বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের চার দিন: সেন্ট পলসসহ হাজারো বাড়ি ধ্বংসের ইতিহাস

সিরিজ: লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ড (১৬৬৬)

লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের চার দিন: সেন্ট পলসসহ হাজারো বাড়ি ধ্বংসের ইতিহাস
চার দিনের আগুনে ধ্বংস হয়েছিল পুরোনো লন্ডনের বিস্তীর্ণ এলাকা।

পুডিং লেনের আগুন কোথায় থামানো যাবে—২ সেপ্টেম্বরের সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নই লন্ডনের সামনে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছিল। বেকারির চারপাশের কয়েকটি বাড়ি রক্ষার সুযোগ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছিল। আগুন নদীতীরের গুদাম, দোকান ও ঘনবসতির দিকে ছুটছিল। পরবর্তী চার দিনে শুধু হাজার হাজার ভবন পুড়বে না; লন্ডন হারাবে তার পরিচিত রাস্তাঘাট, বাণিজ্যের কেন্দ্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনার একটি। তবে এই ধ্বংস এক মুহূর্তে ঘটেনি। প্রতিটি দিনের ব্যর্থ প্রতিরোধ পরের দিনের বিপদকে আরও বড় করে তুলেছিল।

রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ভোর হওয়ার আগেই আগুন পুডিং লেনের সীমানা অতিক্রম করে। রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে সেন্ট মার্গারেট ফিশ স্ট্রিট হিল গির্জায় আগুন লাগে। এটি দেখিয়েছিল, বিপদ আর একটি বেকারি কিংবা বসতবাড়ির মধ্যে সীমিত নেই। সকাল আটটার দিকে লন্ডন ব্রিজের কাছে ফিশমঙ্গার্স হলও পুড়তে শুরু করে। বাণিজ্যিক সংগঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ ভবন হারানোর মধ্য দিয়ে আগুন শহরের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপরও আঘাত হানতে থাকে।

প্রবল পূর্বা বাতাস আগুনকে প্রধানত পশ্চিম দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। শুকনো কাঠের ভবন, সরু গলি এবং নদীতীরের দাহ্য পণ্য তাকে ছড়ানোর উপকরণ জোগায়। একটি বাড়ি জ্বলতে শুরু করলে পাশের বাড়ির জানালা, কাঠের কড়ি ও ছাদের নিচের অংশও বিপন্ন হয়ে পড়ত। অঙ্গার উড়ে সামনে নতুন আগুন ধরাতে পারত। ফলে মানুষ যখন একটি ভবনের আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিল, তখন অন্যদিকে আরও কয়েকটি ভবন থেকে ধোঁয়া উঠছিল। আগুনের বিস্তার প্রতিরোধের গতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।

নৌবাহিনীর প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্যামুয়েল পেপিস প্রথমে পরিস্থিতির বিশালতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি। কিন্তু পরে আগুন দেখে তিনি হোয়াইটহলে গিয়ে রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে বিপদের কথা জানান। আগুনের সামনে বাড়ি ভেঙে ফাঁকা জায়গা তৈরির প্রয়োজন তখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিল। রাজা সেই ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তবু নির্দেশ পৌঁছানো, লোক জড়ো করা এবং বাস্তবে ভবন ভাঙার মধ্যে সময় লাগছিল। ততক্ষণে কোথাও কোথাও আগুন সম্ভাব্য প্রতিরোধরেখার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

টেমস নদী হয়ে ওঠে পালানোর গুরুত্বপূর্ণ পথ। নৌকায় তুলে মানুষ পরিবার, আসবাব ও ব্যবসার পণ্য সরাতে থাকে। অন্যরা গাড়ি বা হাতে টানা বোঝা নিয়ে নগরের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে। নদী আগুন থেকে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ দিলেও সবাই একইভাবে তার সুবিধা নিতে পারেনি। নৌকা, গাড়ি ও শ্রমিক পাওয়ার সামর্থ্য সবার ছিল না। রাস্তায় ফেলে রাখা ভারী মালপত্র এবং একসঙ্গে বহু মানুষের চলাচল অগ্নিনির্বাপণের কাজও কঠিন করে তোলে।

সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর, বিপর্যয় আরও গভীর হয়। আগুন সামলাতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ে এবং আটটি অগ্নিনির্বাপণ সমন্বয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। রাজার ভাই, ইয়র্কের ডিউক জেমস প্রতিরোধের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। কিন্তু সংগঠন বাড়লেও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা দূর হয়নি। বালতি, হাতচালিত পানি ছোড়ার যন্ত্র ও লম্বা হুক দিয়ে এত বড় আগুন থামানো কঠিন ছিল। কোথাও মানুষ সফলভাবে প্রতিরোধ গড়লেও অন্যদিকে আগুন নতুন রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল।

সোমবার বিকেলে রয়্যাল এক্সচেঞ্জ পুড়ে যায়। এটি ছিল ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একই দিনে থ্রেডনিডল স্ট্রিটের ডাকঘরও ধ্বংস হয়। ফলে আগুন শুধু মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছিল না; বাণিজ্য ও যোগাযোগ চালানোর প্রতিষ্ঠানগুলোও অচল করে দিচ্ছিল। যে শহরের জীবিকা নির্ভর করত পণ্য, সংবাদ, ঋণ ও চুক্তির চলাচলের ওপর, তার জন্য এই ক্ষতি ছিল বহুস্তরীয়।

এ সময় বহু মানুষ শহরের বাইরে খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। পেপিসও নিজের মূল্যবান জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে নিরাপদ স্থানে পাঠান। অন্যদের মতো তাঁকেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, কোন জিনিস সঙ্গে নেওয়া যাবে আর কোনটি রেখে যেতে হবে। গাড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভাড়াও বাড়ে। একই আগুনের মধ্যে ধনী ও দরিদ্র মানুষের পালানোর সুযোগ সমান ছিল না। কারও সম্পদ সরানোর ব্যবস্থা ছিল, কারও কাছে জীবন বাঁচিয়ে বেরিয়ে যাওয়াই ছিল একমাত্র লক্ষ্য।

মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ধ্বংসযজ্ঞ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ভোরে চিপসাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে আগুন লাগে। সকালে নগর প্রশাসনের কেন্দ্র গিল্ডহলও আক্রান্ত হয়। দোকান, গির্জা ও প্রশাসনিক ভবন একের পর এক বিপন্ন হওয়ায় পরিচিত লন্ডনের মানচিত্র বদলে যাচ্ছিল। দিনের পরের অংশে নিউগেট কারাগার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লাডগেটের ঋণখেলাপিদের কারাগার আগুনে ঘিরে পড়ে। নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া বড় স্থাপনাগুলোও আর নিশ্চয়তা দিতে পারছিল না।

তবু অনেকের আশা ছিল, পুরোনো সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল টিকে থাকবে। বিশাল পাথরের ভবন এবং চারপাশের গির্জাপ্রাঙ্গণের খোলা জায়গা তাকে তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করিয়েছিল। আশপাশের বই বিক্রেতা ও স্টেশনারি ব্যবসায়ীরা তাঁদের মজুত বই ক্যাথেড্রালের নিচের সেন্ট ফেইথস চ্যাপেলে সরিয়ে রাখেন। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রাঙ্গণে আসবাব এবং কাপড়ের ব্যবসায়ীরা কাপড়ের গাঁট রাখেন। মানুষ নিজের সম্পদ এমন জায়গায় জমা করছিল, যেটিকে তারা আগুনের বিরুদ্ধে শেষ আশ্রয়গুলোর একটি ভেবেছিল।

কিন্তু ক্যাথেড্রাল তখন মেরামতের জন্য কাঠের মাচায় ঘেরা ছিল। এই অস্থায়ী কাঠামো পাথরের বিশাল ভবনটির পাশে গুরুতর দুর্বলতা তৈরি করে। মঙ্গলবার রাত প্রায় আটটার দিকে ছাদে আগুন দেখা যায়। মাচা ও ছাদের কাঠামো আক্রান্ত হলে ভবনের পাথরের বাইরের দেয়াল ভেতরের দাহ্য অংশকে রক্ষা করতে পারেনি। এখানেই নিরাপত্তা সম্পর্কে মানুষের ধারণা ভেঙে পড়ে: চারপাশে খোলা জায়গা এবং পাথরের দেয়াল থাকলেও কোনো স্থাপনা সম্পূর্ণ অগ্নিরোধী হয়ে যায় না।

আগুনে ছাদের সিসার আবরণ গলে যায়, কাঠামো ধসে পড়ে এবং ক্যাথেড্রালের অভ্যন্তর ধ্বংস হয়। নিচে নিরাপদে রাখা বইও রক্ষা পায়নি। সেন্ট পলসের ধ্বংস তাই একই সঙ্গে স্থাপত্য, ধর্মীয় জীবন ও মুদ্রিত সংস্কৃতির ক্ষতি। একটি ভবনকে আশ্রয় ভেবে সেখানে জড়ো করা সম্পদও সেই ভবনের সঙ্গে হারিয়ে যায়। এখানে মনে রাখা দরকার, এটি আজকের গম্বুজওয়ালা সেন্ট পলস ছিল না; সেটি অগ্নিকাণ্ডের পর নির্মিত হয়। ১৬৬৬ সালে পুড়েছিল তার মধ্যযুগীয় পূর্বসূরি।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রতিরোধের কাজে বারুদ দিয়ে ভবন উড়িয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদ্দেশ্য ছিল আগুনের সামনে দ্রুত বড় ফাঁকা অঞ্চল তৈরি করা, যাতে জ্বলতে জ্বলতে এগোনোর ধারাবাহিক উপকরণ না থাকে। টাওয়ার অব লন্ডন ও ক্রিপলগেটের কাছে এই পদ্ধতি কার্যকর হয়। আগুন টাওয়ারের কাছাকাছি পৌঁছালেও টাওয়ারটি ধ্বংস হয়নি। মানুষকে তখন কঠিন হিসাব করতে হচ্ছিল: আরও বড় এলাকা রক্ষার জন্য কিছু অক্ষত ভবন ইচ্ছাকৃতভাবে হারাতে হবে।

এরপর আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসে। ৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বাতাসের দিক বদলায় এবং তার শক্তি কমতে শুরু করে। এতে আগুনের দ্রুত এগোনো ও দূরে অঙ্গার ছড়ানো দুর্বল হয়। ভবন ভেঙে তৈরি করা ফাঁকা অঞ্চল এবং মানুষের প্রতিরোধ তখন বেশি ফল দিতে থাকে। আগুন থেমেছিল প্রতিরোধের কৌশল ও অনুকূল আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে। শুধু বৃষ্টি কিংবা একটি নির্দিষ্ট ঘটনার সাহায্যে পুরো বিপর্যয়ের সমাপ্তি ব্যাখ্যা করা সঠিক হবে না।

বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, মূল অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে সর্বত্র বিপদ শেষ হয়নি। পোড়া ভবনে আগুন ও তাপ রয়ে গিয়েছিল; সেদিন রাতেও কয়েকটি স্থানে নতুন করে আগুন দেখা দেয়। এমনকি ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে বিশপসগেটের একটি বিচ্ছিন্ন আগুনও সামলাতে হয়। তাই “চার দিনের মহাঅগ্নিকাণ্ড” বলতে মূল বিস্তার ও ধ্বংসযজ্ঞের সময় বোঝায়। বুধবার এসে সমস্ত ধ্বংসস্তূপ সম্পূর্ণ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল—এমন ধারণা ভুল।

হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৩,২০০ বাড়ি ও ৮৭টি প্যারিশ গির্জা ধ্বংস হয়েছিল; ঐতিহাসিক সিটি অব লন্ডনের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি বৃহত্তর লন্ডনের চার-পঞ্চমাংশ নয়। আনুমানিক এক লাখ মানুষ গৃহহীন হন। আগুনের সামনে পালিয়ে অনেকেই বাঁচলেও তাঁরা ফিরে পাননি বাসস্থান, কর্মশালা, দোকান কিংবা সঞ্চিত সম্পদ। ধোঁয়া কমে এলে সামনে দেখা দিল আরেক বিপর্যয়—এত মানুষের খাবার, আশ্রয় ও জীবিকার ব্যবস্থা কে করবে? লন্ডনের আগুন থামছিল, কিন্তু বেঁচে যাওয়া মানুষের অনিশ্চয়তার দিন তখনই শুরু হচ্ছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে