বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হাইতির বিপ্লব: তুসাঁ লুভেরত্যুর, দাসপ্রথার অবসান ও ১৮০৪ সালের স্বাধীনতা

সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস

হাইতির বিপ্লব: তুসাঁ লুভেরত্যুর, দাসপ্রথার অবসান ও ১৮০৪ সালের স্বাধীনতা
দাসবিদ্রোহ থেকে স্বাধীন হাইতি—স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষার ঐতিহাসিক সংগ্রাম।

ইউরোপের সভা, ছাপাখানা ও সংসদে যখন দাসত্বের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক চলছিল, তখন ক্যারিবীয় আবাদভূমিতে স্বাধীনতার দাবি সশস্ত্র বিপ্লবে রূপ নেয়। ফরাসি উপনিবেশ সাঁ-দোমিঙ্গে দাসত্বে আবদ্ধ মানুষেরা শুধু ভালো ব্যবহার কিংবা শ্রমের সামান্য ছাড় চাননি; তাঁরা নিজেদের জীবন নিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করেছিলেন। সেই সংগ্রাম থেকেই জন্ম নেয় হাইতি। তুসাঁ লুভেরত্যুর বিপ্লবকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করেছিলেন, কিন্তু ১৮০৪ সালের স্বাধীনতা অর্জিত হয় তাঁর বন্দিত্ব ও মৃত্যুর পর অন্য নেতাদের নেতৃত্বে।

হিস্পানিওলা দ্বীপের পশ্চিমাংশে অবস্থিত সাঁ-দোমিঙ্গ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ফ্রান্সের সবচেয়ে লাভজনক উপনিবেশগুলোর একটি। চিনি ও কফির বিপুল উৎপাদনের পেছনে ছিল প্রায় পাঁচ লাখ দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের শ্রম। তাঁদের তুলনায় শ্বেতাঙ্গ অধিবাসী ও মুক্ত অশ্বেতাঙ্গ মানুষের সংখ্যা অনেক কম ছিল। আবাদে কঠোর পরিশ্রম, রোগ, অপুষ্টি ও শাস্তির কারণে মৃত্যুহার ছিল বেশি। শ্রমশক্তি বজায় রাখতে আফ্রিকা থেকে নতুন বন্দি আনা হতো; সমৃদ্ধির ভিত ছিল ধারাবাহিক মানবিক বিপর্যয়।

এই সমাজের বিরোধ কেবল মালিক ও দাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ধনী শ্বেতাঙ্গ আবাদমালিকেরা বাণিজ্যিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা চাইতেন। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্বেতাঙ্গেরা নিজেদের বর্ণগত সুবিধা রক্ষা করতে আগ্রহী ছিলেন। মুক্ত অশ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সম্পদশালী ও দাসমালিক মানুষও ছিলেন, কিন্তু তাঁরা বৈষম্যের শিকার হতেন। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর স্বাধীনতা ও সমতার ভাষা এসব গোষ্ঠী নিজস্ব দাবিতে ব্যবহার করে। দাসত্বে আবদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বাধীনতা তখনও ক্ষমতাবানদের অধিকাংশ পরিকল্পনার বাইরে ছিল।

১৭৯১ সালের আগস্টে উত্তরাঞ্চলের আবাদগুলোতে ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু হয়। আখখেত ও আবাদবাড়িতে হামলা হয়, মালিকদের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে এবং বিদ্রোহীরা সংগঠিত বাহিনী গড়ে তোলেন। দুতি বুকমান প্রথম পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। বوا কাইমানের সমাবেশ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের স্মৃতি বিপ্লবের প্রতীক হয়ে ওঠে, যদিও তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিদ্রোহের শক্তি এসেছিল আবাদভিত্তিক যোগাযোগ, সম্মিলিত ক্ষোভ, ধর্মীয় বন্ধন এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের অংশগ্রহণ থেকে।

তুসাঁ জন্মেছিলেন দাসত্বে, তবে বিপ্লব শুরুর আগেই মুক্তি পেয়েছিলেন। তিনি ঘোড়া, আবাদ পরিচালনা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কিছু ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। প্রথমে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরে সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসেন। তাঁর সাফল্যের ভিত্তি ছিল শৃঙ্খলা, আলোচনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর অবস্থান বোঝার ক্ষমতা। বিপ্লবকে একজন ব্যক্তির সৃষ্টি বলা ভুল হলেও তুসাঁ বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহী দলগুলোকে বৃহত্তর সামরিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হয়ে ওঠেন।

সংঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হয়। দ্বীপের পূর্বাংশের স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ ফরাসি শক্তিকে দুর্বল করতে কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্রোহী নেতাদের সমর্থন দেয়; তুসাঁও একসময় স্পেনের পক্ষে যুদ্ধ করেন। ব্রিটেন ফরাসি উপনিবেশ দখলের উদ্দেশ্যে হস্তক্ষেপ করে। ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিরা বুঝতে পারেন, বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়া উপনিবেশ রক্ষা কঠিন। স্বাধীনতার প্রশ্ন তাই শুধু দর্শনের বিতর্ক থাকেনি; যুদ্ধক্ষেত্রে কার পক্ষে মানুষ অস্ত্র ধরবেন, তার কেন্দ্রীয় শর্ত হয়ে ওঠে।

১৭৯৩ সালে ফরাসি কমিশনার লেজে-ফেলিসিতে সঁতোনাক্স উত্তরাঞ্চলে দাসমুক্তি ঘোষণা করেন; অন্য অঞ্চলেও মুক্তির ঘোষণা আসে। ১৭৯৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফরাসি জাতীয় কনভেনশন উপনিবেশগুলোতে দাসপ্রথা বিলোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই নীতিগত পরিবর্তনের পর তুসাঁ ফরাসি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে যোগ দেন। দাসমুক্তিকে কার্যকর রাখতে তাঁর বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঘটনাটি দেখায়, প্যারিসের সিদ্ধান্তের পেছনে উপনিবেশের বিদ্রোহ ও সামরিক বাস্তবতার প্রত্যক্ষ চাপ ছিল।

পরবর্তী বছরগুলোতে তুসাঁ স্প্যানিশ ও ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান মজবুত করেন এবং উপনিবেশের প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হন। তবে বিপ্লবী শিবিরও ঐক্যবদ্ধ ছিল না। দক্ষিণাঞ্চলের নেতা আন্দ্রে রিগোর সঙ্গে তাঁর সংঘাত ১৭৯৯–১৮০০ সালে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। এই লড়াই ক্ষমতা, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং সামাজিক বিভাজনের জটিলতা প্রকাশ করে। তুসাঁ বিজয়ী হলেও বিপ্লবের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে।

দাসত্ব বিলোপের পর অর্থনীতি কীভাবে চলবে, তা ছিল কঠিন প্রশ্ন। তুসাঁ রপ্তানি আয় ও কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি সামরিক নিয়ন্ত্রণে আবাদে শ্রম বজায় রাখেন এবং অনেক শ্রমিকের চলাচল সীমিত করেন। আইনি দাসত্ব ফিরে আসেনি, কিন্তু স্বাধীন মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে এই বাধ্যতামূলক শ্রমনীতির সংঘাত তৈরি হয়। দাসমুক্তি, নিজের জমিতে কাজের অধিকার এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাহিদা একই পথে চলছিল না। তুসাঁর শাসনের এই সীমাবদ্ধতা তাঁর অবদানের পাশাপাশি বিবেচনা করা জরুরি।

১৮০১ সালে তুসাঁ একটি সংবিধান প্রবর্তন করেন, যাতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ রাখা হয় এবং তাঁকে আজীবন গভর্নর করা হয়। ভূখণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি সাম্রাজ্যের অংশ বলা হলেও বাস্তবে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি দ্বীপের পূর্বাংশেও কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিলেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এই স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্র মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। ১৮০২ সালে তাঁর শ্যালক শার্ল লেক্লেরের নেতৃত্বে বড় ফরাসি সামরিক অভিযান পাঠানো হয়।

ফরাসি বাহিনী তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়লেও প্রথম পর্যায়ে কয়েকজন স্থানীয় সেনানায়ক সমঝোতা করেন। তুসাঁও যুদ্ধবিরতি মেনে সরে দাঁড়ান। কিন্তু ১৮০২ সালের জুনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। জুরা পর্বতমালার ফোর দ্য জু দুর্গে বন্দি অবস্থায় ১৮০৩ সালের এপ্রিলে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি স্বাধীন হাইতি দেখেননি। তবে তাঁর গড়ে তোলা সামরিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের কাঠামো ও দাসমুক্তি রক্ষার লক্ষ্য পরবর্তী সংগ্রামে টিকে ছিল।

এদিকে গুয়াদেলুপে ফরাসি অভিযানের পর দাসপ্রথা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নেপোলিয়নের ঔপনিবেশিক নীতি সাঁ-দোমিঙ্গে গভীর আশঙ্কা তৈরি করে। অস্ত্রসমর্পণ মানে আবার দাসত্বে ফেরার ঝুঁকি—এই ধারণা প্রতিরোধকে নতুন শক্তি দেয়। জাঁ-জাক দেসালিন, অঁরি ক্রিস্তফ ও আলেক্সান্দ্র পেতিওঁসহ নেতারা ফরাসিদের বিরুদ্ধে একত্র হন। হলুদ জ্বর ফরাসি বাহিনীকে ভয়াবহভাবে দুর্বল করে; লেক্লেরও মারা যান। পাশাপাশি স্থানীয় বাহিনীর যুদ্ধ, সরবরাহসংকট ও ব্রিটিশ নৌচাপ ফরাসি অবস্থান ভেঙে দেয়।

১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর ভের্তিয়েরের যুদ্ধে দেসালিনের বাহিনীর বিজয় ফরাসি নিয়ন্ত্রণের অবসান নিশ্চিত করার প্রধান ঘটনা হয়ে ওঠে। পরবর্তী আত্মসমর্পণ ও প্রত্যাহারের পর ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি গোনাইভে হাইতির স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। সাবেক দাসত্বে আবদ্ধ মানুষদের বিজয় থেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। আটলান্টিকের দাসমালিক সমাজগুলোর কাছে এটি ছিল আতঙ্কের সংবাদ; স্বাধীনতার প্রত্যাশীদের কাছে প্রমাণ, ঔপনিবেশিক দাসব্যবস্থাকে সামরিকভাবেও পরাজিত করা সম্ভব।

স্বাধীনতার জন্ম অবশ্য শান্তিপূর্ণ পরিণতি আনেনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং ১৮০৪ সালে দেসালিনের নির্দেশে অবশিষ্ট ফরাসি শ্বেতাঙ্গদের বহুজনকে হত্যার ঘটনা নতুন রাষ্ট্রের ইতিহাসে গভীর ক্ষত রেখে যায়। বিদেশি বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতি আরও কঠিন করে। ১৮২৫ সালে ফ্রান্স স্বীকৃতির বিনিময়ে সাবেক উপনিবেশমালিকদের জন্য বিপুল ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দেয়। স্বাধীনতা অর্জনকারী মানুষদের রাষ্ট্রকেই সাবেক মালিকদের দাবির ভার বহন করতে হয়।

তবু হাইতির বিপ্লব দাসপ্রথার ইতিহাসে অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন আনে। এটি দেখায়, স্বাধীনতা কেবল শাসকের ঘোষণা বা সংস্কারকের সহানুভূতির ওপর নির্ভরশীল নয়; নিপীড়িত মানুষ নিজেরাও রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি বদলে দিতে পারেন। তুসাঁ সেই পথের প্রধান নির্মাতা, দেসালিন স্বাধীনতার চূড়ান্ত সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিলেন। তাঁদের সংগ্রামের অভিঘাত পৌঁছে যায় ব্রিটেনেও, যেখানে দাসবাণিজ্যবিরোধী আন্দোলনকে এবার নৈতিক যুক্তির পাশাপাশি বিপ্লব, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য রক্ষার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।