল দর্শনার্থীর আগমন ভ্যাটিকানের দৈনন্দিন চরিত্রকে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।
ভ্যাটিকান সিটির দিকে তাকালে সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত সংখ্যায় নয়, বৈপরীত্যে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্র, অথচ এর নাম পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র পরিচিত। এর জনসংখ্যা একটি ছোট গ্রামের চেয়েও কম হতে পারে, অথচ এখান থেকে পরিচালিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিশ্বের অসংখ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এর ভূখণ্ড কয়েকটি বড় নগর উদ্যানের চেয়েও ছোট, অথচ সেই ভূখণ্ডের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে মানবসভ্যতার অমূল্য শিল্প, স্থাপত্য, পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিল। এর সামরিক বাহিনী অত্যন্ত ক্ষুদ্র, কিন্তু শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে। এর নাগরিকত্ব সাধারণ দেশের মতো নয়, এর রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের পদ্ধতিও অন্য রকম, এমনকি এর রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আইনগত পরিচয়ের মধ্যেও রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য।
মাত্র প্রায় ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড তাই ভ্যাটিকান সিটির প্রকৃত গুরুত্ব বোঝাতে পারে না। রোমের মধ্যে দেয়ালঘেরা এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশ যেন ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের একটি করে স্তর। প্রাচীন রোমের স্মৃতি, খ্রিষ্টধর্মের দীর্ঘ ইতিহাস, মধ্যযুগীয় পোপতন্ত্র, রেনেসাঁর শিল্পবিপ্লব, আধুনিক কূটনীতি এবং সমকালীন ধর্মীয় জীবন এখানে একই ভূখণ্ডে এসে মিলেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ সম্পর্কে জানতে গিয়ে তাই শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের গল্প জানা হয় না; জানা হয় প্রায় দুই হাজার বছর ধরে ইউরোপ ও বিশ্বের ইতিহাসে প্রভাব রেখে যাওয়া একটি অসাধারণ কেন্দ্রের গল্প।
১৯৭০ সালের নির্মল বায়ু আইন: রিচার্ড নিক্সন, দূষণবিরোধী লড়াই ও আমেরিকার পরিবেশনীতি বদলের ইতিহাস
মিউনিখ চুক্তি ১৯৩৮: চেম্বারলেইনের তোষণনীতি, হিটলারের সুদেতেন দাবি ও যুদ্ধ ঠেকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা
আরব বসন্ত ২০১০–২০১২: মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাস
মালদ্বীপ: হাজারের বেশি প্রবালদ্বীপ নিয়ে তৈরি দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কতটা নিচু?
অ্যামাজন রেইনফরেস্ট: পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন কতটা বিশাল?
আরাল সাগর: পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ হ্রদ কয়েক দশকের মধ্যে প্রায় অদৃশ্য হলো কীভাবে?