বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

WOW! সংকেত: মহাকাশ থেকে আসা রহস্যময় ৭২ সেকেন্ডের সংকেতটির উৎস কী ছিল?

  • Author: Admin
  • August 29, 2026
WOW! সংকেত: মহাকাশ থেকে আসা রহস্যময় ৭২ সেকেন্ডের সংকেতটির উৎস কী ছিল?
মহাকাশের নীরবতায় ধরা পড়া রহস্যময় ৭২ সেকেন্ড

১৯৭৭ সালের ১৫ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে একটি বিশাল বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিঃশব্দে আকাশ পর্যবেক্ষণ করছিল। তার কাজ ছিল মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এসে পৌঁছানো অত্যন্ত দুর্বল বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করা। প্রতিদিন অসংখ্য সংকেত ধরা পড়ত—কখনো পরিচিত মহাজাগতিক উৎস থেকে, কখনো পৃথিবীর মানুষের তৈরি বেতার ব্যবস্থার কারণে, আবার কখনো এমন উৎস থেকে যার পরিচয় নির্ধারণ করতে কিছুটা সময় লাগত। কিন্তু সেদিন একটি সংকেত ধরা পড়েছিল, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে রাখবে। সংকেতটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে পরে সেটিই পরিচিত হয়ে ওঠে “WOW! সংকেত” নামে।

এই সংকেতের রহস্য বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে সেটি কীভাবে ধরা পড়েছিল। ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগ ইয়ার নামের বিশাল বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তখন মহাকাশে সম্ভাব্য বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধানে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সাধারণ আলোক দূরবীক্ষণ যন্ত্র যেখানে নক্ষত্র ও ছায়াপথ থেকে আসা আলো পর্যবেক্ষণ করে, সেখানে বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র মহাকাশ থেকে আসা বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করে। নক্ষত্র, গ্যাসমেঘ, বিস্ফোরিত নক্ষত্র এবং বহু মহাজাগতিক বস্তু স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ তৈরি করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে এমন সংকেত খুঁজছিলেন, যা প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বিকিরণের তুলনায় অত্যন্ত সংকীর্ণ কম্পাঙ্কসীমায় কেন্দ্রীভূত।

সেদিন দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়া সংকেতটির তথ্য কম্পিউটার কাগজে মুদ্রিত হয়েছিল। কয়েক দিন পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরি এহম্যান তথ্যগুলো পরীক্ষা করার সময় একটি অস্বাভাবিক ক্রম দেখতে পান—“6EQUJ5”। এই ছয়টি চিহ্ন কোনো গোপন বার্তা ছিল না। এগুলো সংকেতটির বিভিন্ন মুহূর্তে আপেক্ষিক তীব্রতার প্রতিনিধিত্ব করছিল। কিন্তু সংখ্যাগুলো দেখে এহম্যান এতটাই বিস্মিত হয়েছিলেন যে তিনি লাল কলম দিয়ে ওই অংশটি ঘিরে পাশে লিখেছিলেন—“Wow!”। সেখান থেকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত রহস্যময় বেতার সংকেতগুলোর একটির নাম হয়ে যায় WOW! সংকেত।

সংকেতটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল এর তীব্রতার পরিবর্তন। এটি হঠাৎ সর্বোচ্চ শক্তিতে উপস্থিত হয়ে আবার হঠাৎ অদৃশ্য হয়নি। বরং দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে আকাশের একটি নির্দিষ্ট উৎস অতিক্রম করলে যে ধরনের তীব্রতার বৃদ্ধি ও পতন প্রত্যাশিত, সংকেতটি অনেকটা সেই ধরন অনুসরণ করেছিল। পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে আকাশের কোনো স্থির মহাজাগতিক উৎস বিগ ইয়ারের গ্রহণক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করলে সেটিকে সীমিত সময়ের জন্য দেখা যেত। সেই সময় ছিল প্রায় ৭২ সেকেন্ড। WOW! সংকেতটিও ঠিক এত সময় ধরে ধরা পড়েছিল।

এই ৭২ সেকেন্ড তাই রহস্যটির কেন্দ্রে রয়েছে। এটি এমন নয় যে অজানা কোনো উৎস ঠিক ৭২ সেকেন্ড ধরে বার্তা পাঠিয়েছিল এবং তারপর বন্ধ করে দিয়েছিল। বরং বিগ ইয়ার যেভাবে আকাশ পর্যবেক্ষণ করত, তার কারণে একটি স্থির উৎসকে সর্বোচ্চ প্রায় ওই সময় পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব ছিল। ফলে প্রকৃত উৎসটি আরও দীর্ঘ সময় ধরে সংকেত পাঠিয়ে থাকতে পারে। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দৃষ্টিক্ষেত্র সরে যাওয়ার পর সেটি আর ধরা পড়েনি। এই বিষয়টি সংকেতটিকে পৃথিবীর কাছাকাছি কোনো ক্ষণস্থায়ী গোলযোগের পরিবর্তে আকাশের একটি নির্দিষ্ট দিক থেকে আসা সংকেত হিসেবে বিবেচনা করার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

আরও বিস্ময়কর ছিল সংকেতটির কম্পাঙ্ক। এটি প্রায় ১৪২০ মেগাহার্টজের কাছাকাছি, অর্থাৎ মহাবিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ মৌল হাইড্রোজেনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিখ্যাত বেতার কম্পাঙ্কের খুব কাছাকাছি ধরা পড়েছিল। নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন পরমাণু প্রায় ২১ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে যে বিকিরণ সৃষ্টি করে, তা বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাবিশ্বে হাইড্রোজেনের বিপুল উপস্থিতির কারণে বহু বিজ্ঞানী দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করেছিলেন, কোনো উন্নত সভ্যতা যদি আন্তঃনাক্ষত্রিক যোগাযোগের জন্য একটি সর্বজনীনভাবে অর্থবহ কম্পাঙ্ক বেছে নিতে চায়, তবে হাইড্রোজেনের এই স্বাভাবিক কম্পাঙ্কের আশপাশ একটি যৌক্তিক স্থান হতে পারে।

কিন্তু এখানেই সতর্ক হওয়া জরুরি। কোনো সংকেত হাইড্রোজেন রেখার কাছাকাছি পাওয়া গেলেই সেটি ভিনগ্রহী সভ্যতার তৈরি হয়ে যায় না। মহাবিশ্ব নিজেই বেতার তরঙ্গে পূর্ণ। আবার মানুষের প্রযুক্তিও বিপুল পরিমাণ বেতার বিকিরণ তৈরি করে। বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো অজানা সংকেতকে কৃত্রিম বহির্জাগতিক বার্তা হিসেবে বিবেচনা করার আগে পৃথিবীর বেতার যোগাযোগ, উপগ্রহ, বিমান, সামরিক ব্যবস্থা, যন্ত্রের ত্রুটি, প্রতিফলিত সংকেত এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক মহাজাগতিক উৎস বাদ দিতে হয়।

WOW! সংকেতের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে যায় এর অত্যন্ত সংকীর্ণ কম্পাঙ্কসীমার কারণে। প্রাকৃতিক মহাজাগতিক উৎস সাধারণত তুলনামূলক বিস্তৃত কম্পাঙ্কজুড়ে শক্তি বিকিরণ করে। অত্যন্ত সংকীর্ণ একটি কম্পাঙ্কে শক্তিশালী সংকেত প্রযুক্তিগত উৎসের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। মানুষের তৈরি বেতার প্রেরক ঠিক এভাবেই নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে পারে। এ কারণেই বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধানে সংকীর্ণ কম্পাঙ্কের বেতার সংকেত বিশেষ গুরুত্ব পায়।

সংকেতটি আকাশের ধনু নক্ষত্রমণ্ডলের দিক থেকে এসেছিল বলে নির্ধারণ করা হয়। এই দিকটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ ধনু নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে তাকালে আমরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘন নাক্ষত্রিক অঞ্চলের দিকে তাকাই। তবে WOW! সংকেতের অবস্থান এত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি যে একটি নির্দিষ্ট নক্ষত্রকে নিশ্চিত উৎস বলা যায়। বিগ ইয়ারের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার কারণে আকাশে সম্ভাব্য উৎসের একাধিক অবস্থান বিবেচনায় আসে।

রহস্যটি আরও গভীর করে বিগ ইয়ারের দুটি পৃথক গ্রহণক্ষেত্র। আকাশের একই অঞ্চল পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে প্রথম গ্রহণক্ষেত্র অতিক্রম করার কয়েক মিনিট পরে দ্বিতীয়টির মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু WOW! সংকেতটি শুধু একটিতেই দেখা গিয়েছিল। যদি কোনো উৎস দীর্ঘ সময় ধরে একটানা সংকেত পাঠিয়ে থাকে, তাহলে দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণেও সেটি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সেটি না পাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে উৎসটি হয়তো ক্ষণস্থায়ী ছিল, সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল, অথবা অন্য কোনো জটিল কারণ কাজ করেছিল।

তারপর শুরু হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ—সংকেতটিকে আবার খুঁজে বের করার চেষ্টা।

বিজ্ঞানীরা একই অঞ্চলে বহুবার অনুসন্ধান চালিয়েছেন। বিগ ইয়ার নিজেও পরবর্তী সময়ে সেই দিক পর্যবেক্ষণ করেছে। আরও সংবেদনশীল বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেও অনুসন্ধান হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৭ সালের সেই অস্বাভাবিক সংকেত আর কখনো একইভাবে ফিরে আসেনি। বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এটিই WOW! সংকেতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। একটি ঘটনা যতই বিস্ময়কর হোক, সেটি যদি পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা না যায়, তাহলে তার প্রকৃতি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন।

তাহলে কি এটি পৃথিবীর মানুষের তৈরি কোনো সংকেত ছিল? এটি প্রথম থেকেই গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাবনা। কোনো দূরবর্তী বেতার প্রেরণ, সামরিক যোগাযোগ, উপগ্রহ অথবা পৃথিবীর কোনো সংকেত মহাকাশের কোনো বস্তুর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সংকেতটির কম্পাঙ্ক, তীব্রতার পরিবর্তনের ধরন এবং পর্যবেক্ষণের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সহজ কোনো পার্থিব ব্যাখ্যা পুরোপুরি মেলানো যায়নি। সেই সময় ওই কম্পাঙ্কের আশপাশের অঞ্চল বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিতও ছিল। ফলে সাধারণ পার্থিব প্রেরণকে সরলভাবে দায়ী করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেকটি ধারণা হলো, এটি কোনো অজানা বা বিরল প্রাকৃতিক মহাজাগতিক ঘটনা হতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে প্রথমে অস্বাভাবিক বেতার সংকেত দেখে কৃত্রিম উৎসের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু পরে নতুন ধরনের প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্র থেকে আসা অত্যন্ত নিয়মিত বেতার স্পন্দন প্রথম আবিষ্কৃত হওয়ার সময়ও সেটির প্রকৃতি নিয়ে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছিল। পরে বোঝা যায় এগুলো পালসার নামের প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বস্তু।

WOW! সংকেতের জন্যও তাই অজানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে বাদ দেওয়া যায় না। কিন্তু সমস্যা হলো, পরিচিত অধিকাংশ মহাজাগতিক উৎস থেকে এমন শক্তিশালী এবং এত সংকীর্ণ কম্পাঙ্কের ক্ষণস্থায়ী সংকেত তৈরি হওয়া সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। যদি কোনো বিরল মহাজাগতিক প্রক্রিয়া এর জন্য দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়াটি ঠিক কী ছিল—সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।

একসময় ধূমকেতু এবং তার চারপাশের হাইড্রোজেন মেঘ দিয়ে WOW! সংকেত ব্যাখ্যা করার একটি ধারণা আলোচনায় আসে। যুক্তি ছিল, ১৯৭৭ সালে ওই আকাশ অঞ্চলের কাছাকাছি দিয়ে অতিক্রম করা কোনো ধূমকেতুর হাইড্রোজেন মেঘ ১৪২০ মেগাহার্টজের কাছাকাছি বেতার বিকিরণের উৎস হতে পারে। ধারণাটি আকর্ষণীয় হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলে এটি সর্বজনস্বীকৃত ব্যাখ্যায় পরিণত হয়নি। প্রধান প্রশ্ন হলো, একটি ধূমকেতুর বিস্তৃত হাইড্রোজেন মেঘ কীভাবে WOW! সংকেতের মতো এত শক্তিশালী ও সংকীর্ণ বৈশিষ্ট্যের সংকেত তৈরি করবে। ফলে ধূমকেতু তত্ত্ব রহস্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলেও চূড়ান্ত সমাধান নয়

আরও সাম্প্রতিক আলোচনায় আন্তঃনাক্ষত্রিক হাইড্রোজেন মেঘের সঙ্গে কোনো অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষণস্থায়ী মহাজাগতিক ঘটনার পারস্পরিক ক্রিয়ার সম্ভাবনাও উত্থাপিত হয়েছে। এমন ধারণায় কাছাকাছি কোনো শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ বা চৌম্বকীয়ভাবে সক্রিয় নিউট্রন নক্ষত্রের শক্তি হাইড্রোজেন মেঘকে সাময়িকভাবে উদ্দীপ্ত করে অস্বাভাবিক বেতার বিকিরণ তৈরি করতে পারে। এই ধরনের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একই সঙ্গে হাইড্রোজেন কম্পাঙ্কের কাছাকাছি সংকেত এবং এর ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটিও এমনভাবে প্রমাণিত হয়নি যে WOW! রহস্যকে সমাধান হয়ে গেছে বলা যায়।

অবশ্য মানুষের কল্পনাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্ভাবনা—এটি কি কোনো বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান সভ্যতার তৈরি সংকেত ছিল?

তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়। কোনো দূরবর্তী সভ্যতা যদি শক্তিশালী সংকীর্ণ কম্পাঙ্কের বেতার প্রেরক ব্যবহার করে থাকে এবং সেই বিকিরণ পৃথিবীর দিকে এসে থাকে, তাহলে আমাদের বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্রে এমন সংকেত ধরা পড়তে পারে। বিশেষ করে হাইড্রোজেন রেখার কাছাকাছি কম্পাঙ্ক নির্বাচন এবং সংকেতটির সংকীর্ণ প্রকৃতি এই ধারণাকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

কিন্তু “ভিনগ্রহী সভ্যতার সংকেত হতে পারে” এবং “ভিনগ্রহী সভ্যতার সংকেত ছিল”—এই দুটি বক্তব্যের মধ্যে বিশাল বৈজ্ঞানিক পার্থক্য রয়েছে। WOW! সংকেতের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দাবিটির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। সংকেতের মধ্যে কোনো ভাষা, সংখ্যা, পুনরাবৃত্ত নকশা বা তথ্যবাহী বিন্যাস শনাক্ত করা যায়নি। বিখ্যাত “6EQUJ5” নিজেও ভিনগ্রহীদের পাঠানো কোনো লেখা নয়; সেটি পৃথিবীর কম্পিউটার ব্যবস্থায় সংকেতের তীব্রতা প্রকাশের পদ্ধতি মাত্র।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো পুনরাবৃত্তির অভাব। কোনো সভ্যতা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মহাকাশে নিজের অস্তিত্ব জানানোর জন্য সংকেত পাঠায়, তাহলে সেটি বারবার পাঠানো যুক্তিসংগত। তবে এখানেও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তারা হয়তো পৃথিবীর দিকে লক্ষ্য করে সংকেত পাঠাচ্ছিল না; আমরা তাদের কোনো সংকীর্ণ রশ্মির মধ্য দিয়ে মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য অতিক্রম করেছি। তাদের গ্রহের ঘূর্ণন, প্রেরক যন্ত্রের দিক পরিবর্তন অথবা ক্ষণস্থায়ী প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের কারণেও সংকেতটি একবারই আমাদের দিকে আসতে পারে। এসব সম্ভাবনা কল্পনাযোগ্য হলেও প্রমাণিত নয়।

WOW! সংকেতের রহস্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ৭২ সেকেন্ডের সীমাবদ্ধতা আমাদের যন্ত্রের ছিল, উৎসের নয়। ফলে আমরা সংকেতটির শুরু বা প্রকৃত শেষ দেখিনি। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের গ্রহণক্ষেত্রে প্রবেশ করার সময় সেটি ইতিমধ্যে সক্রিয় থাকতে পারে এবং বেরিয়ে যাওয়ার পরও চলতে পারে। আবার এটি সত্যিই অল্প সময়ের কোনো বিস্ফোরণধর্মী ঘটনা হয়ে থাকতে পারে। একটি মাত্র পর্যবেক্ষণ থেকে এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হয়নি।

এই ঘটনা আধুনিক বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তা অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও দিয়েছে। এখন কোনো সম্ভাব্য কৃত্রিম সংকেত পাওয়া গেলে বিজ্ঞানীরা দ্রুত অন্য দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে একই উৎস পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেন। সংকেতটি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে একই আকাশীয় অবস্থানে পাওয়া যাচ্ছে কি না, তার কম্পাঙ্ক সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, পৃথিবী ও উৎসের আপেক্ষিক গতির কারণে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না এবং একই সংকেত পুনরায় ফিরে আসছে কি না—এসব বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। WOW! সংকেতের সময় এমন দ্রুত ও সমন্বিত বৈশ্বিক যাচাইয়ের সুযোগ ছিল অনেক সীমিত।

ঘটনার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও WOW! সংকেতের গুরুত্ব তাই শুধু “ভিনগ্রহীর সম্ভাব্য বার্তা” হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সমস্যার অসাধারণ উদাহরণ—একটি মাত্র অস্বাভাবিক পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা কতটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি? সংকেতটির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য প্রযুক্তিগত উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আবার সেটিকে বহির্জাগতিক প্রযুক্তির ফল বলে প্রমাণ করার মতো তথ্য নেই। একইভাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা প্রস্তাব করা হলেও কোনোটিই এখন পর্যন্ত সন্দেহাতীতভাবে ঘটনাটির প্রতিটি বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

সম্ভবত একদিন আমরা এমন কোনো প্রাকৃতিক মহাজাগতিক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করব, যা ১৯৭৭ সালের ঘটনাটিকে সহজেই ব্যাখ্যা করবে। হয়তো কোনো বিরল হাইড্রোজেন-সম্পর্কিত বেতার বিস্ফোরণ, কোনো অজানা নাক্ষত্রিক ঘটনা অথবা পৃথিবীর প্রযুক্তির এমন কোনো প্রভাব সামনে আসবে যা এতদিন শনাক্ত করা যায়নি। আবার এমন সম্ভাবনাও বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি যে সেদিন বিগ ইয়ার সত্যিই কোনো দূরবর্তী প্রযুক্তিগত সভ্যতার ক্ষণস্থায়ী বেতার নির্গমন ধরে ফেলেছিল।

কিন্তু বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে সবচেয়ে নির্ভুল উত্তর হলো—আমরা এখনো জানি না WOW! সংকেতটির প্রকৃত উৎস কী ছিল।

আর সম্ভবত এই “জানি না” কথাটিই ঘটনাটিকে এত অসাধারণ করে তুলেছে। ১৯৭৭ সালের সেই আগস্টের রাতে পৃথিবীর একটি বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র মাত্র ৭২ সেকেন্ডের জন্য এমন কিছু শুনেছিল, যা পরিচিত ব্যাখ্যার কোনো একটিতে নিশ্চিতভাবে বন্দী করা যায়নি। তারপর সেটি হারিয়ে যায়। আর কখনো ঠিক একইভাবে ফিরে আসেনি।

মহাবিশ্বের অসংখ্য নক্ষত্রের মধ্যে কোথাও যদি সত্যিই প্রযুক্তিনির্ভর অন্য কোনো সভ্যতা থাকে, তাহলে তাদের অস্তিত্বের প্রথম প্রমাণ হয়তো কোনো মহাকাশযান হবে না, কোনো দৃশ্যমান আলোকবিন্দুও হবে না। সেটি হতে পারে অত্যন্ত ক্ষীণ একটি বেতার সংকেত—যা অন্ধকার আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্য পেরিয়ে কোনো একদিন পৃথিবীর যন্ত্রে এসে পৌঁছাবে। WOW! সংকেত সেই প্রমাণ ছিল কি না আমরা জানি না। কিন্তু ৭২ সেকেন্ডের সেই রহস্যময় ঘটনা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মহাকাশের নীরবতা মানেই সেখানে শোনার মতো কিছু নেই, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আসেনি।