পৃথিবীর বাইরে প্রাণ খুঁজতে বিজ্ঞানীরা কোন কোন সংকেত অনুসন্ধান করেন?
মহাবিশ্বে প্রাণের চিহ্ন খুঁজছে বিজ্ঞান
পৃথিবীর বাইরে প্রাণ আছে কি না—এই প্রশ্নটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো কৌতূহলগুলোর একটি হলেও আধুনিক বিজ্ঞানে প্রশ্নটি আর শুধু কল্পনার বিষয় নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গ্রহবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বিজ্ঞানীরা এখন নির্দিষ্ট কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য সংকেত খুঁজছেন, যেগুলো কোনো দূরবর্তী জগতে প্রাণের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি হলো, কোনো একটি পদার্থ বা একটি অস্বাভাবিক সংকেত দেখেই প্রাণ আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া যায় না। প্রকৃতি অনেক সময় প্রাণ ছাড়াই এমন রাসায়নিক বা ভৌত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা প্রথম দেখায় জীবনের চিহ্ন বলে মনে হয়। তাই বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য হলো একাধিক স্বাধীন প্রমাণকে একই সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
পৃথিবীর বাইরে প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেখানে প্রাণ টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশ আছে কি না। আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে শুধু পৃথিবীর প্রাণকেই জানি এবং পৃথিবীর সব পরিচিত জীবের জন্য তরল পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে বর্তমান অথবা অতীতের তরল পানির অস্তিত্বের প্রমাণ বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তবে পানি পাওয়া মানেই সেখানে প্রাণ আছে—এমন নয়। পানি মূলত জানায় যে অন্তত আমাদের পরিচিত ধরনের জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সেখানে উপস্থিত থাকতে পারে।
মঙ্গলে এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে পানির ইতিহাস অনুসন্ধান করা হচ্ছে। গ্রহটির বর্তমান পৃষ্ঠ অত্যন্ত শুষ্ক, ঠান্ডা এবং বিকিরণপ্রবণ হলেও সেখানে প্রাচীন নদীপথ, বদ্বীপ, হ্রদের তলদেশ এবং পানির উপস্থিতিতে তৈরি হওয়া বিভিন্ন খনিজের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, কয়েক শত কোটি বছর আগে মঙ্গল বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি আর্দ্র ছিল। বিজ্ঞানীরা তাই মঙ্গলের প্রাচীন পাললিক শিলা ও হ্রদের তলদেশে এমন রাসায়নিক বা অণুবীক্ষণিক গঠন খুঁজছেন, যা অতীতের অণুজীবের সম্ভাব্য অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করতে পারে।
আরও আকর্ষণীয় লক্ষ্য হলো বৃহস্পতি ও শনির কিছু বরফে ঢাকা উপগ্রহ। বৃহস্পতির ইউরোপা এবং শনির এনসেলাডাসের বরফের নিচে বিশাল লবণাক্ত মহাসাগর থাকার শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে। বিশেষ করে এনসেলাডাসের দক্ষিণ মেরুর ফাটল দিয়ে জলীয় বাষ্প, বরফকণা এবং অন্যান্য পদার্থ মহাকাশে ছিটকে বের হয়। ফলে মহাকাশযানকে বরফ ভেদ করে মহাসাগরে নামতেই হবে এমন নয়; ওই নির্গত পদার্থ বিশ্লেষণ করেও ভূগর্ভস্থ মহাসাগরের রাসায়নিক পরিবেশ সম্পর্কে জানা সম্ভব। সেখানে পানি, লবণ, জৈব যৌগ এবং জীবনের জন্য ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক শক্তির উৎস একসঙ্গে পাওয়া গেলে তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে বসবাসযোগ্য পরিবেশের প্রমাণ এবং প্রাণের প্রমাণ এক বিষয় নয়। প্রাণকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নির্দেশ করতে পারে এমন চিহ্নকে সাধারণভাবে জৈবচিহ্ন বলা হয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট গ্যাস, অণু, রাসায়নিক অনুপাত, শিলার গঠন কিংবা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য হতে পারে, যা জীবনের ক্রিয়াকলাপের ফলে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্ভাব্য জৈবচিহ্নের এমন ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা, যা প্রাণহীন ভূতাত্ত্বিক বা রাসায়নিক প্রক্রিয়া দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অক্সিজেন এ ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত একটি গ্যাস। পৃথিবীর বর্তমান বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ মুক্ত অক্সিজেন থাকার প্রধান কারণ সালোকসংশ্লেষী জীব। উদ্ভিদ, শৈবাল এবং কিছু অণুজীব দীর্ঘ সময় ধরে অক্সিজেন উৎপাদন করছে। তাই কোনো পৃথিবীসদৃশ বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য অক্সিজেন পাওয়া গেলে বিজ্ঞানীরা স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহী হবেন। বিশেষ করে অক্সিজেন থেকে তৈরি ওজোনও দূর থেকে শনাক্তযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য জৈবচিহ্ন হতে পারে।
কিন্তু অক্সিজেনের উপস্থিতিই প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। কোনো গ্রহে পানি অতিবেগুনি বিকিরণে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে পরিণত হতে পারে। হালকা হাইড্রোজেন মহাকাশে হারিয়ে গেলে অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে জমা হতে পারে। অর্থাৎ জীব ছাড়াও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অক্সিজেনসমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি হওয়া সম্ভব। বিজ্ঞানীরা তাই অক্সিজেনের পাশাপাশি গ্রহটির নক্ষত্র, তাপমাত্রা, পানির ইতিহাস, অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় গ্যাস এবং সামগ্রিক রাসায়নিক ভারসাম্য বিশ্লেষণ করেন।
মিথেনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য জৈবচিহ্ন। পৃথিবীতে বিপুল পরিমাণ মিথেন অণুজীব এবং অন্যান্য জীবজ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। কিন্তু আগ্নেয়গিরি, শিলা ও পানির নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়াসহ কিছু প্রাণহীন প্রক্রিয়াতেও মিথেন তৈরি হতে পারে। তাই কোনো দূরবর্তী গ্রহে মিথেন পাওয়া গেলেই সেখানে জীব আছে বলা যাবে না। বরং বিজ্ঞানীরা জানতে চাইবেন মিথেন কত পরিমাণে আছে, কত দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, কীভাবে আবার পূরণ হচ্ছে এবং তার সঙ্গে আর কোন গ্যাস উপস্থিত রয়েছে।
বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে এমন কিছু গ্যাসের সহাবস্থান, যেগুলো স্বাভাবিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার কথা নয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন এবং মিথেন এর একটি পরিচিত উদাহরণ। অক্সিজেন মিথেনকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলে। তারপরও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে দুটিই পাওয়া যায়, কারণ বিভিন্ন প্রক্রিয়া ক্রমাগত এগুলো পুনরায় সরবরাহ করছে। কোনো বহির্গ্রহে একই ধরনের শক্তিশালী রাসায়নিক অসমতা পাওয়া গেলে বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করবেন এর পেছনে কোনো জীবজ প্রক্রিয়া কাজ করছে কি না।
এই ‘রাসায়নিক অসমতা’ ধারণাটি বহির্জাগতিক প্রাণ অনুসন্ধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল যদি রাসায়নিক সাম্যাবস্থায় পৌঁছে যায়, তবে অনেক পদার্থ পরস্পরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে স্থিতিশীল অবস্থায় চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রাণ প্রতিনিয়ত পরিবেশ থেকে শক্তি গ্রহণ করে এবং নতুন পদার্থ উৎপাদন করে সেই সাম্যাবস্থা বিঘ্নিত করতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা শুধু একটি গ্যাস খোঁজেন না; পুরো বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক কাঠামো দেখে বোঝার চেষ্টা করেন সেখানে এমন কোনো অস্বাভাবিক অবস্থা রয়েছে কি না, যা ক্রমাগত কোনো সক্রিয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বজায় রাখা হচ্ছে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, জলীয় বাষ্প, নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ যৌগ এবং অন্যান্য গ্যাসও এই বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি গ্যাসকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে অন্য গ্যাসগুলোর সঙ্গে তার অনুপাত বিচার করা হয়। একটি গ্রহের তাপমাত্রা, চাপ, নক্ষত্র থেকে পাওয়া বিকিরণ, আগ্নেয় ক্রিয়াকলাপ এবং ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস না বুঝলে বায়ুমণ্ডলের সম্ভাব্য জৈবচিহ্নের সঠিক ব্যাখ্যা করা কঠিন।
দূরের বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এসব পদার্থ শনাক্ত করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো বর্ণালি বিশ্লেষণ। কোনো বহির্গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে নক্ষত্রের সামান্য আলো গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আমাদের দিকে আসে। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন অণু আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। ফলে সেই আলো বিশ্লেষণ করলে বিজ্ঞানীরা বায়ুমণ্ডলে কোন কোন পদার্থ থাকতে পারে তার সূত্র পান। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী দূরবীক্ষণযন্ত্রের সাহায্যে পৃথিবীসদৃশ ছোট গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ আরও নিখুঁত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাণ অনুসন্ধানে জৈব অণুও বিশেষ গুরুত্ব পায়। কার্বনভিত্তিক জটিল অণু পৃথিবীর জীবনের মৌলিক উপাদান। অ্যামিনো অ্যাসিড, বিভিন্ন কার্বনসমৃদ্ধ যৌগ কিংবা আরও জটিল জৈব পদার্থ পাওয়া গেলে বিজ্ঞানীরা তা গভীরভাবে পরীক্ষা করেন। তবে ‘জৈব’ শব্দটির অর্থ সব সময় ‘জীব থেকে উৎপন্ন’ নয়। মহাকাশে, ধূমকেতুতে, উল্কাপিণ্ডে এবং প্রাণহীন রাসায়নিক পরিবেশেও জটিল কার্বনসমৃদ্ধ অণু তৈরি হতে পারে। তাই জৈব অণু পাওয়া জীবনের উপকরণ উপস্থিত থাকার প্রমাণ হতে পারে, জীবনের সরাসরি প্রমাণ নয়।
আরও সূক্ষ্ম অনুসন্ধান হলো অণুর গঠনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা। পৃথিবীর জীবন অনেক জৈব অণুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ধরনের আণবিক বিন্যাসকে প্রাধান্য দেয়। জীববিজ্ঞানের এই নির্বাচনী বৈশিষ্ট্য যদি অন্য কোনো গ্রহের নমুনায় অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পাওয়া যায় এবং প্রাণহীন প্রক্রিয়া দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়, তবে সেটি সম্ভাব্য জৈবচিহ্ন হিসেবে অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে। এ ধরনের বিশ্লেষণের জন্য সাধারণত দূর থেকে পর্যবেক্ষণের চেয়ে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষাগারসমমানের যন্ত্র বেশি কার্যকর।
শিলার মধ্যেও প্রাচীন জীবনের চিহ্ন লুকিয়ে থাকতে পারে। পৃথিবীতে কোটি কোটি বছরের পুরোনো অণুজীবের কার্যকলাপ কখনো কখনো শিলার স্তর, খনিজ বিন্যাস, কার্বনের রাসায়নিক অনুপাত বা অণুবীক্ষণিক কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে। মঙ্গলের মতো কোনো গ্রহে প্রাচীন হ্রদের তলদেশের পাললিক শিলায় অনুরূপ বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে শুধু দেখতে জীবাশ্মের মতো কোনো আকৃতি পেলেই যথেষ্ট নয়; অজৈব খনিজ প্রক্রিয়াও অনেক সময় জীবসদৃশ ক্ষুদ্র গঠন তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা কিছু মৌলের সমস্থানিক অনুপাতও পরীক্ষা করেন। একই মৌলের ভিন্ন ভরের পরমাণুকে সমস্থানিক বলা হয়। পৃথিবীর জীব বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় কখনো নির্দিষ্ট সমস্থানিককে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহার করে। এর ফলে শিলা বা জৈব পদার্থে বিশেষ ধরনের সমস্থানিক অনুপাত থেকে যেতে পারে। কোনো বহির্জাগতিক নমুনায় এমন অস্বাভাবিক অনুপাত পাওয়া গেলে তা সম্ভাব্য জীবক্রিয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে, যদিও ভূতাত্ত্বিক ও রাসায়নিক বিকল্প ব্যাখ্যাগুলোও বাদ দিতে হয়।
জীবনের আরেক সম্ভাব্য দূরবর্তী সংকেত হতে পারে কোনো গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত আলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর উদ্ভিদের পাতায় থাকা রঞ্জক দৃশ্যমান আলো শোষণ করে এবং কাছাকাছি অবলোহিত অঞ্চলে প্রতিফলনের আচরণ দ্রুত বদলে যায়। অত্যন্ত উন্নত পর্যবেক্ষণে কোনো বহির্গ্রহে ব্যাপক সালোকসংশ্লেষী জীব থাকলে তার পৃষ্ঠের বর্ণালিতে অনুরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে। তবে অন্য গ্রহের জীবন পৃথিবীর উদ্ভিদের মতো হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভিন্ন নক্ষত্রের আলো ব্যবহারকারী জীব সম্পূর্ণ ভিন্ন রঞ্জকও ব্যবহার করতে পারে।
এখানেই পৃথিবীকেন্দ্রিক ধারণার সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। আমরা যে সংকেতগুলোকে জীবনের চিহ্ন হিসেবে গুরুত্ব দিই, তার অধিকাংশই পৃথিবীর জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু অন্য কোনো জগতে প্রাণ ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন রাসায়নিক পথ অনুসরণ করতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীরা পরিচিত জৈবচিহ্নের পাশাপাশি এমন অস্বাভাবিক রাসায়নিক ব্যবস্থা খোঁজার ধারণাও গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা পরিবেশের স্বাভাবিক অজৈব রসায়ন থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা।
পৃথিবীর বাইরে শুধু অণুজীব নয়, প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতার সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা হয়। কোনো উন্নত সভ্যতার প্রযুক্তিগত কার্যকলাপের ফলে যে পর্যবেক্ষণযোগ্য চিহ্ন সৃষ্টি হতে পারে তাকে প্রযুক্তিচিহ্ন বলা হয়। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো কৃত্রিম বেতার সংকেত। পৃথিবীতে আমরা যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করি। প্রকৃতির অনেক উৎসও বেতার তরঙ্গ সৃষ্টি করে, কিন্তু অত্যন্ত সংকীর্ণ কম্পাঙ্কের, বিশেষভাবে সংগঠিত বা পুনরাবৃত্ত সংকেত কোনো প্রযুক্তিগত উৎসের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এই কারণে বৃহৎ বেতার দূরবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র ও সম্ভাব্য বাসযোগ্য বহির্গ্রহের দিক থেকে আসা সংকেত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু অস্বাভাবিক সংকেত পেলেই সেটিকে বহির্জাগতিক সভ্যতার বার্তা বলা যায় না। পৃথিবীর উপগ্রহ, বিমান, যোগাযোগব্যবস্থা, রাডার এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র বিপুল পরিমাণ বেতার হস্তক্ষেপ সৃষ্টি করে। কোনো প্রার্থী সংকেত পাওয়া গেলে তাই সেটি আবার দেখা যায় কি না, আকাশের একই স্থান থেকে আসছে কি না এবং পৃথিবীর প্রযুক্তিগত উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় কি না—এসব কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়।
শুধু বেতার তরঙ্গ নয়, অত্যন্ত শক্তিশালী ও সংক্ষিপ্ত আলোক স্পন্দনও সম্ভাব্য প্রযুক্তিচিহ্ন হিসেবে অনুসন্ধান করা যায়। কোনো উন্নত সভ্যতা যদি যোগাযোগের জন্য শক্তিশালী লেজার ব্যবহার করে, তবে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে দূর থেকেও সেই আলোক সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। প্রকৃতির পরিচিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে না মেলা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট আলোক স্পন্দন তাই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়।
আরও উচ্চাভিলাষী অনুসন্ধানে কোনো সভ্যতার বিপুল শক্তি ব্যবহারের চিহ্ন খোঁজা হয়। উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতা যদি নক্ষত্রের শক্তির বড় অংশ ব্যবহার করে, তবে ব্যবহৃত শক্তির কিছু অংশ শেষ পর্যন্ত তাপ হিসেবে মহাকাশে বিকিরিত হওয়ার কথা। অস্বাভাবিক অতিরিক্ত অবলোহিত বিকিরণ তাই সম্ভাব্য প্রযুক্তিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একইভাবে কোনো নক্ষত্রের আলো যদি এমন অস্বাভাবিকভাবে কমে, যা গ্রহ, ধূলিকণা বা পরিচিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না, তবে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বৃহৎ কাঠামোর সম্ভাবনাও পরীক্ষামূলকভাবে বিবেচনা করতে পারেন। তবে প্রথমে সব সম্ভাব্য প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা পরীক্ষা করাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মূলনীতি।
কোনো বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এমন শিল্পজাত রাসায়নিক পদার্থ থাকলেও তা প্রযুক্তিচিহ্ন হতে পারে, যেগুলো প্রাকৃতিকভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তৈরি হওয়া অত্যন্ত কঠিন। একইভাবে কোনো গ্রহের রাতের দিকে কৃত্রিম আলোকসজ্জা, অস্বাভাবিক তাপবণ্টন বা অন্য প্রযুক্তিগত প্রভাব ভবিষ্যতের অত্যন্ত শক্তিশালী দূরবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে। বর্তমানে এসবের অধিকাংশ শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু প্রযুক্তিচিহ্ন অনুসন্ধানের ধারণা শুধু ‘বেতার বার্তা শোনা’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাব্য আবিষ্কার হবে একাধিক স্বাধীন সংকেতের সমন্বয়। কল্পনা করা যায়, কোনো পৃথিবীসদৃশ গ্রহ তার নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে রয়েছে, সেখানে তরল পানির সম্ভাবনা আছে, বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও মিথেনের শক্তিশালী রাসায়নিক অসমতা দেখা যাচ্ছে, পৃষ্ঠের বর্ণালিতে সম্ভাব্য জৈব রঞ্জকের চিহ্ন রয়েছে এবং এসব বৈশিষ্ট্য দীর্ঘ পর্যবেক্ষণেও বজায় রয়েছে। তখন প্রতিটি প্রমাণ অন্যটিকে শক্তিশালী করবে। একটি মাত্র অস্বাভাবিক গ্যাসের তুলনায় এমন সমন্বিত প্রমাণ অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে সৌরজগতের কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে সরাসরি নমুনা বিশ্লেষণের সুযোগ পাওয়া গেলে প্রমাণ আরও শক্তিশালী হতে পারে। সেখানে জটিল জৈব অণু, অস্বাভাবিক সমস্থানিক অনুপাত, কোষসদৃশ কাঠামো এবং নিয়মিত বিপাকীয় রাসায়নিক পরিবর্তন একই সঙ্গে পাওয়া গেলে জীবনের সম্ভাবনা নাটকীয়ভাবে বাড়বে। কিন্তু নমুনা যেন পৃথিবীর অণুজীব দ্বারা দূষিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এই কারণেই মহাকাশযান নির্মাণ, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ এবং নমুনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কঠোর গ্রহ-সুরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীর বাইরে প্রাণ খোঁজার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান তাই কোনো একক ‘জাদুকরী সংকেতের’ অপেক্ষায় নেই। অনুসন্ধানটি অনেকটা গোয়েন্দা তদন্তের মতো—পানি কোথায়, শক্তির উৎস আছে কি না, পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল, কোন গ্যাস তৈরি হচ্ছে, কোনটি দ্রুত নষ্ট হওয়ার পরও রয়ে যাচ্ছে, জৈব অণু কী ধরনের, শিলায় কী রাসায়নিক ইতিহাস সংরক্ষিত আছে এবং কোনো সংকেত প্রকৃতির পরিচিত নিয়মের বাইরে যাচ্ছে কি না—সবকিছু একসঙ্গে বিচার করতে হয়।
এই সতর্কতার কারণও গভীর। পৃথিবীর বাইরে প্রাণের নিশ্চিত আবিষ্কার মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ঘটনা হবে। তাই সামান্য অস্বাভাবিকতা থেকে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে বিজ্ঞানীরা বারবার পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন যাচাই এবং বিকল্প ব্যাখ্যা পরীক্ষা করেন। কোনো সংকেত যত আকর্ষণীয়ই হোক, আগ্নেয়গিরি, বিকিরণ, ভূতাত্ত্বিক বিক্রিয়া, বায়ুমণ্ডলীয় রসায়ন কিংবা মানুষের নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে সেটি ব্যাখ্যা করা যায় কি না তা আগে যাচাই করতে হয়।
শেষ পর্যন্ত আমরা হয়তো প্রথম বহির্জাগতিক প্রাণকে চোখে দেখব না। প্রথম আবিষ্কারটি হতে পারে বহু আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এমন কয়েকটি গ্যাসের সমন্বয়, যা প্রাণ ছাড়া ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত কঠিন। আবার সেটি হতে পারে মঙ্গলের প্রাচীন শিলায় সংরক্ষিত অণুজীবের রাসায়নিক ছাপ, এনসেলাডাসের বরফকণায় জীবজ বিপাকের চিহ্ন, কিংবা দূর নক্ষত্র থেকে আসা এমন একটি প্রযুক্তিগত সংকেত যার কোনো প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানীরা তাই শুধু ‘এলিয়েন’ খুঁজছেন না; তাঁরা খুঁজছেন এমন প্রমাণের সমষ্টি, যা দেখাবে মহাবিশ্বের কোথাও পদার্থ ও রসায়ন একসময় সেই অসাধারণ সীমা অতিক্রম করেছে, যাকে আমরা জীবন বলি।
চাঁদের অন্ধকার দিক আসলে কী? সেখানে কি কখনো সূর্যের আলো পড়ে না?
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন কীভাবে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে বেড়ায়? কক্ষপথে ভেসে থাকার বিজ্ঞান
মহাবিশ্বে কতটি গ্যালাক্সি আছে? দৃশ্যমান মহাবিশ্বের অকল্পনীয় বিশালতার হিসাব
পৃথিবী যদি ব্ল্যাক হোলে পড়ে যায় তাহলে কী ঘটবে? শেষ মুহূর্তের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
মঙ্গল গ্রহের আকাশ লাল কিন্তু সূর্যাস্ত নীল কেন? ধুলোময় আকাশের বিস্ময়কর বিজ্ঞান
প্লুটো কেন আর গ্রহ নয়? সৌরজগতের নবম গ্রহ থেকে বামন গ্রহ হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস