বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্রথম সেলিমের বিজয়: মামলুক সাম্রাজ্যের পতন, মিশর ও পবিত্র নগরীর ওপর অটোমান কর্তৃত্ব

সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস

প্রথম সেলিমের বিজয়: মামলুক সাম্রাজ্যের পতন, মিশর ও পবিত্র নগরীর ওপর অটোমান কর্তৃত্ব
সেলিমের বিজয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের নতুন যুগ

১৫১২ সালে প্রথম সেলিম যখন অটোমান সিংহাসনে বসেন, তখন তার হাতে থাকা সাম্রাজ্য ইতোমধ্যে বলকান ও আনাতোলিয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু মাত্র আট বছরের শাসনে তিনি অটোমান রাষ্ট্রের ভূগোল, রাজনৈতিক পরিচয় এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে তার অবস্থান এত গভীরভাবে বদলে দেন যে ১৫২০ সালে তার মৃত্যুর সময় অটোমান সাম্রাজ্য আর প্রধানত বলকান-আনাতোলিয়াকেন্দ্রিক শক্তি ছিল না; এটি সিরিয়া, মিশর ও হিজাজ পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল মধ্যপ্রাচ্যীয় সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। এই নাটকীয় পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল মামলুক সাম্রাজ্যের পতন।

প্রথম সেলিম, যিনি ইয়াভুজ সেলিম নামেও পরিচিত, সিংহাসনে বসেই পূর্ব সীমান্তকে অগ্রাধিকার দেন। তার প্রধান উদ্বেগের একটি ছিল ইরানকেন্দ্রিক সাফাভি সাম্রাজ্য। শাহ ইসমাইল প্রথমের নেতৃত্বে সাফাভিরা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এবং শিয়া মতাদর্শকে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল। আনাতোলিয়ার কিছু তুর্কমেন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাফাভি প্রভাব অটোমানদের জন্য রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

এই সংঘাতের ফল আসে ১৫১৪ সালের চালদিরানের যুদ্ধে। অটোমান জানিসারি ও কামাননির্ভর বাহিনী সাফাভিদের পরাজিত করে। সেলিম সাফাভি রাজধানী তাবরিজে প্রবেশ করলেও সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেননি। কিন্তু চালদিরানের বিজয় পূর্ব আনাতোলিয়ায় অটোমান অবস্থান শক্তিশালী করে এবং পরবর্তী দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা তৈরি করে।

এরপর অটোমানদের সঙ্গে মামলুকদের সম্পর্ক দ্রুত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। মামলুক সালতানাত তখন মিশর, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন এবং হিজাজের ওপর প্রভাবশালী মুসলিম শক্তি। কায়রো ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র। মক্কা ও মদিনার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে মামলুক সুলতানদের ধর্মীয় মর্যাদাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অটোমান ও মামলুকদের মধ্যে বিরোধ নতুন ছিল না। আনাতোলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে প্রভাব বিস্তার, স্থানীয় তুর্কি ও কুর্দি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাফাভিদের প্রশ্নে দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে উত্তেজনা ছিল। সেলিমের দ্রুত পূর্বমুখী সম্প্রসারণ এই পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে পরিণত করে।

১৫১৬ সালে সেলিম বিশাল বাহিনী নিয়ে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হন। মামলুক সুলতান কানসুহ আল-গাওরি নিজেই তার বাহিনী নিয়ে অটোমানদের মোকাবিলায় বের হন। দুই শক্তির নির্ধারক সংঘর্ষ ঘটে ১৫১৬ সালের ২৪ আগস্ট মারজ দাবিকের যুদ্ধে, বর্তমান সিরিয়ার আলেপ্পোর উত্তরে।

মামলুক সামরিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রে ছিল উচ্চ প্রশিক্ষিত অশ্বারোহী যোদ্ধা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই সামরিক ব্যবস্থা তাদের শক্তির ভিত্তি ছিল। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে যুদ্ধের প্রযুক্তি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। অটোমানরা জানিসারি পদাতিক, আগ্নেয়াস্ত্র এবং মাঠের কামানকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারে অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছিল।

মারজ দাবিকে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মামলুক অশ্বারোহীদের ব্যক্তিগত যুদ্ধদক্ষতা অসাধারণ হলেও অটোমান কামান ও আগ্নেয়াস্ত্রনির্ভর প্রতিরক্ষা ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে মামলুক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং কিছু কমান্ডারের আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ পরিস্থিতি আরও দুর্বল করে। যুদ্ধের মধ্যে সুলতান কানসুহ আল-গাওরির মৃত্যু ঘটে এবং মামলুক বাহিনী ভেঙে পড়ে।

মারজ দাবিকের বিজয় কার্যত সিরিয়ার দরজা সেলিমের সামনে খুলে দেয়। আলেপ্পো অটোমানদের হাতে আসে। এরপর দামেস্কসহ সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নগরগুলো অটোমান কর্তৃত্ব মেনে নেয়। কয়েক মাসের মধ্যে এমন একটি অঞ্চল অটোমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মিশরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ ছিল।

কিন্তু মামলুক রাষ্ট্র তখনও শেষ হয়ে যায়নি। কায়রোতে তুমান বে দ্বিতীয় নতুন সুলতান হিসেবে প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। তিনি বুঝেছিলেন যে মিশর রক্ষা করতে হলে অটোমানদের সিনাই অতিক্রম করার পরই থামাতে হবে। সেলিমের জন্যও অভিযান সহজ ছিল না। একটি বড় সেনাবাহিনীকে সিনাই মরুভূমির কঠিন পরিবেশ অতিক্রম করিয়ে মিশরে নিয়ে যাওয়া ছিল বিশাল রসদ ও পরিবহন চ্যালেঞ্জ।

অটোমানরা সেই বাধা অতিক্রম করে কায়রোর দিকে এগিয়ে যায়। ১৫১৭ সালের ২২ জানুয়ারি রিদানিয়ার যুদ্ধে দুই পক্ষ আবার মুখোমুখি হয়। তুমান বে কায়রোর কাছে প্রতিরক্ষা তৈরি করেছিলেন এবং অটোমানদের অগ্রযাত্রা থামানোর চেষ্টা করেন। মামলুকরাও কামান ব্যবহার করেছিল, কিন্তু অটোমান সামরিক সংগঠন ও কৌশল শেষ পর্যন্ত বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়।

রিদানিয়ায় মামলুক বাহিনী পরাজিত হলেও যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি। কায়রোর ভেতরে তীব্র প্রতিরোধ ও রাস্তায় সংঘর্ষ ঘটে। তুমান বে পালিয়ে গিয়ে পুনরায় প্রতিরোধ সংগঠনের চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বন্দী হন এবং ১৫১৭ সালের এপ্রিলে কায়রোর বাব জুওয়াইলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

তার মৃত্যুর সঙ্গে স্বাধীন মামলুক সালতানাতের রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে। প্রায় আড়াই শতাব্দী ধরে মিশর ও সিরিয়ার প্রধান শক্তি হিসেবে থাকা মামলুক সাম্রাজ্য অটোমানদের হাতে বিলুপ্ত হয়। তবে মামলুক অভিজাত শ্রেণি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়নি। পরবর্তী অটোমান মিশরেও বহু মামলুক পরিবার ও সামরিক গোষ্ঠী স্থানীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে থাকে।

মিশর বিজয় অটোমানদের জন্য অসাধারণ অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করেছিল। নীলনদের উর্বর কৃষিভূমি সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়। কায়রো ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল কেন্দ্র। লোহিত সাগর, ভূমধ্যসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে মিশরের সংযোগ অটোমান অর্থনীতিকে নতুন কৌশলগত মাত্রা দেয়।

এটি এমন সময় ঘটছিল যখন পর্তুগিজরা আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে নতুন সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজ নৌশক্তির উত্থান লোহিত সাগর এবং মিশরীয় বাণিজ্যপথের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছিল। ফলে মিশর দখলের পর অটোমানদের কৌশলগত দৃষ্টি প্রথমবারের মতো আরও প্রত্যক্ষভাবে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে প্রসারিত হয়।

তবে সেলিমের বিজয়ের সবচেয়ে গভীর প্রভাবগুলোর একটি ছিল হিজাজ এবং মক্কা-মদিনার সঙ্গে অটোমান সম্পর্ক। মামলুক রাষ্ট্রের পতনের পর মক্কার শরিফ অটোমান সুলতানের কর্তৃত্ব স্বীকার করেন। এর ফলে ইসলামের দুই পবিত্র নগরী—মক্কা ও মদিনা—অটোমান রাজনৈতিক সুরক্ষার আওতায় আসে।

এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ইস্তাম্বুল থেকে সরাসরি প্রতিটি স্থানীয় বিষয় পরিচালিত হতো। মক্কার শরিফদের স্থানীয় কর্তৃত্ব বহুলাংশে বজায় ছিল, কিন্তু বৃহত্তর রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অটোমান সুলতানের সঙ্গে যুক্ত হয়। হজপথের নিরাপত্তা, পবিত্র নগরীগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেখানে অর্থ ও খাদ্য সহায়তা পাঠানো অটোমান শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পরিণত হয়।

এর ফলে অটোমান সুলতানদের ধর্মীয় মর্যাদাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তারা এখন শুধু বিশাল মুসলিম ভূখণ্ডের শাসক নন; মক্কা ও মদিনার রক্ষক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করার সুযোগ পান। পরবর্তী অটোমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খাদিম আল-হারামাইন আল-শরিফাইন—“দুই পবিত্র মসজিদের সেবক”—ধারণা বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

এখানে একটি জনপ্রিয় কিন্তু বিতর্কিত ধারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। বহুল প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী কায়রোতে অবস্থানরত শেষ আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল তৃতীয় আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফতের পদ ও প্রতীক সেলিমের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং ১৫১৭ সাল থেকেই অটোমান সুলতানরা আনুষ্ঠানিকভাবে খলিফা হয়ে যান। কিন্তু এই নির্দিষ্ট “খিলাফত হস্তান্তর অনুষ্ঠান” সম্পর্কে সমসাময়িক শক্তিশালী প্রমাণ নেই এবং আধুনিক ইতিহাসবিদরা কাহিনিটিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখেন।

অটোমান সুলতানরা এর আগেও ধর্মীয় কর্তৃত্বসূচক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের খলিফা পরিচয় ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৫১৭ সালে একক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আব্বাসীয় খিলাফত সরাসরি সেলিমের কাছে হস্তান্তর হয়েছিল—এমন সরল বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়। যা নিশ্চিত, তা হলো মিশর, সিরিয়া ও হিজাজ দখলের পর মুসলিম বিশ্বের মধ্যে অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মর্যাদা অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়।

এই বিজয় অটোমান সাম্রাজ্যের জনসংখ্যাগত ও সাংস্কৃতিক চরিত্রও বদলে দেয়। আগে সাম্রাজ্যের বড় অংশ ছিল আনাতোলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে। সেখানে বিপুল খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী বাস করত। সেলিমের বিজয়ের পর সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, মিশর ও হিজাজের বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা এবং আরবিভাষী অঞ্চল অটোমান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়।

একই সঙ্গে কায়রো, দামেস্ক, আলেপ্পো ও জেরুজালেমের মতো ঐতিহাসিক নগর অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। এগুলো শুধু অর্থনৈতিক কেন্দ্র ছিল না; ইসলামি শিক্ষা, আইন, ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে অটোমান রাষ্ট্র এখন আর শুধু তুর্কি-আনাতোলীয় ও বলকান ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়ানো সাম্রাজ্য নয়; আরব-মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন নগর ও ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোও তার রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও পরিবর্তন ছিল বিশাল। অটোমান সীমান্ত এখন উত্তর আফ্রিকার দিকে পৌঁছে গেছে, লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং আরব উপদ্বীপের পশ্চিমাংশের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের একটি বিশাল অংশের উপকূল এখন একই সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে। ইস্তাম্বুল থেকে কায়রো, দামেস্ক ও হিজাজ পর্যন্ত বিস্তৃত এই নতুন ভূগোল অটোমানদের সত্যিকার অর্থে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সংযোগস্থলের সাম্রাজ্যে পরিণত করে।

সেলিমের বিজয়ের গতি ছিল বিস্ময়কর। ১৫১২ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথমে তিনি সাফাভিদের বিরুদ্ধে চালদিরানে বিজয় অর্জন করেন, এরপর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে মামলুক রাষ্ট্র ধ্বংস করে সিরিয়া ও মিশর দখল করেন। ১৫১৬ থেকে ১৫১৭ সালের অভিযান অটোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড ও সম্পদ এক লাফে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করে।

তবে এত বিশাল অঞ্চল দখল করার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল শাসনব্যবস্থা। অটোমানরা সব পুরোনো প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেনি। মিশর ও সিরিয়ায় বিদ্যমান প্রশাসনিক, আর্থিক এবং স্থানীয় সামাজিক কাঠামোর অনেক উপাদান নতুন অটোমান ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। এটি ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য—বিজিত অঞ্চলকে সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করার পরিবর্তে কার্যকর পুরোনো কাঠামোকে সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্বের অধীনে ব্যবহার করা।

১৫২০ সালে মাত্র প্রায় আট বছরের শাসনের পর প্রথম সেলিম মারা যান। তার পুত্র সুলেইমান প্রথম এমন একটি সাম্রাজ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পান, যা দ্বিতীয় মেহমেদের সময়ের তুলনায় আরও বৃহৎ, সমৃদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে শক্তিশালী। মিশরের সম্পদ, সিরিয়ার বাণিজ্যপথ, হিজাজের ধর্মীয় মর্যাদা এবং পূর্ব আনাতোলিয়ার নিরাপত্তা সুলেইমানকে পরবর্তী কয়েক দশকে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরে আরও বৃহৎ অভিযান পরিচালনার শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।

দ্বিতীয় মেহমেদ অটোমানদের কনস্টান্টিনোপলকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যিক বিশ্বশক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম সেলিম সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমিকে দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে আমূল সম্প্রসারিত করেন। তার আগে অটোমান রাজনীতির প্রধান অক্ষ ছিল আনাতোলিয়া ও বলকান; তার পরে এর সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় আরব মধ্যপ্রাচ্য, মিশর, হিজাজ ও লোহিত সাগর।

এই কারণেই মামলুক সাম্রাজ্যের পতনকে শুধু আরেকটি অটোমান বিজয় হিসেবে দেখা যায় না। ১৫১৭ সাল অটোমান সাম্রাজ্যের পরিচয় বদলে দেওয়া একটি মৌলিক মোড়। কায়রো দখল তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি বাড়িয়েছিল, সিরিয়া সাম্রাজ্যের পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় যোগাযোগকে একীভূত করেছিল এবং মক্কা-মদিনার ওপর রাজনৈতিক সুরক্ষা অটোমান সুলতানদের মুসলিম বিশ্বের মধ্যে নতুন মর্যাদা দিয়েছিল।

মাত্র কয়েক বছরের অভিযানে প্রথম সেলিম এমন একটি সাম্রাজ্য রেখে যান, যার উত্তরসূরি এখন একই সঙ্গে বলকানের খ্রিষ্টান রাজ্য, ভূমধ্যসাগরের ইউরোপীয় শক্তি, ইরানের সাফাভি সাম্রাজ্য এবং ভারত মহাসাগরে অগ্রসরমান পর্তুগিজ শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। সেলিমের বিজয় তাই শুধু অটোমান সীমান্ত প্রসারিত করেনি—এটি অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় মর্যাদা এবং বৈশ্বিক কৌশলগত দিগন্তকেই স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে