বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের অন্ধকার দিক আসলে কী? সেখানে কি কখনো সূর্যের আলো পড়ে না?

  • Author: Admin
  • September 04, 2026
চাঁদের অন্ধকার দিক আসলে কী? সেখানে কি কখনো সূর্যের আলো পড়ে না?
চাঁদের তথাকথিত অন্ধকার দিকও সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়

পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে চাঁদের দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত বিষয় সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা চাঁদের প্রায় একই অংশই দেখতে পাই। পূর্ণিমায় যে বিশাল উজ্জ্বল অঞ্চল, কালচে সমভূমি আর অসংখ্য গর্ত দেখা যায়, পরের পূর্ণিমাতেও মূলত সেই একই ভূদৃশ্য ফিরে আসে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—চাঁদের অন্য পাশে কী আছে? যে অংশটি পৃথিবী থেকে দেখা যায় না, সেটিই কি চাঁদের সেই বিখ্যাত ‘অন্ধকার দিক’? সেখানে কি সত্যিই কখনো সূর্যের আলো পৌঁছায় না?

প্রথমেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণাটি পরিষ্কার করা দরকার। চাঁদের যে অংশ পৃথিবী থেকে সাধারণভাবে দেখা যায় না, সেটি স্থায়ীভাবে অন্ধকার নয়। সেখানে নিয়মিত সূর্যের আলো পড়ে এবং সেখানে দিন ও রাত দুটোই ঘটে। তাই ‘চাঁদের অন্ধকার দিক’ কথাটি জনপ্রিয় হলেও বৈজ্ঞানিক অর্থে বিভ্রান্তিকর। একে বরং ‘চাঁদের দূর পাশ’ বলা বেশি যথাযথ। কারণ এই অংশের বিশেষত্ব অন্ধকারে থাকা নয়; বিশেষত্ব হলো এটি অধিকাংশ সময় পৃথিবীর বিপরীত দিকে মুখ করে থাকে।

কেন এমন হয়, সেটি বুঝতে হলে চাঁদের দুটি গতিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। চাঁদ নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরে, আবার একই সঙ্গে পৃথিবীর চারদিকেও প্রদক্ষিণ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিজের অক্ষের চারদিকে একবার ঘুরতে এবং পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে চাঁদের প্রায় সমান সময় লাগে। এই সমন্বিত অবস্থার কারণেই চাঁদের একই দিক পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে।

বিষয়টি প্রথমে একটু অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। অনেকে মনে করেন, আমরা যেহেতু সব সময় চাঁদের একই দিক দেখি, তাই চাঁদ হয়তো নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরেই না। বাস্তবে ঠিক উল্টোটি সত্য। চাঁদ যদি নিজের অক্ষের চারদিকে একেবারেই না ঘুরত, তাহলে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করার সময় আমরা ধীরে ধীরে তার সব পাশই দেখতে পেতাম। কিন্তু চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে যতটা এগোয়, নিজের অক্ষের চারদিকেও ঠিক সেই অনুপাতে ঘুরতে থাকে। ফলে পৃথিবীর দিকে একই পাশটি ধরে রাখতে পারে।

সহজ একটি কল্পনা দিয়ে ব্যাপারটি বোঝা যায়। একটি চেয়ারকে পৃথিবী ধরে নিয়ে তার চারদিকে হাঁটুন, কিন্তু হাঁটার পুরো সময় নিজের মুখটি চেয়ারের দিকেই রাখুন। একবার পুরো চক্কর শেষ করতে গিয়ে দেখবেন, আপনি নিজের দিকও একবার সম্পূর্ণ ঘুরিয়েছেন। চাঁদের ক্ষেত্রেও মোটামুটি একই ঘটনা ঘটে। সে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার পাশাপাশি নিজের অক্ষের চারদিকেও ঘুরছে, আর দুটি গতির সময়কাল এমনভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে একই গোলার্ধ পৃথিবীর দিকে থাকে।

এই অবস্থাকে বলা হয় জোয়ারজনিত আবদ্ধতা। চাঁদ যখন নবীন ছিল, তখন তার নিজের অক্ষের ঘূর্ণনের গতি বর্তমানের মতো ছিল না বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। পৃথিবীর মহাকর্ষ চাঁদের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে অসম টান সৃষ্টি করেছে। চাঁদ পুরোপুরি নিখুঁত গোলক নয় এবং পৃথিবীর মহাকর্ষ তার ভেতরে ও পৃষ্ঠে সামান্য বিকৃতি সৃষ্টি করে। কোটি কোটি বছর ধরে এই মহাকর্ষীয় পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে চাঁদের ঘূর্ণন ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে নিজের অক্ষের ঘূর্ণনকাল এবং পৃথিবীকে প্রদক্ষিণের সময়কাল প্রায় সমান হয়ে গেছে।

তবে আমরা চাঁদের ঠিক অর্ধেক, অর্থাৎ পঞ্চাশ শতাংশ অংশই শুধু দেখতে পাই—এমন ধারণাও পুরোপুরি ঠিক নয়। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করলে পৃথিবী থেকে চাঁদের মোট পৃষ্ঠের প্রায় ঊনষাট শতাংশ পর্যন্ত দেখা সম্ভব। এর কারণ চাঁদের দোলনের মতো আপাত পরিবর্তন। চাঁদের কক্ষপথ পুরোপুরি বৃত্তাকার নয়, কিছুটা উপবৃত্তাকার। একই সঙ্গে তার অক্ষের অবস্থান ও পর্যবেক্ষকের অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সময়ে চাঁদের প্রান্তের সামান্য অতিরিক্ত অঞ্চল আমাদের চোখে পড়ে। ফলে একেবারে লুকানো অঞ্চলটি মোট পৃষ্ঠের ঠিক অর্ধেকের চেয়ে কিছুটা কম।

এখন প্রশ্ন হলো, চাঁদের দূর পাশে সূর্যের আলো কীভাবে পড়ে? এর উত্তর বুঝতে পৃথিবীর চাঁদের কলার দিকে তাকালেই চলে। অমাবস্যার সময় পৃথিবী থেকে চাঁদের আলোকিত অংশ প্রায় দেখা যায় না। তার মানে কিন্তু এই নয় যে তখন পুরো চাঁদ অন্ধকার হয়ে যায়। বরং সেই সময় চাঁদের পৃথিবীমুখী অংশটি মূলত সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে, আর পৃথিবী থেকে অদৃশ্য দূর পাশের বড় অংশ সূর্যের আলোয় আলোকিত থাকে।

অন্যদিকে পূর্ণিমার সময় পরিস্থিতি প্রায় বিপরীত। তখন সূর্যের আলো চাঁদের পৃথিবীমুখী অংশকে আলোকিত করে, ফলে আমরা প্রায় সম্পূর্ণ উজ্জ্বল গোলাকার চাঁদ দেখি। সেই সময় চাঁদের দূর পাশের বড় অংশে রাত বিরাজ করে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে আমরা যে চাঁদের কলা দেখি, তার সঙ্গে চাঁদের দূর পাশের আলো-অন্ধকারের একটি বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে।

এখানেই ‘অন্ধকার দিক’ শব্দটির বিভ্রান্তি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অমাবস্যার কাছাকাছি সময়ে পৃথিবী থেকে অদৃশ্য সেই তথাকথিত অন্ধকার পাশটিই বরং সূর্যের আলোয় সবচেয়ে বেশি আলোকিত থাকে। তাই ‘অন্ধকার’ শব্দটি যদি সূর্যের আলো না পাওয়ার অর্থে ব্যবহার করা হয়, তাহলে নামটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল।

চাঁদের দিন-রাতের দৈর্ঘ্যও পৃথিবীর মতো নয়। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে প্রায় এক দিনে ঘুরে আসায় আমাদের দিন ও রাত দ্রুত পাল্টায়। কিন্তু চাঁদের সূর্যের তুলনায় একই অবস্থায় ফিরে আসতে প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ পৃথিবী-দিন লাগে। ফলে চাঁদের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সূর্যোদয় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত সময় প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ পৃথিবী-দিন। এর অর্থ সাধারণভাবে একটি স্থানে টানা প্রায় দুই সপ্তাহ সূর্যের আলো থাকতে পারে এবং এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ রাত থাকতে পারে।

এই দীর্ঘ দিন ও রাতের কারণে চাঁদের পৃষ্ঠে তাপমাত্রার পরিবর্তন অত্যন্ত তীব্র। বায়ুমণ্ডল প্রায় না থাকার কারণে পৃথিবীর মতো বাতাস বা ঘন আবরণ সেখানে তাপ ধরে রেখে সমভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে না। সূর্যালোকিত পৃষ্ঠ অত্যন্ত গরম হয়ে উঠতে পারে, আবার দীর্ঘ রাতের সময় একই অঞ্চল ভীষণ ঠান্ডা হয়ে যায়। এই বৈশিষ্ট্য শুধু পৃথিবীমুখী পাশে নয়, দূর পাশেও প্রযোজ্য।

তবে চাঁদে এমন কিছু অঞ্চল সত্যিই রয়েছে যেখানে সূর্যের আলো অত্যন্ত বিরল, এমনকি কিছু স্থানে বর্তমান জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিস্থিতিতে সরাসরি সূর্যালোক কার্যত পৌঁছায় না। কিন্তু সেগুলো পুরো দূর পাশ নয়। মূলত চাঁদের উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছে কিছু গভীর গর্তের তলদেশে এমন অঞ্চল রয়েছে। সূর্য সেখানে দিগন্তের খুব নিচ দিয়ে চলাচল করে। গভীর গর্তের উঁচু দেয়াল সূর্যের আলোকে তলদেশে পৌঁছাতে বাধা দিতে পারে।

এসব অঞ্চলকে স্থায়ী ছায়াচ্ছন্ন এলাকা বলা হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ মেরুর কিছু গভীর গর্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দীর্ঘকাল সূর্যের আলো না পৌঁছানোর কারণে তাপমাত্রা এত নিচে থাকতে পারে যে পানির বরফসহ বিভিন্ন উদ্বায়ী পদার্থ বিপুল সময় ধরে সংরক্ষিত থাকতে পারে। ভবিষ্যতে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্র অভিযান ও ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এই বরফ অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। পানি পান করার পাশাপাশি তা ভেঙে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা জীবনধারণ ও জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

চাঁদের দূর পাশ শুধু পৃথিবী থেকে অদৃশ্য বলেই আকর্ষণীয় নয়; ভূতাত্ত্বিকভাবেও এটি পৃথিবীমুখী পাশের তুলনায় বিস্ময়করভাবে আলাদা। আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের গায়ে যে বড় বড় কালচে অঞ্চল দেখতে পাই, সেগুলোর অনেকগুলো প্রাচীন আগ্নেয় সমভূমি। অতীতে বিশাল সংঘর্ষের ফলে তৈরি অববাহিকায় লাভা উঠে এসে জমাট বেঁধে এসব অপেক্ষাকৃত মসৃণ কালচে অঞ্চল সৃষ্টি করেছিল।

দূর পাশে এ ধরনের বিশাল কালচে সমভূমি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সেখানে অসংখ্য সংঘর্ষজনিত গর্ত, উঁচুনিচু ভূমি এবং প্রাচীন ভূত্বকের আধিক্য চোখে পড়ে। দুই পাশের এই অমিল চাঁদের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভূত্বকের পুরুত্ব, অভ্যন্তরীণ তাপের বণ্টন এবং তেজস্ক্রিয় উপাদানের অসম উপস্থিতিসহ একাধিক কারণ দুই পাশের আগ্নেয় ইতিহাসকে আলাদা করে থাকতে পারে।

চাঁদের দূর পাশের অন্যতম বিশাল বৈশিষ্ট্য হলো দক্ষিণ মেরু–আইটকেন অববাহিকা। এটি সৌরজগতের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন সংঘর্ষজনিত অববাহিকার একটি। এর বিস্তার হাজার হাজার কিলোমিটার। কোনো বিশাল মহাজাগতিক বস্তু চাঁদের প্রাচীন পৃষ্ঠে আঘাত করে এই বিরাট অববাহিকা তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হয়। এর গভীর অঞ্চল পরীক্ষা করে চাঁদের ভূত্বক ও আরও গভীর স্তরের গঠন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মানবজাতি দীর্ঘ সময় চাঁদের দূর পাশ সরাসরি দেখতে পারেনি। পৃথিবী থেকে দূরবীন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, চাঁদের শরীরই তার দূর পাশকে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রাখে। বিশ শতকে মহাকাশযুগ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত মহাকাশযান লুনা ৩ প্রথমবার চাঁদের দূর পাশের ছবি পাঠায়। ছবিগুলো বর্তমান মানের তুলনায় অস্পষ্ট হলেও মানব ইতিহাসে প্রথমবার আমরা এমন একটি ভূখণ্ড দেখেছিলাম, যা পৃথিবীর কোনো মানুষ আগে সরাসরি দেখতে পারেনি।

এরপর বিভিন্ন চন্দ্র অভিযান দূর পাশের আরও বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেছে। কক্ষপথে ঘুরতে থাকা মহাকাশযানগুলো উচ্চমানের ছবি, উচ্চতার পরিমাপ এবং বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করেছে। ফলে একসময়ের সম্পূর্ণ অজানা গোলার্ধ এখন চাঁদের সবচেয়ে আগ্রহের গবেষণাক্ষেত্রগুলোর একটি।

দূর পাশে অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে অবশ্য একটি বিশেষ সমস্যা রয়েছে। পৃথিবীমুখী পাশে কোনো অবতরণযান থাকলে সেটি তুলনামূলক সহজে সরাসরি পৃথিবীর সঙ্গে বেতার যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু দূর পাশে চাঁদের বিশাল দেহ পৃথিবী ও অবতরণযানের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হয় না। এই সমস্যার সমাধানে মধ্যবর্তী পুনঃসম্প্রচারকারী উপগ্রহ ব্যবহার করা যায়।

২০১৯ সালে চীনের চাং’ই-৪ অভিযান প্রথমবার চাঁদের দূর পাশে সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত অবতরণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করে। পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে একটি পুনঃসম্প্রচারকারী উপগ্রহ ব্যবহার করা হয়েছিল। এই অভিযান দেখিয়ে দেয়, দূর পাশ শুধু ছবি তোলার স্থান নয়; সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সরাসরি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানও সম্ভব।

চাঁদের দূর পাশ বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্যও অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পৃথিবীতে মানুষের তৈরি অসংখ্য বেতার সংকেত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যোগাযোগব্যবস্থা, সম্প্রচার, রাডার এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি অত্যন্ত দুর্বল মহাজাগতিক বেতার সংকেত শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু চাঁদের দূর পাশে চাঁদের নিজস্ব বিশাল দেহ পৃথিবী থেকে আসা অনেক বেতার তরঙ্গের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢালের মতো কাজ করতে পারে। তাই ভবিষ্যতে সেখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল বেতার পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের ধারণা বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পৃথিবী যদি চাঁদের দূর পাশ থেকে দেখা না যায়, তাহলে সেখানকার আকাশ কেমন? দূর পাশের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে দাঁড়ালে পৃথিবী সাধারণভাবে আকাশে দেখা যাবে না, কারণ চাঁদের নিজস্ব দেহ পৃথিবীকে আড়াল করে রাখবে। পৃথিবীমুখী পাশ থেকে দৃশ্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে পৃথিবী আকাশের প্রায় একই অঞ্চলে অবস্থান করতে দেখা যায়, যদিও চাঁদের দোলনের কারণে তার অবস্থানে কিছু পরিবর্তন ঘটে।

চাঁদের তথাকথিত অন্ধকার দিক নিয়ে রহস্যের জন্মের পেছনে মানুষের দীর্ঘ অজ্ঞতাও বড় কারণ। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ চাঁদ দেখেছে, তার কলা গণনা করেছে, গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং পঞ্জিকা তৈরি করেছে; কিন্তু চাঁদের বিপরীত গোলার্ধ কেমন দেখতে, তা জানার কোনো উপায় ছিল না। পৃথিবীর এত কাছে থাকা একটি বিশাল জগতের প্রায় অর্ধেক অংশ মানুষের চোখের আড়ালে ছিল—এই বাস্তবতাই স্বাভাবিকভাবে কল্পনা, রহস্য এবং নানা ভুল ধারণার জন্ম দিয়েছে।

এমনকি ‘অন্ধকার’ শব্দটির আরেকটি অর্থও এখানে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। কোনো বিষয়কে ‘অন্ধকার’ বলা কখনো কখনো ‘অজানা’ বা ‘রহস্যময়’ বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। সেই অর্থে একসময় চাঁদের দূর পাশ সত্যিই মানবজাতির কাছে অজানা ছিল। কিন্তু সেটিকে যদি সূর্যের আলোহীন অঞ্চল হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে ধারণাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ভুল হয়ে যায়।

বাস্তবে সূর্যের দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদের পৃথিবীমুখী ও দূর পাশের মধ্যে এমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই যে একটি সব সময় আলো পাবে এবং অন্যটি সব সময় অন্ধকার থাকবে। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো তার বিভিন্ন অংশকে আলোকিত করে। কখনো পৃথিবীমুখী অংশে দিন, কখনো দূর পাশে দিন। আবার একইভাবে উভয় পাশেই রাত আসে।

পূর্ণিমা ও অমাবস্যার দিকে একটু মনোযোগ দিলেই এই সত্যটির সৌন্দর্য বোঝা যায়। আমরা যখন পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ দেখি, তখন দূর পাশের অধিকাংশ অঞ্চল রাতের অন্ধকারে থাকে। আর অমাবস্যায় যখন আমাদের চোখে চাঁদ প্রায় অদৃশ্য, তখন সেই রহস্যময় দূর পাশের বিরাট অংশ সূর্যালোকে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। পৃথিবী থেকে যা অন্ধকার মনে হচ্ছে, মহাকাশের অন্য দিক থেকে সেটিই তখন দিনের আলোয় ভাসছে।

তাই চাঁদের ‘অন্ধকার দিক’ আসলে চিরন্তন রাতের কোনো রহস্যময় জগৎ নয়। এটি চাঁদের সেই দূর গোলার্ধ, যা জোয়ারজনিত আবদ্ধতার কারণে সাধারণত পৃথিবীর বিপরীত দিকে থাকে। সেখানে সূর্য ওঠে, দীর্ঘ দিন আসে, সূর্য অস্ত যায় এবং দীর্ঘ রাত নামে। সেখানে পাহাড় আছে, অগণিত সংঘর্ষজনিত গর্ত আছে, বিশাল প্রাচীন অববাহিকা আছে এবং সৌরজগতের ইতিহাসের অসংখ্য চিহ্ন জমা রয়েছে।

চাঁদের সত্যিকার বিস্ময় তাই এই নয় যে তার একটি পাশ অন্ধকার। বরং বিস্ময়টি আরও গভীর—পৃথিবীর এত কাছের একটি জগত নিজের ঘূর্ণন ও প্রদক্ষিণকে এমন নিখুঁত ছন্দে বেঁধে রেখেছে যে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন তার দিকে তাকিয়েও মূলত একই মুখ দেখে। আর সেই পরিচিত মুখের ঠিক পেছনেই রয়েছে আরেক বিশাল ভূখণ্ড, যেখানে আলো ও অন্ধকারের পালাবদল ঠিকই ঘটে, অথচ পৃথিবীর মাটি থেকে দাঁড়িয়ে আমরা সেই সূর্যোদয় কখনো দেখতে পাই না।