বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডে দ্বিতীয় চার্লস: আগুন নিয়ন্ত্রণ, জনদুর্দশা ও অগ্নিসংযোগের গুজব

সিরিজ: লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ড (১৬৬৬)

লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডে দ্বিতীয় চার্লস: আগুন নিয়ন্ত্রণ, জনদুর্দশা ও অগ্নিসংযোগের গুজব
আগুনের পাশাপাশি ক্ষুধা, গৃহহীনতা ও গুজবের সংকটে পড়েছিল লন্ডন।

আগুনের বিস্তার কমে আসার পর লন্ডনের সামনে যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছিল, তা শুধু নতুন বাড়ি নির্মাণের ছিল না। ঘরহারা মানুষের খাবার কোথা থেকে আসবে, উদ্ধার করা মালপত্র কোথায় রাখা হবে, আর আতঙ্কিত জনতাকে কীভাবে শান্ত করা যাবে—এসবের উত্তরও জরুরি হয়ে উঠেছিল। রাজা দ্বিতীয় চার্লসের ভূমিকা তাই আগুন নেভানোর নির্দেশে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁকে একই সঙ্গে উদ্ধার, খাদ্য সরবরাহ ও জনশৃঙ্খলার সংকট সামলাতে হয়েছিল। তবে তাঁর উদ্যোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে রাজকীয় ক্ষমতা এবং বাস্তবে সেই ক্ষমতা কার্যকর করার সীমাবদ্ধতা আলাদা করে দেখতে হয়।

১৬৬৬ সালের লন্ডনের প্রশাসন আজকের কেন্দ্রীয় জরুরি ব্যবস্থাপনার মতো ছিল না। সিটি অব লন্ডনের নিজস্ব কর্তৃপক্ষ, লর্ড মেয়র, অ্যাল্ডারম্যান এবং স্থানীয় প্যারিশভিত্তিক দায়িত্ব ছিল। আগুন লাগলে প্রথম প্রতিক্রিয়া আসার কথা এই স্থানীয় কাঠামো থেকে। রাজা দেশের শাসক হলেও তাঁর হাতে প্রস্তুত অবস্থায় আধুনিক দমকল বাহিনী ছিল না। ফলে আদেশ দেওয়া এবং সেই আদেশ কার্যকর করতে প্রশিক্ষিত লোক, উপযুক্ত সরঞ্জাম ও নিরাপদ প্রবেশপথ পাওয়া এক বিষয় ছিল না।

পুডিং লেনের আগুন শুরুর পর লর্ড মেয়র টমাস ব্লাডওয়ার্থ প্রথমদিকে পরিস্থিতির গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। বাড়ি ভেঙে আগুনের পথ আটকানোর কাজেও মূল্যবান সময় হারায়। কিন্তু আগুন বড় হয়ে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের সামর্থ্য যে যথেষ্ট নয়, তা স্পষ্ট হতে থাকে। নৌবাহিনীর কর্মকর্তা স্যামুয়েল পেপিস আগুনের ভয়াবহতা দেখে হোয়াইটহলে যান এবং রাজাকে পরিস্থিতি জানান। আগুনের সামনে ভবন ভেঙে ফাঁকা জায়গা তৈরি করা তখন প্রধান জরুরি পদক্ষেপগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

চার্লস বাড়িঘর রক্ষার সংকীর্ণ চিন্তা ছেড়ে আগুনের বিস্তার আটকানোর জন্য প্রয়োজনীয় ভবন ভাঙার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের অর্থ ছিল, বৃহত্তর নগর রক্ষায় কিছু মানুষের অক্ষত সম্পত্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে এটি সহজ আদেশ ছিল না। মালিকদের ক্ষতি, স্থানীয় আপত্তি এবং কাজের বাস্তব বাধা ছিল। তবু আগুন পৌঁছে যাওয়ার পর ভবন ভাঙার চেয়ে আগেই যথেষ্ট ফাঁকা অঞ্চল তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারত।

রাজা ঘটনাস্থল থেকে দূরে বসে শুধু নির্দেশ পাঠাননি। তিনি শহরে ঘুরে মানুষকে আগুন প্রতিরোধে উৎসাহিত করেন এবং কাজে অংশ নেওয়ার জন্য অর্থও দেন। তাঁর ভাই ইয়র্কের ডিউক জেমস প্রতিরোধের সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেন। সৈন্য ও অন্যান্য সহায়তাকারীকে কাজে লাগানো হয়, সমন্বয়ের ব্যবস্থা বাড়ে। রাজপরিবারের উপস্থিতি মানুষের কাছে শাসকের সক্রিয়তার দৃশ্যমান চিহ্ন ছিল। কিন্তু সেই উপস্থিতি দিয়ে কাঠের ঘিঞ্জি শহর, প্রবল বাতাস এবং সীমিত পানি ছোড়ার ক্ষমতা দূর করা সম্ভব ছিল না।

এই কারণেই “রাজা আগুন থামিয়েছিলেন” কিংবা “রাজা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিলেন”—দুটি সরল বর্ণনাই অসম্পূর্ণ। রাজকীয় উদ্যোগের পরও সোমবার ও মঙ্গলবার আগুন ছড়িয়েছে, বড় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে এবং সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল পুড়েছে। বাড়ি ভাঙার পর পড়ে থাকা কাঠ ও ধ্বংসাবশেষও কোথাও আগুনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারত। প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও তা যথাসময়ে, যথেষ্ট পরিসরে কার্যকর না হলে ফল সীমিত হয়। লন্ডনের অভিজ্ঞতায় এই ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত বারুদ দিয়ে দ্রুত ভবন ধ্বংস করে বাধা তৈরি করা এবং বাতাস দুর্বল হওয়া আগুন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানে রাজকীয় নির্দেশ, সৈন্যদের কাজ, স্থানীয় মানুষের শ্রম ও আবহাওয়ার পরিবর্তন একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। আবার সমকালীন সরকারি বিবরণে রাজা ও তাঁর ভাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সেই বিবরণ মূল্যবান হলেও সেটি রাজশাসনের প্রকাশিত বক্তব্যও ছিল। ফলে শাসকের উদ্যোগ স্বীকার করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের শ্রম এবং ব্যবস্থাগত ব্যর্থতাও মনে রাখা জরুরি।

আগুন থামার সময় আনুমানিক এক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই নগরের বাইরের মাঠে, অস্থায়ী তাঁবু বা কুঁড়েঘরে আশ্রয় নেন। মুরফিল্ডসের মতো জায়গা বিপর্যস্ত মানুষের অস্থায়ী বসতিতে পরিণত হয়। ঘর হারানো মানেই শুধু রাতে শোয়ার জায়গা হারানো ছিল না। বহু লন্ডনবাসী একই ভবনে থাকতেন এবং কাজ করতেন। ফলে বাড়ি পুড়লে কর্মশালা, দোকান, যন্ত্রপাতি ও পণ্যের মজুতও একসঙ্গে চলে যেত।

খাদ্য সরবরাহের সমস্যা দ্রুত জরুরি হয়ে ওঠে। বাজার, গুদাম, দোকান এবং স্বাভাবিক বণ্টনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের হাতে টাকা থাকলেও খাবার পাওয়া কঠিন হতে পারত। ৫ সেপ্টেম্বরের রাজকীয় ঘোষণায় ক্লার্কেনওয়েল, ইসলিংটন, ফিন্সবারি ফিল্ডস, মাইল এন্ড গ্রিন ও র‍্যাটক্লিফে বাজারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে নিয়মিত পর্যাপ্ত রুটি পৌঁছানোর কথাও ছিল। এটি শুধু দান বিতরণ নয়; বিপর্যস্ত নগরের বাইরে খাদ্য কেনাবেচার কার্যকর ব্যবস্থা পুনরায় গড়ে তোলার চেষ্টা।

উদ্ধার করা সম্পত্তি রাখার ব্যবস্থাও জরুরি ছিল। ঘর থেকে বের করে আনা আসবাব, কাপড় ও ব্যবসার সামগ্রী খোলা জায়গায় পড়ে থাকলে চুরি বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। গির্জা, চ্যাপেল, বিদ্যালয় ও সরকারি ভবন এসব রাখার জন্য খুলে দেওয়ার নির্দেশ আসে। অন্য শহরগুলোকে দুর্গত লন্ডনবাসীকে গ্রহণ করতে এবং তাঁদের হাতে-কলমে পেশা চালানোর সুযোগ দিতে বলা হয়। অর্থাৎ মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি আবার আয় করার পথও তৈরি করতে হচ্ছিল।

তবু ঘোষণা দিয়ে সমস্ত দুর্দশা দূর হয়নি। অন্য এলাকায় বাসস্থানের চাহিদা বেড়ে ভাড়া বাড়ে; কেউ ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হন। অস্থায়ী বসতি অনেকের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। জাতীয় পর্যায়ে অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়, কিন্তু ক্ষতির তুলনায় সহায়তা সীমিত ছিল। যিনি আগের সপ্তাহেও অন্যকে সাহায্য করতে পারতেন, তিনিই আগুনের পর দানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। দুর্যোগ লন্ডনের বহু পরিবারের সামাজিক অবস্থান বদলে দিয়েছিল।

এই দুর্দশার মধ্যে অগ্নিসংযোগের গুজব ছড়ানোর পরিবেশও তৈরি হয়। ইংল্যান্ড তখন নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত। আগের বছরের প্লেগের স্মৃতিও তাজা ছিল। সংবাদ পৌঁছানোর স্বাভাবিক পথ ব্যাহত হওয়ায় অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। কোথাও নতুন আগুন দেখা গেলে মানুষ সহজেই ভাবতে পারত, কেউ ইচ্ছা করে আগুন ছড়াচ্ছে। অথচ বাতাসে উড়ে যাওয়া অঙ্গারও দূরে নতুন আগুন ধরাতে পারত। আতঙ্কের মুহূর্তে এই স্বাভাবিক ব্যাখ্যা অনেকের কাছে কম গ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে।

ফরাসি, ডাচ এবং ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে সন্দেহ বিশেষভাবে তীব্র হয়। প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে আগে থেকেই থাকা ধর্মীয় বিদ্বেষ এই অভিযোগকে শক্তি দেয়। বিদেশিদের আটক করা হয়; তাঁদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হয়ে ওঠে। বিদেশি পরিচয় কিংবা ভিন্ন ধর্ম কোনো ব্যক্তির অপরাধের প্রমাণ ছিল না, কিন্তু ভীত জনতার কাছে সন্দেহই দোষের বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারত। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত শহরে তখন নতুন সংকট ছিল নিরপরাধ মানুষকে জনরোষ থেকে রক্ষা করা।

এই পরিবেশের সবচেয়ে করুণ উদাহরণ রবার্ট হিউবার্ট। এই ফরাসি ব্যক্তি আগুন লাগানোর স্বীকারোক্তি দেন এবং ১৬৬৬ সালেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে গুরুতর অসংগতি ছিল। পরবর্তী সাক্ষ্য অনুযায়ী, আগুন শুরু হওয়ার সময় তিনি লন্ডনে উপস্থিতই ছিলেন না; তিনি পরে পৌঁছেছিলেন। তাই তাঁর স্বীকারোক্তিকে সত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ ধরা যায় না। ঘটনাটি দেখায়, বিপর্যয়ের পরে দ্রুত একজন অপরাধী খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বিচারকে কতটা বিপজ্জনক পথে নিতে পারে।

অগ্নিকাণ্ডে সংগঠিত বিদেশি বা ক্যাথলিক ষড়যন্ত্রের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু অভিযোগের স্মৃতি দীর্ঘদিন টিকে ছিল। দ্বিতীয় চার্লসের জন্য তাই সংকট ছিল বহুমুখী: আগুন ঠেকানো, মানুষকে খাওয়ানো, আশ্রয় ও কাজের ব্যবস্থা করা এবং আতঙ্কের মধ্যে কর্তৃত্ব বজায় রাখা। তাঁর সক্রিয়তা বাস্তব ছিল, সীমাবদ্ধতাও বাস্তব। ধোঁয়া সরে যাওয়ার পর সামনে পড়ে ছিল সম্পত্তির বিরোধ, পুনর্নির্মাণের খরচ এবং নিরাপদ শহর তৈরির কঠিন প্রশ্ন। লন্ডনকে এবার শুধু আবার গড়ে তুললেই চলত না; আগের ভুলগুলোও বদলাতে হতো।


আপনার পছন্দ হতে পারে