বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ষোড়শ লুই ও মেরি আঁতোয়ানেতের মৃত্যুদণ্ড: বিচার ও গিলোটিনের ইতিহাস

সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব

ষোড়শ লুই ও মেরি আঁতোয়ানেতের মৃত্যুদণ্ড: বিচার ও গিলোটিনের ইতিহাস
দুটি পৃথক বিচার ও মৃত্যুদণ্ডে বিপ্লব ছিন্ন করল রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক।

প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ফ্রান্সের সামনে প্রশ্ন ছিল, ক্ষমতাচ্যুত লুইকে কীভাবে বিচার করা হবে এবং তাঁর বেঁচে থাকা নতুন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। ১৭৯২ সালের সেপ্টেম্বরে রাজতন্ত্র বিলোপ হলেও বুরবোঁ পরিবারের রাজনৈতিক গুরুত্ব শেষ হয়নি। তঁপল কারাগারে বন্দি রাজা বিদেশি শক্তি ও রাজতন্ত্রপন্থীদের কাছে সম্ভাব্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হয়ে থাকতে পারতেন। তাঁর বিচার তাই অতীতের অপরাধ নির্ধারণের পাশাপাশি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।

রাজপদ হারানোর পর ষোড়শ লুইকে বিপ্লবীরা ‘লুই ক্যাপে’ নামে উল্লেখ করতে শুরু করেন। ক্যাপেতীয় রাজবংশের নাম ব্যবহার করে তাঁকে সাধারণ নাগরিকের অবস্থানে নামিয়ে আনার রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু আইনি সমস্যা ছিল জটিল। ১৭৯১ সালের সংবিধান রাজার ব্যক্তিকে অলঙ্ঘনীয় ঘোষণা করেছিল এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিংহাসন ত্যাগের বিধান রেখেছিল। প্রশ্ন উঠল, সেই সংবিধানের অধীনে করা কাজের জন্য তাঁকে পরে অপরাধী হিসেবে বিচার করা যাবে কি না।

বিচারের সমর্থকেরা যুক্তি দেন, রাজা জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সাংবিধানিক সুরক্ষার নৈতিক ভিত্তি নষ্ট করেছেন। সাঁ-জুস্ত আরও কঠোর অবস্থান নেন: তাঁর কাছে রাজত্ব নিজেই জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরোধী। রোবেসপিয়েরও লুইয়ের ভাগ্যকে সাধারণ ফৌজদারি মামলার পরিবর্তে প্রজাতন্ত্র রক্ষার রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখেন। এখানে মৌলিক দ্বন্দ্ব ছিল—অভিযুক্তের ব্যক্তিগত আইনি অধিকার এবং বিপ্লবী রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার দাবি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? প্রতিনিধিদের উত্তর এক ছিল না।

১৭৯২ সালের নভেম্বরে তুলেরি প্রাসাদের গোপন লোহার আলমারি থেকে নথি উদ্ধারের ঘটনা রাজার বিরুদ্ধে অবস্থান শক্তিশালী করে। এসব কাগজে গোপন যোগাযোগ, অর্থ প্রদান এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার তথ্য ছিল। এগুলোকে বিপ্লবের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য আনুগত্যের অসততার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে প্রতিটি অভিযোগ একই মানের প্রত্যক্ষ প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। রাজার রাজনৈতিক দায়, তাঁর উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট ঘটনার ব্যক্তিগত নির্দেশ—বিচারে এসব বিষয় প্রায়ই একত্রে আলোচিত হয়।

১১ ডিসেম্বর লুই জাতীয় কনভেনশনে হাজির হন। তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উপস্থাপিত হয়। অভিযোগে এস্টেটস জেনারেলের সময়ের আচরণ, ভারেনের পলায়নচেষ্টা, বিদেশি যোগাযোগ এবং ১০ আগস্টের রক্তপাতসহ বিভিন্ন ঘটনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি বেশ কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং কিছু সিদ্ধান্তকে তৎকালীন আইনগত ক্ষমতার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেন। রাজা হিসেবে ব্যবহৃত কর্তৃত্ব এখন তাঁর বিরুদ্ধেই অভিযোগের উপাদান হয়ে উঠেছিল।

লুইকে প্রতিরক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। মালজেরব, ত্রোঁশে এবং রেমোঁ দ্য সেজ তাঁর পক্ষে কাজ করেন; ২৬ ডিসেম্বর দ্য সেজ প্রধান প্রতিরক্ষা বক্তব্য দেন। তাঁরা সাংবিধানিক সুরক্ষা, প্রমাণের দুর্বলতা এবং অভিযোগের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। লুইও নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। এই বিচার এবং রানির পরবর্তী বিচার একই প্রক্রিয়া ছিল না: লুইয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় কনভেনশন অভিযোগ বিচার, রায় এবং শাস্তি নির্ধারণের কর্তৃত্ব নিজের হাতে রেখেছিল।

১৭৯৩ সালের জানুয়ারিতে প্রতিনিধিরা পৃথক প্রশ্নে ভোট দেন—লুই দোষী কি না, সিদ্ধান্ত জনগণের অনুমোদনে পাঠানো হবে কি না এবং কী শাস্তি দেওয়া হবে। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিভাজন ছিল গভীর। কেউ কারাবাস বা যুদ্ধশেষে নির্বাসনের পক্ষে ছিলেন; কেউ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেও তা স্থগিত রাখতে চেয়েছিলেন। অন্যরা মনে করতেন, বিলম্ব রাজতন্ত্রপন্থী ষড়যন্ত্রের সুযোগ বাড়াবে। ভোটের বিভিন্ন শর্তযুক্ত শ্রেণি থাকায় সংখ্যাগণনা সরল ছিল না, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত হয় মৃত্যুদণ্ড এবং তা স্থগিত না রাখা।

২১ জানুয়ারি সকালে লুইকে প্যারিসের প্লাস দ্য লা রেভল্যুসিয়ঁতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন যাজক হেনরি এসেক্স এজওয়ার্থ। সশস্ত্র পাহারায় ঘেরা স্থানে তিনি উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে কথা বলার চেষ্টা করেন; ঢাকের শব্দে বক্তব্য চাপা পড়ে যায়। এরপর গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। প্রজাতন্ত্র ইউরোপের একটি প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের প্রধানকে জনসমক্ষে দণ্ডিত করে জানিয়ে দিল, রাজকীয় জন্ম আর ব্যক্তিকে বিচারের ঊর্ধ্বে রাখে না। তবে এই সিদ্ধান্ত ফ্রান্সের ভেতরে সমর্থন ও আতঙ্ক—দুই প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করে।

গিলোটিন নিজেই বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য বহন করেছিল। এটি আনার পক্ষে যুক্তি ছিল মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতিকে তুলনামূলক দ্রুত এবং সামাজিক মর্যাদানিরপেক্ষ করা। আগে অভিজাত ও সাধারণ মানুষের শাস্তি কার্যকরের পদ্ধতি আলাদা হতে পারত। চিকিৎসক জোসেফ-ইনিয়াস গিয়োতাঁ এই সমতার নীতি সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু যন্ত্রটির একক উদ্ভাবক ছিলেন না। পরবর্তী ব্যাপক ব্যবহারে যে যন্ত্র সমান দণ্ডের প্রতিশ্রুতি বহন করেছিল, সেটিই বিপ্লবী দমনের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়।

লুইয়ের মৃত্যুর পরও মেরি আঁতোয়ানেতের বিচার সঙ্গে সঙ্গে হয়নি। তিনি তঁপলে বন্দি থাকেন; বিপ্লবী কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘বিধবা ক্যাপে’ বলত। জুলাইয়ে তাঁর ছেলে লুই-শার্লকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করা হয়। আগস্টে তাঁকে কঁসিয়েরজেরি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ইতিমধ্যে যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অর্থসংকট এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। রানির ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছিল লুইয়ের বিচারের সময়ের চেয়েও কঠোর বিপ্লবী পরিবেশে।

রানির বিচার শুরু হয় ১৪ অক্টোবর বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগে বিদেশি শক্তির স্বার্থে কাজ করা, রাষ্ট্রের অর্থের অপব্যবহার এবং বিপ্লববিরোধী ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের কথা ওঠে। তাঁর বিদেশি আত্মীয়দের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ এবং যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান রাজনৈতিকভাবে গুরুতর বিষয় ছিল। কিন্তু অভিযোগের সব অংশ সমানভাবে প্রমাণিত ছিল না; দীর্ঘদিনের নারীবিদ্বেষী কুৎসা ও বিদেশিবিদ্বেষও বিচারকে প্রভাবিত করেছিল। অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেওয়া রানিকে বহু আগেই ফ্রান্সের দুর্দশার প্রধান মুখ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল নিজের ছেলের সঙ্গে যৌন অনাচারের অভিযোগ, যার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না। তিনি প্রথমে জবাব দিতে অস্বীকার করেন, পরে মাতৃত্বের অনুভূতির প্রতি আবেদন জানান। এই ঘটনাটি দেখায়, রাষ্ট্রদ্রোহের বিচার কীভাবে ব্যক্তিগত অপমান ও প্রচারণার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তাঁর আইনজীবীরা প্রস্তুতির জন্য খুব অল্প সময় পান। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ এবং তীব্র রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ১৬ অক্টোবর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

সেদিনই সাধারণ খোলা গাড়িতে করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডস্থলে নেওয়া হয়; লুইকে নেওয়া হয়েছিল বন্ধ গাড়িতে। সাধারণ সাদা পোশাক পরা সাবেক রানি গিলোটিনে প্রাণ হারান। তাঁদের সন্তানদের পরিণতিও করুণ হয়: লুই-শার্ল ১৭৯৫ সালে বন্দিত্বে মারা যায়, আর মেয়ে মেরি-তেরেজ পরে মুক্তি পান। রাজা ও রানির মৃত্যুদণ্ড একই বিচারের ফল ছিল না, কিন্তু একত্রে তারা রাজতন্ত্রের সঙ্গে বিপ্লবের বিচ্ছেদকে অপরিবর্তনীয় করে তোলে। ক্ষমতার বৈধতা এখন জন্মপরিচয়ের বদলে জাতির নামে দাবি করা হচ্ছে; অথচ সেই জাতির শত্রু কে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ক্রমে আরও কঠোর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে