বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহাকাশে সময় কি সত্যিই ধীরে চলে? আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা, মহাকর্ষ ও সময়ের রহস্য

মহাকাশে সময় কি সত্যিই ধীরে চলে? আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা, মহাকর্ষ ও সময়ের রহস্য
মহাকাশে সময়ের গতি বদলে দেয় বেগ ও মহাকর্ষ

মহাকাশে সময় কি সত্যিই ধীরে চলে—প্রশ্নটি শুনলে প্রথমে মনে হতে পারে, পৃথিবীর বাইরে গেলেই বুঝি সময়ের গতি কমে যায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে থাকা একজন মানুষের তুলনায় মহাকাশচারীর বয়স কম বাড়বে। কথাটির মধ্যে কিছু সত্য আছে, কিন্তু এভাবে বললে বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই বাদ পড়ে যায়। মহাকাশে সময় সব জায়গায় একইভাবে ধীরে চলে না। কোনো ঘড়ি কত দ্রুত চলছে, সেটি নির্ভর করে ঘড়িটির গতিবেগ, তার চারপাশের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এবং কোন পর্যবেক্ষকের সঙ্গে তার সময় তুলনা করা হচ্ছে তার ওপর।

এই ধারণার মূল ভিত্তি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় সময়কে আমরা একটি সর্বজনীন প্রবাহ হিসেবে কল্পনা করি। মনে হয় ঢাকা, চাঁদ, মঙ্গল কিংবা দূরের কোনো নক্ষত্রের পাশে এক সেকেন্ড মানে একই ধরনের এক সেকেন্ড। স্থান আলাদা হতে পারে, কিন্তু সময় যেন মহাবিশ্বের সর্বত্র একই অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে এগিয়ে চলছে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দেখিয়েছে, প্রকৃতি আসলে এমন নয়। সময় ও স্থান পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং গতি ও মহাকর্ষের কারণে ভিন্ন পর্যবেক্ষকের মাপা সময়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

এই পার্থক্য বোঝার জন্য প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। নিজের কাছে নিজের সময় কখনো অস্বাভাবিক ধীর বলে মনে হয় না। একজন মহাকাশচারী যদি অত্যন্ত দ্রুতগতির মহাকাশযানে ভ্রমণ করেন, তাঁর হৃদস্পন্দন, চিন্তা, হাতঘড়ি, মহাকাশযানের যন্ত্রপাতি—সবই তাঁর কাছে স্বাভাবিক গতিতে চলবে। তাঁর এক সেকেন্ড তাঁর কাছে ঠিক এক সেকেন্ডই। সময়ের প্রসারণ বোঝা যায় তখনই, যখন ভিন্ন গতিতে চলা বা ভিন্ন মহাকর্ষীয় অবস্থানে থাকা ঘড়িগুলোকে তুলনা করা হয়।

বিশেষ আপেক্ষিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, দুটি পর্যবেক্ষকের মধ্যে আপেক্ষিক গতিবেগ যত বেশি হবে, তাদের মাপা সময়ের পার্থক্য তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবীর তুলনায় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলা একটি মহাকাশযানে থাকা ঘড়ি পৃথিবীতে থাকা ঘড়ির তুলনায় কম সময় অতিক্রম করতে পারে। এই ঘটনাকে সময়ের প্রসারণ বলা হয়।

সাধারণ যানবাহনের গতিতে এই পার্থক্য এত ক্ষুদ্র যে আমরা দৈনন্দিন জীবনে তা অনুভব করতে পারি না। কিন্তু আলোর গতির কাছাকাছি গেলে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ধরা যাক, ভবিষ্যতে এমন একটি মহাকাশযান তৈরি হলো যা আলোর গতির খুব কাছাকাছি বেগে চলতে পারে। সেই যানে একজন নভোচারী দীর্ঘ যাত্রায় গেলেন এবং পরে পৃথিবীতে ফিরে এলেন। তাঁর নিজের হিসাবে হয়তো কয়েক বছর কেটেছে, অথচ পৃথিবীতে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় অতিক্রান্ত হতে পারে। ফলে ফিরে এসে তিনি দেখতে পারেন, পৃথিবীতে থাকা সমবয়সী মানুষের তুলনায় তিনি কম বয়স্ক হয়েছেন।

এটি কল্পবিজ্ঞানের সুবিধার জন্য তৈরি কোনো ধারণা নয়। অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি, দ্রুতগতির কণা এবং পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা যন্ত্রের মাধ্যমে সময়ের এই পার্থক্য বাস্তবে পরিমাপ করা হয়েছে। তবে মানুষের মহাকাশযাত্রায় বর্তমানে গতিবেগ আলোর গতির তুলনায় এত কম যে পার্থক্যটি খুবই ক্ষুদ্র।

এখানেই একটি মজার বিষয় আসে। কেউ যদি বলে, “মহাকাশচারীর সময় পৃথিবীর মানুষের তুলনায় ধীরে চলে”, তাহলে কথাটি কিছু পরিস্থিতিতে ঠিক হলেও অসম্পূর্ণ। কারণ মহাকাশে থাকা ঘড়ির ওপর শুধু গতির প্রভাব পড়ে না; মহাকর্ষও সময়ের গতিকে প্রভাবিত করে।

সাধারণ আপেক্ষিকতার মতে, শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে থাকা ঘড়ি অপেক্ষাকৃত দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে থাকা ঘড়ির তুলনায় ধীরে চলে। পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমরা পৃথিবীর মহাকর্ষের তুলনামূলক শক্তিশালী প্রভাবে আছি। পৃথিবী থেকে অনেক ওপরে গেলে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব দুর্বল হয়। ফলে শুধু মহাকর্ষের প্রভাব বিবেচনা করলে উচ্চতায় থাকা ঘড়ি পৃথিবীর পৃষ্ঠের ঘড়ির তুলনায় কিছুটা দ্রুত চলবে।

অর্থাৎ মহাকাশে যাওয়ার পর সময় সব সময় ধীর হয়ে যায়—এ ধারণাটি এখানেই ভেঙে পড়ে। একটি কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানের ক্ষেত্রে দুটি বিপরীত প্রভাব একসঙ্গে কাজ করতে পারে। মহাকাশযানটি প্রচণ্ড গতিতে চলছে বলে গতিজনিত সময়ের প্রসারণ তার ঘড়িকে পৃথিবীর তুলনায় ধীর করার দিকে কাজ করবে। আবার পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে থাকার কারণে সেখানে মহাকর্ষ দুর্বল, যা ঘড়িটিকে পৃথিবীর পৃষ্ঠের ঘড়ির তুলনায় দ্রুত চালানোর দিকে কাজ করবে। কোন প্রভাবটি বেশি শক্তিশালী, তার ওপর নির্ভর করবে মোট ফলাফল।

এই বাস্তবতা পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা অবস্থান নির্ণয়কারী উপগ্রহগুলোর ঘড়ি অত্যন্ত নির্ভুল। উপগ্রহগুলোর গতির কারণে তাদের ঘড়িতে এক ধরনের আপেক্ষিকতাজনিত পরিবর্তন ঘটে, আবার পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় দুর্বল মহাকর্ষে থাকার কারণে বিপরীত ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই দুই প্রভাব হিসাব করে সংশোধন না করলে সময়ের ক্ষুদ্র ত্রুটি জমতে জমতে অবস্থান নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য ভুল সৃষ্টি করত।

এখান থেকে বোঝা যায়, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব শুধু দূর মহাকাশ বা কৃষ্ণগহ্বর বোঝার জন্য নয়। পৃথিবীতে প্রতিদিন ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যেও সময়ের আপেক্ষিক প্রকৃতিকে হিসাব করতে হয়।

মহাকর্ষ কীভাবে সময়কে বদলে দেয়, সেটি বোঝার জন্য পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী মহাকর্ষের পরিবেশ কল্পনা করা যেতে পারে। কোনো অত্যন্ত ঘন ও ভারী জ্যোতিষ্কের কাছে গেলে স্থানকালের বক্রতা অনেক বেশি হয়। ফলে দূরে থাকা পর্যবেক্ষকের তুলনায় সেই শক্তিশালী মহাকর্ষীয় অঞ্চলে থাকা ঘড়ি ধীরে চলতে পারে।

কৃষ্ণগহ্বর এই ঘটনার সবচেয়ে চরম উদাহরণগুলোর একটি। কৃষ্ণগহ্বরের কাছাকাছি মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এত প্রবল যে দূরের পর্যবেক্ষকের তুলনায় সেখানে সময়ের প্রবাহে বিরাট পার্থক্য দেখা দিতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনাদিগন্তের দিকে পতনশীল কোনো বস্তুকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করলে তার ঘড়ি ক্রমশ ধীর হতে দেখা যায়। একই সঙ্গে সেই বস্তু থেকে আসা আলোর তরঙ্গও ক্রমে দীর্ঘতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে দেখানো দৃশ্যের কারণে এখানে একটি ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের কাছে থাকা মানুষ নিজের সময়কে থেমে যেতে দেখবেন না। তাঁর নিজের ঘড়ি স্বাভাবিকভাবেই চলবে। তাঁর কাছে নিজের হৃদস্পন্দন, চিন্তাভাবনা এবং স্থানীয় ঘটনাগুলো স্বাভাবিক থাকবে। অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় বিভিন্ন অবস্থানে থাকা পর্যবেক্ষকদের সময় তুলনা করলে।

আরেকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে—মহাকাশে যদি কোনো মহাকর্ষ না থাকে, তাহলে কী হবে? বাস্তবে মহাবিশ্বের অধিকাংশ জায়গাতেই কোনো না কোনো জ্যোতিষ্কের মহাকর্ষীয় প্রভাব থাকে। “ওজনহীনতা” আর “মহাকর্ষহীনতা” একই বিষয় নয়। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা মহাকাশচারীরা ভাসতে থাকলেও তাঁরা পৃথিবীর মহাকর্ষ থেকে মুক্ত নন। বরং মহাকাশযান ও মহাকাশচারী একসঙ্গে পৃথিবীর দিকে ক্রমাগত মুক্তপতনে থাকেন এবং একই সঙ্গে এত দ্রুত পাশের দিকে এগিয়ে যান যে পৃথিবীর বাঁকা পৃষ্ঠ তাঁদের নিচে ক্রমাগত সরে যেতে থাকে। এভাবেই কক্ষপথ সৃষ্টি হয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র পৃথিবীর খুব বেশি দূরে নয় এবং এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। ফলে সেখানে থাকা মহাকাশচারীদের সময়ের ক্ষেত্রে গতি ও মহাকর্ষ—দুই ধরনের আপেক্ষিকতাজনিত প্রভাবই কাজ করে। সামগ্রিকভাবে দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থানকারী মহাকাশচারীর অতিক্রান্ত সময় পৃথিবীর পৃষ্ঠে থাকা মানুষের তুলনায় সামান্য কম হতে পারে। পার্থক্যটি মানুষের অনুভব করার মতো নয়, কিন্তু অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ি দিয়ে তা অর্থপূর্ণভাবে বিবেচনা করা যায়।

এখানে যমজ দুই ভাই বা বোনের বিখ্যাত চিন্তাপরীক্ষাটি সময়ের প্রসারণ বুঝতে সাহায্য করে। ধরুন, একজন পৃথিবীতে থাকলেন এবং অন্যজন অত্যন্ত দ্রুতগতির মহাকাশযানে দূরের নক্ষত্রের দিকে যাত্রা করে আবার ফিরে এলেন। ফিরে আসার পর ভ্রমণকারী ব্যক্তি পৃথিবীতে থাকা যমজের তুলনায় কম বয়স্ক হতে পারেন। এটিকে প্রায়ই যমজ বৈপরীত্য বলা হয়।

প্রথমে মনে হতে পারে, মহাকাশযানে থাকা ব্যক্তিও তো বলতে পারেন পৃথিবীই তাঁর তুলনায় দ্রুত সরে যাচ্ছে। তাহলে পৃথিবীর ব্যক্তিরই কম বয়স হওয়া উচিত। কিন্তু পুরো যাত্রাটি সম্পূর্ণ সমমিত নয়। ভ্রমণকারীকে যাত্রার দিক পরিবর্তন করে ফিরে আসতে হয় এবং তাঁর গতির কাঠামো পরিবর্তিত হয়। দুই ব্যক্তির স্থানকালের পথ এক নয়। শেষ পর্যন্ত তাদের নিজ নিজ পথে অতিক্রান্ত সময়ও সমান হতে বাধ্য নয়।

এর অর্থ ভবিষ্যতের দিকে একধরনের সময়ভ্রমণ পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সম্ভব। কেউ যদি আলোর গতির খুব কাছাকাছি বেগে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারেন, তাঁর নিজের তুলনায় পৃথিবীতে অনেক বেশি সময় পার হয়ে যেতে পারে। তিনি অতীতে ফিরে যাবেন না; বরং নিজের স্বল্প অতিক্রান্ত সময়ের বিনিময়ে পৃথিবীর অনেক দূরের ভবিষ্যতে পৌঁছাতে পারবেন।

কিন্তু এখানে বিশাল প্রযুক্তিগত বাধা রয়েছে। ভরযুক্ত কোনো বস্তুকে আলোর গতিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আলোর গতির যত কাছে যাওয়া হবে, মহাকাশযানকে আরও দ্রুত করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ তত বিপুল হয়ে উঠবে। এর সঙ্গে মহাকাশের ক্ষুদ্র ধূলিকণা ও কণার সংঘর্ষ, বিকিরণ, শক্তির উৎস, তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার মতো কঠিন সমস্যাও যুক্ত হবে। তাই আপেক্ষিকতাজনিত সময়ভ্রমণ পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও মানুষের জন্য বাস্তব প্রযুক্তিতে তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।

সময়ের এই আপেক্ষিক প্রকৃতি আমাদের দৈনন্দিন ধারণাকে আরও একটি জায়গায় চ্যালেঞ্জ করে। আমরা সাধারণত ভাবি, মহাবিশ্বে একটি নির্দিষ্ট “এখন” রয়েছে। পৃথিবীতে এই মুহূর্তে যা ঘটছে, দূরের একটি ছায়াপথেও নিশ্চয় একই সর্বজনীন বর্তমান মুহূর্ত রয়েছে। আপেক্ষিকতার কাঠামোতে এমন সর্বজনীন বর্তমানের ধারণা এত সরল নয়। ভিন্ন গতিতে চলা পর্যবেক্ষকের কাছে দূরবর্তী ঘটনাগুলোর সমকালীনতা সম্পর্কে ভিন্ন সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সময় একটি মায়া অথবা ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা যায়। আপেক্ষিকতার নিয়ম অত্যন্ত নির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামো অনুসরণ করে। কে কত দ্রুত চলছে, কোন মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে রয়েছে এবং স্থানকালের কোন পথ অনুসরণ করছে—এসবের ভিত্তিতে ঘড়ির অতিক্রান্ত সময় নির্ণয় করা যায়। আধুনিক পারমাণবিক ঘড়ির নির্ভুলতা এত বেশি যে খুব সামান্য উচ্চতার পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় সময়ের পার্থক্যও পরীক্ষাগারে শনাক্ত করা সম্ভব।

এমনকি পৃথিবীর মধ্যেই সব ঘড়ি সম্পূর্ণ একই হারে চলে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি রাখা একটি ঘড়ি এবং অনেক উঁচু স্থানে রাখা আরেকটি অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ির মধ্যে অতি ক্ষুদ্র পার্থক্য তৈরি হতে পারে। উঁচু স্থানে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় বিভব আলাদা হওয়ায় ঘড়িটি সামান্য দ্রুত চলতে পারে। মানুষের জীবনের সাধারণ সময়মাত্রায় পার্থক্যটি নগণ্য, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের জন্য এটি বাস্তব।

এই বিষয়টি আমাদের “এক সেকেন্ড” সম্পর্কে ধারণাকেও আরও গভীর করে। নিজের স্থানীয় পরিবেশে একটি সঠিক ঘড়ি দিয়ে মাপা সময় স্বাভাবিক। কিন্তু দুইটি ঘড়িকে আলাদা পথে পাঠিয়ে পরে আবার একত্র করলে দেখা যেতে পারে তারা সমান সময় রেকর্ড করেনি। একটি দ্রুতগতির যাত্রা করেছে, অন্যটি স্থির ছিল; একটি শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে ছিল, অন্যটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ক্ষেত্রে—এই পার্থক্যগুলো তাদের জমা হওয়া সময়কে বদলে দিতে পারে।

তাই “মহাকাশে সময় কি সত্যিই ধীরে চলে?” প্রশ্নটির সবচেয়ে নির্ভুল উত্তর হলো—শুধু মহাকাশে থাকার কারণে সময় ধীরে চলে না। কোনো পর্যবেক্ষকের তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত চললে সময়ের প্রসারণের কারণে ঘড়ি ধীরে চলতে পারে। আবার শক্তিশালী মহাকর্ষের তুলনায় দুর্বল মহাকর্ষীয় অঞ্চলে গেলে ঘড়ি দ্রুত চলতে পারে। বাস্তব মহাকাশযাত্রায় এই দুই প্রভাব একই সঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারে এবং মোট ফল নির্ভর করে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপর।

আর এখানেই সময় সম্পর্কে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বিস্ময়কর শিক্ষা লুকিয়ে আছে। সময় মহাবিশ্বের পেছনে চলতে থাকা অপরিবর্তনীয় একটি অদৃশ্য ঘড়ি নয়। এটি স্থান, গতি ও মহাকর্ষের সঙ্গে যুক্ত। পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে এক সেকেন্ডের যে সরল অনুভূতি, মহাবিশ্বের গভীরে সেটিই স্থানকালের জটিল কাঠামোর অংশ। মহাকাশে গিয়ে সময় রহস্যজনকভাবে নিজের গতি কমিয়ে দেয় না; বরং মহাবিশ্বের নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন পথ, গতি ও মহাকর্ষের মধ্যে বিভিন্ন ঘড়ি ভিন্ন পরিমাণ সময় জমা করে। এই ক্ষুদ্র পার্থক্য থেকেই শুরু হয় এমন এক বাস্তবতা, যেখানে একই যাত্রা শেষে দুইটি ঘড়ি আবার পাশাপাশি রাখা হলেও তারা আর একই সময় দেখাতে বাধ্য নয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে