বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন কীভাবে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে বেড়ায়? কক্ষপথে ভেসে থাকার বিজ্ঞান

  • Author: Admin
  • September 04, 2026
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন কীভাবে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে বেড়ায়? কক্ষপথে ভেসে থাকার বিজ্ঞান
পৃথিবীর চারদিকে অবিরাম ছুটে চলা মহাকাশ গবেষণাগার

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ছবি দেখলে প্রথমেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন মনে আসতে পারে—এত বিশাল একটি স্থাপনা পৃথিবীর কয়েক শ কিলোমিটার ওপরে কীভাবে দিনের পর দিন ভেসে থাকে? পৃথিবীর মহাকর্ষ যদি আমাদের মাটির দিকে টেনে রাখে, তাহলে একই মহাকর্ষ মহাকাশ স্টেশনকে নিচে নামিয়ে আনে না কেন? অনেকের ধারণা, মহাকাশ স্টেশন এমন উচ্চতায় রয়েছে যেখানে পৃথিবীর মহাকর্ষ প্রায় নেই। বাস্তবে বিষয়টি ঠিক উল্টো। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন যে উচ্চতায় ঘোরে, সেখানেও পৃথিবীর মহাকর্ষ যথেষ্ট শক্তিশালী। স্টেশনটি পৃথিবীতে পড়ছে না এমনও নয়। বরং বিস্ময়কর সত্য হলো—এটি সব সময়ই পৃথিবীর দিকে পড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে এত দ্রুত সামনের দিকে ছুটছে যে পৃথিবীর বাঁকানো পৃষ্ঠকে ক্রমাগত এড়িয়ে যাচ্ছে। এই অবিরাম পতনই আসলে কক্ষপথে ঘোরা।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অবস্থান করে। এর উচ্চতা স্থির কোনো সংখ্যা নয়; সময়ের সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার উচ্চতার অঞ্চলে ঘোরে। মহাকাশের বিশালতার তুলনায় এই দূরত্ব খুব বেশি নয়। পৃথিবীকে যদি বিশাল একটি গোলক হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে স্টেশনটি তার তুলনায় খুব কাছ দিয়েই ঘুরছে। এই কারণেই পৃথিবীর মহাকর্ষ সেখানে দুর্বল হয়ে শূন্য হয়ে যায় না।

কক্ষপথের মূল রহস্য বোঝার জন্য একটি সাধারণ চিন্তাপ্রয়োগ করা যায়। ধরুন, পৃথিবীর অনেক ওপরে একটি পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি বস্তু অনুভূমিকভাবে ছুড়ে দেওয়া হলো। ধীরে ছুড়লে বস্তুটি কিছু দূর গিয়ে মাটিতে পড়বে। আরও বেশি গতিতে ছুড়লে সেটি আরও দূরে গিয়ে পড়বে। এখন যদি এমন প্রচণ্ড গতি দেওয়া যায় যে বস্তুটি যতক্ষণে নিচের দিকে পড়ছে, ততক্ষণে পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠও তার নিচে একই অনুপাতে বাঁক নিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে, তাহলে বস্তুটি আর মাটিতে পৌঁছাতে পারবে না। সেটি পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকবে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ক্ষেত্রেও মূলত এই ঘটনাই ঘটছে।

স্টেশনটি ঘণ্টায় প্রায় আটাশ হাজার কিলোমিটারের কাছাকাছি গতিতে পৃথিবীর চারদিকে ছুটে চলে। প্রতি সেকেন্ডে এই গতি প্রায় সাত দশমিক সাত কিলোমিটারের কাছাকাছি। অর্থাৎ মাত্র এক সেকেন্ডে এটি এমন দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, যা একটি শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার দূরত্বের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এত বিপুল অনুভূমিক গতির কারণেই পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে নিচের দিকে টানলেও স্টেশনটি সরাসরি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে না।

এই গতিতে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মোটামুটি নব্বই মিনিটের কাছাকাছি সময় লাগে। ফলে এক দিনে এটি প্রায় ষোলোবার পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে আসতে পারে। স্টেশনে থাকা নভোচারীরা তাই পৃথিবীর মানুষের মতো প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় মাত্র একবার সূর্যোদয় ও একবার সূর্যাস্ত দেখেন না। কক্ষপথের প্রতিটি চক্করে তারা পৃথিবীর আলোকিত অংশ থেকে অন্ধকার অংশে এবং আবার অন্ধকার থেকে আলোকিত অংশে প্রবেশ করেন। ফলে এক পৃথিবী-দিনে তাদের সামনে বহুবার সূর্য ওঠে এবং ডুবে যায়।

এখানে মহাকর্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর মহাকর্ষ না থাকলে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতই না। তখন এটি তার গতির দিক বরাবর প্রায় সরল পথে মহাশূন্যে চলে যেত। পৃথিবীর মহাকর্ষই প্রতিনিয়ত তার চলার দিক পরিবর্তন করে তাকে পৃথিবীর দিকে বাঁকিয়ে রাখছে। অন্যদিকে স্টেশনের সামনের দিকে থাকা বিপুল গতি তাকে সরাসরি নিচে পড়ে যেতে দিচ্ছে না। এই দুইয়ের সম্মিলিত ফল হলো কক্ষপথ।

এই অবস্থাকে বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ভেতরে নভোচারীদের ভাসতে দেখা যায় বলে অনেকেই মনে করেন সেখানে মহাকর্ষ নেই। বাস্তবে নভোচারী, স্টেশন এবং স্টেশনের ভেতরের সব বস্তু একই সঙ্গে পৃথিবীর দিকে মুক্তভাবে পড়ছে। তাই স্টেশনের মেঝে নভোচারীদের শরীরকে পৃথিবীর মাটির মতো ঠেকিয়ে রাখছে না। একজন নভোচারী এবং তার পাশের কলম দুটিই প্রায় একই হারে পতনের অবস্থায় থাকায় তাদের একে অপরের তুলনায় ভাসমান মনে হয়। এই পরিবেশকে তাই মহাকর্ষ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত বলা যথাযথ নয়; বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী মুক্তপতনের পরিবেশ।

পৃথিবীর পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে আমরা ভাসি না, কারণ মাটি আমাদের আরও নিচে পড়তে বাধা দেয়। মহাকর্ষ আমাদের পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টানছে, কিন্তু ভূমি তার বিপরীতে আমাদের শরীরকে ঠেলে ধরে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে এমন স্থির ভূমি নেই। পুরো স্টেশনটিই পৃথিবীর দিকে পড়ছে। ফলে ভেতরের মানুষ ও বস্তু স্টেশনের সঙ্গে একই মুক্তপতনে অংশ নেয়। এই কারণেই নভোচারীরা সেখানে দেয়াল, ছাদ ও মেঝের প্রচলিত ধারণা ছাড়াই চলাফেরা করতে পারেন।

তবে কক্ষপথে একবার পৌঁছে গেলেই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন চিরকাল একই উচ্চতায় ঘুরতে থাকবে—এমন নয়। প্রায় চারশ কিলোমিটার উচ্চতাতেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সেখানে বাতাস অত্যন্ত পাতলা, কিন্তু একেবারে অনুপস্থিত নয়। এই অতি পাতলা বায়ুমণ্ডলের কণাগুলো স্টেশনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায় এবং সামান্য প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। প্রতিরোধটি খুব দুর্বল হলেও দীর্ঘ সময় ধরে এর প্রভাব জমতে থাকে।

এই বায়ুপ্রতিরোধের কারণে স্টেশন ধীরে ধীরে গতিশক্তি হারায় এবং তার কক্ষপথের উচ্চতা কমতে শুরু করে। অর্থাৎ কোনো সংশোধন করা না হলে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ক্রমে নিচের দিকে নেমে আসত। নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ঘন বায়ুমণ্ডলের প্রভাব আরও বাড়ত, ফলে পতনের হারও বাড়তে পারত। এই কারণেই সময়ে সময়ে স্টেশনের কক্ষপথ আবার উঁচু করা হয়।

কক্ষপথ উঁচু করার এই প্রক্রিয়ায় স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত মহাকাশযানের চালনাব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চালকযন্ত্র সক্রিয় করে স্টেশনের গতিতে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়। এই সামান্য পরিবর্তনই তার কক্ষপথকে আবার কিছুটা উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এত বিশাল স্টেশনকে নিশ্চয়ই ক্রমাগত ইঞ্জিন চালিয়ে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরাতে হয়। বাস্তবে মূল কক্ষপথীয় চলাচলের জন্য সারাক্ষণ ইঞ্জিন চালানোর প্রয়োজন হয় না। একবার যথাযথ গতি ও কক্ষপথে পৌঁছানোর পর মহাকর্ষ এবং জড়তার কারণে স্টেশন নিজেই পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকে। চালনাব্যবস্থা মূলত প্রয়োজনীয় সংশোধন, উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে কক্ষপথ পরিবর্তনের কাজে লাগে।

স্টেশনের কক্ষপথ নিখুঁতভাবে একই অবস্থায় থাকে না। পৃথিবীর মহাকর্ষক্ষেত্র পুরোপুরি সমান নয়, সূর্য ও চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাব রয়েছে, বায়ুমণ্ডলের ঘনত্বও সব সময় একই থাকে না। সূর্যের কার্যকলাপ বেড়ে গেলে পৃথিবীর ওপরের বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হতে পারে। তখন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন যে উচ্চতায় রয়েছে, সেখানে বায়ুকণার ঘনত্ব কিছুটা বাড়তে পারে এবং স্টেশনের ওপর প্রতিরোধও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে কক্ষপথের উচ্চতা কত দ্রুত কমবে, তা সব সময় একই থাকে না।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কক্ষপথ পৃথিবীর বিষুবরেখার ঠিক ওপর দিয়ে ঘোরে না। এর কক্ষপথ বিষুবরেখার তুলনায় প্রায় একান্ন দশমিক ছয় ডিগ্রি কাত হয়ে রয়েছে। এই কক্ষপথীয় ঢালের কারণে স্টেশনটি পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণের বিস্তৃত অঞ্চলের ওপর দিয়ে যেতে পারে। পৃথিবী আবার নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে। ফলে স্টেশন প্রতিবার প্রদক্ষিণের সময় পৃথিবীর ঠিক একই ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে যায় না। এক চক্কর থেকে পরের চক্করে তার নিচে ভিন্ন অঞ্চল চলে আসে।

এ কারণেই কখনো আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ইউরোপের ওপর দিয়ে, কখনো এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা বিভিন্ন মহাসাগরের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। তবে এর কক্ষপথীয় ঢালের সীমার কারণে এটি পৃথিবীর একেবারে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর ওপর দিয়ে যায় না। মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে নিয়মিত যাত্রা এবং মহাকাশযানের উৎক্ষেপণসংক্রান্ত বাস্তবতার ক্ষেত্রে এই কক্ষপথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

স্টেশনটি পৃথিবীর চারদিকে যে পথে ঘোরে, সেটিকে শুধু পৃথিবীর পৃষ্ঠে আঁকা একটি বৃত্ত হিসেবে ভাবলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে স্টেশন মহাশূন্যে তার কক্ষপথ অনুসরণ করছে, আর একই সময়ে পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে। ফলে পৃথিবীর মানচিত্রে স্টেশনের চলার পথ দেখালে সেটি এক জায়গায় স্থির বৃত্তের মতো দেখা যায় না। প্রতিটি প্রদক্ষিণের পর তার নিচের ভূখণ্ড বদলে যায়। এই কারণেই নির্দিষ্ট কোনো শহরের আকাশে স্টেশন প্রতিটি চক্করে দৃশ্যমান হয় না।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে খালি চোখেও কখনো কখনো দেখা যায়। তখন এটি আকাশে দ্রুত চলমান উজ্জ্বল বিন্দুর মতো মনে হয়। এটি নিজে কোনো নক্ষত্রের মতো আলো তৈরি করছে বলে এত উজ্জ্বল দেখায় না। মূলত সূর্যের আলো এর বিশাল সৌরফলক ও অন্যান্য অংশে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে পৌঁছায়। বিশেষ করে সূর্যাস্তের কিছু সময় পর কিংবা সূর্যোদয়ের আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন পর্যবেক্ষকের অবস্থান অন্ধকারে থাকলেও কয়েক শ কিলোমিটার ওপরে থাকা স্টেশনটি তখনও সূর্যের আলো পাচ্ছে। ফলে রাতের আকাশের পটভূমিতে সেটিকে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখা যেতে পারে।

স্টেশনের বিশাল সৌরফলকগুলো শুধু তাকে দৃশ্যমান করে তোলার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এগুলো তার বিদ্যুৎ সরবরাহেরও প্রধান ভিত্তি। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে স্টেশনের গবেষণাগার, জীবনধারণ ব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা, কম্পিউটার এবং অসংখ্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্র পরিচালিত হয়। কিন্তু পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার সময় স্টেশন বারবার পৃথিবীর ছায়ায় প্রবেশ করে। তখন সৌরফলক সরাসরি সূর্যের আলো পায় না। এই সময় সঞ্চিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালু রাখা হয়। আবার সূর্যালোকে ফিরে এলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শক্তি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

কক্ষপথে স্টেশনের অবস্থান শুধু উচ্চতা ও গতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর দিক, অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পথ অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। পৃথিবীর চারপাশের নিম্ন কক্ষপথে অসংখ্য কার্যকর ও অকার্যকর কৃত্রিম উপগ্রহ, ব্যবহৃত রকেটের অংশ এবং বিভিন্ন আকারের মহাকাশ আবর্জনা রয়েছে। বিপুল কক্ষপথীয় গতির কারণে তুলনামূলক ছোট কোনো বস্তুর সংঘর্ষও স্টেশনের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সম্ভাব্য বিপজ্জনক কোনো বস্তু স্টেশনের খুব কাছে দিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার গতিপথ বিশ্লেষণ করা হয়। প্রয়োজন হলে স্টেশনের কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন এনে সংঘর্ষের ঝুঁকি কমানো যায়। এই পরিবর্তন বাইরে থেকে খুব সামান্য মনে হলেও কক্ষপথগতিবিদ্যায় অল্প গতিবদলও কিছু সময় পর অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে। ফলে মহাকাশ স্টেশনের নিরাপদ পরিচালনায় কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবীকে ঘিরে চললেও পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই স্থানের ওপর স্থির থাকে না। কিছু যোগাযোগ উপগ্রহ এমন উচ্চতা ও কক্ষপথে স্থাপন করা হয়, যেখানে তাদের পৃথিবী প্রদক্ষিণের সময় পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারদিকে একবার ঘোরার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে সেগুলোকে আকাশের একই অঞ্চলে প্রায় স্থির মনে হতে পারে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তার তুলনায় পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি এবং অনেক দ্রুত প্রদক্ষিণ করে। তাই এটি কোনো একটি দেশের ওপর স্থির হয়ে থাকে না।

কক্ষপথে গতির গুরুত্ব এত বেশি যে স্টেশনটিকে হঠাৎ সম্পূর্ণ থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সেটি আর বর্তমান কক্ষপথে থাকতে পারত না। তার অনুভূমিক গতি হারিয়ে গেলে পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে দ্রুত নিচের দিকে টেনে আনত। আবার বর্তমান উচ্চতায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি গতি দেওয়া হলে তার কক্ষপথ বদলে যেত; যথেষ্ট বেশি গতি পেলে কোনো বস্তু পৃথিবীর মহাকর্ষীয় বন্ধন ছেড়েও দূরে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ মহাকাশে অবস্থানের জন্য শুধু উচ্চতায় ওঠাই যথেষ্ট নয়—সঠিক দিকে সঠিক কক্ষপথীয় গতি অর্জন করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

এই কারণেই মহাকাশযান উৎক্ষেপণের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো তাকে শুধু ওপরে তোলা নয়, বরং বিপুল অনুভূমিক গতি দেওয়া। রকেট প্রথমে পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে ওপরে ওঠে, পরে তার যাত্রাপথ ক্রমে বাঁকিয়ে এমন গতি অর্জন করে যাতে মহাকাশযান পৃথিবীর চারদিকে মুক্তপতনের কক্ষপথে প্রবেশ করতে পারে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বিভিন্ন অংশও একবারে মহাকাশে পাঠানো হয়নি। বহু বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন অংশ কক্ষপথে পাঠিয়ে সেখানে যুক্ত করে বিশাল গবেষণাগারটি নির্মাণ করা হয়েছে।

স্টেশনের ভেতরের জীবনও এই দ্রুত কক্ষপথীয় চলাচলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাইরে থেকে একজন পর্যবেক্ষক দেখলে বুঝতে পারবেন স্টেশনটি প্রতি সেকেন্ডে কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করছে, অথচ ভেতরে থাকা নভোচারীর কাছে নিজের চারপাশের পরিবেশ শান্ত মনে হতে পারে। কারণ নভোচারী, স্টেশন, বাতাস, যন্ত্রপাতি এবং ভাসমান বস্তু—সবকিছুই প্রায় একই গতিতে একই কক্ষপথে চলছে। অনেকটা সমান গতিতে চলা একটি মসৃণ যানবাহনের ভেতরে বসে থাকার মতো, যদিও এখানে গতি তুলনাহীনভাবে বেশি এবং পুরো ব্যবস্থাটি পৃথিবীর দিকে মুক্তপতনে রয়েছে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ক্ষীণ সংঘর্ষ, কক্ষপথের উচ্চতার পরিবর্তন, মহাকাশ আবর্জনা এড়ানো, সৌরফলকের অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আগত মহাকাশযানের মিলন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে কক্ষপথে পরিচালনা করা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি কাজ। কোনো মহাকাশযান স্টেশনের কাছে গেলেই সরাসরি তার দিকে লক্ষ্য করে উড়ে গেলেই হয় না। তাকে এমনভাবে কক্ষপথ পরিবর্তন করতে হয় যাতে নির্দিষ্ট সময়ে তার অবস্থান ও গতি স্টেশনের অবস্থান ও গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। পৃথিবীতে দুটি গাড়ির সাক্ষাতের তুলনায় এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের গতিবিদ্যা।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে আকাশে স্থিরভাবে ঝুলিয়ে রাখার জন্য কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে না। এটি পৃথিবীর মহাকর্ষ থেকে মুক্তও নয়। বরং মহাকর্ষই তাকে পৃথিবীর সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। প্রতি মুহূর্তে পৃথিবী তাকে নিজের দিকে টানছে, আর তার প্রচণ্ড অনুভূমিক গতি তাকে প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর পৃষ্ঠকে এড়িয়ে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। এই দুইয়ের নিখুঁত সমন্বয়ে শত শত টনের বিশাল গবেষণাগারটি পৃথিবীর চারদিকে অবিরাম ছুটে চলছে।

তাই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কক্ষপথকে শুধু “মহাকাশে ভেসে থাকা” বললে এর প্রকৃত বিজ্ঞানটি ধরা পড়ে না। আরও যথার্থভাবে বলা যায়, এটি এমন এক অন্তহীন পতনের মধ্যে রয়েছে যার নিচে পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠও ক্রমাগত বাঁক নিয়ে সরে যাচ্ছে। পৃথিবী তাকে টেনে নিচ্ছে, কিন্তু সে কখনো মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না। প্রায় নব্বই মিনিট পরপর একটি পূর্ণ চক্কর শেষ করে আবার নতুন করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছে। মহাকর্ষ, গতি ও পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির এই অসাধারণ সমন্বয়ই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে মানবজাতির অন্যতম বিস্ময়কর চলমান গবেষণাগার হিসেবে পৃথিবীর আকাশে ধরে রেখেছে।