বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফাইভজি কীভাবে কাজ করে? ফোরজির সঙ্গে গতি ও প্রযুক্তির পার্থক্য

ফাইভজি কীভাবে কাজ করে? ফোরজির সঙ্গে গতি ও প্রযুক্তির পার্থক্য
দ্রুত তথ্য আদানপ্রদান ও অধিক সংযোগের প্রযুক্তি ফাইভজি।

ফাইভজি আসলে কী এবং ফোনের তথ্য কোথায় যায়?

ফোনের পর্দায় ফাইভজি লেখা দেখলেই অনেকে ধরে নেন, ইন্টারনেট এবার অবিশ্বাস্য দ্রুত চলবে। কিন্তু পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্কের পরিবর্তন শুধু গতি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই এলাকায় বেশি যন্ত্রকে সংযোগ দেওয়া, তথ্য পৌঁছানোর বিলম্ব কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নেটওয়ার্কের সম্পদ ব্যবহার করাও এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

আপনি ফোনে কোনো ভিডিও চালু করলে অনুরোধটি প্রথমে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে কাছের ভিত্তিকেন্দ্রে পৌঁছায়। সেখান থেকে পরিবহন নেটওয়ার্ক ও অপারেটরের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পেরিয়ে সংশ্লিষ্ট তথ্যসেবকের কাছে যায়। ভিডিওর তথ্য একই ব্যবস্থায় ফিরে আসে।

ফোরজিতেও মূল যাত্রাপথ এমনই। ফাইভজি বদল আনে বেতার সংযোগের নিয়ম, অ্যান্টেনার ব্যবহার, তথ্য পাঠানোর সময়বিন্যাস এবং কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের গঠনে।

বেতার তরঙ্গ নিজে ইন্টারনেট নয়। এটি ফোন ও ভিত্তিকেন্দ্রের মধ্যকার তথ্য পরিবহনের মাধ্যম। টাওয়ারের পরের সংযোগ দুর্বল হলে কিংবা ভিডিও সরবরাহকারী ব্যবস্থা ধীর হলে উন্নত বেতার প্রযুক্তি একা সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

বেতার তরঙ্গ ও অ্যান্টেনার সাহায্যে গতি বাড়ে কীভাবে?

ফাইভজি নতুন বেতার সংযোগমান ব্যবহার করে। এতে উপলব্ধ বেতার বর্ণালিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বহু ব্যবহারকারীর তথ্য পাঠানো হয়। সময়, কম্পাঙ্ক ও সংকেতের বিন্যাস মিলিয়ে নেটওয়ার্ক নির্ধারণ করে, কে কখন কতটুকু সম্পদ পাবেন।

বেশি প্রশস্ত তথ্যপথ

একটি সরু রাস্তার তুলনায় চওড়া রাস্তায় একসঙ্গে বেশি যান চলতে পারে। একইভাবে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে বেশি প্রশস্ত বেতার চ্যানেল দিয়ে বেশি তথ্য পাঠানো যায়। ফাইভজিতে এমন প্রশস্ত চ্যানেল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে অপারেটরের হাতে পর্যাপ্ত বর্ণালি থাকতে হবে।

বহু অ্যান্টেনায় সমান্তরাল সংযোগ

আধুনিক ভিত্তিকেন্দ্রে অনেক অ্যান্টেনা উপাদান একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ব্যবহারকারীদের অবস্থান ও বেতার পথের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে একই সময়ে একাধিক তথ্যধারা পাঠানো সম্ভব হয়। এতে একই এলাকার মোট তথ্য পরিবহনের ক্ষমতা বাড়ে।

নির্দিষ্ট দিকে সংকেত কেন্দ্রীভূত করা

অ্যান্টেনা উপাদানগুলোর সংকেত সমন্বয় করে নির্দিষ্ট দিকে শক্তি বেশি কেন্দ্রীভূত করা যায়। এই পদ্ধতিতে কাঙ্ক্ষিত ব্যবহারকারীর সংকেত উন্নত হতে পারে এবং অন্য সংযোগে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ কমতে পারে।

তবে বহু অ্যান্টেনা বা নির্দেশিত সংকেতের ধারণা ফাইভজির একচেটিয়া আবিষ্কার নয়। উন্নত ফোরজিতেও এসবের ব্যবহার রয়েছে। ফাইভজিতে সেগুলো আরও ব্যাপক ও নমনীয়ভাবে কাজে লাগানো হয়।

সব ফাইভজির গতি ও কভারেজ এক রকম নয় কেন?

ফাইভজি কোন কম্পাঙ্কে চলছে, তার ওপর অভিজ্ঞতা অনেকখানি নির্ভর করে। শুধু প্রজন্মের নাম দেখে তাই গতি কিংবা ঘরের ভেতরের সংযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

নিম্ন কম্পাঙ্কের সংযোগ

নিম্ন কম্পাঙ্কের সংকেত সাধারণত দূরে পৌঁছাতে এবং ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে সুবিধা পায়। বিস্তৃত এলাকায় সেবা দেওয়ার জন্য এটি কার্যকর। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত প্রশস্ত বর্ণালি না থাকলে গতির উন্নতি সীমিত হতে পারে।

মধ্যম কম্পাঙ্কের সংযোগ

মধ্যম কম্পাঙ্কে কভারেজ ও তথ্য পরিবহনের ক্ষমতার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য পাওয়া যায়। বহু শহুরে নেটওয়ার্কে তাই এই অংশ গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত অ্যান্টেনা ও পর্যাপ্ত বর্ণালি থাকলে উল্লেখযোগ্য গতিবৃদ্ধি সম্ভব।

অতি উচ্চ কম্পাঙ্কের সংযোগ

মিলিমিটার তরঙ্গের মতো উচ্চ কম্পাঙ্কে খুব প্রশস্ত চ্যানেল ব্যবহার করা যায়। ফলে সীমিত এলাকায় বিপুল তথ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দেয়াল, গাছপালা ও অন্যান্য বাধায় সংকেত সহজে দুর্বল হতে পারে। কার্যকর কভারেজের জন্য কাছাকাছি আরও ভিত্তিকেন্দ্র প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ, ফাইভজি মানেই মিলিমিটার তরঙ্গ নয়। আবার উচ্চ কম্পাঙ্ক মানেই সব জায়গায় ভালো সংযোগও নয়। বিস্তৃত সেবা দিতে অপারেটররা বিভিন্ন কম্পাঙ্কের স্তর একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন।

ফোরজির তুলনায় গতি ও বিলম্ব কতটা বদলায়?

ফাইভজির আলোচনায় প্রতি সেকেন্ডে বিশ গিগাবিট গতির কথা শোনা যায়। এটি নির্দিষ্ট আদর্শ পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা মূল্যায়নের একটি মানদণ্ড; সাধারণ গ্রাহকের ফোনে সর্বক্ষণ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি নয়।

বাস্তব গতি নির্ভর করে বর্ণালির পরিমাণ, ব্যবহারকারীর ভিড়, ফোনের সক্ষমতা, সংকেতের মান এবং ভিত্তিকেন্দ্রের পরের সংযোগের ওপর। ভালো ফোরজি কখনো দুর্বল বা ব্যস্ত ফাইভজির চেয়েও দ্রুত হতে পারে। তাই ফাইভজি সব সময় নির্দিষ্ট সংখ্যক গুণ দ্রুত—এমন দাবি নির্ভরযোগ্য নয়।

গতি ও সাড়া দেওয়ার সময় আলাদা বিষয়। গতি বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ে কত তথ্য আদানপ্রদান হচ্ছে। বিলম্ব বোঝায় তথ্য পৌঁছাতে কত সময় লাগছে। বড় নথি নামাতে বেশি গতি সাহায্য করে; অনলাইন খেলায় দ্রুত সাড়া পেতে কম বিলম্ব জরুরি।

ফাইভজির বিশেষ নির্ভরযোগ্য ও কম বিলম্বের যোগাযোগে এক মিলিসেকেন্ডের বেতার বিলম্বের মানদণ্ড রয়েছে। এটি ফোন থেকে দূরের তথ্যসেবক ঘুরে ফিরে আসার সম্পূর্ণ সময় নয়। মাঝের পথ, যন্ত্রের প্রক্রিয়াকরণ ও তথ্যসেবকের অবস্থান সেই সময় বাড়ায়।

আরেকটি পার্থক্য হলো ঘন এলাকায় বেশি সংযোগ সামলানোর সম্ভাবনা। তবে অসংখ্য ছোট সংবেদকের সামান্য তথ্য পাঠানো এবং হাজারো ফোনে একসঙ্গে উচ্চমানের ভিডিও চালানো এক ধরনের চাহিদা নয়। সংযোগসংখ্যা ও প্রত্যেকের গতি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।

ফোনে ফাইভজি দেখালেও সম্পূর্ণ সুবিধা নাও মিলতে পারে

সব ফাইভজি নেটওয়ার্কের ভেতরের কাঠামো এক নয়। কোনো ব্যবস্থায় নতুন বেতার সংযোগের সঙ্গে ফোরজির কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। এতে বিদ্যমান অবকাঠামোর সাহায্যে তুলনামূলক দ্রুত নতুন সেবা চালু করা যায়।

অন্য ব্যবস্থায় ফাইভজির নিজস্ব কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক থাকে। এটি উন্নত সেবা পরিচালনা, কম বিলম্বের যোগাযোগ এবং আলাদা প্রয়োজনের জন্য নেটওয়ার্কের সম্পদ সাজানোর ভিত্তি তৈরি করে।

এক নেটওয়ার্কে ভিন্ন সেবার ব্যবস্থা

একটি কারখানার নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের দরকার হতে পারে নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সাড়া। অন্যদিকে ভিডিও দেখা ব্যবহারকারীর দরকার বেশি তথ্য পরিবহনের ক্ষমতা। উপযুক্ত ব্যবস্থায় একই ভৌত অবকাঠামোর ওপর এসব চাহিদার জন্য পৃথক যৌক্তিক সেবা তৈরি করা যায়।

তবে নিজস্ব ফাইভজি কেন্দ্র থাকলেই সব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয় না। অপারেটরকে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হয় এবং গ্রাহকের যন্ত্রেও সমর্থন থাকতে হয়।

একইভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবহারকারীর কাছাকাছি আনা হলে বিলম্ব কমতে পারে। কিন্তু দূরের তথ্যসেবক ব্যবহার করা সেবায় শুধু ফোনের সংযোগ বদলালেই সেই দূরত্ব মুছে যায় না।

সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে পার্থক্য কোথায় বোঝা যাবে?

বড় নথি নামানো, উচ্চমানের ভিডিও পাঠানো, ভিড়ের মধ্যে সংযোগ ব্যবহার এবং উপযুক্ত এলাকায় বেতারভিত্তিক ঘরোয়া ইন্টারনেটে ফাইভজির সুবিধা স্পষ্ট হতে পারে। সাধারণ বার্তা পাঠানো বা হালকা ওয়েবসাইট দেখার ক্ষেত্রে ভালো ফোরজি ও ফাইভজির পার্থক্য তুলনামূলক কম বোঝা স্বাভাবিক।

সুবিধা পেতে ফোনে অপারেটরের ব্যবহৃত কম্পাঙ্ক ও প্রযুক্তির সমর্থন থাকতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্থানে সেবা, উপযুক্ত গ্রাহক সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সক্রিয় থাকা দরকার। শুধু ফোনের বিজ্ঞাপনে ফাইভজি লেখা যথেষ্ট নয়।

দ্রুত সংযোগ মানেই একই নথি নামাতে বেশি তথ্য খরচ হবে, এমনও নয়। নথির আকার অপরিবর্তিত থাকে। তবে ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি মানে চললে বা ব্যবহার বাড়লে মোট তথ্য খরচ বাড়তে পারে।

ফাইভজির আসল পার্থক্য বোঝার জন্য তাই তিনটি প্রশ্ন জরুরি: আপনার এলাকায় কী ধরনের সেবা আছে, ব্যবহারের সময় কতটা ভিড় থাকে এবং আপনার কাজের জন্য কোন সুবিধাটি দরকার? প্রজন্মের নাম সম্ভাবনা জানায়; বাস্তব অবকাঠামো ও ব্যবহারপরিস্থিতি নির্ধারণ করে আপনি সেই সম্ভাবনার কতটুকু পাবেন।


আপনার পছন্দ হতে পারে