পেদ্রো আলভারেস কাবরাল ও ব্রাজিল: ১৫০০ সালের অভিযান ও উপনিবেশের সূচনা
সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান
ভারতমুখী কাবরালের বহর ব্রাজিলে পৌঁছে দক্ষিণ আমেরিকায় পর্তুগিজ দাবির ভিত্তি তৈরি করে।
আমেরিগো ভেসপুচির বিবরণ ও ইউরোপীয় মানচিত্রে পশ্চিমের ভূখণ্ডের নতুন পরিচয় গড়ে ওঠার পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ছিল। সেই ঘটনার সূত্রপাত বুঝতে ফিরতে হবে ১৫০০ সালে। পর্তুগালের উদ্দেশ্য তখন আফ্রিকা ঘুরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সুসংহত করা। অথচ ভারতমুখী একটি বহর আটলান্টিক পেরিয়ে এমন উপকূলে পৌঁছায়, যা ভবিষ্যতে পর্তুগালের বৃহত্তম উপনিবেশ হবে। পেদ্রো আলভারেস কাবরালের ব্রাজিল আগমন দেখায়, এশিয়ামুখী বাণিজ্য ও আমেরিকায় সম্প্রসারণ শুরু থেকেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ভাস্কো দা গামার প্রথম যাত্রা প্রমাণ করেছিল, সমুদ্রপথে ভারত যাওয়া সম্ভব। কিন্তু কালিকটে তাঁর বাণিজ্যিক আলোচনা প্রত্যাশামতো সফল হয়নি। রাজা প্রথম মানুয়েল তাই পরবর্তী অভিযানে আরও বড় বহর পাঠান। ৯ মার্চ ১৫০০ সালে কাবরালের নেতৃত্বে তেরোটি জাহাজ লিসবন ছাড়ে। বহরে ছিলেন অভিজ্ঞ নৌপরিচালক, সৈনিক, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি এবং ধর্মযাজক। লক্ষ্য ছিল ভারতের বন্দরে স্থায়ী বাণিজ্যিক উপস্থিতি তৈরি করা এবং প্রয়োজনে রাজকীয় শক্তি প্রদর্শন করা।
কাবরাল অভিজাত পরিবারের সদস্য হলেও তাঁর আগের সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তথ্য সীমিত। তাই পুরো অভিযানের দক্ষতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নৌজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বহরে বার্তোলোমেউ দিয়াশের মতো অভিজ্ঞ অভিযাত্রীও ছিলেন। নাবিকেরা জানতেন, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণে যাওয়ার চেয়ে আটলান্টিকের ভেতরে ঘুরে অনুকূল বাতাস ধরা কার্যকর হতে পারে। ব্রাজিলে পৌঁছানোর ঘটনাটি এই বৃহত্তর দক্ষিণ আটলান্টিক নৌকৌশলের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হয়।
তবে বহর এত পশ্চিমে কেন গেল, তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। একটি ব্যাখ্যা হলো, আফ্রিকামুখী প্রচলিত ঘুরপথ অনুসরণ করতে গিয়ে তারা প্রত্যাশার চেয়ে পশ্চিমে চলে যায়। অন্য ব্যাখ্যায় পূর্বপরিকল্পিত অনুসন্ধানের সম্ভাবনা উঠে আসে। কিন্তু পর্তুগিজ রাজদরবার নিশ্চিতভাবে ব্রাজিলের অবস্থান জানত এবং কাবরালকে গোপনে সেটি দখল করতে পাঠিয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তের অকাট্য প্রমাণ নেই। আবার কোনো ঝড় তাঁকে আকস্মিকভাবে ব্রাজিলে ছুড়ে দিয়েছিল, এমন সরল গল্পও নির্ভরযোগ্য নয়।
২২ এপ্রিল ১৫০০ সালে বহর বর্তমান ব্রাজিলের বাহিয়া অঞ্চলের উপকূল দেখতে পায়। প্রথম দৃশ্যমান উঁচু ভূমির নাম দেওয়া হয় মঁতি পাসকোয়াল, ইস্টার উৎসবের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে। এরপর উপকূলের কাছাকাছি এসে নোঙর এবং তীরে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমান পোর্তু সেগুরু ও সান্তা ক্রুজ কাব্রালিয়া অঞ্চলের সঙ্গে এই অবস্থান জড়িত। পর্তুগিজদের কাছে অপরিচিত হলেও ভূখণ্ডটি মানুষের উপস্থিতিবিহীন ছিল না।
সেখানে বহু আগে থেকেই আদিবাসী সমাজের বসতি ছিল। কাবরালের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া মানুষদের সাধারণত তুপি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর পরিসরে চিহ্নিত করা হয়; তাঁদের নির্দিষ্ট পরিচয় নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। তাঁরা মাছ ধরা, চাষাবাদ, অরণ্যের সম্পদ ব্যবহার এবং সামাজিক সম্পর্কের নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করতেন। পর্তুগিজদের আগমন ব্রাজিলের মানুষের ইতিহাসের সূচনা নয়; এটি ছিল ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের একটি নির্ণায়ক সূচনা।
প্রথম যোগাযোগে কৌতূহল, ইশারা এবং ছোটখাটো বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভাষা বোঝা না যাওয়ায় উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যায় ভুলের সুযোগ ছিল প্রচুর। ইউরোপীয়রা স্থানীয় মানুষের আচরণকে নিজেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বুঝতে চাইতেন। কোনো অলংকার বা ইশারা দেখে সোনা থাকার সম্ভাবনা অনুমান করা হতো। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ স্থানীয় সমাজের রাজনীতি, বিশ্বাস কিংবা সম্পদের যথার্থ ধারণা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
এই ঘটনাগুলোর সবচেয়ে পরিচিত বিবরণ লিখেছিলেন বহরের লেখক পেরো ভাজ দে কামিনিয়া। রাজা মানুয়েলকে পাঠানো তাঁর চিঠিতে উপকূল, মানুষ এবং সাক্ষাতের বিস্তারিত রয়েছে। চিঠিটি অমূল্য হলেও নিরপেক্ষ ক্যামেরার মতো নয়। কামিনিয়া যা দেখেছিলেন, তা লিখেছিলেন রাজকীয় সেবা ও খ্রিস্টীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর থেকে। আদিবাসীদের ধর্মান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর আগ্রহ দেখায়, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের মধ্যেই ভবিষ্যৎ কর্তৃত্বের ধারণা উপস্থিত ছিল।
পর্তুগিজরা ভূখণ্ডকে ভেরা ক্রুজ এবং পরে সান্তা ক্রুজ নামের সঙ্গে যুক্ত করে। ক্রুশ স্থাপন ও খ্রিস্টীয় উপাসনা রাজকীয় উপস্থিতির প্রতীক হয়ে ওঠে। ২৬ এপ্রিল প্রথম মিসা অনুষ্ঠিত হয়, ফ্রেই এনরিক দে কোইম্ব্রার পরিচালনায়। স্থানীয় মানুষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও সেটিকে পর্তুগিজ কর্তৃত্বে তাঁদের সম্মতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। ইউরোপীয়দের প্রতীকী দাবি এবং আদিবাসীদের নিজের ভূখণ্ডের অধিকার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় ছিল।
এই দাবি শক্তিশালী করার জন্য আগে থেকেই একটি কূটনৈতিক ব্যবস্থা ছিল: ১৪৯৪ সালের টরডেসিলাস চুক্তি। কাবরালের পাওয়া পূর্ব ব্রাজিলীয় উপকূল পর্তুগালের দাবিক্ষেত্রের মধ্যে পড়ছিল। ফলে স্পেনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পর্তুগাল নিজের অবস্থানের যুক্তি পায়। তবে চুক্তিটি আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পাদিত হয়নি। আর সমুদ্রে বিভাজনরেখা নির্ভুলভাবে মাপার সীমাবদ্ধতা থাকায় পুরো ভূখণ্ডের সীমানাও তখন নিশ্চিত ছিল না।
কাবরাল সেখানে স্থায়ী শহর প্রতিষ্ঠা করেননি। প্রায় দশ দিনের অবস্থান শেষে সংবাদবাহী একটি জাহাজ পর্তুগালে পাঠানো হয়; মূল বহর ভারতের দিকে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ ১৫০০ সালের আগমন ছিল রাজকীয় দাবি ও যোগাযোগের সূচনা, পূর্ণাঙ্গ বসতি-উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা নয়। পর্তুগালের প্রধান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তখনও এশিয়ার মসলার বাণিজ্য। ব্রাজিলের সম্পদ কী এবং তা কীভাবে লাভজনক করা যাবে, সেই অনুসন্ধান তখন শুরু হচ্ছে।
ভারতমুখী পরবর্তী যাত্রা বিপর্যয়হীন ছিল না। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কাছে ঝড়ে বহরের একাধিক জাহাজ হারিয়ে যায়; বার্তোলোমেউ দিয়াশও প্রাণ হারান। কালিকটে পৌঁছে পর্তুগিজ বাণিজ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সংঘর্ষে গড়ায় এবং বহু পর্তুগিজ নিহত হন। কাবরাল পাল্টা আক্রমণ চালান, পরে কোচিনে বাণিজ্যিক সহযোগিতা পান। এই ঘটনাপ্রবাহ মনে করিয়ে দেয়, ব্রাজিলে পৌঁছানোর পরও বহরটির মূল কর্মসূচি ছিল ভারত মহাসাগরেই।
ব্রাজিলে পরবর্তী অভিযানগুলো উপকূল সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ায়। দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পাউ-ব্রাজিল বা ব্রাজিলকাঠ, যার লাল রঞ্জক ইউরোপীয় বস্ত্রশিল্পে মূল্যবান ছিল। ধীরে ধীরে কাঠটির নাম থেকেই ভূখণ্ডের ‘ব্রাজিল’ নাম প্রচলিত হয়। প্রথম দিকে উপকূলীয় বাণিজ্যকেন্দ্র ও অস্থায়ী স্থাপনা যথেষ্ট মনে করা হয়েছিল। বন থেকে কাঠ সংগ্রহ, কাটা এবং জাহাজ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে স্থানীয় মানুষের শ্রম ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই সম্পর্ককে কেবল ইউরোপীয় আধিপত্যের একমুখী ছবি হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব স্বার্থ ছিল; তারা লোহার সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্যের বিনিময়ে সহযোগিতা করত এবং নিজেদের আঞ্চলিক সম্পর্কেও বিদেশিদের ব্যবহার করত। কিন্তু বিনিময় বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতারণা, সংঘর্ষ ও মানুষ বন্দি করার ঘটনাও বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপীয় উপস্থিতি আদিবাসীদের জমি, স্বাধীনতা ও জীবনব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করে।
ফরাসি ব্যবসায়ীদের ব্রাজিলীয় উপকূলে উপস্থিতি পর্তুগালের জন্য নতুন উদ্বেগ হয়ে ওঠে। শুধু চুক্তির দাবি দেখিয়ে অন্যদের ঠেকানো সম্ভব ছিল না। ১৫৩০ সালে মার্তিম আফোঁসো দে সৌজার অভিযান, পরে বংশানুক্রমিক ক্যাপ্টেনসি ব্যবস্থা এবং ১৫৪৯ সালে কেন্দ্রীয় গভর্নর-জেনারেলের শাসন স্থাপন অধিক সংগঠিত উপনিবেশায়নের ধাপ। চিনির বাগান, জমি দখল এবং প্রথমে আদিবাসী ও ক্রমে বিপুলসংখ্যক দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকানের শ্রম সেই অর্থনীতি গড়ে তোলে।
কাবরালের ১৫০০ সালের অভিযানের গুরুত্ব তাই একটি দিনের অবতরণে সীমিত নয়। তাঁর বহর এমন যোগাযোগ ও রাজকীয় দাবির ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা কয়েক দশকে স্থায়ী উপনিবেশে রূপ নেয়। কিন্তু আজকের ব্রাজিলের বিশাল সীমানা কিংবা সমাজ সেদিনই নির্ধারিত হয়নি। সমুদ্রের ওপারের ভূমিকে মানচিত্রে চিহ্নিত করা থেকে সেখানে জমি, শ্রম ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের এই রূপান্তরই আবিষ্কারের যুগকে উপনিবেশ বিস্তারের যুগে নিয়ে যায়।
ওয়াটারলুর যুদ্ধ: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের কাছে নেপোলিয়ন কেন পরাজিত হন?
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও হান্ড্রেড ডেজ: নেপোলিয়নের আবার ক্ষমতা দখল
নেপোলিয়নের প্রথম পতন: ১৮১৪ সালে ফ্রান্স আক্রমণ, সিংহাসনত্যাগ ও এলবা নির্বাসন
কলম্বাসের আমেরিকা অভিযান: ১৪৯২ সালে ভারত খুঁজতে আটলান্টিক পাড়ি
বার্তোলোমেউ দিয়াশের অভিযান: ১৪৮৮ সালে উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম
পর্তুগালের সমুদ্র অভিযান: প্রিন্স হেনরি ও আফ্রিকার উপকূল অনুসন্ধান