বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে কী ধরনের জীবনযাপন দরকার? খাদ্যাভ্যাস, ওজন ও ব্যায়ামের পূর্ণ নির্দেশিকা

ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে কী ধরনের জীবনযাপন দরকার? খাদ্যাভ্যাস, ওজন ও ব্যায়ামের পূর্ণ নির্দেশিকা
সুস্থ যকৃতের জন্য নিয়ন্ত্রিত ও সক্রিয় জীবনযাপন

যকৃত মানুষের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করা, শক্তি সঞ্চয়, বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ নিষ্ক্রিয় করা এবং চর্বি ও শর্করার বিপাক নিয়ন্ত্রণসহ অসংখ্য কাজে এটি অংশ নেয়। কিন্তু যকৃতের কোষে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চর্বি জমতে শুরু করলে তৈরি হতে পারে ফ্যাটি লিভার বা যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমার সমস্যা

এটি শুধু অতিরিক্ত ওজনের মানুষের সমস্যা—এমন ধারণা ঠিক নয়। পেটের অতিরিক্ত চর্বি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা গ্রহণ, রক্তে শর্করার অস্বাভাবিকতা, রক্তে চর্বির সমস্যা এবং অনিয়মিত জীবনযাপনও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষ বিষয় হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তাই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো এমন জীবনযাপন গড়ে তোলা, যা একই সঙ্গে যকৃত, শরীরের ওজন, রক্তের শর্করা এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর কাজ করে

শরীরের ওজনের চেয়ে কোমরের চর্বির দিকেও নজর দিন

ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে শুধু ওজন মাপার যন্ত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পেটের ভেতরে বিভিন্ন অঙ্গের চারপাশে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

তাই কারও ওজন খুব বেশি না হলেও কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত মেদ থাকলে ঝুঁকি থাকতে পারে।

অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো যকৃতে জমা চর্বি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত টেকসই ওজন হ্রাস, দ্রুত কয়েক কিলোগ্রাম কমানোর চেষ্টা নয়।

খুব কঠোর উপবাস, একেবারে না খেয়ে থাকা বা অস্বাভাবিক খাদ্যতালিকার পরিবর্তে দৈনিক খাবারের পরিমাণ সামান্য কমানো এবং শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।

চিনি ও মিষ্টি পানীয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কমাতে হবে

ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমানোর খাদ্যাভ্যাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমানো

বিশেষ করে কোমল পানীয়, মিষ্টি ফলের পানীয়, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত চা-কফি, মিষ্টি শরবত, মিষ্টান্ন এবং নিয়মিত বেশি পরিমাণে চিনি দেওয়া খাবার সমস্যাজনক হতে পারে।

তরল অবস্থায় চিনি গ্রহণের আরেকটি অসুবিধা হলো—এতে অনেক শক্তি গ্রহণ করা গেলেও পেট ভরা অনুভূতি তুলনামূলক কম হতে পারে। ফলে মোট শক্তি গ্রহণ সহজেই বেড়ে যায়।

তৃষ্ণার প্রধান পানীয় হিসেবে তাই পানি রাখাই সবচেয়ে সহজ অভ্যাস।

ফলের ক্ষেত্রেও রসের বদলে আস্ত ফল ভালো পছন্দ। কারণ আস্ত ফলে আঁশ থাকে এবং চিবিয়ে খাওয়ার কারণে একবারে অতিরিক্ত গ্রহণের সম্ভাবনাও তুলনামূলক কম।

ভাত পুরোপুরি বাদ নয়, পরিমাণ ও খাবারের গঠন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশি খাদ্যাভ্যাসে ভাত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি আছে বলেই ভাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে—এমন নয়।

সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন বড় পরিমাণ সাদা ভাতের সঙ্গে খুব কম শাকসবজি ও প্রোটিন খাওয়া হয় এবং দিনের মোট শক্তি গ্রহণ শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়।

একটি প্রধান খাবারের থালা এমনভাবে সাজানো যেতে পারে যেখানে বড় অংশ থাকবে বিভিন্ন সবজি, সঙ্গে থাকবে মাছ, ডাল, ডিম বা অন্য উপযুক্ত প্রোটিন এবং পরিমিত পরিমাণ ভাত বা অন্য শস্য।

সম্ভব হলে আঁশসমৃদ্ধ শস্য ও খাবার বাড়ানো যেতে পারে। এতে খাবারের সামগ্রিক পুষ্টিমান উন্নত হয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে।

প্রতিদিনের খাবারে কী বেশি রাখা উচিত?

যকৃতবান্ধব খাদ্যাভ্যাস কোনো বিশেষ ‘ডিটক্স খাবার’-এর ওপর নির্ভর করে না। বরং সম্পূর্ণ খাদ্যতালিকার মান গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত খাবারে গুরুত্ব দেওয়া যায়—

  • বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
  • পরিমিত আস্ত ফল
  • ডাল ও অন্যান্য শুঁটিজাতীয় খাবার
  • মাছ
  • ডিম ও পরিমিত চর্বিহীন প্রোটিন
  • আঁশসমৃদ্ধ শস্য
  • পরিমিত বাদাম ও বীজ
  • পর্যাপ্ত পানি

অন্যদিকে অতিরিক্ত মিষ্টি, গভীর তেলে ভাজা খাবার, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এবং নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার কমানো দরকার।

মূল লক্ষ্য কোনো একটি খাবারকে ‘ওষুধ’ হিসেবে দেখা নয়; বরং প্রতিদিনের মোট খাদ্যাভ্যাসকে উন্নত করা

সপ্তাহে কয়েক দিন ব্যায়াম করলেই যথেষ্ট নয়—দৈনন্দিন চলাফেরাও বাড়াতে হবে

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম শরীরের শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়ায়, পেটের চর্বি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহজুড়ে মোটামুটি দুই ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে। দ্রুত হাঁটা এর সহজ উদাহরণ।

তবে শুধু নির্দিষ্ট সময় ব্যায়াম করলেই হবে না।

দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও ভাঙতে হবে।

কাজের কারণে সারাদিন কম্পিউটারের সামনে থাকতে হলে কিছুক্ষণ পরপর উঠে হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, কাছাকাছি দূরত্বে হেঁটে যাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজে শরীরের নড়াচড়া বাড়ানো উপকারী।

পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ

হাঁটা বা অন্যান্য বায়বীয় ব্যায়ামের পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত কয়েক দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম যোগ করা যেতে পারে।

নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করে বসা-ওঠা, দেয়ালে ভর দিয়ে চাপ দেওয়া, নিরাপদভাবে ভার তোলা বা উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম করা যায়।

পেশি শুধু চলাফেরার জন্য নয়; শরীরের শর্করা ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা এবং শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের সমন্বয় ভালো কৌশল।

দীর্ঘ সময় না খেয়ে পরে অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস এড়ান

অনেকেই দিনের বড় অংশ না খেয়ে রাতে একবারে প্রচুর খাবার খান। আবার কেউ নিয়মিত রাত জেগে মিষ্টি বা উচ্চশক্তির খাবার খান।

ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে এমন খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তে নিজের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নিয়ন্ত্রিত খাদ্যসূচি তৈরি করা ভালো।

কখন খাওয়া হচ্ছে তার পাশাপাশি কী এবং কতটা খাওয়া হচ্ছে—এ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবারের সামনে বসলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে। তাই এমন একটি রুটিন দরকার যা দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা সম্ভব।

ঘুমকে অবহেলা করলে জীবনযাপনের অন্য পরিবর্তনও কঠিন হয়ে যায়

ঘুম সরাসরি খাবারের বিকল্প বা ব্যায়ামের বিকল্প নয়। কিন্তু নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা, খাদ্য নির্বাচন, শারীরিক সক্রিয়তা এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণভাবে প্রতিরাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টার মানসম্মত ঘুমের লক্ষ্য রাখা ভালো।

প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও জাগা, রাতে অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়ানো এবং ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস কমানো সহায়ক হতে পারে।

কেউ পর্যাপ্ত সময় ঘুমিয়েও যদি নিয়মিত প্রচণ্ড নাক ডাকেন, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসে বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ধূমপান ও মদ্যপানের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি

যকৃতের সুস্থতার জন্য মদ্যপানের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের ইতিমধ্যে যকৃতে চর্বি জমেছে বা যকৃতের অন্য সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মদ্যপান নিরাপদ কি না তা ব্যক্তিভেদে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।

ধূমপানও সামগ্রিক হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ফলে শুধু যকৃত নয়, পুরো শরীরের ঝুঁকি কমানোর জীবনযাপনে ধূমপান বর্জন গুরুত্বপূর্ণ।

‘লিভার ডিটক্স’ বা হারবাল ওষুধকে নিরাপদ ধরে নেবেন না

ফ্যাটি লিভার নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ‘লিভার পরিষ্কার’, ‘ডিটক্স’, ভেষজ গুঁড়া, পানীয় ও খাদ্য-পরিপূরক বিক্রি হয়।

কিন্তু যকৃতকে পরিষ্কার করার জন্য আলাদা কোনো জাদুকরী পানীয়ের প্রয়োজন নেই। বরং অজানা উপাদানের কিছু ভেষজ বা খাদ্য-পরিপূরক নিজেই যকৃতের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু ‘প্রাকৃতিক’ লেখা দেখে কোনো পণ্যকে নিরাপদ মনে করা উচিত নয়।

রক্তের শর্করা, চর্বি ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি

ফ্যাটি লিভারকে বিচ্ছিন্নভাবে শুধু যকৃতের সমস্যা হিসেবে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি প্রায়ই শরীরের সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত।

তাই যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের শর্করা, রক্তের বিভিন্ন চর্বি, রক্তচাপ, শরীরের ওজন এবং কোমরের মাপ পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তে চর্বির সমস্যা থাকলে সেগুলোর চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়াও যকৃতের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের অংশ।

ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে শুধু জীবনযাপন বদলে অপেক্ষা করবেন না

আল্ট্রাসনোগ্রাম বা অন্য পরীক্ষায় ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে শুধু ‘কম তেল খাব’ বলে বিষয়টি শেষ করা ঠিক নয়।

চিকিৎসকের প্রয়োজন হতে পারে বোঝার জন্য যকৃতে শুধু চর্বি জমেছে, নাকি প্রদাহ বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতের ঝুঁকিও রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, যকৃতের কার্যকারিতা মূল্যায়ন বা আরও পরীক্ষা লাগতে পারে।

বিশেষ করে চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, পেট ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, পায়ে পানি জমা, বিভ্রান্তি বা অন্য গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

মূল কথা

ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমানোর জন্য কোনো একক ফল, পানীয়, ওষুধ বা সাত দিনের ‘ডিটক্স পরিকল্পনা’ নেই। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো শরীরের অতিরিক্ত ওজন ও বিশেষ করে পেটের চর্বি নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয় কমানো, পরিমিত ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা

এই পরিবর্তনগুলো কয়েক দিনের প্রকল্প নয়। এগুলোকে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশে পরিণত করাই আসল লক্ষ্য।

ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে কার্যকর জীবনযাপন সাধারণত সবচেয়ে নাটকীয় জীবনযাপন নয়—বরং যে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর ধরে বাস্তবে বজায় রাখা সম্ভব, সেগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


আপনার পছন্দ হতে পারে