মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কীভাবে কোটি মানুষের মধ্যে একটি মুখ খুঁজে পায়?
মুখের সংখ্যাভিত্তিক বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে সম্ভাব্য পরিচয় খোঁজে প্রযুক্তি।
- মুখ খুঁজে পাওয়া আর পরিচয় শনাক্ত করা আলাদা কাজ
- ছবি থেকে মুখের সংখ্যাভিত্তিক পরিচিতি তৈরি হয় কীভাবে?
- কোটি মুখের মধ্যে এত দ্রুত অনুসন্ধান সম্ভব হয় কেন?
- সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া মানেই সঠিক মানুষ নয়
- আলো, বয়স ও প্রশিক্ষণের তথ্য কেন ফল বদলে দেয়?
- নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার জন্য কোন পার্থক্যগুলো বোঝা জরুরি?
মুখ খুঁজে পাওয়া আর পরিচয় শনাক্ত করা আলাদা কাজ
ক্যামেরায় ধরা একটি মুখ থেকে কয়েক মুহূর্তে সম্ভাব্য পরিচয় বের করা বিস্ময়কর মনে হয়। কিন্তু মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি মানুষের মতো কাউকে দেখে স্মৃতি থেকে তার নাম মনে করে না। এটি ছবিকে সংখ্যাভিত্তিক বৈশিষ্ট্যে রূপান্তর করে এবং আগে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে।
শুরুতেই তিনটি কাজ আলাদা করা জরুরি। মুখের উপস্থিতি নির্ণয় হলো ছবির কোথায় মুখ আছে, তা খুঁজে বের করা। ক্যামেরায় মুখের চারপাশে চৌকো ঘর দেখা গেলেই পরিচয় শনাক্ত হয়েছে, এমন নয়।
পরিচয় যাচাইয়ে নতুন মুখকে নির্দিষ্ট একজনের সংরক্ষিত মুখের সঙ্গে তুলনা করা হয়। যেমন, কোনো হিসাবে প্রবেশ করতে আসা ব্যক্তি সেই হিসাবের মালিক কি না।
অন্যদিকে, পরিচয় অনুসন্ধানে একটি মুখকে অনেক মানুষের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে সম্ভাব্য মিল খোঁজা হয়। কোটি মানুষের মধ্যে মুখ খোঁজার প্রশ্নটি মূলত এই কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য না থাকলে ব্যবস্থা তার পরিচয় জাদুর মতো জানবে না। ভালো ব্যবস্থা প্রয়োজন হলে জানাতে পারে, গ্রহণযোগ্য কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
ছবি থেকে মুখের সংখ্যাভিত্তিক পরিচিতি তৈরি হয় কীভাবে?
প্রথমে ছবি বা ভিডিও থেকে মুখের অংশ আলাদা করা হয়। এরপর অনেক ব্যবস্থায় চোখ, নাক ও মুখের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নির্ণয় করে ছবির আকার ও কৌণিক অবস্থান সামঞ্জস্য করা হয়। উদ্দেশ্য হলো তুলনার জন্য যতটা সম্ভব সামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদান তৈরি করা।
এতে ঝাপসা ছবিতে হারিয়ে যাওয়া তথ্য অবশ্য ফিরে আসে না। মুখের অর্ধেক দেখা গেলে যন্ত্র নিশ্চিতভাবে বাকি অর্ধেকের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করতে পারে না।
পরের ধাপে কাজ করে প্রশিক্ষিত স্নায়ুজাল। এটি মুখের ছবি থেকে কয়েকশ সংখ্যার একটি বিন্যাস তৈরি করতে পারে। এই বিন্যাস মুখটির বিভিন্ন শেখা বৈশিষ্ট্যের গাণিতিক প্রতিনিধিত্ব করে।
সংখ্যাগুলো শুধু চোখের দূরত্ব বা নাকের দৈর্ঘ্যের সরল তালিকা নয়। আধুনিক ব্যবস্থা ছবির জটিল গঠন ও বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় শেখে। ফলে প্রতিটি সংখ্যা আলাদাভাবে মানুষের বোধগম্য কোনো অঙ্গের মাপ নির্দেশ করবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
একই ব্যক্তির ভিন্ন ছবির সংখ্যারূপ কাছাকাছি এবং ভিন্ন ব্যক্তির সংখ্যারূপ দূরে রাখার উদ্দেশ্যে মডেল প্রশিক্ষিত হয়। তবে এটি কোনো অব্যর্থ, অপরিবর্তনীয় পরিচয়সংখ্যা নয়। ছবি ও মডেল বদলালে প্রতিনিধিত্বও বদলাতে পারে।
কোটি মুখের মধ্যে এত দ্রুত অনুসন্ধান সম্ভব হয় কেন?
বড় সংগ্রহের প্রতিটি ছবি নতুন করে স্নায়ুজালের মধ্য দিয়ে চালাতে হলে অনুসন্ধান ব্যয়বহুল হতো। তাই সাধারণত নিবন্ধনের সময়ই ছবিগুলোর সংখ্যারূপ তৈরি করে সংরক্ষণ করা হয়। নতুন ছবি এলে প্রধানত তার প্রতিনিধিত্ব তৈরি করলেই চলে।
এরপর কাজটি হয়ে যায় সংখ্যার বিন্যাসগুলোর মধ্যে কাছাকাছি মিল খোঁজা। দুটি বিন্যাসের গাণিতিক দূরত্ব বা দিকের সাদৃশ্য দিয়ে তুলনা করা যায়।
দ্রুত অনুসন্ধানের জন্য তৈরি হয় বিশেষ সূচি। বিশাল গ্রন্থাগারে বিষয় অনুযায়ী বই সাজানোর মতো করে তথ্য এমনভাবে সংগঠিত করা হয়, যাতে প্রতিবার সব তথ্য সমানভাবে পরীক্ষা করতে না হয়।
কিছু পদ্ধতি সম্ভাব্য কাছাকাছি গুচ্ছে আগে খোঁজে। অন্য পদ্ধতিতে সংখ্যারূপগুলোর মধ্যে প্রতিবেশী সম্পর্ক ধরে ধাপে ধাপে উপযুক্ত অঞ্চলে পৌঁছানো হয়। শক্তিশালী গণনাযন্ত্র ও একসঙ্গে বহু তুলনা করার ব্যবস্থাও গতি বাড়ায়।
প্রয়োজনে প্রথম ধাপে অল্প কিছু সম্ভাব্য মিল বেছে নিয়ে পরে আরও নির্ভুল তুলনা করা হয়। তবে দ্রুততার বিনিময়ে কিছু আনুমানিক অনুসন্ধানপদ্ধতি প্রকৃত সেরা মিল বাদ দিতে পারে।
অনুসন্ধানের সময় তাই শুধু ছবির সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সূচির ধরন, যন্ত্রের ক্ষমতা, একসঙ্গে আসা অনুরোধ এবং কতটা নির্ভুল ফল চাওয়া হচ্ছে—সবই ভূমিকা রাখে। কোটি মুখের সংগ্রহ মানেই প্রতিটি ব্যবস্থা একই সময়ে ফল দেবে না।
সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া মানেই সঠিক মানুষ নয়
ধরা যাক, একটি নতুন মুখের সঙ্গে সংগ্রহের পাঁচটি মুখের তুলনামূলক বেশি মিল পাওয়া গেল। প্রথম স্থানে থাকা মুখটি অন্য চারটির চেয়ে কাছাকাছি হলেও সেটি সঠিক পরিচয়, এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্রকৃত ব্যক্তিটি সংগ্রহে অনুপস্থিত থাকলেও তুলনায় কাউকে না কাউকে সবচেয়ে কাছাকাছি পাওয়া সম্ভব। এজন্য একটি গ্রহণযোগ্যতার সীমা ব্যবহার করা হয়। মিলের মান সেই সীমা না পেরোলে ফল প্রত্যাখ্যান করা যায়।
সীমা কঠোর করলে ভিন্ন ব্যক্তিকে একই মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার ঝুঁকি কমতে পারে। কিন্তু তখন একই ব্যক্তির কিছু প্রকৃত মিলও বাদ পড়তে পারে। সীমা শিথিল করলে উল্টো সমস্যা দেখা দেয়।
এই দুই ভুল আলাদা: একজনকে অন্যজন হিসেবে মিলিয়ে ফেলা এবং একই ব্যক্তির দুটি ছবিকে আলাদা মানুষ ভাবা।
মিলের মান সরাসরি পরিচয় সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা নয়। কোনো ব্যবস্থায় উচ্চ মান পাওয়া মানেই সমপরিমাণ শতাংশ নিশ্চয়তা—এমন ব্যাখ্যা যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া করা যায় না।
বড় সংগ্রহে অসংখ্য প্রার্থীর মধ্যে দেখতে কাছাকাছি মুখ পাওয়ার সুযোগও বাড়ে। তাই দুটি ছবি তুলনার পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই কোটি মানুষের অনুসন্ধানে একই নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হয় না।
আলো, বয়স ও প্রশিক্ষণের তথ্য কেন ফল বদলে দেয়?
মুখ শনাক্তকরণের নির্ভুলতা ছবির মানের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। কম আলো, অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা, পাশ ফিরে থাকা মুখ, ঝাপসা দৃশ্য কিংবা মুখের অংশ ঢাকা থাকলে প্রয়োজনীয় তথ্য কমে যায়।
দূরের নজরদারি ক্যামেরায় ধরা ছোট মুখ এবং নিয়ন্ত্রিত আলোয় তোলা পরিচয়পত্রের ছবি তাই সমমানের উপাদান নয়। শুধু ছবি বড় করে দেখালেই হারিয়ে যাওয়া সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য ফিরে আসে না।
সময়ের ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ। শিশু বড় হলে, দীর্ঘদিন পর নতুন ছবি তুললে কিংবা মুখে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এলে তুলনা কঠিন হতে পারে। দেখতে খুব কাছাকাছি মানুষ বা যমজের ক্ষেত্রেও ভুলের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হয়।
প্রশিক্ষণের তথ্যের প্রতিনিধিত্বও জরুরি। বিভিন্ন বয়স, গাত্রবর্ণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মানুষের মধ্যে ভুলের হার সমান নাও হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ছবির মানের পার্থক্য, অন্য ক্ষেত্রে মডেলের শেখা বৈশিষ্ট্য ও প্রশিক্ষণের তথ্য ভূমিকা রাখে।
তাই একটি মাত্র “নির্ভুলতার হার” পুরো সক্ষমতা বোঝায় না। কোন জনগোষ্ঠী, কেমন ছবি, কত বড় সংগ্রহ এবং কোন গ্রহণযোগ্যতার সীমায় পরীক্ষা হয়েছে, তা জানা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার জন্য কোন পার্থক্যগুলো বোঝা জরুরি?
মুখ মিলে যাওয়া এবং ক্যামেরার সামনে জীবিত ব্যক্তি উপস্থিত থাকা দুটি আলাদা প্রশ্ন। কোনো ব্যবস্থা শুধু ছবি তুলনা করলে পর্দায় দেখানো ছবি বা অন্য উপস্থাপনার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সুরক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু ব্যবস্থায় গভীরতা, অবলোহিত তথ্য, চলাচল বা অন্যান্য সংকেত পরীক্ষা করা হয়। তবে সব মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় একই সুরক্ষা থাকে না; সব সুরক্ষাও সমান কার্যকর নয়।
একইভাবে ফোনে মুখ দিয়ে তালা খোলা মানেই মুখের তথ্য কোনো কোটি মানুষের কেন্দ্রীয় সংগ্রহে খোঁজা হচ্ছে না। নির্দিষ্ট যন্ত্রে তথ্য রেখে সীমিত যাচাই করা এবং দূরের সংগ্রহে পরিচয় অনুসন্ধান করা ভিন্ন ব্যবস্থা।
গোপনীয়তার প্রশ্নে জানতে হয়, ছবি ও সংখ্যারূপ কোথায় রাখা হচ্ছে, কারা ব্যবহার করতে পারছেন এবং কতদিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে। মুখের সংখ্যারূপকে সাধারণ, ঝুঁকিমুক্ত তথ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়; সেটি পরিচয় মেলানোর কাজে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য মিলকে অন্যান্য প্রমাণ দিয়ে যাচাই করা দরকার। এই প্রযুক্তির শক্তি হলো দ্রুত বিপুল তথ্য থেকে প্রার্থী খুঁজে আনা। সঠিক পরিচয়ের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে সেই ফলের মান, ব্যবহারের পরিস্থিতি এবং যথাযথ যাচাইয়ের ওপর।
টেলিস্কোপ কীভাবে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু দেখে? আলোর যাত্রা ও প্রযুক্তির বিজ্ঞান
নিউরাল নেটওয়ার্ক কীভাবে শেখে? মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে মিল ও পার্থক্য
রোবট কি ব্যথা অনুভব করতে পারবে? কৃত্রিম স্পর্শ ও ইলেকট্রনিক ত্বকের বিজ্ঞান
ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে? তার ছাড়া দুটি যন্ত্রে তথ্য পাঠানোর বিজ্ঞান
কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট কী? আইনস্টাইনের ‘ভৌতিক’ আপত্তি ও বিজ্ঞানের উত্তর
ডেটা সেন্টারের ভেতরে কী থাকে? ইন্টারনেটের অদৃশ্য অবকাঠামোর পরিচয়