বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নতুন অর্থনৈতিক নীতি ১৯২১: কমিউনিজম থেকে লেনিনের সাময়িক পিছু হটার ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 18, 2026
নতুন অর্থনৈতিক নীতি ১৯২১: কমিউনিজম থেকে লেনিনের সাময়িক পিছু হটার ইতিহাস
নতুন অর্থনৈতিক নীতি ১৯২১

১৯২১ সালের বসন্তে বলশেভিক নেতৃত্ব এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, যা ১৯১৭ সালের বিপ্লবের সময় তাদের কল্পিত সমাজতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সঙ্গে খুব কমই মিলত। রাশিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত, শিল্প উৎপাদন ভেঙে পড়েছে, পরিবহনব্যবস্থা অচলপ্রায়, শহরগুলো খাদ্যসংকটে জর্জরিত এবং গ্রামাঞ্চলে সরকারের বিরুদ্ধে কৃষকদের ক্ষোভ ক্রমেই বিস্ফোরক হয়ে উঠছিল। বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে সফল হলেও বলশেভিকরা বুঝতে পারছিল, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন না করলে রাজনৈতিক ক্ষমতাও বিপন্ন হতে পারে। এই সংকট থেকেই জন্ম নেয় লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি, যা সংক্ষেপে ‘নেপ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

নতুন অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য ছিল এর আপাত বৈপরীত্য। যে বলশেভিকরা ব্যক্তিগত মালিকানা, বাজারভিত্তিক বাণিজ্য এবং পুঁজিবাদী মুনাফার বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছিল, তারাই এখন সীমিত পরিসরে এসব ব্যবস্থাকে আবার অনুমোদন করল। লেনিন নিজেও এটিকে সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য থেকে একটি সাময়িক পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সম্পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ার আগে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশটির উৎপাদনশক্তি পুনরুদ্ধার করা জরুরি। অর্থনীতি যদি টিকে না থাকে, তবে বিপ্লবের রাজনৈতিক অর্জনও টিকবে না।

এই পরিবর্তনের পেছনের পরিস্থিতি বুঝতে হলে ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সালের গৃহযুদ্ধের সময়কার ‘যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ’-এর দিকে তাকাতে হয়। বলশেভিক সরকার তখন লাল ফৌজকে খাদ্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ এবং শহরের শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়, ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং কৃষকদের কাছ থেকে রাষ্ট্র নির্ধারিত পদ্ধতিতে শস্য সংগ্রহ করা হতে থাকে।

সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল কৃষকদের উদ্বৃত্ত শস্য জোরপূর্বক সংগ্রহ। সরকারি সংগ্রহকারী দল গ্রামে গিয়ে নির্ধারিত পরিমাণ শস্য নিয়ে আসত। এর উদ্দেশ্য ছিল শহর ও সেনাবাহিনীর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু কৃষকের দৃষ্টিতে এর অর্থ ছিল উৎপাদন বাড়ানোর প্রেরণা হারিয়ে ফেলা। নিজের পরিবারের প্রয়োজনের অতিরিক্ত শস্য উৎপাদন করলে সেটি যদি রাষ্ট্র নিয়ে যায়, তবে অতিরিক্ত উৎপাদনের অর্থনৈতিক কারণই থাকে না। অনেক কৃষক তাই উৎপাদন কমিয়ে দেন, শস্য লুকিয়ে রাখেন অথবা সরকারি সংগ্রহকারীদের প্রতিরোধ করেন।

একই সময়ে শিল্পক্ষেত্রেও বিপর্যয় নেমে আসে। যুদ্ধ, কাঁচামালের অভাব, পরিবহন সংকট, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় বহু কারখানার উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমে যায়। মুদ্রার মূল্য এত দ্রুত কমছিল যে অনেক ক্ষেত্রে অর্থের পরিবর্তে সরাসরি পণ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শহরের শ্রমিকেরা খাদ্যের সন্ধানে গ্রামে ফিরে যেতে শুরু করেন। যে নগর শ্রমিকশ্রেণিকে বলশেভিক বিপ্লবের সামাজিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই শ্রেণিই সংখ্যায় সংকুচিত হতে থাকে।

১৯২০ সালের শেষ এবং ১৯২১ সালের শুরুতে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। তামবভ অঞ্চলের বিদ্রোহ বিশেষভাবে গুরুতর ছিল। কৃষকেরা শুধু খাদ্যসংগ্রহের বিরুদ্ধে নয়, বলশেভিক রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেও অস্ত্র তুলে নেয়। সরকারকে বিদ্রোহ দমনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে কৃষকদের সঙ্গে বলশেভিক সরকারের সম্পর্ক ভেঙে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এরপর আসে ক্রনশ্টাট বিদ্রোহ। ১৯২১ সালের মার্চে পেত্রোগ্রাদের কাছে ক্রনশ্টাট নৌঘাঁটির নাবিকেরা বলশেভিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ এই নাবিকদের একটি অংশ ১৯১৭ সালের বিপ্লবে বলশেভিকদের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের বিদ্রোহ লেনিন ও বলশেভিক নেতৃত্বের কাছে এক ভয়াবহ সতর্কসংকেত হয়ে ওঠে। বিদ্রোহ সামরিকভাবে দমন করা হলেও এর রাজনৈতিক বার্তা উপেক্ষা করা কঠিন ছিল।

ঠিক এই সংকটময় সময়ে ১৯২১ সালের মার্চে বলশেভিক দলের দশম কংগ্রেসে লেনিন নতুন অর্থনৈতিক নীতি সামনে আনেন। পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কৃষি। জোরপূর্বক উদ্বৃত্ত শস্য সংগ্রহের ব্যবস্থা বাতিল করে শস্যের ওপর নির্দিষ্ট কর আরোপ করা হয়। কৃষক রাষ্ট্রকে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট উৎপাদন নিজের কাছে রাখতে এবং বাজারে বিক্রি করতে পারত। এর ফলে বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কৃষকের কাছে অতিরিক্ত উৎপাদনের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রণোদনা ফিরে আসে।

এই পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক সংস্কার ছিল না; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির কার্যপ্রণালিকাই বদলে দেয়। আগে বেশি শস্য উৎপাদন করলে কৃষকের উদ্বৃত্ত রাষ্ট্র নিয়ে যেতে পারত। এখন বেশি উৎপাদনের অর্থ ছিল বেশি বিক্রি এবং বেশি আয়। ফলে কৃষক আবার জমিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারের জন্য উদ্বৃত্ত তৈরিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। বলশেভিক নেতৃত্বের কাছে এটি ছিল রাজনৈতিকভাবেও জরুরি, কারণ রাশিয়ার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তখন কৃষক।

নতুন অর্থনৈতিক নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সীমিত ব্যক্তিগত বাণিজ্যের বৈধতা। ছোট দোকান, বাজার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা আবার সক্রিয় হতে শুরু করে। ব্যক্তিরা পণ্য কিনে বিক্রি করতে পারত এবং মুনাফা অর্জনও বৈধ হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের বাজারে নতুন ধরনের ব্যবসায়ী শ্রেণির উত্থান ঘটে। এদের সাধারণভাবে ‘নেপমান’ বলা হতো। তারা খুচরা বাণিজ্য, খাদ্য সরবরাহ, ছোট উৎপাদন এবং নানা ধরনের সেবায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই নেপমানদের উপস্থিতি বিপ্লবী সমাজে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করে। মস্কো ও অন্যান্য শহরে দোকান, রেস্তোরাঁ, বাজার এবং ব্যক্তিগত ব্যবসার পুনরুত্থান অনেক কমিউনিস্টের কাছে অস্বস্তিকর ছিল। মাত্র কয়েক বছর আগে যে ব্যক্তিগত মুনাফাকে পুরোনো ব্যবস্থার শোষণের প্রতীক হিসেবে নিন্দা করা হয়েছিল, এখন সেই মুনাফাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছিল। ফলে নেপ ছিল শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি বলশেভিক মতাদর্শের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গভীর প্রশ্নও তৈরি করেছিল।

তবে লেনিন কখনোই অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ মুক্ত বাজারের হাতে ছেড়ে দেননি। নতুন অর্থনৈতিক নীতির অধীনে রাষ্ট্র বৃহৎ শিল্প, ব্যাংক, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং অর্থনীতির কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখে। ভারী শিল্প, বৃহৎ খনি, গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনব্যবস্থা এবং আর্থিক কাঠামো রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অধীনেই ছিল। অর্থাৎ এটি পুরোনো পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পূর্ণ প্রত্যাবর্তন ছিল না; বরং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বৃহৎ অর্থনীতির পাশে সীমিত বাজার ও ব্যক্তিগত উদ্যোগকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

লেনিন এই ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক গন্তব্য হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে এটি ছিল এমন একটি কৌশল, যার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাজারের কিছু শক্তিকে ব্যবহার করে উৎপাদন পুনরুদ্ধার করবে। রাশিয়া তখন পশ্চিম ইউরোপের শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কৃষিনির্ভর ছিল। বিপ্লবীরা দ্রুত সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর করতে চাইলেও বাস্তব অর্থনৈতিক ভিত্তি সেই গতিকে সমর্থন করছিল না। তাই লেনিন মনে করেন, কৃষক ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি নতুন অর্থনৈতিক সমঝোতা অপরিহার্য।

নেপ চালুর পর কৃষি উৎপাদন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। কৃষকেরা আবার বাজারে পণ্য আনতে শুরু করে এবং শহরের খাদ্য সরবরাহের পরিস্থিতিও উন্নত হয়। গ্রাম ও শহরের মধ্যে পণ্য বিনিময় পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে। ছোট ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উৎপাদনের প্রসার দৈনন্দিন জীবনে পণ্যের প্রাপ্যতা বাড়ায়। গৃহযুদ্ধের সময়কার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও ঘাটতির অর্থনীতি থেকে সমাজ ধীরে ধীরে তুলনামূলক স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে ফিরে আসে।

তবে পুনরুদ্ধার সহজ ছিল না। ১৯২১–১৯২২ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সোভিয়েত রাশিয়ার বহু অঞ্চলকে আঘাত করে। যুদ্ধ, কৃষি উৎপাদনের পতন, পূর্ববর্তী খাদ্যসংগ্রহ নীতি এবং প্রতিকূল আবহাওয়া মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম খাদ্যসংকটে পড়ে। ফলে নতুন অর্থনৈতিক নীতির প্রথম বছরগুলোতে সরকারকে একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং তাৎক্ষণিক মানবিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে হয়।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য মুদ্রাব্যবস্থার সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গৃহযুদ্ধের সময় রুশ মুদ্রার মূল্য ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছিল। বাজারভিত্তিক লেনদেন ফিরিয়ে আনতে হলে কার্যকর মুদ্রা অপরিহার্য ছিল। পরবর্তী কয়েক বছরে আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল মুদ্রা চালু করা হয়। এতে বাণিজ্য, মূল্য নির্ধারণ, সঞ্চয় এবং হিসাবরক্ষণ আবার বাস্তব অর্থনৈতিক অর্থ ফিরে পেতে শুরু করে।

কিন্তু নেপ নতুন সমস্যাও সৃষ্টি করেছিল। সবচেয়ে আলোচিত সংকটগুলোর একটি ছিল কৃষিপণ্যের দাম এবং শিল্পপণ্যের দামের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান। কৃষি উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্প একই গতিতে সস্তা পণ্য সরবরাহ করতে পারছিল না। ফলে কৃষকের বিক্রি করা শস্যের দাম তুলনামূলক কম এবং তার কেনা শিল্পপণ্যের দাম অনেক বেশি হয়ে পড়ে। এই বৈষম্যকে কাঁচির দুই ফলার মতো দূরে সরে যাওয়া দামের সঙ্গে তুলনা করা হতো।

এই পরিস্থিতিতে কৃষকেরা অনেক সময় শস্য বাজারে বিক্রি না করে ধরে রাখতে শুরু করে, কারণ শস্য বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছিল তা দিয়ে পর্যাপ্ত শিল্পপণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছিল না। সরকার শিল্পের মূল্য কমানো, উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো এবং বাণিজ্যব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সংকট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে বাজারকে আংশিক স্বাধীনতা দিলেও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক বাজার অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ ছিল না।

নেপ সমাজেও নতুন বৈষম্য তৈরি করে। কিছু দক্ষ ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী দ্রুত সম্পদ অর্জন করে। গ্রামাঞ্চলেও তুলনামূলক সমৃদ্ধ কৃষক এবং দরিদ্র কৃষকের মধ্যে পার্থক্য দৃশ্যমান হতে থাকে। বলশেভিক দলের অনেক সদস্যের কাছে এসব পরিবর্তন উদ্বেগজনক ছিল। বিপ্লবের উদ্দেশ্য যেখানে শ্রেণিবৈষম্য দূর করা, সেখানে নতুন ব্যবস্থার অধীনে ব্যক্তিগত সম্পদ ও মুনাফার পুনরুত্থান রাজনৈতিক ও নৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করেছিল।

তারপরও নেপের অর্থনৈতিক সাফল্য উপেক্ষা করা যায় না। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হয়। শহরের বাজার আবার সচল হয়, খাদ্য সরবরাহ উন্নত হয় এবং অর্থনৈতিক লেনদেন স্বাভাবিক হতে থাকে। ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ সোভিয়েত অর্থনীতির বহু সূচক যুদ্ধ ও বিপ্লবের আগের মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছাতে শুরু করে। এই পুনরুদ্ধার বলশেভিক সরকারকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হওয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সময় দেয়।

তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমিত স্বাধীনতা দেওয়া হলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একই ধরনের উদারীকরণ ঘটেনি। বরং একদলীয় শাসন আরও সুসংহত হয়। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কার্যক্রম সীমিত ছিল এবং বলশেভিক দলের অভ্যন্তরেও সংগঠিত গোষ্ঠীবাদ নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ১৯২০-এর দশকের সোভিয়েত ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয়—অর্থনীতির কিছু অংশে বাজার ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগ বাড়ছিল, অথচ রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল।

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর নেপের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। সোভিয়েত নেতৃত্বের সামনে প্রধান প্রশ্ন ছিল, কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে কীভাবে দ্রুত শিল্পায়িত করা হবে। কেউ নেপকে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে কৃষকদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন। অন্যরা আশঙ্কা করতেন যে বাজার, ব্যক্তিগত ব্যবসা এবং তুলনামূলক সমৃদ্ধ কৃষকের বিকাশ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিতরেই নতুন পুঁজিবাদী শক্তি তৈরি করছে।

এই বিতর্ক ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে। জোসেফ স্তালিন ধীরে ধীরে দলের সর্বাধিক ক্ষমতাবান নেতায় পরিণত হওয়ার পর অর্থনৈতিক নীতির দিকও বদলাতে থাকে। ১৯২০-এর দশকের শেষদিকে শস্য সংগ্রহ নিয়ে নতুন সংকট দেখা দিলে সরকার কৃষকদের ওপর চাপ বাড়ায়। একই সঙ্গে দ্রুত শিল্পায়নের জন্য বিপুল সম্পদ সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দেয়। নেপের ধীর ও মিশ্র অর্থনৈতিক পথ তখন নেতৃত্বের কাছে ক্রমেই অপর্যাপ্ত বলে মনে হতে থাকে।

১৯২৮ সাল থেকে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সোভিয়েত অর্থনীতি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ে প্রবেশ করে। রাষ্ট্র দ্রুত ভারী শিল্প সম্প্রসারণ, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা এবং কৃষির সমবায়ীকরণের পথে এগোয়। ব্যক্তিগত ব্যবসার সুযোগ সংকুচিত হতে থাকে এবং কৃষকদের স্বাধীন বাজারভিত্তিক উৎপাদনের ক্ষেত্রও দ্রুত বিলুপ্ত হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন অর্থনৈতিক নীতির মূল কাঠামো কার্যত শেষ হয়ে যায়।

নেপের অবসান দেখায় যে লেনিনের সাময়িক পশ্চাদপসরণের ধারণাটি শেষ পর্যন্ত সত্যিই সাময়িক ছিল। তবে এই নীতিকে শুধু কমিউনিজম থেকে পিছু হটা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি ছিল বিপ্লবী মতাদর্শ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সংঘর্ষ থেকে জন্ম নেওয়া এক অসাধারণ রাজনৈতিক সমঝোতা। বলশেভিকরা উপলব্ধি করেছিল যে রাষ্ট্রীয় আদেশ দিয়ে উৎপাদনের প্রতিটি সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয় এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক প্রণোদনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলে পুরো ব্যবস্থাই বিপন্ন হতে পারে।

নতুন অর্থনৈতিক নীতির ইতিহাস আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ করে। লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক সরকার আদর্শগতভাবে কঠোর হলেও প্রয়োজনে অত্যন্ত বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম ছিল। ১৯২১ সালে তাদের প্রধান লক্ষ্য আর অবিলম্বে বিশুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা ছিল না; বরং বিপ্লবী রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক পতন থেকে রক্ষা করা, কৃষকদের সঙ্গে সংঘাত কমানো এবং উৎপাদন পুনরুদ্ধার করা ছিল জরুরি। সেই উদ্দেশ্যে বাজার ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের সীমিত প্রত্যাবর্তনকে গ্রহণ করা হয়।

এই কারণেই ১৯২১ সালের নতুন অর্থনৈতিক নীতি সোভিয়েত ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি এমন একটি সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে যখন বিপ্লবী রাষ্ট্র নিজের আদর্শিক গতিপথ সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমঝোতা করেছিল। নেপ সোভিয়েত অর্থনীতিকে গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে সমাজতন্ত্রের মধ্যে বাজারের ভূমিকা, কৃষকের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মুনাফা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এমন প্রশ্ন সৃষ্টি করেছিল, যার উত্তর সোভিয়েত নেতৃত্বের ভেতরে কখনোই সহজ ছিল না।

শেষ পর্যন্ত স্তালিনের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও বাধ্যতামূলক সমবায়ীকরণ নেপের পরীক্ষামূলক মিশ্র ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটায়। তবু ১৯২১ থেকে ১৯২০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত এই সংক্ষিপ্ত অধ্যায়টি প্রমাণ করে যে সোভিয়েত অর্থনৈতিক ইতিহাস সরলভাবে ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার একমুখী যাত্রা ছিল না। এর মাঝখানে ছিল এমন এক সময়, যখন লেনিনের সরকার বিপ্লবকে বাঁচানোর জন্য সেই বাজারব্যবস্থারই কিছু উপাদান ফিরিয়ে এনেছিল, যাকে তারা কয়েক বছর আগে উৎখাত করার ঘোষণা দিয়েছিল। সেই বৈপরীত্যই নতুন অর্থনৈতিক নীতিকে সোভিয়েত ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিতর্কিত অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।