বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

দ্বিতীয় মেহমেদের সাম্রাজ্য নির্মাণ: কনস্টান্টিনোপল থেকে বলকান ও আনাতোলিয়ায় অটোমান বিশ্বশক্তির উত্থান

সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস

দ্বিতীয় মেহমেদের সাম্রাজ্য নির্মাণ: কনস্টান্টিনোপল থেকে বলকান ও আনাতোলিয়ায় অটোমান বিশ্বশক্তির উত্থান
ফাতিহ মেহমেদের হাতে অটোমান বিশ্বশক্তির উত্থান

১৪৫৩ সালের ২৯ মে কনস্টান্টিনোপল দখল দ্বিতীয় মেহমেদকে ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত বিজেতায় পরিণত করেছিল। কিন্তু কনস্টান্টিনোপল জয় ছিল তার সাম্রাজ্য নির্মাণের শেষ নয়—বরং প্রকৃত সূচনা। একটি প্রাচীন রাজধানী দখল করা এবং সেই রাজধানীকে কেন্দ্র করে স্থায়ী বিশ্বশক্তি নির্মাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। মেহমেদ বুঝেছিলেন, অটোমানদের যদি সত্যিকার সাম্রাজ্যে পরিণত হতে হয়, তবে শুধু যুদ্ধ জিতলেই চলবে না। বলকান ও আনাতোলিয়ার বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দমন করতে হবে, কৃষ্ণসাগর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সুলতানের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বাড়াতে হবে এবং কনস্টান্টিনোপলকে কার্যকর সাম্রাজ্যিক রাজধানীতে রূপ দিতে হবে।

১৪৫৩ সালে বাইজেন্টাইন রাজধানী পতনের পর শহরটি যুদ্ধ, দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে তার প্রাচীন গৌরবের তুলনায় অনেকটাই সংকুচিত ছিল। মেহমেদের প্রথম বড় কাজগুলোর একটি ছিল কনস্টান্টিনোপলকে পুনরায় জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় করা। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম, গ্রিক খ্রিষ্টান, আর্মেনীয়, ইহুদি এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে শহরে নিয়ে আসা বা বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করা হয়।

বাজার, কর্মশালা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনকল্যাণমূলক স্থাপনা এবং নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। মেহমেদের সময়েই তোপকাপি প্রাসাদের প্রাথমিক নির্মাণ শুরু হয়, যা পরে শতাব্দীর পর শতাব্দী অটোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজকীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। পুরোনো বাইজেন্টাইন রাজধানীকে তিনি কেবল দখল করেননি; এটিকে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক হৃদয়ে রূপান্তর করতে শুরু করেছিলেন।

মেহমেদের সাম্রাজ্যিক ধারণাও ছিল বিস্তৃত। কনস্টান্টিনোপল দখলের পর তিনি নিজেকে শুধু তুর্কি মুসলিম বিজেতা হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি “কায়সার-ই রুম”, অর্থাৎ রোমের সিজার বা রোমান সাম্রাজ্যিক উত্তরাধিকারের দাবিদার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার কাছে অটোমান রাষ্ট্র আর শুধু একটি সীমান্ত বেইলিকের বিস্তৃত সংস্করণ ছিল না; এটি ছিল বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও ঐতিহাসিক অঞ্চলকে ধারণকারী একটি সর্বজনীন সাম্রাজ্য।

এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রথম বাস্তব ক্ষেত্র ছিল বলকান। কনস্টান্টিনোপল দখল করলেও সার্বিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া, মোরিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে স্বাধীন বা আধা-স্বাধীন শক্তি তখনও বিদ্যমান ছিল। মেহমেদ বুঝেছিলেন যে এগুলোকে অটোমান নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে কনস্টান্টিনোপলকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য নিরাপদ থাকবে না।

সার্বিয়ায় অটোমান ও হাঙ্গেরীয় প্রভাবের দীর্ঘ প্রতিযোগিতা চলছিল। ১৪৫৬ সালে বেলগ্রেড দখলের চেষ্টা মেহমেদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়ায়। ইয়ানোশ হুনিয়াদির নেতৃত্বে প্রতিরোধের মুখে অটোমানরা শহরটি নিতে পারেনি। এই পরাজয় দেখিয়ে দেয় যে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পরও মেহমেদ অপ্রতিরোধ্য ছিলেন না।

কিন্তু তিনি সার্বিয়ার অন্য অংশে চাপ অব্যাহত রাখেন। শেষ পর্যন্ত ১৪৫৯ সালে স্মেদেরেভোর পতনের মাধ্যমে সার্বিয়ান ডেসপোটেটের স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে এবং এর অধিকাংশ ভূখণ্ড সরাসরি অটোমান নিয়ন্ত্রণে আসে। এর ফলে মধ্য বলকানে অটোমান অবস্থান অনেক শক্তিশালী হয় এবং হাঙ্গেরির সঙ্গে তাদের সীমান্ত আরও প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে।

এরপর মেহমেদ দক্ষিণ গ্রিসের মোরিয়া ডেসপোটেটের দিকে মনোযোগ দেন। এখানে বাইজেন্টাইন পালাইওলোগোস রাজবংশের সদস্যরা শাসন করছিলেন। ১৪৬০ সালের অভিযানে অটোমানরা মোরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে। ফলে কনস্টান্টিনোপলের পতনের পরও গ্রিসে টিকে থাকা বাইজেন্টাইন রাজবংশীয় শাসনের আরেকটি প্রধান কেন্দ্র বিলুপ্ত হয়।

তবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন কেন্দ্র তখনও কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে টিকে ছিল—ত্রেবিজন্দ সাম্রাজ্য। ১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের পর প্রতিষ্ঠিত এই গ্রিক রাষ্ট্রটি কোমনেনোস রাজবংশের অধীনে দীর্ঘদিন স্বাধীন ছিল। মেহমেদের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি ছোট দূরবর্তী রাজ্য ছিল না; এটি অটোমান আনাতোলীয় ঐক্য এবং কৃষ্ণসাগরীয় কৌশলের জন্য সম্ভাব্য সমস্যা ছিল।

১৪৬১ সালে মেহমেদ ত্রেবিজন্দের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। স্থল ও সমুদ্র থেকে চাপের মুখে শহরটি আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যিক ঐতিহ্যের শেষ গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন গ্রিক উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রগুলোর একটির অবসান ঘটে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব আনাতোলিয়া ও কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ উপকূলে অটোমান প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

বলকানে মেহমেদের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষদের একজন ছিলেন জর্জ কাস্ত্রিওতি স্কান্দারবেগ। অটোমান ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তিনি আলবেনিয়ায় ফিরে বিদ্রোহ করেন এবং কয়েক দশক ধরে অটোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পরিচালনা করেন। দুর্গম পার্বত্য ভূগোল, দ্রুত আক্রমণ এবং স্থানীয় সমর্থন ব্যবহার করে স্কান্দারবেগ অটোমানদের বারবার সমস্যায় ফেলেন।

মেহমেদ নিজেও আলবেনিয়ার বিরুদ্ধে বড় অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু স্কান্দারবেগের জীবদ্দশায় আলবেনীয় প্রতিরোধ পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। ১৪৬৮ সালে স্কান্দারবেগের মৃত্যুর পর প্রতিরোধ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, যদিও অটোমানদের অঞ্চলটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আরও সময় লাগে। এই দীর্ঘ সংঘর্ষ মেহমেদের সাম্রাজ্য নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে—সব বিজয় দ্রুত বা সহজ ছিল না।

১৪৬৩ সালে বসনিয়া অভিযানে মেহমেদ আরও একটি বড় সাফল্য অর্জন করেন। বসনীয় রাজ্যের অধিকাংশ অংশ দ্রুত অটোমান নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং রাজা স্তেফান তোমাশেভিচ বন্দী হয়ে নিহত হন। এর ফলে পশ্চিম বলকানে অটোমান উপস্থিতি আরও গভীর হয়। তবে হাঙ্গেরীয় পাল্টা অভিযানের কারণে বসনিয়ার কিছু উত্তরাঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে থাকে।

একই সময়ে অটোমানদের সঙ্গে ভেনিস প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হয়। ১৪৬৩ থেকে ১৪৭৯ সাল পর্যন্ত চলা এই সংঘর্ষ দেখিয়ে দেয় যে মেহমেদের সাম্রাজ্য শুধু স্থলভিত্তিক শক্তি হিসেবে থাকতে পারবে না। এজিয়ান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যপথ এবং দ্বীপগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য শক্তিশালী নৌশক্তির প্রয়োজন ছিল।

মেহমেদ তাই নৌবাহিনী ও জাহাজ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন। অটোমান নৌক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তখনও ছিল, কিন্তু কনস্টান্টিনোপল ও গ্যালিপোলিকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর সামুদ্রিক শক্তির ভিত্তি গড়ে উঠতে থাকে। ভেনিসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে অটোমানরা গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগত সুবিধা অর্জন করে এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

আনাতোলিয়ায় মেহমেদের প্রধান সমস্যা ছিল কারামানীয় বেইলিক। অটোমানদের মতোই তুর্কি-মুসলিম রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও কারামান দীর্ঘদিন মধ্য আনাতোলিয়ায় শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। অটোমানদের ইউরোপীয় যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে কারামানীয়রা বারবার নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করত।

মেহমেদ একাধিক অভিযানের মাধ্যমে কারামানীয় শক্তি ভেঙে দেন এবং তাদের ভূখণ্ডের বড় অংশ অটোমান নিয়ন্ত্রণে আনেন। কিন্তু এর ফলে অটোমানরা আরও পূর্বের শক্তিশালী আক কইউনলু শাসক উজুন হাসানের সঙ্গে সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যায়। উজুন হাসান শুধু পূর্ব আনাতোলিয়ার বড় শক্তিই ছিলেন না; তিনি অটোমানবিরোধী বিভিন্ন পক্ষের সম্ভাব্য মিত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন।

সংঘর্ষের চূড়ান্ত পর্যায় আসে ১৪৭৩ সালের ওতলুকবেলির যুদ্ধে। মেহমেদের বাহিনী উজুন হাসানের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে। অটোমানদের সংগঠিত পদাতিক, জানিসারি এবং বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র ও কামানের কার্যকর ব্যবহার যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়। ওতলুকবেলির বিজয় পূর্ব আনাতোলিয়ায় অটোমান অবস্থানকে নিরাপদ করে এবং মেহমেদের কেন্দ্রীভূত সামরিক রাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শন করে।

কৃষ্ণসাগরেও মেহমেদের লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য ও কৌশলগত পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। জেনোয়ান বাণিজ্যিক উপনিবেশগুলো দীর্ঘদিন কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৪৭৫ সালে অটোমান অভিযান ক্রিমিয়ার কাফা এবং অন্যান্য জেনোয়ান কেন্দ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। একই সময়ে ক্রিমিয়ান খানাত অটোমান প্রভাবাধীন মিত্রশক্তিতে পরিণত হয়।

এর ফলে কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ ও উত্তর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও রাজনৈতিক শক্তির ওপর অটোমান প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। পরবর্তী যুগে কৃষ্ণসাগর ক্রমশ এমন একটি অঞ্চলে পরিণত হবে যেখানে অটোমানদের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।

তবে মেহমেদের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনগুলো সব যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটেনি। তিনি অটোমান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীকরণকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান। আগের যুগের সীমান্ত বেই ও শক্তিশালী তুর্কি অভিজাত পরিবারগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সুলতানের নিজস্ব প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মচারীদের গুরুত্ব বাড়ানো হয়।

এই ব্যবস্থায় দেভশিরমে-উৎপত্তির প্রশাসক ও কাপিকুলু বাহিনীর গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। তারা সাধারণত স্বাধীন বংশগত আঞ্চলিক ক্ষমতার পরিবর্তে সরাসরি সুলতানের কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে পুরোনো তুর্কি অভিজাতদের পাশাপাশি এমন একটি প্রশাসনিক শ্রেণি গড়ে ওঠে, যার রাজনৈতিক অবস্থান কেন্দ্রীয় দরবারের ওপর নির্ভরশীল।

মেহমেদের আইনসংক্রান্ত ব্যবস্থাও কেন্দ্রীকরণের অংশ ছিল। তার সঙ্গে যুক্ত কানুননামে বা রাজকীয় বিধানগুলো প্রশাসন, দরবার এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের কার্যক্রমকে নিয়মবদ্ধ করার প্রচেষ্টার প্রতিফলন। ইসলামি শরিয়াভিত্তিক বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সুলতানি কানুন রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মেহমেদ রাজবংশীয় উত্তরাধিকার নিয়েও কঠোর বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। ভবিষ্যৎ গৃহযুদ্ধ এড়ানোর যুক্তিতে ভ্রাতৃহত্যাকে অনুমোদনকারী বিখ্যাত রাজবংশীয় বিধানের সঙ্গে তার নাম যুক্ত। আধুনিক দৃষ্টিতে এটি নির্মম হলেও অটোমানদের স্মৃতিতে ১৪০২-১৪১৩ সালের গৃহযুদ্ধ ছিল একটি বাস্তব সতর্কবার্তা—একাধিক রাজপুত্রের ক্ষমতার লড়াই পুরো রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

কনস্টান্টিনোপলকেও মেহমেদ সচেতনভাবে বহুজাতিক সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলছিলেন। মুসলিম প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গ্রিক অর্থোডক্স প্যাট্রিয়ার্কেটকে অটোমান ব্যবস্থার মধ্যে টিকিয়ে রাখা হয়। আর্মেনীয় ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিও বাড়ে। বাজার, বন্দর, কারুশিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলে।

এই নীতির পেছনে শুধু ধর্মীয় সহনশীলতার প্রশ্ন ছিল না; ছিল সাম্রাজ্য পরিচালনার বাস্তব হিসাব। একটি বিশ্বরাজধানীর জন্য জনসংখ্যা, দক্ষ কারিগর, ব্যবসায়ী, করদাতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রয়োজন। মেহমেদ বিজিত জনগোষ্ঠীকে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পদে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।

তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ জীবনে আরও পশ্চিমে পৌঁছে যায়। ১৪৮০ সালে অটোমান বাহিনী দক্ষিণ ইতালির ওত্রান্তো দখল করে। একই সময়ে রোডসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও নাইটস হসপিটালারের দুর্গ দখল করা সম্ভব হয়নি। ওত্রান্তো দখল ইউরোপে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল, কারণ এটি ইতালীয় উপদ্বীপে অটোমানদের স্থায়ী সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।

কিন্তু সেই সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়ার আগেই ১৪৮১ সালে দ্বিতীয় মেহমেদ মারা যান। তার মৃত্যুর পর ওত্রান্তোতে অটোমান অবস্থান দ্রুত হারিয়ে যায়। তিনি শেষ অভিযানে ঠিক কোথায় আঘাত করতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। ফলে তার শেষ সামরিক লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করা কঠিন।

মেহমেদ যে রাষ্ট্র রেখে যান, সেটি ১৪৫১ সালে তার হাতে পাওয়া রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও কেন্দ্রীভূত। কনস্টান্টিনোপল সাম্রাজ্যের রাজধানী, সার্বিয়া ও বসনিয়ার বড় অংশ অটোমান নিয়ন্ত্রণে, গ্রিসের অধিকাংশ অঞ্চল অধীন, ত্রেবিজন্দ বিলুপ্ত, কারামানীয় শক্তি ভেঙে পড়েছে এবং কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো অটোমান প্রভাবের মধ্যে এসেছে।

তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তাই কনস্টান্টিনোপল জয় করাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিজিত শহরটিকে একটি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন এবং সেই কেন্দ্রের চারপাশে বলকান, আনাতোলিয়া, এজিয়ান ও কৃষ্ণসাগরকে যুক্ত করে নতুন ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণ করেছিলেন।

ওসমান প্রথমের রাষ্ট্র ছিল একটি সীমান্ত বেইলিক। ওরহানের রাষ্ট্র ছিল উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি। মুরাদ প্রথমের অটোমানরা বলকানে আধিপত্য বিস্তার শুরু করেছিল। বায়েজিদ প্রথমের সময় তারা দ্রুত বিস্তার লাভ করেও আঙ্কারায় প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মেহমেদ প্রথম ও দ্বিতীয় মুরাদ সেই রাষ্ট্র পুনর্গঠন করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেহমেদের সময়েই অটোমানরা স্থায়ীভাবে একটি সাম্রাজ্যিক বিশ্বশক্তির বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।

১৪৫৩ তাকে ফাতিহ বানিয়েছিল; পরবর্তী প্রায় তিন দশক তাকে সাম্রাজ্য নির্মাতা বানায়। তার যুদ্ধ, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ, রাজধানী পুনর্গঠন, নৌকৌশল এবং রোমান সাম্রাজ্যিক উত্তরাধিকারের দাবি অটোমান শাসনের চরিত্রই বদলে দেয়। ১৪৮১ সালে মেহমেদের মৃত্যুর সময় অটোমান রাষ্ট্র আর আনাতোলিয়া থেকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া কোনো সীমান্তরাজ্য ছিল না—এটি ছিল দুই মহাদেশে বিস্তৃত, শক্তিশালী রাজধানী ও কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থাসম্পন্ন এমন এক সাম্রাজ্য, যার সঙ্গে ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার প্রধান শক্তিগুলোকে এখন বাধ্যতামূলকভাবে হিসাব করে চলতে হতো।


আপনার পছন্দ হতে পারে