অ্যাডাম স্মিথ ও ইমানুয়েল কান্ট: মুক্তবাজার, নৈতিকতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার দর্শন
সিরিজ: আলোকায়নের যুগ (The Age of Enlightenment)
বাজারের স্বাধীনতা থেকে নৈতিক স্বায়ত্তশাসন—আলোকায়নের দুই প্রভাবশালী অনুসন্ধান।
এনসাইক্লোপিডিয়া ও স্যালনের আলোচনায় জ্ঞান যখন আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজে পৌঁছাচ্ছিল, তখন আলোকায়নের সামনে স্বাধীনতার ব্যবহার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছিল। মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করবে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে চলবে? ব্যক্তিগত লাভের চেষ্টা কি সমাজের উপকার করতে পারে? আবার স্বাধীন ব্যক্তি কোন নীতিতে নিজের আচরণ নির্ধারণ করবেন? অ্যাডাম স্মিথ ও ইমানুয়েল কান্ট ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন। একজন অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো বিশ্লেষণ করেন, অন্যজন অনুসন্ধান করেন জ্ঞান, নৈতিক কর্তব্য ও স্বাধীন বিচারের ভিত্তি।
১৭২৩ সালে স্কটল্যান্ডের কার্কলডিতে জন্ম নেওয়া স্মিথ ছিলেন স্কটিশ আলোকায়নের গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে তিনি ন্যায়বিচার, সমাজ, শাসন ও অর্থনীতি নিয়ে পাঠদান করেন। তাঁর কাছে অর্থনীতি মানুষের বৃহত্তর সামাজিক জীবনের অংশ ছিল। ১৭৫৯ সালে প্রকাশিত দ্য থিওরি অব মোরাল সেন্টিমেন্টস বোঝা ছাড়া তাঁর বাজারচিন্তার পূর্ণ অর্থ ধরা কঠিন। বইটিতে মানুষকে কেবল স্বার্থপর জীব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; অন্যের অভিজ্ঞতা উপলব্ধি এবং অন্যের মূল্যায়ন সম্পর্কে সচেতনতাও মানুষের আচরণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
স্মিথের নৈতিক দর্শনে ‘সহানুভূতি’ বলতে শুধু দুঃখে করুণা বোঝায় না; কল্পনার সাহায্যে অন্যের অবস্থানে নিজেকে স্থাপন করার ক্ষমতাও বোঝায়। নিজের আচরণ বিচার করতে মানুষ একটি নিরপেক্ষ দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে। আমি নিজের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছি, কিন্তু পক্ষপাতহীন কেউ ঘটনাটি কীভাবে দেখবেন—এই প্রশ্ন নৈতিক সংযম তৈরি করে। নিজস্ব স্বার্থের উপস্থিতি নৈতিকতার অনুপস্থিতি নয়। ন্যায়বিচার, আত্মসংযম ও সামাজিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রিত হয়।
১৭৭৬ সালে প্রকাশিত দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এ স্মিথ জাতীয় সমৃদ্ধির উৎস বিশ্লেষণ করেন। রাষ্ট্রের সম্পদকে শুধু স্বর্ণ-রৌপ্যের মজুত বা বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত দিয়ে বিচার করার পরিবর্তে তিনি উৎপাদন ও শ্রমের ফলের দিকে দৃষ্টি দেন। বইয়ের শুরুতে পিন তৈরির উদাহরণ দিয়ে দেখান, কাজকে বিভিন্ন ধাপে ভাগ করলে উৎপাদন বাড়তে পারে। দক্ষতা বৃদ্ধি, কাজ বদলানোর সময় সাশ্রয় এবং যন্ত্রের ব্যবহার এর কারণ। তবে শ্রমবিভাগ কতদূর বিস্তৃত হবে, তা বাজারের আকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এই বিশেষায়ন মানুষকে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল করে। প্রত্যেকে নিজের প্রয়োজনের সব বস্তু তৈরি করেন না; বিনিময়ের মাধ্যমে অন্যের উৎপাদিত জিনিস পান। এখানে ব্যক্তিগত লাভের আকাঙ্ক্ষা সহযোগিতার একটি চালিকা শক্তি হতে পারে। কিন্তু স্মিথের বহুল আলোচিত ‘অদৃশ্য হাত’ কথাটিকে সব বাজারে অবধারিত মঙ্গল উৎপাদনের সূত্র ভাবা ভুল। ধারণাটি তাঁর লেখায় নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে ব্যবহৃত। প্রতিযোগিতা, ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত বাদ দিয়ে স্বার্থপরতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনকল্যাণ সৃষ্টি করবে—এমন সর্বব্যাপী প্রতিশ্রুতি তিনি দেননি।
বরং ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ও জনস্বার্থের সংঘাত সম্পর্কে স্মিথ সতর্ক ছিলেন। একচেটিয়া সুবিধা, বাজারে প্রবেশের বাধা এবং ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ প্রতিযোগিতাকে বিকৃত করতে পারে। উপনিবেশিক বাণিজ্য-একচেটিয়াও তাঁর সমালোচনার বিষয় ছিল। মুক্তবাজারের পক্ষে অবস্থান মানে ব্যবসায়ীর প্রতিটি দাবির পক্ষে অবস্থান নয়। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিশেষ গোষ্ঠী সুবিধা আদায় করলে উৎপাদক বা বণিক লাভবান হলেও ভোক্তা ও বৃহত্তর সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ধারণায় বিশেষাধিকার কমানোর প্রশ্ন তাই গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের ভূমিকাও তিনি অস্বীকার করেননি। প্রতিরক্ষা ও বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি এমন জনপরিকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান দরকার, যার সামাজিক উপকার বড় হলেও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর যথেষ্ট লাভ নাও হতে পারে। শিক্ষার বিষয়েও তাঁর উদ্বেগ ছিল নির্দিষ্ট। শ্রমবিভাগে একই সংকীর্ণ কাজ বারবার করতে করতে শ্রমিকের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা এই বিপদের প্রতিকার করতে পারে। ফলে স্মিথের চিন্তা বুঝতে বাজারের উৎপাদনশক্তি এবং বাজারসমাজের মানবিক ক্ষতির সম্ভাবনা—উভয় দিক একসঙ্গে দেখতে হয়।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার এই আলোচনার পাশাপাশি প্রুশিয়ার কনিগ্সবের্গে কান্ট স্বাধীন চিন্তার ভিত্তি পরীক্ষা করছিলেন। ১৭২৪ সালে জন্ম নেওয়া কান্ট ১৭৮৪ সালের আলোকায়নবিষয়ক প্রবন্ধে অন্যের নির্দেশ ছাড়া নিজের বোধশক্তি ব্যবহারের সাহসকে গুরুত্ব দেন। মানুষ অনেক সময় অক্ষমতার কারণে নয়, অভ্যাস ও ভয়ের কারণে অন্যকে নিজের হয়ে বিচার করতে দেয়। তাঁর আহ্বান ছিল এই নির্ভরতা কাটানোর। তবে স্বাধীন চিন্তা মানে তাৎক্ষণিক পছন্দকে সত্য বলে গ্রহণ করা নয়; নিজের যুক্তিকেও সমালোচনার সামনে দাঁড় করাতে হবে।
১৭৮১ সালের ক্রিটিক অব পিওর রিজন-এ কান্ট অনুসন্ধান করেন মানুষের জ্ঞান কীভাবে সম্ভব এবং তার সীমা কোথায়। অভিজ্ঞতা জ্ঞানের উপাদান দেয়, কিন্তু মনও সেই অভিজ্ঞতাকে নির্দিষ্ট কাঠামোয় সংগঠিত করে। তাঁর মতে, স্থান ও সময় অভিজ্ঞতার রূপ; কার্যকারণের মতো ধারণাও অভিজ্ঞতাকে বোধগম্য করতে ভূমিকা রাখে। তাই তাঁকে শুধু যুক্তিবাদের পুরোনো ধারার অনুসারী বলা যথেষ্ট নয়। কান্ট যুক্তির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তার বৈধ ব্যবহারের সীমাও নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন।
নৈতিক দর্শনে এই অনুসন্ধান নতুন রূপ পায়। ১৭৮৫ সালের গ্রাউন্ডওয়ার্ক অব দ্য মেটাফিজিক্স অব মোরালস-এ কান্ট নৈতিকতার ভিত্তি খোঁজেন কর্তব্যে। কোনো কাজ ব্যক্তিগত লাভ বা প্রশংসার প্রত্যাশায় করা এবং নৈতিক বিধানের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে করা এক বিষয় নয়। তাঁর ‘নিঃশর্ত বিধান’-এর একটি রূপ অনুসারে, এমন নীতিতে কাজ করতে হবে, যাকে সবার জন্য সাধারণ বিধান হিসেবে গ্রহণ করা যায়। নিজের সুবিধার জন্য এমন ব্যতিক্রম দাবি করা যাবে না, যা অন্যদের ক্ষেত্রে মেনে নিতে আমি রাজি নই।
একই বিধানের আরেক রূপে মানুষের মর্যাদা বিশেষ গুরুত্ব পায়। মানুষকে শুধু নিজের উদ্দেশ্য পূরণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না; তাকে নিজেও একটি উদ্দেশ্য হিসেবে সম্মান করতে হবে। এতে প্রতারণা, জবরদস্তি ও শোষণ বিচার করার শক্তিশালী মানদণ্ড পাওয়া যায়। মানুষের মূল্য তার বাজারদর, উপযোগিতা কিংবা সামাজিক পদমর্যাদায় শেষ হয় না। তবে কান্টের ‘মানুষ’ বলতে নৈতিক যুক্তিসম্পন্ন সত্তার ধারণা এবং আধুনিক মানবাধিকারের সম্পূর্ণ কাঠামোকে এক করে দেখা উচিত নয়; পরবর্তী চিন্তায় এই সম্পর্ক আরও বিকশিত হয়েছে।
কান্টের কাছে নৈতিক স্বাধীনতা হলো স্বায়ত্তশাসন—যুক্তির মাধ্যমে স্বীকৃত নৈতিক বিধান অনুযায়ী নিজেকে পরিচালনা করা। এটি প্রবৃত্তি অনুসরণের স্বাধীনতা থেকে আলাদা। রাজনৈতিক আলোচনায় তিনি প্রকাশ্য যুক্তিচর্চার গুরুত্ব দিলেও দায়িত্ব পালনের সময় আনুগত্যের অবকাশ রাখেন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিপ্লবের অধিকারও তিনি সমর্থন করেননি। আবার নারীর রাজনৈতিক অবস্থান, নির্ভরশীল মানুষের নাগরিক মর্যাদা এবং জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্য তাঁর সার্বজনীন নৈতিক আদর্শের সঙ্গে গুরুতর টানাপোড়েন তৈরি করে।
স্মিথ ও কান্টের প্রভাব তাই একই পথে আসেনি। স্মিথ উৎপাদন, বিনিময়, প্রতিযোগিতা ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আধুনিক অর্থনৈতিক বিতর্কের ভিত্তি সমৃদ্ধ করেন। কান্ট নৈতিক স্বায়ত্তশাসন, মানুষের মর্যাদা এবং প্রকাশ্য যুক্তিচর্চার ভাষাকে গভীরতা দেন। তাঁদের সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেও পরবর্তী সমাজ তাঁদের প্রশ্নগুলো এড়াতে পারেনি। বাজার কতটা স্বাধীন হবে, ক্ষমতা কীভাবে সীমিত থাকবে এবং অন্য মানুষের প্রতি আমার কর্তব্য কী—এসব প্রশ্ন আধুনিকতার কেন্দ্রে স্থান পায়। এখন দেখার বিষয় ছিল, এই দর্শনগুলো বাস্তব সংস্কার, শাসন এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কতদূর কার্যকর হতে পারে।
ব্ল্যাক ডেথের লক্ষণ ও মৃত্যুর কারণ: প্লেগের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
ব্ল্যাক ডেথের বিস্তার: ১৩৪৭–১৩৫৩ সালে ইউরোপে কোটি মানুষের মৃত্যু
কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ
ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তি: এশিয়া থেকে ইউরোপে প্লেগ ছড়ানোর ইতিহাস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য, নারী ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা
ভিকসবার্গ অবরোধ: গ্রান্ট কীভাবে কনফেডারেসিকে দুই ভাগ করেছিলেন?