বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

দক্ষিণাঞ্চলের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে ইয়র্কটাউন: কর্নওয়ালিসের আত্মসমর্পণে যেভাবে ভেঙে পড়েছিল ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টা

সিরিজ: আমেরিকান বিপ্লব: স্বাধীনতার সংগ্রাম ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম

দক্ষিণাঞ্চলের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে ইয়র্কটাউন: কর্নওয়ালিসের আত্মসমর্পণে যেভাবে ভেঙে পড়েছিল ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টা
দক্ষিণের রক্তক্ষয় থেকে ইয়র্কটাউনের আত্মসমর্পণ

১৭৭৮ সালের পর আমেরিকান বিপ্লব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে ব্রিটিশ নেতৃত্ব বুঝতে পারছিল, শুধু নিউইয়র্ক বা উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে বিদ্রোহ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। সারাটোগায় জন বার্গয়েনের বিপর্যয় এবং ১৭৭৮ সালে ফ্রান্সের প্রকাশ্য প্রবেশ যুদ্ধের কৌশলগত পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। ব্রিটেনকে এখন শুধু কন্টিনেন্টাল আর্মির বিরুদ্ধে নয়, একটি শক্তিশালী ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে। এই অবস্থায় ব্রিটিশরা যুদ্ধের প্রধান কেন্দ্র দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ধারণা ছিল, জর্জিয়া ও ক্যারোলাইনায় বিপুলসংখ্যক রাজভক্ত বা লয়্যালিস্টকে সংগঠিত করে দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী অগ্রযাত্রার মাধ্যমে বিদ্রোহকে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে।

এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল না। দক্ষিণাঞ্চলে সত্যিই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লয়্যালিস্ট ছিল। ব্রিটিশ নেতৃত্ব আশা করেছিল নিয়মিত সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখল করলে হাজার হাজার স্থানীয় রাজভক্ত অস্ত্র হাতে তাদের সঙ্গে যোগ দেবে। এরপর ব্রিটিশ ও লয়্যালিস্ট শক্তি একত্রে অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কন্টিনেন্টাল বাহিনীর ওপর চাপ বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণাঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন এত গভীর ছিল যে যুদ্ধটি দ্রুত দেশপ্রেমিক ও রাজভক্ত প্রতিবেশীদের মধ্যকার এক নির্মম গৃহযুদ্ধের চরিত্রও ধারণ করে।

ব্রিটিশ দক্ষিণাঞ্চলীয় কৌশলের প্রথম বড় সাফল্য আসে ১৭৭৮ সালের শেষদিকে সাভানা দখলের মাধ্যমে। জর্জিয়ায় ব্রিটিশ কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু হয়। ১৭৭৯ সালে আমেরিকান ও ফরাসি বাহিনী সাভানা পুনর্দখলের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। ফলে ব্রিটিশ নেতৃত্বের কাছে মনে হতে থাকে যে দক্ষিণাঞ্চলীয় কৌশল কার্যকর হতে পারে।

এরপর লক্ষ্য হয় দক্ষিণ ক্যারোলাইনার চার্লস্টন। ১৭৮০ সালের বসন্তে জেনারেল স্যার হেনরি ক্লিনটন এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল চার্লস কর্নওয়ালিসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী শহরটি ঘিরে ফেলে। নৌ ও স্থলপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া আমেরিকান বাহিনী শেষ পর্যন্ত ১২ মে ১৭৮০ আত্মসমর্পণ করে। পাঁচ হাজারেরও বেশি আমেরিকান সৈন্য ও মিলিশিয়া বন্দী হওয়ায় এটি পুরো বিপ্লবী যুদ্ধের অন্যতম বৃহৎ আমেরিকান সামরিক বিপর্যয় হয়ে ওঠে।

চার্লস্টনের পতনের পর দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ব্রিটিশ কর্তৃত্ব দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে বলে মনে হয়। ক্লিনটন নিউইয়র্কে ফিরে গেলে কর্নওয়ালিস দক্ষিণাঞ্চলীয় অভিযানের প্রধান দায়িত্ব নেন। ব্রিটিশ অশ্বারোহী কর্মকর্তা বানাস্টার টার্লেটন বিভিন্ন অভিযানে দ্রুত ও আক্রমণাত্মক কৌশল ব্যবহার করে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মে মাসে ওয়াক্সহসের সংঘর্ষে আত্মসমর্পণের চেষ্টা করা আমেরিকানদের ওপর টার্লেটনের বাহিনীর আক্রমণ এবং ব্যাপক হতাহতের ঘটনা দেশপ্রেমিক প্রচারে “টার্লেটনের কোয়ার্টার” নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশরা মনে করেছিল নিয়মিত কন্টিনেন্টাল বাহিনীকে সরিয়ে দিতে পারলেই দক্ষিণ ক্যারোলাইনা শান্ত হয়ে যাবে। বাস্তবে ঘটে উল্টোটি। ফ্রান্সিস ম্যারিয়ন, থমাস সামটার এবং অ্যান্ড্রু পিকেন্সের মতো দেশপ্রেমিক নেতাদের অধীনে ছোট ছোট বাহিনী ব্রিটিশ ঘাঁটি, যোগাযোগ ও সরবরাহপথে আঘাত করতে থাকে। জলাভূমি, বন ও গ্রামীণ ভূখণ্ড ব্যবহার করে পরিচালিত এসব অভিযান ব্রিটিশদের জন্য পুরো অঞ্চল কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন করে তোলে।

একই সঙ্গে লয়্যালিস্ট ও প্যাট্রিয়টদের সংঘর্ষ অত্যন্ত সহিংস হয়ে ওঠে। নিয়মিত সেনাবাহিনীর বড় যুদ্ধের পাশাপাশি হত্যা, প্রতিশোধ, সম্পত্তি ধ্বংস এবং স্থানীয় শত্রুতার ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণাঞ্চলের যুদ্ধ তাই শুধু ব্রিটেন বনাম স্বাধীনতাকামী আমেরিকানদের সংঘর্ষ ছিল না; অনেক অঞ্চলে এটি একই সমাজের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধও ছিল।

১৭৮০ সালের আগস্টে ব্রিটিশরা আরেকটি বড় সাফল্য অর্জন করে। জেনারেল হোরেশিও গেটস, যিনি সারাটোগার বিজয়ের পর ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, দক্ষিণে আমেরিকান বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে কর্নওয়ালিসের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ১৬ আগস্ট ক্যামডেনের যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী বিপর্যস্ত হয়। অনভিজ্ঞ মিলিশিয়ার একটি বড় অংশ ব্রিটিশ আক্রমণের মুখে ভেঙে পড়ে এবং গেটসের সেনাবাহিনী কার্যত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

১৭৮০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘটনাগুলো দেখে ব্রিটিশ দক্ষিণাঞ্চলীয় কৌশল সফল হচ্ছে বলে মনে হতে পারত। সাভানা ও চার্লস্টন তাদের হাতে, ক্যামডেনে প্রধান আমেরিকান বাহিনী পরাজিত এবং কন্টিনেন্টাল সামরিক উপস্থিতি দুর্বল। কিন্তু শহর দখল করা এবং একটি বিশাল গ্রামীণ অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় ছিল না। ব্রিটিশরা দ্রুত বুঝতে শুরু করে যে প্রতিটি নতুন এলাকা ধরে রাখতে সেনা ও সরবরাহ প্রয়োজন, অথচ স্থানীয় প্রতিরোধ ক্রমেই বাড়ছে।

পরিস্থিতি পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে ৭ অক্টোবর ১৭৮০-এর কিংস মাউন্টেনের যুদ্ধে। ব্রিটিশ মেজর প্যাট্রিক ফার্গুসনের নেতৃত্বাধীন প্রধানত লয়্যালিস্ট বাহিনী সীমান্তাঞ্চলের প্যাট্রিয়ট মিলিশিয়াদের দ্বারা ঘিরে পড়ে এবং পরাজিত হয়। ফার্গুসন নিহত হন এবং তাঁর বাহিনীর বড় অংশ বন্দী হয়। এটি কর্নওয়ালিসের উত্তর ক্যারোলাইনায় অগ্রযাত্রাকে সাময়িকভাবে ব্যাহত করে এবং ব্রিটিশদের লয়্যালিস্ট সংগঠনের পরিকল্পনায় বড় আঘাত দেয়।

এই সংকটের মধ্যে আমেরিকান দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনীর কমান্ড দেওয়া হয় মেজর জেনারেল ন্যাথানিয়েল গ্রিনকে। তাঁর হাতে খুব শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল না, কিন্তু তিনি দক্ষিণের যুদ্ধকে নতুনভাবে পরিচালনা করেন। গ্রিন বুঝেছিলেন, প্রতিটি শহর বা যুদ্ধক্ষেত্র ধরে রাখার চেষ্টা করার চেয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে ক্রমাগত চলাচল, বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে রেখে দুর্বল করা বেশি কার্যকর।

গ্রিন তাঁর বাহিনী ভাগ করার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড্যানিয়েল মরগানকে একটি অংশ নিয়ে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার পশ্চিমাঞ্চলে পাঠানো হয়। কর্নওয়ালিস মরগানের বিরুদ্ধে টার্লেটনকে পাঠান। এর ফল হয় আমেরিকান বিপ্লবের অন্যতম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত যুদ্ধ—১৭ জানুয়ারি ১৭৮১-এর কাউপেন্সের যুদ্ধ

মরগান তাঁর বাহিনীর বিভিন্ন স্তরকে পরিকল্পিতভাবে সাজিয়েছিলেন। সামনে রাইফেলম্যান, তাদের পেছনে মিলিশিয়া এবং আরও পেছনে অভিজ্ঞ কন্টিনেন্টাল সৈন্য রাখা হয়। মিলিশিয়াদের নির্দিষ্ট সংখ্যক গুলি চালিয়ে পেছনে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। টার্লেটন এই পশ্চাদপসরণকে ভাঙন মনে করে আক্রমণ তীব্র করেন। কিন্তু সেটিই তাঁকে অপেক্ষমাণ আমেরিকান নিয়মিত বাহিনীর সামনে নিয়ে আসে। পাল্টা আক্রমণে ব্রিটিশ বাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। কাউপেন্স শুধু একটি বিজয় নয়; শত্রুর আক্রমণাত্মক স্বভাবকে তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করার অসাধারণ কৌশলগত উদাহরণ ছিল।

কর্নওয়ালিস এবার গ্রিন ও মরগানের বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য দ্রুত অনুসরণ শুরু করেন। দ্রুত চলাচলের জন্য তিনি নিজের কিছু ভারী সরঞ্জাম ও অতিরিক্ত রসদ ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। শুরু হয় বিখ্যাত “রেস টু দ্য ড্যান”—আমেরিকান বাহিনী উত্তর দিকে সরে গিয়ে ড্যান নদী পার হয়ে ভার্জিনিয়ায় প্রবেশ করে এবং কর্নওয়ালিস অল্পের জন্য তাদের ধরতে ব্যর্থ হন।

কিছুদিন পর শক্তিবৃদ্ধি পেয়ে গ্রিন আবার উত্তর ক্যারোলাইনায় ফিরে আসেন। ১৫ মার্চ ১৭৮১ গিলফোর্ড কোর্টহাউসের যুদ্ধে কর্নওয়ালিস তাঁর বাহিনীর মুখোমুখি হন। গ্রিন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যান, ফলে কৌশলগত নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটিশরা বিজয় দাবি করতে পারে। কিন্তু সেই বিজয়ের মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি। কর্নওয়ালিসের তুলনামূলক ছোট বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ নিহত বা আহত হয়।

গিলফোর্ড কোর্টহাউস দক্ষিণাঞ্চলীয় অভিযানের মৌলিক সমস্যাকে স্পষ্ট করে দেয়—ব্রিটিশরা যুদ্ধ জিতছিল, কিন্তু সেই বিজয়ের মূল্য তাদের সেনাবাহিনীকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করছিল। গ্রিনের বাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি; বিপরীতে কর্নওয়ালিস হারানো প্রশিক্ষিত সৈন্য সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারছিলেন না।

কর্নওয়ালিস এরপর উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে উইলমিংটনে যান এবং সেখান থেকে ভার্জিনিয়ায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ধারণা ছিল ভার্জিনিয়ার সামরিক সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাত করে দক্ষিণের বিদ্রোহী শক্তিকে দুর্বল করা যাবে। অন্যদিকে গ্রিন কর্নওয়ালিসকে অনুসরণ না করে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ফিরে যান এবং সেখানে অবশিষ্ট ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে থাকেন। এর ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়—কর্নওয়ালিস উত্তর দিকে চলে যাচ্ছেন, আর তাঁর পেছনে ব্রিটিশদের দক্ষিণাঞ্চলীয় নিয়ন্ত্রণ ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে।

১৭৮১ সালের গ্রীষ্মে ভার্জিনিয়ায় কর্নওয়ালিস বিভিন্ন অভিযান পরিচালনার পর ইয়র্কটাউন অঞ্চলে অবস্থান নেন। ব্রিটিশ উচ্চকমান্ড চেসাপিক উপকূলে এমন একটি ঘাঁটি চেয়েছিল, যেখানে রয়্যাল নেভির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা যাবে। কর্নওয়ালিস ইয়র্ক নদীর তীরে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করেন। তাঁর কাছে সমুদ্রপথ ছিল নিরাপত্তার মূল ভিত্তি—প্রয়োজনে ব্রিটিশ নৌবহর তাঁকে সরবরাহ, শক্তিবৃদ্ধি বা উদ্ধার করতে পারবে।

কিন্তু ঠিক এই ধারণাটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য ফাঁদে পরিণত হয়।

উত্তরে জর্জ ওয়াশিংটন এবং ফরাসি জেনারেল জ্যঁ-বাতিস্ত দ্য রোশাম্বো প্রথমে নিউইয়র্কে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে চিন্তা করছিলেন। কিন্তু ফরাসি অ্যাডমিরাল ফ্রাঁসোয়া জোসেফ পল দ্য গ্রাস ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে তাঁর শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে চেসাপিক অঞ্চলে আসতে পারবেন—এই খবর কৌশলগত পরিস্থিতি বদলে দেয়। ওয়াশিংটন দ্রুত উপলব্ধি করেন যে কর্নওয়ালিসকে ভার্জিনিয়ায় বিচ্ছিন্ন করার একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এরপর শুরু হয় অসাধারণ সামরিক সমন্বয়। ওয়াশিংটন ও রোশাম্বোর সম্মিলিত বাহিনী নিউইয়র্ক অঞ্চল থেকে শত শত কিলোমিটার দক্ষিণে ভার্জিনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। চলাচলের প্রকৃত উদ্দেশ্য যতটা সম্ভব গোপন রাখা হয়, যাতে নিউইয়র্কে থাকা ব্রিটিশ কমান্ডার হেনরি ক্লিনটন সময়মতো পরিস্থিতি বুঝতে না পারেন।

কিন্তু ইয়র্কটাউন অভিযানের ভাগ্য শুধু স্থলবাহিনী নির্ধারণ করেনি। ৫ সেপ্টেম্বর ১৭৮১ চেসাপিকের নৌযুদ্ধে দ্য গ্রাসের ফরাসি নৌবহর এবং ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল থমাস গ্রেভসের বহরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। যুদ্ধটি সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক নৌবিজয় না হলেও কৌশলগতভাবে ফরাসিরা লক্ষ্য অর্জন করে। ব্রিটিশ নৌবহর নিউইয়র্কে ফিরে যায় এবং চেসাপিকের নিয়ন্ত্রণ ফরাসিদের হাতে থাকে।

এই মুহূর্তে কর্নওয়ালিসের অবস্থান অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। স্থলপথে আমেরিকান ও ফরাসি সেনাবাহিনী এবং সমুদ্রপথে ফরাসি নৌবাহিনী তাঁকে ঘিরে ফেলেছিল। ব্রিটিশ সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান সুবিধা—রয়্যাল নেভির মাধ্যমে সৈন্য সরানো ও উদ্ধার করা—ইয়র্কটাউনে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

সেপ্টেম্বরের শেষদিকে প্রায় ১৭ হাজার আমেরিকান ও ফরাসি সৈন্য ইয়র্কটাউন ঘিরে অবরোধ শুরু করে। বিপরীতে কর্নওয়ালিসের অধীনে ছিল প্রায় আট হাজার ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্য। মিত্রবাহিনী ইউরোপীয় অবরোধযুদ্ধের নিয়ম মেনে ধীরে ধীরে পরিখা খুঁড়ে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা অবস্থানের কাছাকাছি এগোতে থাকে। ভারী কামান স্থাপন করা হয় এবং ৯ অক্টোবর থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হয়।

আমেরিকান ও ফরাসি কামানের ক্রমাগত আঘাতে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দুর্বল হতে থাকে। কিন্তু দ্বিতীয় অবরোধরেখা আরও সামনে নিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ রিডাউট দখল করা প্রয়োজন ছিল। ১৪ অক্টোবর রাতে রিডাউট ৯ ও ১০-এর ওপর সমন্বিত আক্রমণ পরিচালিত হয়। ফরাসি সৈন্যরা একটি এবং আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের নেতৃত্বাধীন আমেরিকান বাহিনী অন্যটি দখল করে। এরপর মিত্রবাহিনীর কামান আরও কাছে এনে ব্রিটিশ অবস্থানের ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব হয়।

কর্নওয়ালিস শেষবারের মতো ইয়র্ক নদী পার হয়ে গ্লস্টার পয়েন্ট দিয়ে বাহিনী বের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া ও ঝড় সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। তাঁর গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছিল এবং প্রত্যাশিত ব্রিটিশ উদ্ধারবহর সময়মতো পৌঁছায়নি। ১৭ অক্টোবর তিনি আত্মসমর্পণের আলোচনা শুরু করেন।

দুই দিন পর, ১৯ অক্টোবর ১৭৮১, প্রায় আট হাজার ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এটি আমেরিকান বিপ্লবের সবচেয়ে বিখ্যাত সামরিক মুহূর্তগুলোর একটি। তবে জনপ্রিয় চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। কর্নওয়ালিস নিজে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। অসুস্থতার কথা জানিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চার্লস ও’হারাকে পাঠান। ও’হারা প্রথমে ওয়াশিংটনের কাছে আত্মসমর্পণের প্রতীকী তলোয়ার দেওয়ার চেষ্টা করলে ওয়াশিংটন তাঁকে তাঁর দ্বিতীয় কমান্ডার বেনজামিন লিংকনের দিকে নির্দেশ করেন।

ইয়র্কটাউনের আত্মসমর্পণ যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ছিল না। ব্রিটিশদের হাতে তখনও নিউইয়র্ক, চার্লস্টন ও সাভানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের যুদ্ধ চলছিল। আমেরিকান স্বাধীনতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হবে ১৭৮৩ সালের প্যারিস চুক্তিতে। তাই ১৯ অক্টোবর ১৭৮১-কে সরাসরি যুদ্ধের শেষ দিন বলা সঠিক নয়।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ইয়র্কটাউন ছিল বিধ্বংসী। ব্রিটেনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—আর কত সেনা, অর্থ ও সময় ব্যয় করে উত্তর আমেরিকার বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব? সারাটোগায় একটি ব্রিটিশ বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল; এখন ইয়র্কটাউনে আরেকটি বড় বাহিনী হারানো হলো। একই সময়ে ব্রিটেনকে বিশ্বজুড়ে ফ্রান্স, স্পেন ও ডাচ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে বৃহত্তর সংঘাত সামলাতে হচ্ছিল। আমেরিকাকে পুনরায় সম্পূর্ণভাবে বশে আনার রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য ক্রমেই অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছিল।

১৭৮২ সালে লর্ড নর্থের সরকার পতনের পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে শান্তি আলোচনার পথ আরও পরিষ্কার হয়। যুদ্ধের কিছু অভিযান চলতে থাকলেও উত্তর আমেরিকায় বৃহৎ আক্রমণাত্মক যুদ্ধপ্রচেষ্টা কার্যত আর আগের রূপে ফিরে আসেনি। শেষ পর্যন্ত ৩ সেপ্টেম্বর ১৭৮৩-এর প্যারিস চুক্তিতে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা স্বীকার করে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় অভিযান থেকে ইয়র্কটাউন পর্যন্ত ঘটনাগুলো তাই শুধু কর্নওয়ালিসের একটি ভুল সিদ্ধান্তের ইতিহাস নয়। ব্রিটিশ পরিকল্পনার মৌলিক সমস্যা ছিল আরও গভীর। তারা সাভানা, চার্লস্টন ও ক্যামডেনে বড় সাফল্য অর্জন করেছিল, কিন্তু সেই সাফল্যকে স্থায়ী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপ দিতে পারেনি। কিংস মাউন্টেন ও কাউপেন্সে বাহিনী হারানো, গ্রিনের ক্ষয়ক্ষতির কৌশল, গিলফোর্ড কোর্টহাউসের ব্যয়বহুল বিজয় এবং দীর্ঘ সরবরাহপথ কর্নওয়ালিসের সেনাবাহিনীকে ক্রমাগত দুর্বল করে।

আর ইয়র্কটাউনে সেই দীর্ঘ ক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক শক্তির নির্ধারক প্রভাব। আমেরিকান সেনাবাহিনী একা নয়, ফরাসি স্থলবাহিনী, ফরাসি অর্থ ও সরবরাহ এবং সর্বোপরি দ্য গ্রাসের নৌবহর এমন একটি সামরিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেখান থেকে কর্নওয়ালিসের বেরিয়ে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সারাটোগার পর যে ফরাসি জোট গড়ে উঠেছিল, ইয়র্কটাউনে তার পূর্ণ কৌশলগত মূল্য প্রকাশ পায়।

ইয়র্কটাউন তাই কোনো একক সেনাপতির একক বিজয় ছিল না। এটি ছিল ওয়াশিংটনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত, রোশাম্বোর সহযোগিতা, দ্য গ্রাসের নৌক্ষমতা, কন্টিনেন্টাল ও ফরাসি সৈন্যদের অবরোধ অভিযান এবং দক্ষিণে বহু বছর ধরে চলা ক্ষয়যুদ্ধের সম্মিলিত ফল। দক্ষিণাঞ্চলে ব্রিটিশরা বহু যুদ্ধ জিতেও বিদ্রোহকে ধ্বংস করতে পারেনি; বরং প্রতিটি ব্যয়বহুল সাফল্যের সঙ্গে তাদের কার্যকর শক্তি কমেছে।

১৯ অক্টোবর ১৭৮১-এ কর্নওয়ালিসের বাহিনী যখন ইয়র্কটাউনে অস্ত্র সমর্পণ করে, তখন আমেরিকার স্বাধীনতা আইনগতভাবে এখনো নিশ্চিত হয়নি—কিন্তু ব্রিটেনের সামরিক উপায়ে সেই স্বাধীনতা রোধ করার রাজনৈতিক সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছিল। লেক্সিংটনের ছোট্ট সবুজ মাঠে শুরু হওয়া সংঘর্ষ, বাঙ্কার হিলের রক্তক্ষয়, ট্রেন্টনের বরফাচ্ছন্ন রাত এবং সারাটোগার আন্তর্জাতিক মোড় ঘুরে শেষ পর্যন্ত ইয়র্কটাউনে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকার করতে হয়—যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে নতুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তির পথ খোঁজাই এখন বাস্তবসম্মত বিকল্প।


আপনার পছন্দ হতে পারে