বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে কত শক্তিশালী? নাকের ভেতরের বিস্ময়কর বিজ্ঞান

কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে কত শক্তিশালী? নাকের ভেতরের বিস্ময়কর বিজ্ঞান
একটি গন্ধেই কুকুর খুঁজে পায় অদেখা তথ্য

বাড়ির দরজা খুলতেই কুকুরটি মেঝে শুঁকে বুঝতে পারে, কিছুক্ষণ আগে কে ঘরে ঢুকেছিল। বাইরে হাঁটার সময় একটি ঝোপের গোড়ায় থেমে সে এমন মনোযোগ দেয়, যেন সেখানে লেখা কোনো বার্তা পড়ছে। মানুষের কাছে জায়গাটি গন্ধহীনও মনে হতে পারে। তাহলে কুকুর কী পাচ্ছে? তার নাক বাতাসে ও মাটিতে ছড়িয়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র গন্ধবাহী কণা শনাক্ত করে। এরপর মস্তিষ্ক সেই সংকেতের পার্থক্য বিচার করে। কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের তুলনায় অসাধারণ সংবেদনশীল, কিন্তু ‘কত গুণ বেশি’ প্রশ্নটির উত্তর একটি মাত্র সংখ্যা দিয়ে দেওয়া যায় না। কোন গন্ধ পরীক্ষা করা হচ্ছে, কীভাবে পরীক্ষা হচ্ছে এবং কোন কুকুরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে—ফল তার ওপর নির্ভর করে।

জনপ্রিয় লেখায় প্রায়ই বলা হয়, কুকুর মানুষের চেয়ে দশ হাজার থেকে এক লক্ষ গুণ ভালো গন্ধ পায়। এই পরিসরটি কুকুরের ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দিতে ব্যবহৃত হয়; প্রতিটি গন্ধের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় পাওয়া স্থির অনুপাত হিসেবে নয়। একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থের অত্যন্ত কম ঘনত্ব কুকুর শনাক্ত করতে পারলেও অন্য কোনো গন্ধের ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে ব্যবধান আলাদা হতে পারে। মানুষের নাকও সব গন্ধের প্রতি সমান সংবেদনশীল নয়। তাই ‘কুকুর ঠিক পঞ্চাশ হাজার গুণ বেশি ঘ্রাণ পায়’ ধরনের বক্তব্য যত আকর্ষণীয় শোনাক, ততটা নির্ভুল নয়। নিশ্চিত কথাটি হলো, বহু গন্ধ শনাক্ত ও আলাদা করার কাজে কুকুর মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ।

এই দক্ষতার একটি কারণ নাকের ভেতরে থাকা ঘ্রাণগ্রাহী অংশ। নাক দিয়ে টানা বাতাসের গন্ধবাহী অণু বিশেষ আবরণে পৌঁছালে সেখানকার সংবেদনশীল কোষ উদ্দীপ্ত হয়। কুকুরের নাকের ভেতরের গঠন অনেক ভাঁজযুক্ত; ফলে সীমিত জায়গার মধ্যেও গন্ধ ধরার জন্য বিস্তৃত পৃষ্ঠ তৈরি হয়। মানুষের তুলনায় কুকুরের ঘ্রাণগ্রাহী কোষের সংখ্যা সাধারণত অনেক বেশি বলে ধরা হয়। কুকুরের ক্ষেত্রে প্রায় কয়েক কোটি থেকে কয়েক শ কোটি নয়, বরং জাত ও আকারভেদে কয়েক দশ কোটি পর্যন্ত ঘ্রাণগ্রাহী কোষ থাকার অনুমান প্রচলিত। তবে সব কুকুরের নাকে একই সংখ্যা থাকে না এবং কোষ গুনলেই পুরো ঘ্রাণক্ষমতা মাপা যায় না।

গন্ধ ধরা শুরু হয় বাতাস নাকের ভেতরে প্রবেশ করার সঙ্গে। বাতাসের একটি অংশ শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজে ফুসফুসের দিকে যায়; অন্য অংশ নাকের এমন অঞ্চলে পৌঁছায়, যেখানে গন্ধ শনাক্তের কোষ রয়েছে। এই বায়ুপ্রবাহের বিন্যাস কুকুরকে গন্ধবাহী অণুর নমুনা সংগ্রহে সাহায্য করে। নাকের ভেতরটি তাই কেবল একটি ফাঁকা নল নয়। সেখানে সরু পথ, ভাঁজ এবং সংবেদনশীল আবরণ মিলে জটিল ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। বাইরে থেকে কুকুরকে শুধু নাক নাড়তে দেখা যায়, কিন্তু প্রতিবার বাতাস টানার সময় ভেতরে দ্রুত গন্ধ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

কুকুরের বারবার ছোট ছোট শ্বাস টানার আচরণকে আমরা সাধারণভাবে শোঁকা বলি। স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়া আর মনোযোগ দিয়ে শোঁকার কাজ এক নয়। আগ্রহের কোনো গন্ধ পেলে কুকুর দ্রুত পরপর বাতাস টানে। এতে একবারের বদলে বহুবার নতুন নমুনা নাকে পৌঁছায়। গন্ধের উৎসের কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নমুনার তীব্রতা ও গঠন বদলাতে পারে। কুকুর তখন থেমে, মাথা ঘুরিয়ে কিংবা মাটির কাছাকাছি নাক নামিয়ে আরও তথ্য নেয়। যে আচরণ মানুষের কাছে অকারণ ঘোরাঘুরি মনে হয়, সেটি আসলে পরপর নেওয়া নমুনার তুলনা হতে পারে।

নাকের বাইরের গঠনও কাজে লাগে। কুকুর শ্বাস ছাড়ার সময় নাসারন্ধ্রের পাশের ফাঁক দিয়ে বাতাস কিছুটা পাশ ও পেছনের দিকে বেরোয়। ফলে সামনের দিক থেকে নতুন বাতাস টানার সুযোগ বজায় থাকে। শোঁকার সময় কুকুর যেন একই বাতাস বারবার পরীক্ষা না করে আশপাশ থেকে নতুন গন্ধের নমুনা পায়। বাতাসের এই চলাচল চোখে দেখা যায় না বলে নাকের সূক্ষ্ম গঠনটির গুরুত্ব সহজে বোঝা যায় না। অথচ গন্ধ খুঁজে এগোনোর সময় দ্রুত নতুন নমুনা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কুকুরের দুটি নাসারন্ধ্রও আলাদা করে তথ্য নিতে পারে। গন্ধ এক পাশের নাকে অন্য পাশের চেয়ে একটু আগে বা বেশি তীব্রভাবে পৌঁছালে উৎস কোন দিকে, তার ধারণা পাওয়া সম্ভব। তবে বিষয়টি এমন নয় যে প্রতিবার কুকুর দুটি নাসারন্ধ্র দিয়ে নির্ভুল দূরত্ব মেপে ফেলে। বাতাসের দিক, গন্ধবাহী কণা কোথায় আটকে আছে এবং চারপাশের বাধা—সবই সংকেতকে বদলে দেয়। কুকুর নাকের সঙ্গে মাথা ও শরীর নাড়িয়ে বারবার নতুন অবস্থান থেকে গন্ধ নেয়। এভাবে একটি গন্ধের দিকে এগোনোর সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে তৈরি হয়।

কুকুরের নাক অনেক সময় আর্দ্র থাকে। আর্দ্র পৃষ্ঠ বাতাসের কিছু গন্ধবাহী অণুর সংস্পর্শে আসতে সাহায্য করতে পারে। তবে ভেজা নাকই তার ঘ্রাণশক্তির একমাত্র রহস্য নয়। নাকের ভেতরের সংবেদনশীল কোষ, বায়ুপ্রবাহ, দ্রুত শোঁকার অভ্যাস এবং মস্তিষ্কের তথ্য বিশ্লেষণ—সব একসঙ্গে কাজ করে। একই কারণে কুকুরের নাক শুকনো দেখলেই সে গন্ধ পাচ্ছে না, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। নাকের আর্দ্রতা দিনের সময় ও পরিবেশ অনুযায়ী বদলাতে পারে; শুধু সেটি দেখে কুকুরের সামগ্রিক ক্ষমতা বিচার করা ভুল।

গন্ধ শনাক্তের পর মস্তিষ্কে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়। একই জায়গায় মানুষের পায়ের ছাপ, অন্য প্রাণীর চলাচল, খাবার, গাছপালা এবং পরিবেশের অসংখ্য গন্ধ মিশে থাকতে পারে। প্রশিক্ষিত কুকুরকে এই মিশ্রণ থেকে নির্দিষ্ট একটি গন্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত সংকেত অনুসরণ করতে শেখানো হয়। সে কেবল ‘কিছু একটা গন্ধ পাচ্ছি’ বুঝে থামে না; লক্ষ্য গন্ধটি আশপাশের অন্য গন্ধ থেকে আলাদা করার চেষ্টা করে। তাই অনুসন্ধানী কুকুরের সাফল্য শুধু শক্তিশালী নাকের ফল নয়। মনোযোগ, শেখা, পুরস্কারভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং কাজের পরিবেশও ফল নির্ধারণ করে।

একজন মানুষ কোনো পথ ধরে গেলে তার শরীর ও পোশাক থেকে ক্ষুদ্র কণা পরিবেশে ছড়াতে পারে। ত্বক থেকে ঝরে পড়া উপাদান, ঘাম, জুতার সঙ্গে আসা মাটির গন্ধ এবং আশপাশের পৃষ্ঠে লাগা নানা চিহ্ন মিলিয়ে জটিল গন্ধের সূত্র তৈরি হয়। কুকুর সেই সূত্র অনুসরণ করতে পারে বলে অনেক সময় বলা হয়, সে যেন মানুষের ‘অদৃশ্য পথ’ দেখতে পায়। কথাটি রূপক অর্থে ঠিক, আক্ষরিক অর্থে নয়। কুকুর চোখে কোনো ঝলমলে রেখা দেখে না। সে বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গন্ধের নমুনা মিলিয়ে সম্ভাব্য পথ অনুসরণ করে।

একই ব্যক্তির গন্ধও সব সময় এক রকম থাকে না। তিনি কী পোশাক পরেছেন, কোথায় হেঁটেছেন, কী স্পর্শ করেছেন এবং পথের পরিবেশ কেমন—এসব কারণে গন্ধের মিশ্রণ বদলায়। বৃষ্টি কিছু গন্ধ সরিয়ে দিতে পারে, আবার আর্দ্রতা কোনো অবস্থায় গন্ধের উপস্থিতি বোঝার ধরনও বদলাতে পারে। তাপমাত্রা ও বাতাসের গতিতে গন্ধ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়ায়। খোলা মাঠে যে সূত্র সহজে অনুসরণ করা যায়, ব্যস্ত রাস্তা বা প্রবল বাতাসে তা কঠিন হতে পারে। তাই কোনো কুকুর একটি অনুসন্ধানে সফল হলেই অন্য সব পরিস্থিতিতে সে একই ফল দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

কুকুর অন্য কুকুরের রেখে যাওয়া গন্ধ থেকেও তথ্য পায়। হাঁটার সময় গাছের গোড়া বা খুঁটি দীর্ঘক্ষণ শোঁকার কারণ অনেক ক্ষেত্রে সেখানে জমে থাকা রাসায়নিক সংকেত। কোনো প্রাণী ওই এলাকায় এসেছে কি না, তার সম্পর্কে কিছু তথ্য এসব গন্ধে থাকতে পারে। মানুষ রাস্তার নামফলক বা পরিচিত মুখ দেখে পরিবেশ সম্পর্কে জানে; কুকুর গন্ধকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। সে যখন হাঁটার সময় বারবার থামে, তখন হয়তো চারপাশের প্রাণীদের সাম্প্রতিক উপস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে। তার কাছে হাঁটা শুধু শরীরচর্চা নয়, পরিবেশ জানার সুযোগও।

নাকের ভেতরে সাধারণ গন্ধ শনাক্তের ব্যবস্থা ছাড়াও রাসায়নিক সংকেত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি অঙ্গ রয়েছে, যাকে জ্যাকবসনের অঙ্গ বলা হয়। প্রাণীদের পারস্পরিক যোগাযোগের কিছু রাসায়নিক সংকেত বোঝার ক্ষেত্রে এই অঙ্গের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে কুকুরের সব অসাধারণ ঘ্রাণক্ষমতা ওই একটি অঙ্গের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। খাবার, মানুষের গন্ধ বা অনুসন্ধানের লক্ষ্য শনাক্তের আলোচনায় নাকের ঘ্রাণগ্রাহী অংশ ও মস্তিষ্কের কাজই প্রধান। কুকুরের নাক সম্পর্কে নানা গল্পে বিভিন্ন অঙ্গের কাজ একসঙ্গে মিশিয়ে বলা হয়; আলাদা করে বুঝলে আসল প্রক্রিয়াটি পরিষ্কার হয়।

জাতভেদে নাকের আকার ও মুখের গঠন আলাদা হওয়ায় ঘ্রাণসংক্রান্ত কাজে কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে। দীর্ঘ নাকওয়ালা কিছু জাতকে অনুসন্ধানের জন্য বিশেষভাবে বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু শুধু চেহারা দেখে একটি কুকুর কত ভালো গন্ধ শনাক্ত করবে, তা নিশ্চিত বলা যায় না। একটি কুকুরের স্বাস্থ্য, বয়স, আগ্রহ, ক্লান্তি ও প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। নাক বা শ্বাসপথের সমস্যা থাকলে কাজ ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পাওয়া একটি কুকুর জটিল পরিবেশেও নির্দিষ্ট গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। জন্মগত সামর্থ্য এবং শেখানো দক্ষতা এখানে একে অপরের পরিপূরক।

এই ক্ষমতার কারণেই মানুষ কুকুরকে নিখোঁজ ব্যক্তি খোঁজা, নির্দিষ্ট বস্তু শনাক্ত করা এবং সংরক্ষণমূলক গবেষণার নানা কাজে প্রশিক্ষণ দেয়। কোনো কোনো গবেষণায় শরীরের অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত গন্ধের পরিবর্তন শনাক্ত করতেও কুকুর ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু কুকুর গন্ধ পেয়েছে মানেই কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসাগত নির্ণয় হয়ে গেছে—এমন বলা যাবে না। নমুনা সংগ্রহের নিয়ম, প্রশিক্ষণ এবং ফল যাচাইয়ের পদ্ধতি নির্ভুল না হলে ভুল সংকেত পাওয়া সম্ভব। কুকুরের নাক শক্তিশালী হলেও তার কাজের ফলকে উদ্দেশ্য অনুযায়ী পরীক্ষা করতে হয়।

সুতরাং কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে ঠিক কত গুণ বেশি—তার সর্বজনীন একটি সংখ্যা নেই। তবে তার নাকের বিস্তৃত ঘ্রাণগ্রাহী অংশ, শোঁকার সময় বাতাস সংগ্রহের বিশেষ পদ্ধতি এবং মস্তিষ্কের গন্ধ বিশ্লেষণের ক্ষমতা তাকে অনেক সূক্ষ্ম গন্ধ ধরতে সাহায্য করে। মানুষ যেখানে একটি পথকে চোখ দিয়ে দেখে, কুকুর সেখানে চোখের পাশাপাশি গন্ধের অসংখ্য চিহ্ন পায়। সে যখন হঠাৎ থেমে মাটি শোঁকে, তখন হয়তো আমাদের অজানা একটি ঘটনার সূত্র খুঁজছে। সেই সূত্র পড়ার ক্ষমতাই কুকুরের নাককে এত বিস্ময়কর করে তুলেছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে