বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নিউইয়র্ক থেকে ট্রেন্টন ও প্রিন্সটন: পরাজয়ের মুখ থেকে জর্জ ওয়াশিংটন যেভাবে আমেরিকান বিপ্লবকে বাঁচিয়েছিলেন

সিরিজ: আমেরিকান বিপ্লব: স্বাধীনতার সংগ্রাম ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম

নিউইয়র্ক থেকে ট্রেন্টন ও প্রিন্সটন: পরাজয়ের মুখ থেকে জর্জ ওয়াশিংটন যেভাবে আমেরিকান বিপ্লবকে বাঁচিয়েছিলেন
পরাজয়ের অন্ধকার থেকে ট্রেন্টন-প্রিন্সটনের প্রত্যাবর্তন

১৭৭৬ সালের গ্রীষ্মে স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণ করার সময় আমেরিকান বিপ্লবীরা এমন এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যার সামরিক মূল্য খুব দ্রুতই তাদের দিতে হয়। কাগজে তেরো উপনিবেশ নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করলেও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখনও ছিল ভয়ংকর শক্তিশালী। ব্রিটেন নিউইয়র্কে বিশাল স্থল ও নৌবাহিনী সমবেত করে বিদ্রোহের কেন্দ্রভাগ ভেঙে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই জর্জ ওয়াশিংটনের কন্টিনেন্টাল আর্মি একের পর এক পরাজয়ের মুখে পড়ে, নিউইয়র্ক হারায় এবং নিউ জার্সি পেরিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ১৭৭৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রশ্নটি আর আমেরিকানরা দ্রুত স্বাধীনতা অর্জন করবে কি না ছিল না; প্রশ্ন ছিল বিপ্লব আদৌ টিকে থাকবে কি না।

নিউইয়র্কের কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। এর গভীর বন্দর ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য আদর্শ ঘাঁটি এবং হাডসন নদীর নিয়ন্ত্রণ নিউ ইংল্যান্ডকে দক্ষিণের উপনিবেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ দিতে পারত। ব্রিটিশ জেনারেল উইলিয়াম হাও এবং তাঁর ভাই অ্যাডমিরাল রিচার্ড হাও ১৭৭৬ সালের গ্রীষ্মে নিউইয়র্ক অঞ্চলে একটি বিশাল অভিযান পরিচালনা করেন। ব্রিটিশ নিয়মিত সৈন্যদের পাশাপাশি জার্মান রাজ্যগুলো থেকে ভাড়া করা হাজার হাজার সৈন্য—যাদের সাধারণভাবে হেসিয়ান বলা হয়—এই বাহিনীতে যুক্ত ছিল।

ওয়াশিংটন নিউইয়র্ক রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু তাঁর বাহিনীর সামনে গুরুতর সীমাবদ্ধতা ছিল। কন্টিনেন্টাল আর্মির অনেক সৈন্য ছিল অনভিজ্ঞ, স্বল্পমেয়াদি নিয়োগে আসা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণবিহীন। ব্রিটিশ বাহিনী বিপরীতে পেশাদার, অভিজ্ঞ এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট। নিউইয়র্কের দ্বীপ, নদী ও জলপথের ভূগোলও ব্রিটিশ নৌক্ষমতাকে বিশাল সুবিধা দিচ্ছিল।

২৭ আগস্ট ১৭৭৬ লং আইল্যান্ডের যুদ্ধে এই অসমতার ভয়াবহ ফল দেখা যায়। ব্রিটিশ বাহিনী আমেরিকান প্রতিরক্ষা অবস্থানের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে বাহিনী ঘুরিয়ে নিয়ে আমেরিকানদের পাশ ও পেছন থেকে আক্রমণ করে। কন্টিনেন্টাল বাহিনী গুরুতর ক্ষতির মুখে ব্রুকলিন হাইটসে আশ্রয় নেয়। ওয়াশিংটনের সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ তখন ইস্ট রিভারের এক পাশে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। ব্রিটিশরা যদি দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলতে পারত, বিপ্লবী সেনাবাহিনীর বিশাল অংশ ধ্বংস বা বন্দী হয়ে যেতে পারত।

এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। ২৯ থেকে ৩০ আগস্টের রাতে সৈন্যদের নীরবে ইস্ট রিভার পার করে ম্যানহাটনে সরিয়ে নেওয়া হয়। ম্যাসাচুসেটসের নাবিকদের পরিচালিত নৌকায় রাতভর সৈন্য, অস্ত্র ও সরঞ্জাম স্থানান্তর করা হয়। ভোরের কুয়াশা শেষ পর্যায়ের প্রত্যাহার আড়াল করতে সাহায্য করে। এটি কোনো যুদ্ধজয় ছিল না, কিন্তু সেনাবাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। ওয়াশিংটনের ১৭৭৬ সালের অভিযানের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এখানেই দেখা যায়—প্রয়োজন হলে ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে সেনাবাহিনীকে বাঁচিয়ে রাখা।

তবু বিপর্যয় থামেনি। সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশরা ম্যানহাটনে অবতরণ করে। হারলেম হাইটসে আমেরিকানরা সীমিত সাফল্য পেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি তাদের বিপক্ষে ছিল। অক্টোবরে হোয়াইট প্লেইনসের যুদ্ধে আবারও ব্রিটিশ চাপের মুখে ওয়াশিংটন পিছিয়ে যান। এরপর ম্যানহাটনের ফোর্ট ওয়াশিংটন ধরে রাখার সিদ্ধান্ত বিপর্যয় ডেকে আনে। ১৬ নভেম্বর ব্রিটিশ ও হেসিয়ান বাহিনী দুর্গটি দখল করে এবং দুই হাজারেরও বেশি আমেরিকান সৈন্য বন্দী হয়। অল্পদিনের মধ্যেই হাডসনের অপর পাশে ফোর্ট লিও ছেড়ে দিতে হয়।

নিউইয়র্ক অভিযান কার্যত ব্রিটিশদের বড় সাফল্যে পরিণত হয়। এবার জেনারেল চার্লস কর্নওয়ালিস ওয়াশিংটনের পিছু নিয়ে নিউ জার্সির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন। কন্টিনেন্টাল আর্মি একের পর এক অবস্থান ছেড়ে পশ্চিমে সরে যায়। সৈন্যদের পোশাক ও জুতার অভাব, অসুস্থতা, পালিয়ে যাওয়া এবং নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার সমস্যা ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। ডিসেম্বরের শুরুতে ওয়াশিংটন তাঁর অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে ডেলাওয়্যার নদী পার হয়ে পেনসিলভানিয়ায় আশ্রয় নেন।

পরিস্থিতির মনস্তাত্ত্বিক দিকও ছিল অত্যন্ত গুরুতর। নিউইয়র্ক হারিয়ে গেছে, নিউ জার্সির বড় অংশ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে, বহু সৈন্য বন্দী এবং কন্টিনেন্টাল আর্মির সদস্যসংখ্যা দ্রুত কমছে। অনেকের নিয়োগের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। বিপ্লবের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও দুর্বল হচ্ছিল। ব্রিটিশরা বিদ্রোহীদের ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়ে আনুগত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ দিলে নিউ জার্সির বহু মানুষ সেই সুযোগ গ্রহণ করে।

এই অন্ধকার সময়েই থমাস পেইন আবার তাঁর লেখনী ব্যবহার করেন। ১৭৭৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত দ্য আমেরিকান ক্রাইসিস-এর প্রথম অংশ শুরু হয় এমন এক বিখ্যাত ভাবনা দিয়ে—এমন সময় মানুষের আত্মাকে পরীক্ষা করে। লেখাটি সৈন্য ও সাধারণ জনগণের মনোবল পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। ওয়াশিংটনের বাহিনীর সামনে তখন শুধু ব্রিটিশ সেনাবাহিনী নয়, সময়ও শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ওয়াশিংটন বুঝতে পারেন, শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি বদলানো যাবে না। তাঁর এমন একটি বিজয় দরকার যা সামরিকভাবে সীমিত হলেও রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপ্লবকে পুনরুজ্জীবিত করবে। লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয় নিউ জার্সির ট্রেন্টন, যেখানে কর্নেল ইয়োহান রালের নেতৃত্বে প্রায় ১,৪০০ হেসিয়ান সৈন্য অবস্থান করছিল।

পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২৫ ডিসেম্বর ১৭৭৬, বড়দিনের রাতে ওয়াশিংটনের বাহিনীকে বরফে ভরা ডেলাওয়্যার নদী পার হতে হবে এবং ভোরে ট্রেন্টনে আকস্মিক আক্রমণ চালাতে হবে। আরও কয়েকটি আমেরিকান বাহিনীর অন্য স্থান দিয়ে নদী পার হয়ে অভিযানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রবল শীত, তুষার, বরফ ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে মূল বাহিনী ছাড়া অন্য পরিকল্পিত পারাপারগুলোর অধিকাংশ সফল হয়নি।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রায় ২,৪০০ সৈন্য নদী পার হয়। ভারী কামানও নৌকায় বহন করা হয়। জনপ্রিয় চিত্রকলায় এই পারাপারকে কখনো শান্ত ও বীরত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে দেখানো হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ—বরফের টুকরো, তীব্র বাতাস, তুষার ও শীতের মধ্যে রাতভর অভিযান। পারাপার প্রত্যাশার চেয়ে দেরিতে শেষ হয়। তারপরও ওয়াশিংটন অভিযান বাতিল করেননি।

২৬ ডিসেম্বর সকালে কন্টিনেন্টাল বাহিনী দুই দিক থেকে ট্রেন্টনে আক্রমণ করে। হেসিয়ানরা সম্পূর্ণ যুদ্ধক্ষমতাহীন মাতাল অবস্থায় ছিল—এমন জনপ্রিয় গল্প ঐতিহাসিকভাবে অতিরঞ্জিত। তারা উৎসবের সময়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু আমেরিকান সাফল্যের প্রধান কারণ ছিল আকস্মিকতা, আবহাওয়া, কার্যকর পরিকল্পনা এবং দ্রুত আক্রমণ। হেসিয়ানরা প্রতিরোধের চেষ্টা করে, কিন্তু আমেরিকান কামান ও পদাতিক আক্রমণে তাদের সংগঠন ভেঙে পড়ে। কর্নেল রাল মারাত্মকভাবে আহত হন।

ট্রেন্টনের প্রথম যুদ্ধে প্রায় ৯০০ হেসিয়ান সৈন্য বন্দী হয়। বিপুল অস্ত্র ও সরঞ্জামও আমেরিকানদের হাতে আসে। ওয়াশিংটনের বাহিনী তুলনামূলক সামান্য যুদ্ধক্ষয় নিয়ে ডেলাওয়্যারের পশ্চিম তীরে ফিরে যায়। সামরিক দৃষ্টিতে এটি বিশাল ব্রিটিশ বাহিনী ধ্বংসের ঘটনা ছিল না। কিন্তু বিপ্লবের মনোবলের ওপর এর প্রভাব ছিল অসাধারণ। কয়েক মাস ধরে শুধু পরাজয় ও পশ্চাদপসরণ দেখা সৈন্য ও জনগণ প্রথমবার উপলব্ধি করল যে ব্রিটিশ সামরিক ব্যবস্থার একটি অংশকে পরিকল্পিত আক্রমণে পরাজিত করা সম্ভব।

ওয়াশিংটন এখানেই থামেননি। তিনি আবার নিউ জার্সিতে প্রবেশ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ট্রেন্টনের সাফল্যকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে না দেওয়া। ২ জানুয়ারি ১৭৭৭ কর্নওয়ালিসের বাহিনী ট্রেন্টনের কাছে এসে ওয়াশিংটনের অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। অ্যাসানপিঙ্ক ক্রিকের সেতুর কাছে আমেরিকানরা একাধিক ব্রিটিশ আক্রমণ প্রতিহত করে। রাত নামলে কর্নওয়ালিস পরদিন সকালে চূড়ান্ত আক্রমণ করে ওয়াশিংটনকে পরাজিত করার আশা করেন।

ওয়াশিংটনের সামনে আবারও ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সামনে শক্তিশালী ব্রিটিশ বাহিনী, পেছনে ডেলাওয়্যার নদী। কিন্তু সরাসরি অপেক্ষা করার বদলে তিনি আরেকটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। রাতে শিবিরে আগুন জ্বালিয়ে এবং কিছু লোককে শব্দ তৈরি করতে রেখে মূল বাহিনীকে নিঃশব্দে ব্রিটিশদের পাশ কাটিয়ে প্রিন্সটনের দিকে নিয়ে যান। কর্নওয়ালিস সকালে বুঝতে পারেন তাঁর প্রতিপক্ষ আর সামনে নেই।

৩ জানুয়ারি ১৭৭৭ প্রিন্সটনের কাছে আমেরিকানদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউ মার্সারের বাহিনী কঠিন আঘাতের মুখে পড়ে এবং মার্সার মারাত্মকভাবে আহত হন। আমেরিকান সৈন্যদের একটি অংশ পিছিয়ে যেতে শুরু করে। এই সংকটময় মুহূর্তে ওয়াশিংটন নিজে সামনে এগিয়ে সৈন্যদের পুনর্গঠিত করেন এবং নতুন আক্রমণে নেতৃত্ব দেন।

প্রিন্সটনের যুদ্ধ বিশাল ছিল না, কিন্তু ফল আবারও আমেরিকানদের পক্ষে যায়। ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটে এবং ওয়াশিংটন দ্রুত এলাকা ছেড়ে নিউ জার্সির উত্তরাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। তাঁর বাহিনী পরে মরিস্টাউনের নিরাপদ অঞ্চলে শীতকালীন অবস্থান নেয়। ট্রেন্টন ও প্রিন্সটনের পর নিউ জার্সিতে ব্রিটিশদের বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের অনেক ছোট অগ্রবর্তী ঘাঁটি ত্যাগ করতে হয়।

এই কয়েক সপ্তাহে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। তিনি নিউইয়র্কে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বড় যুদ্ধে বারবার সমস্যায় পড়েছিলেন। কিন্তু ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে তিনি গতিশীলতা, আকস্মিক আক্রমণ, গোয়েন্দা তথ্য, রাতের অভিযান এবং শত্রুর বিচ্ছিন্ন অবস্থানের বিরুদ্ধে সীমিত শক্তি কেন্দ্রীভূত করার কৌশল অনেক কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন। তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন যে আমেরিকানদের প্রতিটি শহর বা ভূখণ্ড ধরে রাখার প্রয়োজন নেই; প্রধান বিষয় হলো কন্টিনেন্টাল আর্মিকে বাঁচিয়ে রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া।

এটাই তাঁর বৃহত্তর কৌশলের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ব্রিটিশদের কাছে শহর দখল করার সামর্থ্য ছিল, কিন্তু বিদ্রোহ শেষ করতে হলে ওয়াশিংটনের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করতে হতো। যতদিন কন্টিনেন্টাল আর্মি টিকে থাকবে, ততদিন কংগ্রেসের স্বাধীনতার দাবি সামরিকভাবে জীবিত থাকবে। ফলে ওয়াশিংটনের অনেক পশ্চাদপসরণকে শুধু পরাজয় হিসেবে বিচার করলে তাঁর কৌশলের মূল বিষয়টি বোঝা যায় না।

ট্রেন্টন ও প্রিন্সটনের সাফল্য আমেরিকানদের সব সমস্যার সমাধান করেনি। সৈন্যসংকট, অর্থাভাব, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ব্রিটিশ সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব তখনও বাস্তব ছিল। নিউইয়র্কও ব্রিটিশদের হাতেই থেকে যায় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সেটি তাদের প্রধান সামরিক ঘাঁটির একটি হবে। কিন্তু ১৭৭৬ সালের ডিসেম্বরের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানো গিয়েছিল। নতুন সৈন্য নিয়োগ, জনসমর্থন এবং বিপ্লবের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য এই সাফল্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিউইয়র্ক থেকে ট্রেন্টন ও প্রিন্সটনের অভিযান তাই শুধুই তিনটি যুদ্ধের ধারাবাহিক ইতিহাস নয়। এটি দেখায় কীভাবে একটি বিপ্লব সামরিকভাবে প্রায় ভেঙে পড়েও নেতৃত্ব, ঝুঁকি গ্রহণ এবং কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। আগস্ট ১৭৭৬-এ ওয়াশিংটন নিউইয়র্কে পরাজিত সেনাপতি; ডিসেম্বরের শুরুতে তিনি নিউ জার্সি ছেড়ে পালাতে থাকা একটি ভেঙে পড়া বাহিনীর নেতা; কিন্তু জানুয়ারি ১৭৭৭ নাগাদ তিনিই আবার ব্রিটিশদের কৌশলগত উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ করা সেনাপতি।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছিল মানুষের মনে। স্বাধীনতার ঘোষণা কাগজে নতুন রাষ্ট্রের দাবি প্রতিষ্ঠা করেছিল, কিন্তু সেই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধক্ষেত্রে বিশ্বাস ধরে রাখা জরুরি ছিল। ট্রেন্টনের বরফাচ্ছন্ন রাত এবং প্রিন্সটনের সাহসী অভিযান আমেরিকানদের সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে তখনও পরাজিত করেননি; কিন্তু তিনি আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি কাজ করেছিলেন—১৭৭৬ সালের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তে তিনি কন্টিনেন্টাল আর্মিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এমন দুটি বিজয় এনে দিয়েছিলেন, যা আমেরিকান বিপ্লবকে বেঁচে থাকার সময় ও সাহস দুটোই দিয়েছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে