প্রথম বুল রান থেকে শাইলো: আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ বিস্তার
সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
বুল রানের পরাজয় থেকে শাইলোর রক্তাক্ত বাস্তবতা
ফোর্ট সামটারের পতনের পর যে স্বেচ্ছাসেবকেরা দ্রুত জয়ের আশায় সেনাশিবিরে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রথম বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল ভার্জিনিয়ায়। উত্তরের অনেক সংবাদপত্র কনফেডারেট রাজধানী রিচমন্ডের দিকে অবিলম্বে অগ্রসর হওয়ার দাবি তুলছিল। দক্ষিণেও ধারণা ছিল, একটি বড় বিজয় পেলেই উত্তর যুদ্ধের আগ্রহ হারাবে। ১৮৬১ সালের গ্রীষ্মে উভয় পক্ষ যুদ্ধের রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝলেও তার সামরিক মূল্য সম্পর্কে গভীরভাবে অপ্রস্তুত ছিল।
ইউনিয়নের সামনে প্রথম বাধা ছিল ওয়াশিংটনের দক্ষিণ-পশ্চিমে মানাসাস জংশন। গুরুত্বপূর্ণ রেলসংযোগস্থলটি দখল করতে পারলে কনফেডারেট বাহিনীর যোগাযোগ দুর্বল করা সম্ভব হতো। কাছেই বয়ে গেছে বুল রান নামের ছোট জলধারা। এই ভূখণ্ডেই ২১ জুলাই সংঘটিত হয় প্রথম বুল রান যুদ্ধ, যা দক্ষিণে প্রথম মানাসাসের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এটি ছিল গৃহযুদ্ধের প্রথম বৃহৎ স্থলসংঘর্ষ।
ইউনিয়ন বাহিনীর কমান্ডার ইরভিন ম্যাকডাওয়েল জানতেন, তাঁর সৈন্যদের প্রশিক্ষণ অসম্পূর্ণ। অনেকের অভিজ্ঞতা সীমাবদ্ধ ছিল কুচকাওয়াজ ও শিবিরজীবনে। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ এবং স্বল্পমেয়াদি সৈন্যদের চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় অপেক্ষার সুযোগ কমছিল। তাঁর পরিকল্পনা ছিল শত্রুর সামনে চাপ সৃষ্টি করে একটি বড় বাহিনী ঘুরিয়ে কনফেডারেট বাম প্রান্তে আঘাত করা। কাগজে কার্যকর মনে হলেও বাস্তবে এমন অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল অল্প।
কনফেডারেট অবস্থান সামলাচ্ছিলেন পি. জি. টি. বোরেগার্ড। তাঁকে সাহায্য করতে শেনানডোয়া উপত্যকা থেকে জোসেফ ই. জনস্টনের সৈন্যরা রেলপথে মানাসাসে আসেন। ইউনিয়ন নেতৃত্ব আশা করেছিল, উপত্যকায় থাকা তাদের অন্য বাহিনী জনস্টনকে আটকে রাখবে; তা সম্ভব হয়নি। রেলপথে দ্রুত সৈন্য স্থানান্তর যুদ্ধের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং দেখিয়ে দেয়, যোগাযোগব্যবস্থা এখন যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
২১ জুলাই সকালে ইউনিয়নের আক্রমণে কনফেডারেটরা ম্যাথিউস হিল থেকে পিছিয়ে যায়। উত্তরের বিজয় তখন সম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু হেনরি হিলের কাছে দক্ষিণী বাহিনী নতুন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেখানে টমাস জে. জ্যাকসনের ব্রিগেডের দৃঢ় অবস্থান তাঁকে বিখ্যাত ‘স্টোনওয়াল’ জ্যাকসন পরিচিতি এনে দেয়। তবে কনফেডারেট সাফল্য কোনো একজনের কৃতিত্ব ছিল না; নতুন সৈন্যের আগমন ও বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিরোধও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়ায়। দুই পক্ষের পোশাকে তখনও পূর্ণ একরূপতা আসেনি, আর দূর থেকে পতাকা চিনতেও সমস্যা হতো। কামানের অবস্থান বদল, ক্লান্ত সৈন্য এবং অস্পষ্ট নির্দেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। বিকেলে কনফেডারেট পাল্টা আক্রমণে ইউনিয়নের ডান প্রান্ত ভেঙে পড়ে। সংগঠিত পশ্চাদপসরণ দ্রুত বিশৃঙ্খল পলায়নে পরিণত হয়; সরু পথ ও সেতুতে সৈন্য, গাড়ি এবং যুদ্ধ দেখতে আসা কিছু বেসামরিক মানুষ আটকে পড়েন।
কনফেডারেটরা জিতলেও পরাজিত বাহিনীকে ধাওয়া করে ওয়াশিংটন দখলের মতো প্রস্তুতি তাদের ছিল না। বিজয়ী সৈন্যরাও ক্লান্ত ও ছত্রভঙ্গ ছিলেন। দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৪,৯০০ জন নিহত, আহত, বন্দি বা নিখোঁজ হন। সংখ্যাটি মোট মৃত্যু বোঝায় না; তবু তখনকার আমেরিকার কাছে এই ক্ষয়ক্ষতি ছিল বড় ধাক্কা। একটি যুদ্ধ জিতলেই পুরো সংঘাত শেষ হবে—এমন বিশ্বাসের দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
পরাজয়ের পর লিংকন প্রশাসন জর্জ বি. ম্যাকক্লেলানকে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাহিনী পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেয়। তিনি প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, সরবরাহ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নত করে আর্মি অব দ্য পোটোম্যাক গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ বাড়ে। যুদ্ধ পরিচালনা এখন শুধু সৈন্য পাঠানোর বিষয় ছিল না; হাজারো মানুষের খাবার, পোশাক, অস্ত্র, ঘোড়া, চিকিৎসা এবং বেতন নিয়মিত জোগানোর ব্যবস্থা তৈরি করতে হচ্ছিল।
ভার্জিনিয়া মানুষের মনোযোগ ধরে রাখলেও পশ্চিমাঞ্চলে যুদ্ধের ভিন্ন সম্ভাবনা তৈরি হয়। টেনেসি ও কাম্বারল্যান্ড নদী দক্ষিণের অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ খুলে দিতে পারত। নদীতে গানবোট এগোলে সঙ্গে সৈন্য ও রসদও পরিবহন করা যেত। জেনারেল উইনফিল্ড স্কটের অবরোধ ও নদীপথ নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর ধারণা তাই ক্রমে বাস্তব সামরিক গুরুত্ব পেতে থাকে। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত শুধু শত্রুর রাজধানীর সামনে হবে না, তা স্পষ্ট হচ্ছিল।
পশ্চিমে উঠে আসছিলেন ইউলিসিস এস. গ্রান্ট। ১৮৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি টেনেসি নদীর ফোর্ট হেনরি দখলে ইউনিয়ন নৌবাহিনীর অ্যান্ড্রু এইচ. ফুটের গানবোটগুলো প্রধান ভূমিকা রাখে। বন্যায় বিপর্যস্ত দুর্গটি স্থলবাহিনীর মূল অংশ পৌঁছানোর আগেই আত্মসমর্পণ করে। এরপর গ্রান্ট কাম্বারল্যান্ড নদীর ফোর্ট ডোনেলসনের দিকে এগিয়ে যান। এখানে লড়াই ছিল কঠিনতর; কনফেডারেটরা পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করে।
১৬ ফেব্রুয়ারি ফোর্ট ডোনেলসন আত্মসমর্পণ করে এবং বহু হাজার কনফেডারেট সৈন্য বন্দি হন। গ্রান্টের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি তাঁকে উত্তরে পরিচিত করে তোলে। এই দুই দুর্গ হারানোর ফলে দক্ষিণের প্রতিরক্ষারেখা দুর্বল হয়; কেন্টাকি ও টেনেসির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ন্যাশভিলও ইউনিয়নের হাতে যায়। নদী, দুর্গ ও রেলপথের নিয়ন্ত্রণ যে পরস্পরসংযুক্ত, অভিযানটি তার কার্যকর উদাহরণ।
কনফেডারেট পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডার আলবার্ট সিডনি জনস্টন মিসিসিপির করিন্থে বাহিনী কেন্দ্রীভূত করেন। এটি ছিল দুটি গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের সংযোগস্থল। গ্রান্টের সৈন্যরা টেনেসি নদীপথে এগিয়ে পিটসবার্গ ল্যান্ডিংয়ের কাছে শিবির স্থাপন করে। কাছের ছোট কাঠের গির্জা শাইলো মিটিং হাউস থেকে পরবর্তী যুদ্ধের নাম হয় শাইলো। গ্রান্ট অপেক্ষা করছিলেন ডন কার্লোস বুয়েলের আর্মি অব দ্য ওহাইও এসে যোগ দেওয়ার জন্য।
জনস্টনের পরিকল্পনা ছিল, দুই ইউনিয়ন বাহিনী একত্র হওয়ার আগেই গ্রান্টকে আঘাত করা। বৃষ্টি, কর্দমাক্ত রাস্তা ও সৈন্য পরিচালনার সমস্যায় কনফেডারেট অগ্রযাত্রা বিলম্বিত হয়। তবু ৬ এপ্রিল ১৮৬২ ভোরে তারা ইউনিয়নের অগ্রবর্তী শিবিরগুলোতে আক্রমণ চালায়। কিছু টহল সংঘর্ষ ও সতর্কসংকেত থাকলেও ইউনিয়ন নেতৃত্ব বড় আক্রমণের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। শিবিরগুলোর সামনে শক্ত প্রতিরক্ষাব্যূহও গড়ে তোলা হয়নি।
প্রথম দিনের লড়াইয়ে বহু ইউনিয়ন ইউনিট পিছিয়ে যায়, কিন্তু সবাই একযোগে ভেঙে পড়েনি। উইলিয়াম টেকামসা শেরম্যানসহ বিভিন্ন কমান্ডারের সৈন্যরা বারবার নতুন অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ করেন। বন, ছোট খেত ও অসম ভূমিতে ইউনিটগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে লড়ছিল। পরে ‘হর্নেটস নেস্ট’ নামে পরিচিত এলাকায় কঠিন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। তবে শাইলোর পুরো যুদ্ধকে শুধু ওই অবস্থানের লড়াই দিয়ে ব্যাখ্যা করলে অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধগুলো আড়ালে পড়ে যায়।
বিকেলে জনস্টন পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান। এরপর বোরেগার্ড কমান্ড গ্রহণ করেন। কনফেডারেটরা অনেকটা অগ্রসর হলেও ইউনিয়ন বাহিনীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেনি। নদীর কাছাকাছি গ্রান্ট শেষ প্রতিরক্ষারেখা সংগঠিত করেন; কামান ও গানবোট সহায়তা দেয়। সন্ধ্যা নামার সময় আক্রমণকারীরাও ক্লান্ত, তাদের সারি বিশৃঙ্খল। দিনের অগ্রগতি দেখে বোরেগার্ড আশা করেছিলেন, পরদিন অবশিষ্ট প্রতিরোধ শেষ করা যাবে।
কিন্তু রাতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বুয়েলের সৈন্যরা নদী পার হয়ে যোগ দেয়, আর লিউ ওয়ালেসের ডিভিশনও পৌঁছায়। বৃষ্টি ও আহত মানুষের দুর্ভোগের মধ্যেই ইউনিয়ন বাহিনী পুনর্গঠিত হয়। ৭ এপ্রিল সকালে গ্রান্ট ও বুয়েলের সৈন্যরা পাল্টা আক্রমণ চালায়। দক্ষিণী বাহিনী কয়েক জায়গায় প্রতিরোধ করলেও আগের দিনের ক্ষয়ক্ষতি এবং নতুন ইউনিয়ন শক্তির চাপ সামলাতে পারেনি। বিকেলে বোরেগার্ড করিন্থের দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
দুই দিনের শাইলো যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রায় ২৩,৭০০ জন নিহত, আহত, বন্দি বা নিখোঁজ হন; নিহতের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন হাজারের কাছাকাছি। ক্ষয়ক্ষতির এই মাত্রা সাধারণ মানুষ ও সামরিক নেতৃত্বকে স্তম্ভিত করে। আহতদের সরানো, অস্ত্রোপচার, আশ্রয় এবং পরিচর্যার ব্যবস্থা বিপুল চাপের মুখে পড়ে। বিজয়ের খবরের সঙ্গে বাড়িতে পৌঁছাতে থাকে মৃত ও নিখোঁজ স্বজনের সংবাদ।
শাইলো ইউনিয়নের বিজয় হলেও দক্ষিণের প্রধান পশ্চিমাঞ্চলীয় বাহিনী ধ্বংস হয়নি। একইভাবে প্রথম বুল রানের কনফেডারেট বিজয়ও উত্তরের যুদ্ধক্ষমতা শেষ করেনি। পরাজিত পক্ষ নতুন সৈন্য এনে আবার লড়তে পারছিল—এটাই দীর্ঘ যুদ্ধের প্রধান বাস্তবতা। শিল্প, পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন, জনবল এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার গুরুত্ব তাই প্রতিটি অভিযানের সঙ্গে বাড়তে থাকে।
বুল রান স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের প্রত্যাশায় প্রথম আঘাত করেছিল; শাইলো দেখাল, বিজয়ও কত ভয়াবহ মূল্য দাবি করতে পারে। ১৮৬২ সালের বসন্তে যুদ্ধ এখন একাধিক রণাঙ্গনে বিস্তৃত। পশ্চিমে করিন্থের যোগাযোগব্যবস্থা দখলের প্রস্তুতি চলছিল, আর পূর্বে ম্যাকক্লেলানের বিশাল বাহিনী রিচমন্ডের দিকে এগোনোর উদ্যোগ নিচ্ছিল। আমেরিকা এমন এক যুদ্ধে প্রবেশ করেছে, যার সমাপ্তি কোনো এক বিকেলের বিজয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ম্যাগেলান ও এলকানোর বিশ্বপরিক্রমা: ১৫১৯–১৫২২ সালের ঐতিহাসিক অভিযান
বালবোয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর: ১৫১৩ সালের পানামা অভিযানের ইতিহাস
পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য: গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজ দখলের ইতিহাস
জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি: জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতা
মন্টেস্কু ও ভলতেয়ার: ক্ষমতার বিভাজন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
জন লক ও আধুনিক গণতন্ত্র: প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সম্মতি