ইউরোপা: বৃহস্পতির বরফঢাকা চাঁদের নিচে কি বিশাল সমুদ্র ও প্রাণ লুকিয়ে আছে?
ইউরোপার বরফের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাণবান্ধব এক বিশাল সমুদ্র
সৌরজগতের এমন কিছু জগৎ রয়েছে, যেগুলোকে প্রথম দেখায় প্রাণের সন্ধানের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত মনে হতে পারে। বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা তাদের অন্যতম। সূর্য থেকে পৃথিবীর তুলনায় অনেক দূরে অবস্থিত এই ছোট জগতের পৃষ্ঠ বরফে ঢাকা, তাপমাত্রা অত্যন্ত কম এবং তার চারপাশে রয়েছে বৃহস্পতির শক্তিশালী বিকিরণ পরিবেশ। তবু আধুনিক গ্রহবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখন ইউরোপাকে ঘিরেই—এর বরফের নিচে কি সত্যিই একটি বিশাল তরল সমুদ্র রয়েছে, আর সেই সমুদ্রে কি প্রাণের উদ্ভব ও টিকে থাকার মতো পরিবেশ থাকতে পারে?
ইউরোপা বৃহস্পতির চারটি বৃহৎ গ্যালিলীয় চাঁদের একটি। এর ব্যাস প্রায় ৩ হাজার ১২২ কিলোমিটার, অর্থাৎ পৃথিবীর চাঁদের তুলনায় কিছুটা ছোট। কিন্তু আকারের বিচারে সাধারণ মনে হওয়া এই চাঁদের ভেতরের গঠন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর উপরিভাগ মূলত পানির বরফ দিয়ে তৈরি। সেই বরফের নিচে তরল পানির একটি বৈশ্বিক সমুদ্র থাকার পক্ষে এত শক্তিশালী পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে যে বর্তমানে গ্রহবিজ্ঞানীরা ইউরোপাকে সৌরজগতের সম্ভাব্য সমুদ্রজগতগুলোর অন্যতম প্রধান উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন।
ইউরোপার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর অস্বাভাবিকভাবে মসৃণ পৃষ্ঠ। সৌরজগতের বহু পুরোনো চাঁদ ও গ্রহাণুর গায়ে অসংখ্য সংঘর্ষগহ্বর দেখা যায়। কিন্তু ইউরোপার পৃষ্ঠে তুলনামূলকভাবে কম বড় সংঘর্ষগহ্বর রয়েছে। এর অর্থ, ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসাবে এর দৃশ্যমান পৃষ্ঠ তুলনামূলকভাবে নবীন এবং কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় পুরোনো বরফের ভূমি পরিবর্তিত বা পুনর্গঠিত হয়েছে। কোথাও বরফ ফেটে গেছে, কোথাও বিশাল বরফখণ্ড সরে গিয়ে নতুনভাবে জমেছে, আবার কোথাও নিচ থেকে তুলনামূলক উষ্ণ পদার্থ উঠে এসে পৃষ্ঠের আকৃতি বদলে দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইউরোপার ছবিতে সবচেয়ে সহজে চোখে পড়ে এর পৃষ্ঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দীর্ঘ বাদামি ও লালচে রেখা। কোনো কোনো রেখা শত শত বা হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এগুলো সাধারণ আঁচড় নয়। বরফের আবরণ বারবার প্রসারিত, সংকুচিত ও ভেঙে যাওয়ার ফলে এ ধরনের ফাটল ও উঁচু রেখা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফাটলের দুই পাশের ভূখণ্ডের বিন্যাস দেখে বোঝা যায়, বরফের বিশাল অংশ একে অপরের তুলনায় সরে গেছে। পৃথিবীর সমুদ্রের ভাসমান বরফ ভেঙে সরে যাওয়ার সঙ্গে এর কিছু দৃশ্যগত মিল থাকলেও ইউরোপার প্রক্রিয়াটি অনেক বৃহৎ ভূতাত্ত্বিক মাত্রায় ঘটে।
কিন্তু এত দূরে সূর্যের দুর্বল আলো পাওয়া একটি চাঁদের ভেতরে তরল পানি থাকবে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বৃহস্পতির প্রবল মহাকর্ষ এবং ইউরোপার কক্ষপথে। ইউরোপা বৃহস্পতিকে পুরোপুরি বৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে না; এর কক্ষপথ সামান্য উপবৃত্তাকার। বৃহস্পতির অন্য বড় চাঁদগুলোর মহাকর্ষীয় প্রভাবও এই অবস্থাকে বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে ইউরোপা যখন বৃহস্পতির চারদিকে ঘোরে, তখন বৃহস্পতির মহাকর্ষ কখনো তাকে তুলনামূলক বেশি এবং কখনো কম টানে।
এই পরিবর্তনশীল মহাকর্ষীয় টান ইউরোপার শরীরকে বারবার সামান্য বিকৃত করে। চাঁদটির ভেতরের পদার্থ সংকুচিত ও প্রসারিত হওয়ার সময় ঘর্ষণজাত তাপ সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়াকে জোয়ারজনিত উত্তাপ বলা যায়। পৃথিবীতে চাঁদের মহাকর্ষ যেমন সমুদ্রে জোয়ার সৃষ্টি করে, বৃহস্পতির বিপুল মহাকর্ষ ইউরোপার কঠিন দেহের মধ্যেই অনেক শক্তিশালী জোয়ারজনিত বিকৃতি ঘটাতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ উত্তাপই বরফের নিচে পানি দীর্ঘ সময় তরল রাখার অন্যতম প্রধান সম্ভাব্য শক্তির উৎস।
ইউরোপার বরফস্তরের সঠিক পুরুত্ব এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক নমুনা ও পর্যবেক্ষণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। তবে অনেক গবেষণায় ধারণা করা হয়, উপরিভাগের বরফের আবরণ বহু কিলোমিটার পুরু হতে পারে এবং তার নিচে কয়েক দশক থেকে শতাধিক কিলোমিটার গভীর একটি বৈশ্বিক সমুদ্র থাকতে পারে। যদি এই ধারণা সঠিক হয়, তবে ইউরোপায় তরল পানির মোট পরিমাণ পৃথিবীর সব মহাসাগরের পানির সম্মিলিত পরিমাণের চেয়েও বেশি হতে পারে। ইউরোপা পৃথিবীর তুলনায় অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও তার সমুদ্র অত্যন্ত গভীর হওয়ার কারণেই এমনটি সম্ভব।
এই সমুদ্র থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ এসেছে ইউরোপার চৌম্বকীয় আচরণ থেকে। বৃহস্পতির নিজস্ব অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে। ইউরোপা সেই পরিবর্তনশীল চৌম্বকীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে চলার সময় তার ভেতরে এমন একটি বিদ্যুৎপরিবাহী স্তরের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা একটি প্রবর্তিত চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে। বিপুল পরিমাণ দ্রবীভূত লবণযুক্ত তরল পানি এমন বিদ্যুৎপরিবাহী স্তর হিসেবে খুব ভালোভাবে কাজ করতে পারে। ফলে এই পর্যবেক্ষণ বরফের নিচে লবণাক্ত সমুদ্র থাকার ধারণাকে শক্তিশালী করেছে।
ইউরোপার পৃষ্ঠের কিছু অঞ্চল আরও রহস্যময়। সেখানে পরিচিত সমতল বরফের পরিবর্তে ভাঙা, ঘোরানো ও এলোমেলোভাবে পুনর্বিন্যস্ত বরফখণ্ড দেখা যায়। এগুলোকে বিশৃঙ্খল ভূভাগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। দেখতে অনেকটা এমন, যেন বিশাল বরফের পাত ভেঙে খণ্ডে খণ্ডে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কিছুটা ঘুরেছে, স্থান পরিবর্তন করেছে এবং পরে আবার জমাট বেঁধেছে। এর ব্যাখ্যায় বিজ্ঞানীরা বরফের নিচে উষ্ণ অঞ্চল, আংশিক গলিত বরফ কিংবা অগভীর তরল পানির আধারের সম্ভাবনা বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ গভীর সমুদ্র ও পৃষ্ঠের মধ্যে কোনো কোনো স্থানে পদার্থের আদান-প্রদান ঘটতে পারে।
এই সম্ভাবনাটি প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সমুদ্র শুধু তরল হলেই সেখানে প্রাণ সৃষ্টি হবে—এমন নয়। পৃথিবীতে প্রাণের জন্য তরল পানি ছাড়াও শক্তির উৎস এবং কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফসফরাস ও সালফারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান প্রয়োজন। ইউরোপার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের মূল কারণ হলো, সেখানে এই তিনটি মৌলিক শর্ত—তরল পানি, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান এবং ব্যবহারযোগ্য শক্তি—একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপার সমুদ্রের তলদেশ যদি সরাসরি পাথুরে আবরণের সংস্পর্শে থাকে, তবে পানি ও শিলার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে পারে। পৃথিবীর সমুদ্রতলে এমন বিক্রিয়া বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক শক্তি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কিছু অঞ্চলে গরম পানি শিলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করে আবার সমুদ্রে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের উষ্ণ জলীয় উৎসের চারপাশে সূর্যের আলো ছাড়াই জটিল বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। সেখানে অণুজীব সূর্যালোকের পরিবর্তে রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে শক্তি সংগ্রহ করে।
এ কারণেই ইউরোপার সমুদ্রতলে অনুরূপ কোনো ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি ইউরোপার পাথুরে অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত তাপ থাকে এবং সমুদ্রের পানি শিলার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে বিক্রিয়া করে, তবে প্রাণের জন্য ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক শক্তি তৈরি হতে পারে। তবে ইউরোপায় পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের মতো উষ্ণ জলীয় উৎস আছে—এটি এখনো প্রমাণিত নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা, যার সত্যতা ভবিষ্যতের অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
ইউরোপার পৃষ্ঠের শক্তিশালী বিকিরণও এখানে অদ্ভুতভাবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে পারে। বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্রে আটকে থাকা উচ্চশক্তির কণা ইউরোপার বরফে আঘাত করে পানির অণু ভেঙে বিভিন্ন অক্সিজেনসমৃদ্ধ পদার্থ তৈরি করতে পারে। যদি পৃষ্ঠের এই রাসায়নিক পদার্থ কোনো ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে নিচের সমুদ্রে পৌঁছায়, তবে সেগুলো সমুদ্রের রাসায়নিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ যে বিকিরণ ইউরোপার পৃষ্ঠে পরিচিত ধরনের প্রাণের জন্য মারাত্মক, সেই বিকিরণই পরোক্ষভাবে বরফের নিচের পরিবেশে উপকারী রাসায়নিক পদার্থ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এখানে একটি বড় সমস্যা রয়েছে। ইউরোপার বরফের আবরণ কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে পৃষ্ঠের পদার্থ গভীর সমুদ্রে পৌঁছে দেয়, তা জানা যায়নি। বরফ যদি অত্যন্ত পুরু ও স্থিতিশীল হয়, তাহলে পৃষ্ঠ ও সমুদ্রের মধ্যে রাসায়নিক আদান-প্রদান সীমিত হতে পারে। আবার বরফের মধ্যে যদি নিয়মিত ভাঙন, নিমজ্জন, উত্থান এবং আংশিক গলনের ঘটনা ঘটে, তাহলে এই আদান-প্রদান অনেক বেশি সক্রিয় হতে পারে। তাই ইউরোপার বরফের প্রকৃতি বোঝা আসলে তার সমুদ্রের বাসযোগ্যতা বোঝারই একটি অংশ।
আরও একটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন হলো, ইউরোপার বরফের ফাটল দিয়ে কখনো পানি বা জলীয় বাষ্প মহাকাশে বেরিয়ে আসে কি না। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে সম্ভাব্য জলীয় বাষ্পের উদ্গীরণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, কিন্তু ঘটনাটি কতটা নিয়মিত এবং এর প্রকৃতি কী—তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। যদি সত্যিই গভীর বা অগভীর জলাধার থেকে পদার্থ মহাকাশে বেরিয়ে আসে, তাহলে ভবিষ্যতের মহাকাশযানের জন্য এটি অসাধারণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। বরফের বহু কিলোমিটার গভীরে প্রবেশ না করেও মহাকাশযান সেই নির্গত পদার্থের মধ্য দিয়ে উড়ে তার রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করতে পারবে।
তবে ইউরোপায় প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। কোনো পরিবেশ ‘বাসযোগ্য’ হওয়া এবং সেখানে বাস্তবে ‘প্রাণ থাকা’ একই কথা নয়। বাসযোগ্যতার অর্থ হলো সেখানে পরিচিত জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত শর্ত থাকতে পারে। কিন্তু সেই পরিবেশে কখনো প্রাণের উৎপত্তি হয়েছে কি না, হলে তা এখনো টিকে আছে কি না এবং থাকলে তার প্রকৃতি কেমন—এসব সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।
ইউরোপার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণ আবিষ্কৃত হয়নি। এমনকি সেখানে জীবনের সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণও নেই। বর্তমান বৈজ্ঞানিক আগ্রহের ভিত্তি হলো সম্ভাব্য বাসযোগ্য পরিবেশের একাধিক লক্ষণ। তাই ইউরোপার সমুদ্রে মাছ, বিশাল সামুদ্রিক প্রাণী কিংবা জটিল জীব রয়েছে—এমন কল্পনা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অনেক বাইরে চলে যায়। যদি সেখানে প্রাণ থাকে, তাহলে প্রথমে অণুজীবের মতো সরল জীবের সন্ধান পাওয়াই তুলনামূলক যুক্তিসঙ্গত প্রত্যাশা।
এমন অণুজীবও পৃথিবীর জীবনের অনুরূপ হবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। পৃথিবীর সব পরিচিত প্রাণ শেষ পর্যন্ত একই মৌলিক জৈব রসায়নের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউরোপায় যদি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রাণের উৎপত্তি ঘটে থাকে, তাহলে তার জৈব রসায়নে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থাকতে পারে। আবার সৌরজগতের প্রাথমিক যুগে সংঘর্ষের মাধ্যমে এক জগতের পদার্থ অন্য জগতে পৌঁছানোর ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ভবিষ্যতে ইউরোপায় কোনো জীবনের চিহ্ন পাওয়া গেলে তার উৎস নির্ধারণ করাও একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ হবে।
ইউরোপার সমুদ্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে তার লবণাক্ততা। পৃষ্ঠে বিভিন্ন লবণজাত ও রাসায়নিক যৌগের সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এগুলোর সবই সরাসরি গভীর সমুদ্র থেকে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। যদি সমুদ্র দীর্ঘকাল ধরে পাথুরে তলদেশের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে থাকে, তবে পানিতে নানা দ্রবীভূত খনিজ থাকার কথা। সমুদ্রের অম্লতা, লবণাক্ততা এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের অনুপাত নির্ধারণ করা গেলে সেখানে পরিচিত ধরনের অণুজীব টিকে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভুল ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রাণের জন্য শক্তির পরিমাণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর পৃষ্ঠে অধিকাংশ বাস্তুতন্ত্র শেষ পর্যন্ত সূর্যের শক্তির ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপার গভীর সমুদ্রের ওপর বহু কিলোমিটার বরফ থাকলে সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাবে না। তাই সেখানে সালোকসংশ্লেষভিত্তিক জীবনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত বা অনুপস্থিত হওয়ার কথা। সম্ভাব্য জীবকে রাসায়নিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে। ফলে সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা, পানি ও শিলার বিক্রিয়া এবং উপরিভাগ থেকে জারক পদার্থের সরবরাহ ইউরোপার সম্ভাব্য জীবমণ্ডলের আকার নির্ধারণ করতে পারে।
ইউরোপার সমুদ্র কয়েক কোটি বছর নয়, সম্ভবত আরও অনেক দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে আগ্রহী করে। প্রাণের উৎপত্তির জন্য শুধু উপযুক্ত পরিবেশ থাকাই যথেষ্ট নাও হতে পারে; সেই পরিবেশ দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতির সঙ্গে ইউরোপার মহাকর্ষীয় সম্পর্ক যদি দীর্ঘকাল ধরে তার অভ্যন্তরে তাপ সৃষ্টি করে থাকে, তবে এর সমুদ্রও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে তরল পানি, শিলা ও রাসায়নিক শক্তির পারস্পরিক ক্রিয়া প্রাণের উৎপত্তির জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপা মোটেও সহজ কোনো বাসস্থান নয়। এর পৃষ্ঠে তীব্র শীত, প্রায় শূন্য বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এবং বৃহস্পতির শক্তিশালী বিকিরণ রয়েছে। কোনো মানুষ বিশেষ সুরক্ষা ছাড়া সেখানে বেঁচে থাকতে পারবে না। সম্ভাব্য প্রাণের জন্য আসল আশ্রয় হলো বরফের গভীরে থাকা সমুদ্র, কারণ পুরু বরফ বৃহস্পতির ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে নিচের পানিকে অনেকটাই রক্ষা করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইউরোপার বরফ শুধু সমুদ্রকে বন্দী করে রাখা একটি আবরণ নয়; এটি সম্ভাব্য জীবমণ্ডলের প্রতিরক্ষাবর্মও হতে পারে।
ইউরোপাকে বোঝার জন্য মহাকাশযানের পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিযানগুলো এই চাঁদের পৃষ্ঠ, চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও অভ্যন্তরীণ সমুদ্রের ধারণা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। এখন আরও উন্নত অনুসন্ধানের লক্ষ্য হলো ইউরোপার পৃষ্ঠের গঠন, বরফের প্রকৃতি, সম্ভাব্য জলীয় উদ্গীরণ, রাসায়নিক উপাদান এবং অভ্যন্তরীণ সমুদ্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অনেক বেশি বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা। বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্রের সাহায্যে বরফস্তরের নিচের গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, পৃষ্ঠের রাসায়নিক পদার্থ বিশ্লেষণ করা এবং সম্ভাব্য বাসযোগ্য অঞ্চলের অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
ভবিষ্যতে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিযান ইউরোপার পৃষ্ঠে অবতরণ করে সরাসরি বরফ পরীক্ষা করতে পারে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত কঠিন পরিকল্পনা হলো বরফ ভেদ করে সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানো। বহু কিলোমিটার বরফ গলিয়ে বা ছিদ্র করে একটি স্বয়ংক্রিয় অনুসন্ধানযন্ত্র নিচে নামানো সহজ কাজ নয়। যন্ত্রটিকে প্রচণ্ড শীত, বিকিরণ, যোগাযোগের সমস্যা এবং পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ দূরনিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করতে হবে।
এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা—পৃথিবীর জীবাণু দিয়ে ইউরোপাকে দূষিত না করা। যদি কোনো যন্ত্র ইউরোপার সমুদ্রে প্রবেশ করে, তবে পৃথিবী থেকে বহন করা অণুজীব সেখানে পৌঁছে যাওয়া ঠেকাতে অত্যন্ত কঠোর জীবাণুমুক্তকরণ প্রয়োজন হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে কোনো অণুজীব পাওয়া গেলে সেটি সত্যিই ইউরোপার নিজস্ব প্রাণ, নাকি পৃথিবী থেকে বহন করে নিয়ে যাওয়া দূষণ—তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, পৃথিবীর কোনো জীব সেখানে টিকে গেলে একটি সম্ভাব্য স্বাধীন জীবমণ্ডলকে মানবজাতি অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে।
ইউরোপায় প্রাণ পাওয়া গেলে তার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব প্রায় অকল্পনীয়। পৃথিবীর বাইরে স্বাধীনভাবে উদ্ভূত প্রাণের একটি উদাহরণ পাওয়া মানে হবে মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি হয়তো একেবারে বিরল ঘটনা নয়। একই সৌরজগতের দুটি আলাদা জগতে যদি স্বাধীনভাবে প্রাণের জন্ম ঘটে থাকে, তাহলে কোটি কোটি নক্ষত্র ও গ্রহে ভরা ছায়াপথে জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমূল বদলে যাবে।
আবার ইউরোপায় কোনো প্রাণ না পাওয়াও বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল হতে পারে। যদি সেখানে দীর্ঘস্থায়ী সমুদ্র, রাসায়নিক উপাদান এবং শক্তির উৎস থাকা সত্ত্বেও প্রাণের কোনো চিহ্ন না থাকে, তাহলে বোঝা যেতে পারে যে বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি হওয়া আর প্রাণের উৎপত্তি হওয়ার মধ্যে বড় একটি ব্যবধান রয়েছে। তখন পৃথিবীতে প্রাণের জন্মের জন্য ঠিক কোন বিশেষ পরিস্থিতি প্রয়োজন হয়েছিল, সেই প্রশ্ন আরও গভীর হয়ে উঠবে।
ইউরোপার রহস্য তাই শুধু একটি বরফঢাকা চাঁদের নিচে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত প্রাণ সম্পর্কে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর একটির সঙ্গে যুক্ত। পৃথিবীতে মহাসাগরের গভীরে আমরা দেখেছি, সূর্যের আলো ছাড়াও পানি, শিলা ও রাসায়নিক শক্তির ওপর নির্ভর করে জীবন বিকশিত হতে পারে। ইউরোপা সেই ধারণাকে পৃথিবীর সীমানার বাইরে পরীক্ষা করার এক অসাধারণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার।
আজকের তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে সতর্ক বৈজ্ঞানিক বক্তব্য হলো—ইউরোপার বরফের নিচে একটি গভীর, বিস্তৃত ও সম্ভবত লবণাক্ত তরল সমুদ্র থাকার শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে এবং সেই পরিবেশে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি মৌলিক শর্ত উপস্থিত থাকার বাস্তব সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেখানে সত্যিই প্রাণ আছে কি না, তার উত্তর এখনো অজানা। সেই অজানাই ইউরোপাকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বৃহস্পতির বিকিরণময় আকাশের নিচে, বহু কিলোমিটার বরফের অন্ধকার আবরণের তলায় যদি সত্যিই কোনো জীবন্ত জগৎ লুকিয়ে থাকে, তবে তার সন্ধান মানবজাতির ইতিহাসে পৃথিবীর বাইরে জীবন অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হয়ে উঠবে।
ওয়ার্মহোল কি সত্যিই থাকতে পারে? মহাকাশের শর্টকাট নিয়ে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর ধারণা
সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ৮ মিনিটের বেশি সময় লাগে কেন? আলোর গতি ও মহাকাশের দূরত্বের বিজ্ঞান
পৃথিবীর বাইরে প্রাণ খুঁজতে বিজ্ঞানীরা কোন কোন সংকেত অনুসন্ধান করেন?
সুপারনোভা কী? একটি নক্ষত্রের মৃত্যু কীভাবে মহাবিশ্বকে আলোকিত করে?
চাঁদের অন্ধকার দিক আসলে কী? সেখানে কি কখনো সূর্যের আলো পড়ে না?
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন কীভাবে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে বেড়ায়? কক্ষপথে ভেসে থাকার বিজ্ঞান