ফরাসি বিপ্লবে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র: গির্জার সংস্কার, ভারেন ও ১৭৯১ সালের সংবিধান
সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব
সংবিধানে বাঁধা রাজক্ষমতা টিকল না ধর্মীয় বিভাজন, অবিশ্বাস ও যুদ্ধের চাপে।
রাজপরিবারকে প্যারিসে নিয়ে আসার পর বিপ্লবীদের সামনে কাজ ছিল ঘোষিত অধিকারকে স্থায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দেওয়া। ১৭৮৯ সালের অক্টোবরে তুইলেরি প্রাসাদে বসবাস শুরু করা ষোড়শ লুই তখনও রাজা, কিন্তু তাঁর চারপাশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। জাতীয় পরিষদ আইন তৈরি করছে, সংবাদপত্র রাজদরবারের সমালোচনা করছে, আর রাজধানীর জনতা রাজপরিবারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। সংস্কারপন্থী অধিকাংশ প্রতিনিধি তখনও বিশ্বাস করতেন, সংবিধানের অধীনে রাজাকে রেখেই বিপ্লবের অর্জন রক্ষা করা সম্ভব।
এই পরিকল্পনায় রাজা হবেন নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান, কিন্তু আইন ও জাতীয় প্রতিনিধিত্বের ঊর্ধ্বে থাকবেন না। পুরোনো প্রাদেশিক বিভাজনের পরিবর্তে বিভাগভিত্তিক প্রশাসন, নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং নতুন বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছিল। জন্মগত বিশেষাধিকারের জায়গায় সমান নাগরিক আইনের নীতি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। তবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টার মধ্যেই এমন একটি ক্ষেত্রে পরিষদ হস্তক্ষেপ করে, যা মানুষের বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাজার বিবেকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল—ক্যাথলিক গির্জা।
গির্জার সংস্কারের প্রথম বড় পদক্ষেপটির পেছনে ছিল অর্থসংকট। ১৭৮৯ সালের ২ নভেম্বর পরিষদ চার্চের সম্পত্তি জাতির ব্যবহারের অধীনে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। বিনিময়ে রাষ্ট্র ধর্মীয় সেবা, যাজকদের ভরণপোষণ এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এই সম্পত্তির ভিত্তিতে আসিনিয়া নামে আর্থিক দলিল চালু হয়, যা পরে কাগুজে মুদ্রার ভূমিকাও নেয়। চার্চের জমি রাষ্ট্রের ঋণসংকট সামলানোর সম্পদ হয়ে ওঠে, আর সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে বিপ্লবী ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন মালিকদের স্বার্থ জড়িয়ে যায়।
কিন্তু জমির মালিকানা বদলানোর চেয়েও গভীর বিভাজন তৈরি করে ১৭৯০ সালের ১২ জুলাই গৃহীত যাজকদের বেসামরিক সংবিধান। এতে ধর্মপ্রদেশের সীমানাকে নতুন প্রশাসনিক বিভাগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়, বহু পদ পুনর্গঠিত হয় এবং বিশপ ও প্যারিশযাজক নির্বাচনের ব্যবস্থা আসে। নির্বাচকমণ্ডলী শুধু ক্যাথলিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পোপের নিয়ন্ত্রণও সংকুচিত হয়। সংস্কারকদের চোখে এটি ছিল জাতীয় প্রশাসনের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস; বহু বিশ্বাসীর কাছে ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্বে রাষ্ট্রের অনধিকার প্রবেশ।
পরিস্থিতি আরও কঠিন হয় যখন যাজকদের নতুন ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বলা হয়। প্রায় অর্ধেক প্যারিশযাজক শপথ গ্রহণ করেন, কিন্তু অঞ্চলভেদে পার্থক্য ছিল ব্যাপক; বিশপদের প্রায় সবাই তা প্রত্যাখ্যান করেন। শপথগ্রহণকারী এবং শপথপ্রত্যাখ্যানকারী যাজকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়। ১৭৯১ সালে পোপের নিন্দা এই বিরোধকে আরও তীব্র করে। গ্রামের মানুষের কাছে প্রশ্নটি শুধু রাজনীতি ছিল না: কার পরিচালিত উপাসনা বৈধ, কাকে বিশ্বাস করা যাবে, কিংবা পরিচিত যাজককে কেন সরানো হচ্ছে?
ষোড়শ লুই ছিলেন আন্তরিক ক্যাথলিক। তিনি সংস্কারের কিছু সিদ্ধান্ত অনুমোদন করলেও ধর্মীয় পরিবর্তন নিয়ে গভীর আপত্তি পোষণ করতেন। রাজাকে বিপ্লবের সঙ্গে সমঝোতায় আনার চেষ্টা তাই তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। একই সময়ে দেশত্যাগী অভিজাতদের তৎপরতা এবং বিদেশি রাজদরবারের সঙ্গে যোগাযোগ সন্দেহ বাড়ায়। রাজা প্রকাশ্যে নতুন ব্যবস্থার অংশ, অথচ অন্তরে তা মানছেন কি না—এই প্রশ্ন সাংবিধানিক সমঝোতার ভিত্তিকে দুর্বল করতে থাকে।
১৭৯১ সালের ২০ জুন রাতে রাজপরিবার গোপনে প্যারিস ত্যাগ করে। পরিকল্পনা ছিল পূর্ব সীমান্তের কাছে মোঁমেদির দিকে পৌঁছে অনুগত সেনাবাহিনীর সুরক্ষা নেওয়া। তাই ঘটনাটিকে শুধু বিদেশে পালানোর চেষ্টা বলা যথাযথ নয়; উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবী রাজধানীর চাপমুক্ত অবস্থান থেকে রাজনৈতিক শক্তি ফিরে পাওয়া। তবে সীমান্তমুখী গোপন যাত্রা এবং সামরিক সহায়তার প্রত্যাশা জনতার চোখে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
বড় গাড়ি, যাত্রায় বিলম্ব এবং সমন্বয়ের ব্যর্থতায় পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। সাঁত-মেনেউলদে ডাক বিভাগের কর্মী জ্যঁ-বাতিস্ত দ্রুয়ে রাজাকে চিনতে পারেন এবং সতর্কবার্তা পৌঁছে দেন। ২১ জুন রাতে ভারেনে রাজপরিবারের যাত্রা থামানো হয়। পরে তাঁদের প্যারিসে ফিরিয়ে আনা হয়। রাজার রেখে যাওয়া ঘোষণায় বিপ্লবী পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল; ফলে তিনি স্বেচ্ছায় নতুন ব্যবস্থাকে সমর্থন করছেন—এমন ধারণা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভারেনের পলায়নচেষ্টা রাজতন্ত্রের সংকটকে ব্যক্তিগত অবিশ্বাসের সংকটে পরিণত করে। এতদিন অনেকে রাজার চারপাশের উপদেষ্টা বা রানিকে দোষ দিয়ে তাঁকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। এবার তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত সামনে আসে। তবু পরিষদের মধ্যপন্থী নেতারা রাজতন্ত্র বজায় রাখতে চান। তাঁরা আশঙ্কা করছিলেন, রাজাকে সরালে গণআন্দোলন আরও তীব্র হবে এবং রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে প্রজাতন্ত্রের দাবি আগের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেতে থাকে।
এই বিভাজন প্রকাশ্য হয় ১৭৯১ সালের ১৭ জুলাই শঁ দ্য মার্সে। রাজাকে অপসারণের দাবিতে আবেদন সমর্থন করতে মানুষ সমবেত হলে উত্তেজনা ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সামরিক আইন জারি করা হয়। বাইয়ি ও লাফায়েতের কর্তৃত্বাধীন জাতীয় রক্ষীবাহিনী গুলি চালায়; বহু মানুষ নিহত হন। নিহতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও রাজনৈতিক ফল স্পষ্ট ছিল। সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সমর্থক এবং আরও গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকামীদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে; জ্যাকোবিনদের মধ্য থেকেও ফইয়াঁ গোষ্ঠী আলাদা হয়ে যায়।
এই অবিশ্বাসের মধ্যেই ১৭৯১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সংবিধান সম্পন্ন হয়; সেপ্টেম্বরে রাজা তা গ্রহণ করেন। এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আইন প্রণয়ন করবে, রাজা নির্বাহী বিভাগের প্রধান থাকবেন এবং মন্ত্রীরা তাঁর মাধ্যমে নিযুক্ত হবেন। রাজাকে সাময়িকভাবে আইন আটকে দেওয়ার স্থগিতকারী ভেটো দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি আইনসভা ভেঙে দিতে পারতেন না। ব্যবস্থাটি ক্ষমতা ভাগ করেছিল, অথচ রাজা ও আইনসভার মধ্যে আস্থার অভাব মেটানোর কার্যকর রাজনৈতিক পথ তৈরি করতে পারেনি।
সংবিধান সর্বজনীন ভোটাধিকারও প্রতিষ্ঠা করেনি। নির্দিষ্ট বয়স, কর প্রদান ও অন্যান্য শর্ত পূরণকারী পুরুষেরা ‘সক্রিয় নাগরিক’ হিসেবে ভোটের সুযোগ পান; নির্বাচন ছিল পরোক্ষ। নারীরা রাজনৈতিক ভোটাধিকার থেকে বাদ পড়েন। ফলে অধিকার ঘোষণার সর্বজনীন ভাষার সঙ্গে বাস্তব অংশগ্রহণের সীমার ব্যবধান থেকে যায়। অক্টোবরের নতুন আইনসভাকে এমন একটি রাজতন্ত্র পরিচালনা করতে হয়, যার রাজা সন্দেহভাজন এবং যার বাইরে শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্লাব, সংবাদপত্র ও জনআন্দোলন সক্রিয়।
১৭৯২ সালের এপ্রিলে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই দুর্বল ব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে। যুদ্ধসমর্থকদের উদ্দেশ্য এক ছিল না: কেউ বিপ্লব রক্ষা ও বিস্তার করতে চেয়েছিলেন, আবার রাজদরবারের হিসাব ছিল ভিন্ন। প্রাথমিক সামরিক বিপর্যয় এবং রাজার ভেটো তাঁকে শত্রুর সহযোগী বলে সন্দেহ করার সুযোগ বাড়ায়। ব্রান্সউইকের ঘোষণায় রাজপরিবারের ক্ষতি হলে প্যারিসকে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়; এতে রাজাকে রক্ষার বদলে জনতার ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।
১০ আগস্ট ১৭৯২ প্যারিসের বিদ্রোহী জনতা ও প্রদেশ থেকে আসা সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবকেরা তুইলেরি আক্রমণ করলে রাজক্ষমতা স্থগিত করা হয়। সেপ্টেম্বরে জাতীয় কনভেনশন রাজতন্ত্র বিলোপ করে। ১৭৯১ সালের সংবিধান ব্যর্থ হয়েছিল শুধু তার ধারার দুর্বলতায় নয়; ধর্মীয় বিভাজন, রাজার বিশ্বাসযোগ্যতার পতন, সীমিত প্রতিনিধিত্ব এবং যুদ্ধের চাপে তার রাজনৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়েছিল। রাজাকে সংবিধানের মধ্যে রাখার চেষ্টা শেষ হয় তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। এবার বিপ্লবকে নির্ধারণ করতে হবে, রাজাহীন ফ্রান্সের শাসন কেমন হবে এবং ক্ষমতাচ্যুত রাজার বিচার কীভাবে চলবে।
অ্যাঞ্জেল ফলস: পৃথিবীর সর্বোচ্চ জলপ্রপাতের পানি এত উঁচু থেকে নামে কীভাবে?
তাকলামাকান মরুভূমি: বালুর সমুদ্রের নিচে হারানো নগর ও প্রাচীন মানুষের ইতিহাস
প্যাটাগোনিয়া: দক্ষিণ আমেরিকার বন্য ভূখণ্ড এত অসাধারণ কেন?
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের পর পুনর্নির্মাণ: ক্রিস্টোফার রেন, সেন্ট পলস ও অগ্নিনিরাপত্তা
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডে দ্বিতীয় চার্লস: আগুন নিয়ন্ত্রণ, জনদুর্দশা ও অগ্নিসংযোগের গুজব
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের চার দিন: সেন্ট পলসসহ হাজারো বাড়ি ধ্বংসের ইতিহাস