বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মাইক্রোচিপ কীভাবে তৈরি হয়? বালু থেকে কোটি কোটি ট্রানজিস্টরের বিস্ময়কর যাত্রা

মাইক্রোচিপ কীভাবে তৈরি হয়? বালু থেকে কোটি কোটি ট্রানজিস্টরের বিস্ময়কর যাত্রা
বালুর সিলিকন থেকে কোটি কোটি ট্রানজিস্টরের মাইক্রোচিপ

এক মুঠো বালু আর আধুনিক মুঠোফোনের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র মাইক্রোচিপকে পাশাপাশি রাখলে তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। একদিকে অগণিত অনিয়মিত বালুকণা, অন্যদিকে মানুষের তৈরি সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও জটিল যন্ত্রগুলোর একটি। অথচ এই দুই জগতের মধ্যে রয়েছে গভীর বস্তুগত সম্পর্ক। অধিকাংশ বালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সিলিকন ডাই-অক্সাইড, আর আধুনিক অর্ধপরিবাহী শিল্পের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো অত্যন্ত বিশুদ্ধ সিলিকন। তবে সমুদ্রসৈকত থেকে এক মুঠো বালু তুলে সরাসরি কারখানায় ঢুকিয়ে দিলেই চিপ তৈরি হয়ে যায় না। বালু থেকে ব্যবহারযোগ্য সিলিকন, সেখান থেকে একক স্ফটিক, তারপর পাতলা ওয়েফার এবং শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টরসমৃদ্ধ চিপ তৈরির পথটি অত্যন্ত দীর্ঘ, জটিল ও সূক্ষ্ম।

সিলিকনকে এত গুরুত্ব দেওয়ার মূল কারণ তার বৈদ্যুতিক ধর্ম। এটি তামার মতো ভালো পরিবাহীও নয়, আবার কাচের মতো পুরোপুরি অন্তরকও নয়। নির্দিষ্ট অমিশ্রণ যোগ করে এবং এর ভেতরের বৈদ্যুতিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে সিলিকনের পরিবাহিতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বদলানো যায়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই সিলিকন দিয়ে এমন ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সুইচ তৈরি করা সম্ভব, যেগুলোকে আমরা ট্রানজিস্টর বলি। আধুনিক গণনাযন্ত্রে এই ট্রানজিস্টরগুলো অসংখ্যবার চালু ও বন্ধ হয়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মৌলিক কাজ সম্পন্ন করে।

যাত্রার শুরুতে দরকার সিলিকনসমৃদ্ধ কাঁচামাল। প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ সিলিকন সাধারণত মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় না; এটি অক্সিজেনসহ বিভিন্ন মৌলের সঙ্গে যৌগ হিসেবে থাকে। সিলিকন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ কাঁচামালকে উচ্চ তাপমাত্রায় কার্বনের সঙ্গে বিক্রিয়া করিয়ে প্রথমে তুলনামূলকভাবে বিশুদ্ধ সিলিকন তৈরি করা যায়। কিন্তু অর্ধপরিবাহী তৈরির জন্য এতটুকু বিশুদ্ধতা যথেষ্ট নয়। সামান্য অনাকাঙ্ক্ষিত অমিশ্রণও ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টরের বৈদ্যুতিক আচরণ বদলে দিতে পারে। তাই পরবর্তী পর্যায়ে রাসায়নিক পরিশোধনের মাধ্যমে সিলিকনকে অত্যন্ত উচ্চ বিশুদ্ধতায় নিয়ে যেতে হয়।

বিশুদ্ধ সিলিকন পাওয়ার পরও সেটি দিয়ে সরাসরি চিপ বানানো যায় না। আধুনিক অর্ধপরিবাহী নির্মাণের জন্য সিলিকনের পরমাণুগুলোকে অত্যন্ত নিয়মিত স্ফটিক কাঠামোতে সাজানো প্রয়োজন। এজন্য বিশুদ্ধ সিলিকন গলিয়ে তার মধ্যে একটি ছোট একক স্ফটিকের বীজ প্রবেশ করানো হয়। বীজটিকে ধীরে ধীরে ঘোরাতে ঘোরাতে গলিত সিলিকন থেকে ওপরে তোলা হলে তার চারপাশে একই স্ফটিক বিন্যাস অনুসরণ করে সিলিকন জমতে থাকে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় দীর্ঘ নলাকার একক স্ফটিক সিলিকনের দণ্ড।

এই দণ্ড দেখতে খুব নাটকীয় কিছু নয়, কিন্তু এর ভেতরের পরমাণুগুলোর সুশৃঙ্খল বিন্যাসই পরবর্তী সব কাজের ভিত্তি। স্ফটিকের মধ্যে অতিরিক্ত ত্রুটি থাকলে পরবর্তী ট্রানজিস্টরগুলোর বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য নির্ভরযোগ্য থাকবে না। তাই স্ফটিক বৃদ্ধির সময় তাপমাত্রা, ঘূর্ণনের গতি, টানার হার এবং অমিশ্রণের মাত্রা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এরপর বিশাল সিলিকন দণ্ডকে অত্যন্ত পাতলা গোল চাকতির মতো টুকরোয় কাটা হয়। এগুলোই সিলিকন ওয়েফার। আধুনিক কারখানায় একটি ওয়েফারের ওপর একই সঙ্গে বহু চিপের নকশা তৈরি করা যায়। কাটার পর ওয়েফারের পৃষ্ঠ প্রথমে যথেষ্ট মসৃণ থাকে না। তাই ঘষামাজা, রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং অতিসূক্ষ্ম পালিশের মাধ্যমে এর পৃষ্ঠকে প্রায় আয়নার মতো সমতল করা হয়। কারণ পরবর্তী ধাপে যে ক্ষুদ্র নকশা তৈরি করা হবে, সেখানে সামান্য অসমতাও বড় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

এরপর ওয়েফার প্রবেশ করে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শিল্পপরিবেশগুলোর একটিতে। অর্ধপরিবাহী কারখানার পরিচ্ছন্ন কক্ষে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। কর্মীরা বিশেষ পোশাক, মুখাবরণ, মাথার আবরণ, দস্তানা ও জুতা ব্যবহার করেন। কারণ মানুষের চুল, ত্বকের ক্ষুদ্র কণা কিংবা সাধারণ ধূলিকণাও চিপের সূক্ষ্ম নকশার তুলনায় বিশাল হতে পারে। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কণা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঢেকে দিলে পুরো চিপ ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে।

ওয়েফারের ওপর ট্রানজিস্টরের জটিল নকশা তৈরির অন্যতম প্রধান পদ্ধতি হলো আলোকছাপ প্রক্রিয়া। সহজভাবে ভাবলে এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছাপ তৈরির ব্যবস্থা। প্রথমে ওয়েফারের পৃষ্ঠে আলো-সংবেদনশীল বিশেষ রাসায়নিকের অতি পাতলা আবরণ দেওয়া হয়। ওয়েফারকে দ্রুত ঘোরানোর মাধ্যমে এই আবরণ সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

এরপর পূর্বনির্ধারিত নকশা অনুসারে আলো ব্যবহার করে আবরণের নির্বাচিত অংশে পরিবর্তন ঘটানো হয়। আধুনিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত জটিল আলোকযন্ত্র, মুখোশ, প্রতিফলক, নিয়ন্ত্রিত আলোকরশ্মি এবং অত্যন্ত নিখুঁত অবস্থান নির্ধারণ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়। উন্নত প্রজন্মের ক্ষুদ্র নকশা তৈরিতে অত্যন্ত স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনি আলোও ব্যবহৃত হয়। উদ্দেশ্য একটাই—ওয়েফারের নির্দিষ্ট স্থানে অবিশ্বাস্য সূক্ষ্মতায় কাঙ্ক্ষিত নকশা স্থানান্তর করা।

আলো পাওয়ার পর রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আলোক-সংবেদনশীল আবরণের নির্দিষ্ট অংশ সরিয়ে ফেলা হয়। ফলে নিচের স্তরের কিছু অংশ উন্মুক্ত হয় এবং কিছু অংশ সুরক্ষিত থাকে। এরপর খোদাই প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত অংশ থেকে পদার্থ সরানো হতে পারে। কখনো রাসায়নিক দ্রবণ, কখনো আয়নিত গ্যাসের সাহায্যে এই কাজ করা হয়। বিশেষ করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাঠামো তৈরিতে শুষ্ক খোদাই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট দিকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে পদার্থ অপসারণ করা যায়।

কিন্তু ট্রানজিস্টর তৈরির জন্য শুধু সিলিকনের আকার কেটে দিলেই চলে না। সিলিকনের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যও নির্দিষ্ট অঞ্চলে পরিবর্তন করতে হয়। এজন্য খুব অল্প পরিমাণে নির্বাচিত মৌলের পরমাণু সিলিকনের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। এই নিয়ন্ত্রিত অমিশ্রণ সংযোজনের মাধ্যমে এমন অঞ্চল তৈরি করা যায় যেখানে বৈদ্যুতিক আধান বহনকারী কণার প্রকৃতি ও ঘনত্ব ভিন্ন হয়। আধুনিক কারখানায় আয়ন প্রবেশ করানোর পদ্ধতিতে উচ্চশক্তির আয়নকে সিলিকনের নির্দিষ্ট অঞ্চলে নিক্ষেপ করা হয়। পরে তাপপ্রয়োগের মাধ্যমে স্ফটিক কাঠামোর ক্ষতি মেরামত এবং যোগ করা পরমাণুগুলোকে কার্যকর অবস্থানে স্থাপন করা হয়।

একটি আধুনিক ট্রানজিস্টরকে খুব সরলভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক দরজা হিসেবে ভাবা যায়। একটি অংশে প্রয়োগ করা বৈদ্যুতিক সংকেত অন্য দুটি অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহ হবে কি না, তা নিয়ন্ত্রণ করে। এই ক্ষুদ্র সুইচের অসংখ্য সমন্বয় দিয়েই যুক্তিদ্বার, স্মৃতিকোষ, গণনা একক এবং শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

ট্রানজিস্টর ছোট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের গঠনও পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় ট্রানজিস্টরের নিয়ন্ত্রণকারী অংশ মূলত সমতল কাঠামোর ওপর তৈরি হতো। পরে ত্রিমাত্রিক পাখনার মতো কাঠামোর চারপাশে নিয়ন্ত্রণকারী অংশ বসিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহের ওপর আরও ভালো নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা হয়। আরও উন্নত নির্মাণে প্রবাহপথকে অত্যন্ত সরু স্তর বা তারের মতো কাঠামোয় তৈরি করে তার চারপাশ থেকে বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। ট্রানজিস্টরের মাত্রা যত ক্ষুদ্র হয়েছে, অবাঞ্ছিত বিদ্যুৎক্ষরণ, তাপ এবং পরমাণুস্তরের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ তত কঠিন হয়ে উঠেছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোটি কোটি ট্রানজিস্টর একবারে ওয়েফারের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয় না। একই ওয়েফারের ওপর স্তরের পর স্তর তৈরি, আলো দিয়ে নকশা আঁকা, খোদাই করা, পদার্থ জমা দেওয়া, অমিশ্রণ প্রবেশ করানো, পরিষ্কার করা এবং সমতল করার কাজ বারবার করা হয়। একটি উন্নত চিপ তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় এমন শত শত ধাপ থাকতে পারে এবং ওয়েফারকে বিভিন্ন অত্যন্ত জটিল যন্ত্রের মধ্য দিয়ে বারবার যেতে হয়।

ট্রানজিস্টর তৈরি হয়ে গেলেও কাজের বড় অংশ তখনো বাকি। কারণ কোটি কোটি ক্ষুদ্র সুইচকে পরস্পরের সঙ্গে সঠিকভাবে যুক্ত করতে হবে। একটি নগরের কোটি কোটি বাড়ি তৈরি করে যদি তাদের মধ্যে রাস্তা না থাকে, তবে সেই নগর কার্যকর হবে না। একইভাবে ট্রানজিস্টরের ওপর বহু স্তরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধাতব সংযোগ তৈরি করা হয়। নিচের স্তরগুলোতে সংযোগ অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ঘন হতে পারে, আর ওপরের স্তরগুলো তুলনামূলকভাবে মোটা সংযোগের মাধ্যমে শক্তি ও দূরবর্তী সংকেত পরিবহন করতে পারে।

এক স্তরের ধাতব পথকে অন্য স্তরের সঙ্গে যুক্ত করতে ক্ষুদ্র উল্লম্ব সংযোগ তৈরি করা হয়। ফলে পুরো চিপের ভেতরে ত্রিমাত্রিক বৈদ্যুতিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠে। একটি আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ চিপের অণুবীক্ষণিক কাটা অংশ দেখলে তাই শুধু নিচে ট্রানজিস্টরের স্তর নয়, তার ওপর একের পর এক সংযোগস্তরের জটিল জাল দেখা যায়।

প্রতিটি নতুন স্তর তৈরির পর পৃষ্ঠ অসম হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সূক্ষ্ম নকশা তৈরির জন্য সমতল পৃষ্ঠ দরকার। তাই রাসায়নিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়া একত্রে ব্যবহার করে অতিরিক্ত পদার্থ সরিয়ে পৃষ্ঠকে আবার সমতল করা হয়। এই সমতলকরণ ছাড়া বহু স্তরের জটিল চিপ নির্ভরযোগ্যভাবে তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন।

পুরো প্রক্রিয়ায় একটি বিস্ময়কর বিষয় হলো স্তরগুলোর পারস্পরিক অবস্থান। একটি স্তরের নকশা যদি আগের স্তরের তুলনায় সামান্য সরে যায়, তবে ক্ষুদ্র সংযোগ ভুল স্থানে পড়তে পারে। তাই ওয়েফারের অবস্থান ও নকশার সামঞ্জস্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এখানে যন্ত্রের কম্পন, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং পদার্থের অতি সামান্য প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চিপ নির্মাণে পানি পর্যন্ত সাধারণ পানি নয়। বিভিন্ন পরিষ্কারকরণ ধাপে এমন অতিবিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয়, যেখান থেকে দ্রবীভূত খনিজ, জৈব পদার্থ, ক্ষুদ্র কণা এবং অন্যান্য অমিশ্রণ অত্যন্ত কঠোরভাবে অপসারণ করা হয়েছে। একইভাবে ব্যবহৃত গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থের বিশুদ্ধতাও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। কারণ অণু ও পরমাণুস্তরে কাজ করার সময় সাধারণ শিল্পকারখানায় তুচ্ছ বলে বিবেচিত অমিশ্রণও এখানে গুরুতর ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে।

ওয়েফারের ওপর সব স্তর তৈরি হয়ে গেলে সেটিকে সরাসরি কেটে ফেলা হয় না। প্রথমে প্রতিটি সম্ভাব্য চিপের বৈদ্যুতিক পরীক্ষা করা হয়। ক্ষুদ্র পরীক্ষক সংযোগের মাধ্যমে দেখা হয় কোন অংশ সঠিকভাবে কাজ করছে এবং কোনটি ত্রুটিপূর্ণ। একই ওয়েফারের সব চিপ নিখুঁত হয় না। কোথাও ধূলিকণা, নকশাগত বিচ্যুতি, উপাদানের ত্রুটি বা প্রক্রিয়াগত সমস্যার কারণে কিছু চিপ নষ্ট হতে পারে। একটি ওয়েফার থেকে কত শতাংশ কার্যকর চিপ পাওয়া গেল, তা উৎপাদনের অর্থনীতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরীক্ষার পর ওয়েফারকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কেটে পৃথক আয়তাকার চিপে ভাগ করা হয়। এই পৃথক অংশকে ডাই বলা হয়। কার্যকর ডাইগুলো এরপর মোড়কীকরণ পর্যায়ে যায়। অনেকেই কম্পিউটারের ভেতরে যে কালো বা সবুজ আবৃত অংশটিকে চিপ হিসেবে দেখেন, সেটি আসলে ভেতরের ক্ষুদ্র সিলিকন ডাইসহ সম্পূর্ণ মোড়ক। এই মোড়ক চিপকে যান্ত্রিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, বাইরের বর্তনীর সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয় এবং উৎপন্ন তাপ বের করতেও সহায়তা করে।

আধুনিক মোড়কীকরণ নিজেই এখন অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে। সব ক্ষেত্রে একটি মোড়কের মধ্যে শুধু একটি ডাই থাকে না। একাধিক বিশেষায়িত ডাই পাশাপাশি বা স্তরে স্তরে যুক্ত করা যেতে পারে। কোনো অংশ গণনার কাজ করতে পারে, কোনো অংশ স্মৃতি হিসেবে কাজ করতে পারে, আবার কোনো অংশ বাইরের যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ সামলাতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের উন্নতি শুধু ট্রানজিস্টর ছোট করার ওপর নির্ভর করছে না; বিভিন্ন চিপকে অত্যন্ত দ্রুত ও দক্ষভাবে একত্রে যুক্ত করার প্রযুক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মোড়কীকরণের পরও পরীক্ষা শেষ হয় না। চিপকে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক অবস্থা, কাজের চাপ ও তাপমাত্রায় পরীক্ষা করা হয়। কোন চিপ নির্দিষ্ট গতিতে স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে, কত শক্তি ব্যবহার করে এবং তাপমাত্রা বাড়লে তার আচরণ কী হয়—এসব যাচাই করা হয়। একই নকশার তৈরি চিপের মধ্যেও উৎপাদনের ক্ষুদ্র পার্থক্যের কারণে কার্যক্ষমতায় কিছু তারতম্য থাকতে পারে। পরীক্ষার ফল অনুসারে সেগুলোকে বিভিন্ন কার্যক্ষমতার শ্রেণিতে ভাগ করা সম্ভব।

এই পুরো যাত্রার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো আকারের পরিবর্তন। শুরুতে ছিল চোখে দেখা যায় এমন বালুকণা। সেখান থেকে সিলিকন আলাদা ও বিশুদ্ধ করা হলো, একক স্ফটিক জন্মানো হলো, সেটিকে চাকতির মতো ওয়েফারে কাটা হলো। এরপর সেই ওয়েফারের ক্ষুদ্র অংশে এমন কাঠামো তৈরি হলো, যার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো এত ছোট যে খালি চোখ তো দূরের কথা, সাধারণ আলোক অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়েও সেগুলোর প্রকৃত গঠন দেখা সম্ভব নয়।

তবে “বালু থেকে চিপ” কথাটি শুনে একটি ভুল ধারণা হওয়া স্বাভাবিক। চিপের মূল্য কাঁচামালের সিলিকনে নয়। প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তি, স্ফটিক বৃদ্ধি, অতি সূক্ষ্ম আলোকছাপ, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, যন্ত্র প্রকৌশল, নকশা, পরিমাপ, ত্রুটি নিয়ন্ত্রণ এবং শত শত উৎপাদন ধাপের সম্মিলিত দক্ষতায়। একটি আধুনিক অর্ধপরিবাহী কারখানা নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অন্যতম কারণও এটি। এখানে ব্যবহৃত কিছু যন্ত্র নিজেরাই পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল শিল্পযন্ত্রের মধ্যে পড়ে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চিপ তৈরির আগেই তার ভেতরের কোটি কোটি ট্রানজিস্টর ও সংযোগের বিন্যাস পরিকল্পনা করতে হয়। প্রকৌশলীরা প্রথমে নির্ধারণ করেন চিপটি কী কাজ করবে, তারপর সেই কাজকে বিভিন্ন গণনামূলক অংশে ভাগ করেন। সেই যুক্তিগত নকশাকে ধীরে ধীরে এমন বাস্তব বিন্যাসে রূপ দেওয়া হয়, যা কারখানায় সিলিকনের ওপর নির্মাণ করা সম্ভব। অর্থাৎ চিপ একই সঙ্গে একটি ভৌত বস্তু এবং বিপুল জটিলতার তথ্যনির্ভর নকশা।

একটি আধুনিক মাইক্রোচিপ তাই শুধু ক্ষুদ্র একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র নয়। এর মধ্যে ঘনীভূত রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, আলোকবিজ্ঞান, তড়িৎ প্রকৌশল, যন্ত্র প্রকৌশল, গণিত, উপাদানবিজ্ঞান এবং গণনাবিজ্ঞানের কয়েক দশকের অগ্রগতি। আমরা যখন মুঠোফোনে একটি ছবি তুলি, মানচিত্র দেখি, ভিডিও চালাই বা কোনো গণনা করি, তখন আঙুলের নিচে থাকা যন্ত্রটির ভেতরে অসংখ্য ট্রানজিস্টর প্রতি মুহূর্তে বৈদ্যুতিক সংকেত নিয়ন্ত্রণ করছে।

আর এই অবিশ্বাস্য প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয় এমন একটি মৌল দিয়ে, যা পৃথিবীর ভূত্বকে অত্যন্ত পরিচিত। প্রকৃতি আমাদের সিলিকন দিয়েছে; মানুষ সেই সিলিকনের পরমাণুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল আবিষ্কার করেছে। বালু থেকে বিশুদ্ধ সিলিকন, সিলিকন থেকে স্ফটিক, স্ফটিক থেকে ওয়েফার, ওয়েফার থেকে ট্রানজিস্টর এবং কোটি কোটি ট্রানজিস্টর থেকে আধুনিক মাইক্রোচিপ—এই দীর্ঘ যাত্রাই সম্ভব করেছে আজকের গণনাযন্ত্র, মুঠোফোন, চিকিৎসাযন্ত্র, যানবাহন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতার বিশাল অংশ।


আপনার পছন্দ হতে পারে