বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আলোকিত স্বৈরতন্ত্র: ফ্রেডেরিক, ক্যাথরিন, জোসেফ ও অধিকার নিয়ে আলোকায়নের বিতর্ক

সিরিজ: আলোকায়নের যুগ (The Age of Enlightenment)

আলোকিত স্বৈরতন্ত্র: ফ্রেডেরিক, ক্যাথরিন, জোসেফ ও অধিকার নিয়ে আলোকায়নের বিতর্ক
রাজকীয় সংস্কার ও সর্বজনীন অধিকারের দাবির মধ্যেই ফুটে ওঠে আলোকায়নের দ্বন্দ্ব।

স্মিথ ও কান্টের আলোচনার শেষে যে প্রশ্ন সামনে এসেছিল—স্বাধীনতা ও নৈতিকতার দর্শন বাস্তব শাসনে কতদূর কার্যকর হবে—অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে তার একটি উত্তর খুঁজেছিলেন কয়েকজন শক্তিশালী রাজা ও সম্রাজ্ঞী। তাঁরা শিক্ষা, আইন ও প্রশাসনে সংস্কার আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জনগণের হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা তুলে দিতে চাননি। এই ব্যবস্থাকে ইতিহাসে আলোকিত স্বৈরতন্ত্র বলা হয়। একই সময়ে দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ ও অধিকারবঞ্চিত নারীরা স্বাধীনতার ভাষাকে আরও বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ফলে আলোকায়ন রাজকীয় সংস্কারের প্রকল্প এবং প্রতিষ্ঠিত আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—দুই রূপেই ছড়িয়ে পড়ে।

আলোকিত স্বৈরতন্ত্র কোনো অভিন্ন কর্মসূচি ছিল না। শাসকেরা নিজ নিজ রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক দক্ষতা, উৎপাদন, কর আদায় ও সামাজিক শৃঙ্খলা উন্নত করতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় সহনশীলতা কিংবা শিক্ষাবিস্তার মানবিক বিবেচনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের শক্তি বাড়ানোর উপায়ও হতে পারত। তাঁদের সংস্কারে যুক্তি ও জনকল্যাণের ভাষা থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার মূলত ওপরেই কেন্দ্রীভূত থাকত। প্রজার জীবন উন্নত করা এবং প্রজাকে শাসন নির্ধারণের অধিকার দেওয়া এক বিষয় নয়—এই পার্থক্য ব্যবস্থাটির কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব।

প্রুশিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক ১৭৪০ সালে সিংহাসনে বসেন। ভলতেয়ারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তাঁকে আলোকায়নের আলোচনায় পরিচিত করে। তিনি ধর্মীয় সহনশীলতার তুলনামূলক বিস্তৃত পরিবেশ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং বিচারসংস্কারে গুরুত্ব দেন। নির্যাতনের ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। ১৭৬৩ সালের বিদ্যালয়সংক্রান্ত বিধান প্রাথমিক শিক্ষার সংগঠন উন্নত করতে চেয়েছিল, যদিও বাস্তবায়ন সর্বত্র সমান ছিল না। শাসককে রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে দেখার ভাষা তাঁর রাজত্বের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

কিন্তু ফ্রেডেরিকের প্রুশিয়া সামরিক ও সামাজিক আধিপত্যের রাষ্ট্রই ছিল। অভিজাত ইয়ুঙ্কারদের জমিদারি শক্তি এবং বহু কৃষকের অধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে। ধর্মীয় সহনশীলতাও সমান নাগরিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দেয়নি; ইহুদিদের ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ ছিল। সিলেশিয়া দখল এবং পোল্যান্ডের প্রথম বিভাজনে অংশগ্রহণ তাঁর রাষ্ট্রবিস্তারের নীতি দেখায়। ফলে দার্শনিকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও দক্ষ প্রশাসনের সঙ্গে যুদ্ধ এবং অসম সামাজিক সম্পর্ক পাশাপাশি চলেছিল। তাঁর সংস্কার রাজক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে তা শক্তিশালী করেছিল।

রাশিয়ার দ্বিতীয় ক্যাথরিন ১৭৬২ সালে ক্ষমতায় আসেন। তিনি ভলতেয়ার ও দিদেরোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং নিজেকে সংস্কারমুখী শাসক হিসেবে তুলে ধরেন। ১৭৬৭ সালে আইনপ্রণয়ন কমিশনের জন্য প্রস্তুত তাঁর নাকাজ বা নির্দেশনায় মন্টেস্কু ও বেক্কারিয়ার মতো চিন্তাবিদের প্রভাব দেখা যায়। আইনের যুক্তিসংগত বিন্যাস ও শাস্তির প্রশ্ন আলোচিত হয়। তবে কমিশন থেকে প্রত্যাশিত নতুন সামগ্রিক আইনসংহিতা তৈরি হয়নি। কৃষিদাসেরা স্বাধীন রাজনৈতিক কণ্ঠ হিসেবে সেখানে উপস্থিতও ছিল না; সংস্কারের আলোচনা বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ ছিল।

ক্যাথরিনের রাজত্বের সীমা সবচেয়ে স্পষ্ট কৃষিদাসত্বে। অভিজাতদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল শাসন কৃষিদাসমুক্তির পথে এগোয়নি। ১৭৭৩–১৭৭৫ সালের পুগাচভ বিদ্রোহ সামাজিক অসন্তোষের গভীরতা প্রকাশ করে; দমন শেষে অভিজাত কর্তৃত্ব আরও দৃঢ় হয়। ১৭৮৫ সালের অভিজাতদের সনদ তাঁদের বিশেষাধিকার নিশ্চিত করে। শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্যোগ, বিশেষত মেয়েদের জন্য স্মোলনি প্রতিষ্ঠানের মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সীমিত জনগোষ্ঠীকে উপকৃত করে। আলোকায়নের ভাষায় সংস্কার ঘোষণা করেও অধিকাংশ কৃষকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অস্বীকার করা সম্ভব ছিল।

হাবসবার্গ শাসক দ্বিতীয় জোসেফ সংস্কারে আরও দ্রুত ও হস্তক্ষেপমূলক পথ নেন। ১৭৮১ সালের সহিষ্ণুতা-সংক্রান্ত বিধান প্রোটেস্ট্যান্ট ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দেয়; ইহুদিদের জন্যও পৃথক সংস্কার আসে। একই বছরে হাবসবার্গের বিভিন্ন ভূখণ্ডে ব্যক্তিগত কৃষিদাসত্ব শিথিল করার উদ্যোগ শুরু হয়। বিয়ে, পেশা নির্বাচন ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কৃষকের স্বাধীনতা বাড়ে। তবে জমিদারি পাওনা ও বাধ্যতামূলক শ্রমের সব দায় সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি। কৃষকের ব্যক্তিগত অধীনতা কমানো এবং সামন্তীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলোপ করা আলাদা প্রক্রিয়া ছিল।

জোসেফ চার্চের প্রতিষ্ঠানকেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনতে চান। শিক্ষা, চিকিৎসা বা সমাজসেবায় সরাসরি ভূমিকা নেই বলে বিবেচিত বহু মঠ বন্ধ করা হয়। প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ ও দ্রুত সংস্কার স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, অভিজাত এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরোধিতা সৃষ্টি করে। তাঁর রাজত্বের শেষদিকে অনেক উদ্যোগ প্রত্যাহার বা সংশোধন করতে হয়। এতে আলোকিত স্বৈরতন্ত্রের আরেক সমস্যা দেখা যায়: জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া যুক্তিসংগত বলে বিবেচিত নীতি চাপিয়ে দিলে তা স্থানীয় বাস্তবতা ও সম্মতির সংকটে পড়তে পারে।

রাজদরবারের বাইরে স্বাধীনতার সবচেয়ে তীব্র পরীক্ষা হচ্ছিল আটলান্টিক দাসপ্রথায়। ইউরোপীয় বাণিজ্য ও উপনিবেশিক সমৃদ্ধির একটি বড় অংশ দাসশ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অথচ প্রাকৃতিক অধিকার ও মানবসমতার ভাষা দাসত্বের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্ন করত। দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনে আলোকায়নের যুক্তির পাশাপাশি কোয়েকার ও অন্যান্য খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের সংগঠন এবং দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অলাউদাহ একুইয়ানোর ১৭৮৯ সালের আত্মজীবনী দাসত্বের অভিজ্ঞতাকে পাঠকের সামনে এনে বিলোপবাদী প্রচারে শক্তি জোগায়।

এই দ্বন্দ্ব ক্যারিবীয় সাঁ-দোম্যাঁয় বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। ১৭৯১ সালে শুরু হওয়া দাসবিদ্রোহ পরবর্তী হাইতি বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দেয়। ফরাসি বিপ্লবের অধিকারসংক্রান্ত ভাষা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ কেবল ইউরোপীয় ধারণার নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা ছিলেন না। নিজেদের সংগ্রামের মাধ্যমে তাঁরা স্বাধীনতার বাস্তব অর্থ বদলান। ফ্রান্স ১৭৯৪ সালে উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপ করে; নেপোলিয়নের পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সেই অর্জন বিপন্ন করে। দীর্ঘ যুদ্ধের পর ১৮০৪ সালে হাইতি স্বাধীন হয়।

নারীর অধিকারেও একইভাবে সার্বজনীনতার দাবি পরীক্ষা করা হয়। ১৭৯১ সালে অলিম্প দ্য গুজ নারীর ও নারী নাগরিকের অধিকার ঘোষণায় রাজনৈতিক সমতার প্রশ্ন তোলেন। মেরি উলস্টোনক্রাফট ১৭৯২ সালের অ্যা ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওম্যান-এ যুক্তি দেন, নারীর কথিত বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা শিক্ষাবঞ্চনা ও সামাজিক প্রশিক্ষণের ফল। যুক্তিবুদ্ধি যদি মানুষের মর্যাদার ভিত্তি হয়, তবে নারীকে যুক্তিচর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার ন্যায্যতা কোথায়? নারীকে পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য গড়ে তোলার শিক্ষাদর্শ তাঁর সমালোচনার লক্ষ্য হয়।

তবে নারী অধিকার নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়া মানেই সমান রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়। বিপ্লবী ফ্রান্সেও নারীরা ভোটাধিকার পাননি এবং ১৭৯৩ সালে নারী রাজনৈতিক ক্লাব নিষিদ্ধ করা হয়। দ্য গুজের মৃত্যুদণ্ডকে শুধু নারী অধিকার দাবির শাস্তি বলা সরলীকরণ; তাঁর বিপ্লবী রাজনীতি ও বিরোধিতাও ঘটনাটির অংশ। একইভাবে ইউরোপজুড়ে নারীর শিক্ষা ও নাগরিকত্বের দাবিতে দীর্ঘ সংগ্রাম প্রয়োজন হয়। আলোকায়নের ভাষা প্রতিবাদের উপকরণ দিয়েছিল, কিন্তু সেই ভাষা ব্যবহারকারী সমাজগুলো নিজেদের বৈষম্য সহজে ত্যাগ করেনি।

বিশ্বব্যাপী বিস্তারও একমুখী ছিল না। বই, অনুবাদ, বাণিজ্য, উপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান ও বিপ্লবের সংবাদ স্থানীয় চিন্তার সঙ্গে মিশে নতুন অর্থ পায়। স্প্যানিশ আমেরিকায় স্বাধীনতার বিতর্কে আলোকায়নের পাশাপাশি স্থানীয় স্বার্থ ও পুরোনো রাজনৈতিক ঐতিহ্য কাজ করে। পরবর্তী বাংলায় রামমোহন রায়ের যুক্তিনির্ভর ধর্মসমালোচনা ও সামাজিক সংস্কারও ভারতীয় শাস্ত্রচর্চা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। আলোকায়নের এই যাত্রা তাই দেখায়, স্বাধীনতার ধারণা রাজদরবারে সীমিত রাখা যায়নি। যাঁদের বাদ দিয়ে সর্বজনীন অধিকারের কথা বলা হয়েছিল, তাঁরাই ক্রমে সেই দাবিকে আরও বিস্তৃত ও বাস্তব করে তুলতে শুরু করেন।