ব্ল্যাক হোল কি পুরো মহাবিশ্ব গিলে ফেলতে পারে? বিজ্ঞান কী বলে
কৃষ্ণগহ্বরের প্রবল আকর্ষণ থাকলেও দূরের সব পদার্থ অনিবার্যভাবে তার মধ্যে পড়ে না।
একটি কৃষ্ণগহ্বরের কাছে নক্ষত্র ছিন্নভিন্ন হচ্ছে, উত্তপ্ত গ্যাস ঘুরতে ঘুরতে অদৃশ্য সীমানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর চারপাশের আলো বাঁকা হয়ে অস্বাভাবিক দৃশ্য তৈরি করছে। মহাকাশের এমন ছবি দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, কৃষ্ণগহ্বর বুঝি এক অন্তহীন ক্ষুধার যন্ত্র। যত পদার্থ পাবে, তত বড় হবে; তারপর আরও দূরের বস্তু টেনে নেবে। এই ধারণা থেকে প্রশ্ন আসে, একদিন কি একটি কৃষ্ণগহ্বর অথবা সব কৃষ্ণগহ্বর মিলিয়ে পুরো মহাবিশ্ব গিলে ফেলবে? প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী এমন অনিবার্য পরিণতির ভিত্তি নেই। কৃষ্ণগহ্বর শক্তিশালী মহাজাগতিক বস্তু, কিন্তু দূরের সবকিছুকে নির্বিচারে টেনে নেওয়া যন্ত্র নয়।
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে প্রথমে কৃষ্ণগহ্বরের পরিচয় জানা দরকার। সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী, এটি মহাকাশ-সময়ের এমন একটি অঞ্চল, যার ভেতর থেকে কোনো সংকেত বাইরে পৌঁছাতে পারে না। এর সীমানাকে ঘটনাদিগন্ত বলা হয়। আলোও সেই সীমানার ভেতর থেকে বেরিয়ে দূরের পর্যবেক্ষকের কাছে আসতে পারে না। কিন্তু এই বক্তব্য শুধু ঘটনাদিগন্তের ভেতরের জন্য প্রযোজ্য। সীমানার বাইরে আলো চলতে পারে, পদার্থ কক্ষপথে ঘুরতে পারে এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে দূরে সরে যেতে পারে। ভেতরের বৈশিষ্ট্যকে পুরো মহাবিশ্বের ওপর প্রয়োগ করলেই মূল বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
কৃষ্ণগহ্বরকে প্রায়ই মহাজাগতিক ধুলাশোষক যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই তুলনা আকর্ষণীয় হলেও ভুল ধারণা দেয়। একটি ধুলাশোষক বাতাসের চাপের পার্থক্য ব্যবহার করে আশপাশের পদার্থ টানে। কৃষ্ণগহ্বর মাধ্যাকর্ষণের মাধ্যমে অন্য বস্তুর গতিকে প্রভাবিত করে। সেই মাধ্যাকর্ষণ তার ভর, ঘূর্ণন এবং দূরত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘটনাদিগন্ত থেকে অনেক দূরে একই ভরের অন্য কোনো বস্তুর তুলনায় তার আকর্ষণ জাদুকরীভাবে অতিরিক্ত হয়ে যায় না। বিশেষত্ব হলো বিপুল ভর খুব ছোট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকা।
একটি পরিচিত কল্পিত উদাহরণ বিষয়টি পরিষ্কার করে। যদি সূর্যের জায়গায় ঠিক সূর্যের সমান ভরের একটি কৃষ্ণগহ্বর বসানো হয়, তাহলে পৃথিবী সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে পড়ে যাবে না। পৃথিবীর বর্তমান দূরত্বে প্রধান মাধ্যাকর্ষণগত প্রভাব প্রায় একই থাকবে এবং কক্ষপথও মোটামুটি একইভাবে চলতে পারবে। অবশ্য সূর্যের আলো ও তাপ হারিয়ে পৃথিবীর পরিবেশ ভয়াবহভাবে বদলে যাবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের কারণ আলোহীনতা, তাৎক্ষণিকভাবে গিলে ফেলা নয়। বাস্তব সূর্যের স্বাভাবিক বিবর্তনে কৃষ্ণগহ্বর হওয়ার মতো ভর নেই; উদাহরণটি শুধু মাধ্যাকর্ষণ বোঝানোর জন্য।
সূর্যের সমান ভরের একটি অঘূর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনাদিগন্তের ব্যাসার্ধ প্রায় তিন কিলোমিটার হবে। পৃথিবীর কক্ষপথ তার তুলনায় বিপুল দূরে। এই অনুপাত দেখায়, একটি কৃষ্ণগহ্বরের উপস্থিতি এবং তার মধ্যে পড়ে যাওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোনো বস্তু কৃষ্ণগহ্বরের মাধ্যাকর্ষণ অনুভব করতে পারে, কিন্তু ঘটনাদিগন্তের কাছে পৌঁছাতে না-ও পারে। যেমন পৃথিবী সূর্যের আকর্ষণে থাকে, অথচ সূর্যের মধ্যে পড়ে না। গতির দিক ও কক্ষপথ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কক্ষপথে থাকা বস্তু সাধারণত পাশের দিকে চলতে চলতে মহাকর্ষীয় কেন্দ্রের দিকে পতনের প্রবণতাকে ভারসাম্য দেয়। কৃষ্ণগহ্বরের আশপাশেও এমন গতি সম্ভব। যথেষ্ট দূরে একটি নক্ষত্র দীর্ঘ সময় কক্ষপথে থাকতে পারে। তাকে ভেতরে নামতে হলে কক্ষপথের শক্তি বা কৌণিক ভরবেগ বদলাতে হবে। অন্য বস্তুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া, গ্যাসের ঘর্ষণ কিংবা কিছু ক্ষেত্রে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে শক্তি হারানো এই পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিন্তু শুধু কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে বলেই সব কক্ষপথ নিজে থেকে দ্রুত সংকুচিত হয় না।
আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রের অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে নক্ষত্রের গতিই এই বাস্তবতার শক্তিশালী উদাহরণ। নক্ষত্রগুলো কেন্দ্রের অদৃশ্য বিশাল ভরের চারদিকে ঘোরে। তাদের কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ করে সেই ভর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। যদি কৃষ্ণগহ্বর কাছের সব নক্ষত্রকে অনিবার্যভাবে সঙ্গে সঙ্গে টেনে নিত, তাহলে এমন পুনরাবৃত্ত কক্ষপথ দেখা সম্ভব হতো না। কিছু নক্ষত্র খুব কাছে গেলে বিপদে পড়তে পারে, কিন্তু নিরাপদ দূরত্বের কক্ষপথ এবং সরাসরি পতন এক ঘটনা নয়।
কৃষ্ণগহ্বরের কাছে যাওয়ার বিপদের একটি কারণ জোয়ারীয় বল। কোনো বড় বস্তুর কাছের অংশ এবং দূরের অংশে মাধ্যাকর্ষণের শক্তি এক নয়। এই পার্থক্য যথেষ্ট হলে নক্ষত্র বা অন্য বস্তু টেনে ছিন্নভিন্ন হতে পারে। ছোট কৃষ্ণগহ্বরের কাছে ঘটনাদিগন্তের আশপাশে এই পার্থক্য অত্যন্ত তীব্র হতে পারে। অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা, কারণ তার ঘটনাদিগন্ত অনেক বড়। তাই “যেকোনো কৃষ্ণগহ্বরের একই দূরত্বে একই বিপদ”—এমন ধারণাও ঠিক নয়। ভর ও অবস্থান দুটোই বিবেচনা করতে হয়।
কৃষ্ণগহ্বর বাস্তবেই বড় হতে পারে। গ্যাস, ধুলা, নক্ষত্রের অংশ কিংবা অন্য কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে একীভূত হয়ে তার ভর বাড়ে। কিন্তু বেড়ে ওঠার জন্য পদার্থকে উপযুক্ত পথে তার কাছে আসতে হয়। দূরে থাকা গ্যাসের নিজস্ব গতি থাকতে পারে, নক্ষত্রের কক্ষপথ থাকতে পারে এবং আশপাশের পরিবেশে পদার্থের যোগান সীমিত হতে পারে। একটি কৃষ্ণগহ্বরের ভর বড় হলেই মহাবিশ্বের সব পদার্থ তার জন্য সহজলভ্য হয়ে যায় না। আকার বাড়ার সম্ভাবনা আর সীমাহীনভাবে বাড়তে থাকা এক বিষয় নয়।
গ্যাস ভেতরে যাওয়ার আগে অনেক সময় একটি সঞ্চয়চাকতি তৈরি করে। সেখানে পদার্থ ঘুরতে থাকে, ঘর্ষণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় উত্তপ্ত হয় এবং প্রচুর আলো ছাড়ে। কৃষ্ণগহ্বর নিজে কালো হলেও তার আশপাশ তাই অত্যন্ত উজ্জ্বল হতে পারে। এই আলো এবং কখনো শক্তিশালী বহির্গামী প্রবাহ আশপাশের গ্যাসকে প্রভাবিত করে। ফলে খাদ্যযোগান বাড়ার পাশাপাশি বাধাগ্রস্তও হতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের বৃদ্ধি শুধু ভেতরের টান নয়; আশপাশের পদার্থের ওপর তার পরিবেশের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
উজ্জ্বল কৃষ্ণগহ্বরব্যবস্থায় বিকিরণের চাপ গ্যাসের প্রবেশে বাধা দিতে পারে। কিছু সরল মডেলে এই প্রতিযোগিতা থেকে বৃদ্ধির একটি পরিচিত সীমা পাওয়া যায়। তবে প্রকৃত পরিবেশে প্রবাহের আকৃতি, গ্যাসের ঘনত্ব এবং বিকিরণ কীভাবে বের হচ্ছে, তার ওপর ফল বদলায়। কোনো বিশেষ অবস্থায় সরল সীমার চেয়ে বেশি হারে পদার্থ যোগ হতে পারে। তবু এই আলোচনা দেখায়, কৃষ্ণগহ্বরের খাওয়া একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। যত বেশি পদার্থ কাছে আসে, ততই সব বিনা বাধায় ভেতরে যায়—এমন নয়।
কৃষ্ণগহ্বরের দুই মেরু বরাবর দেখা শক্তিশালী পদার্থের ধারা নিয়েও ভুল ধারণা রয়েছে। মনে হতে পারে, কৃষ্ণগহ্বর যা খেয়েছে তা আবার ভেতর থেকে ছুড়ে বের করছে। বাস্তবে ঘটনাদিগন্তের বাইরে থাকা উত্তপ্ত পদার্থ ও চৌম্বকীয় ব্যবস্থার সঙ্গে এসব ধারার সম্পর্ক রয়েছে। ঘটনাদিগন্তের ভেতর থেকে সাধারণ পদার্থ বেরিয়ে আসার প্রমাণ হিসেবে এগুলোকে দেখা যায় না। একইভাবে চাকতির আলো কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরের দৃশ্য নয়। বাইরের সক্রিয় পরিবেশ এবং ভেতরের অতিক্রম-অযোগ্য সীমানাকে আলাদা রাখতে হয়।
একটি ছায়াপথের কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বরও পুরো ছায়াপথের ভর নয়। নক্ষত্র, গ্যাস এবং অদৃশ্য পদার্থ মিলিয়ে ছায়াপথের মাধ্যাকর্ষণগত কাঠামো তৈরি হয়। কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বর নির্দিষ্ট অঞ্চলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বহুদূরের প্রতিটি নক্ষত্রের গতি একাই নিয়ন্ত্রণ করে না। ছায়াপথকে একটি কেন্দ্রীয় গর্তের চারদিকে ঘোরা একটিমাত্র চাকতি মনে করলে এই ভরবণ্টন বাদ পড়ে যায়। তাই একটি অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর আছে বলেই ছায়াপথের সব নক্ষত্র ক্রমে তার মুখে ঢুকে যাবে, এমন সিদ্ধান্ত সঠিক নয়।
দুটি কৃষ্ণগহ্বর একীভূত হলে আরও বড় কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হতে পারে। এমন ঘটনার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু একীভবনের জন্য তাদের যথেষ্ট কাছে আসতে হয় এবং কক্ষপথের শক্তি হারাতে হয়। মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সব কৃষ্ণগহ্বর কোনো স্বয়ংক্রিয় নিয়মে একে অপরকে খুঁজে এক স্থানে জড়ো হয় না। কিছু ব্যবস্থা একীভূত হতে পারে, অন্যগুলো বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মাধ্যাকর্ষণ এবং মহাবিশ্বের বড় পরিসরের প্রসারণ কাজ করে। এই দুই পরিসরের আচরণ আলাদা।
মহাবিশ্বের প্রসারণ পুরো মহাবিশ্ব গিলে ফেলার ধারণার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বড় পরিসরে দূরের, পরস্পরের সঙ্গে মহাকর্ষীয়ভাবে আবদ্ধ নয় এমন অঞ্চলের মধ্যকার দূরত্ব বাড়ছে। এই প্রসারণ একটি কৃষ্ণগহ্বরের দিকে সবকিছুর যাত্রা নয়। অন্যদিকে সৌরজগৎ বা আবদ্ধ ছায়াপথের মতো কাঠামো একইভাবে প্রসারিত হচ্ছে না, কারণ স্থানীয় বল তাদের ধরে রাখে। তাই প্রসারণ আছে বলে কোনো কৃষ্ণগহ্বর কাছে থাকা গ্যাস ধরতে পারবে না—এটিও ভুল। স্থানীয় পদার্থ সংগ্রহ এবং সমগ্র মহাবিশ্বের বিবর্তন পৃথক প্রক্রিয়া।
প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি আচরণ অন্ধকার শক্তি নামে পরিচিত অজানা উপাদানের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। প্রচলিত মহাজাগতিক মডেলে ত্বরিত প্রসারণ দূরের আবদ্ধ কাঠামোগুলোকে আরও বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একটি কৃষ্ণগহ্বরের জন্য ক্রমে পুরো মহাবিশ্বের পদার্থ সংগ্রহ করার সুযোগ তৈরি হয় না। তবে অন্ধকার শক্তির প্রকৃতি এবং মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা চলছে। বর্তমান মডেলের সম্ভাব্য ফলকে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
“পুরো মহাবিশ্ব” কথাটির মধ্যেও একটি সীমা আছে। আমরা মহাবিশ্বের যে অংশ থেকে তথ্য পেতে পারি, সেটিকে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব বলা হয়। তার বাইরেও অঞ্চল থাকতে পারে, যার মোট আকার সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান নেই। একটি স্থানীয় কৃষ্ণগহ্বরকে সেই সমস্ত অঞ্চলের সর্বজনীন কেন্দ্র মনে করার কোনো ভিত্তি নেই। মহাবিশ্বের প্রসারণেরও সাধারণ অর্থে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র নেই, যার দিকে সব বস্তু পড়ছে। দৈনন্দিন জীবনের গর্ত বা ঘূর্ণির ছবি দিয়ে মহাজাগতিক জ্যামিতি বোঝাতে গেলে এখানেই বিভ্রান্তি বাড়ে।
অত্যন্ত দূর ভবিষ্যতে কিছু পদার্থ কৃষ্ণগহ্বরে শেষ হতে পারে। দীর্ঘ সময়ে নক্ষত্রের বিবর্তন, মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া এবং একীভবন বিভিন্ন ব্যবস্থাকে বদলাবে। কিন্তু এই সম্ভাবনা থেকে সব পদার্থ অবশ্যই কৃষ্ণগহ্বরে পড়বে বলা যায় না। কোনো বস্তু অন্যের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় একটি আবদ্ধ ব্যবস্থা থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেতে পারে। কোনো অবশিষ্টাংশ দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে। দূর ভবিষ্যতের হিসাবের সঙ্গে কণার স্থায়িত্ব এবং মহাজাগতিক মডেলের অন্যান্য অনিশ্চয়তাও যুক্ত। তাই একটি সরল গিলে ফেলার গল্প যথেষ্ট নয়।
কৃষ্ণগহ্বর নিজেও চিরস্থায়ী থাকবে কি না, সেই প্রশ্নে হকিং বিকিরণ গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ান্টাম ক্ষেত্রকে বাঁকা মহাকাশ-সময়ের মধ্যে বিবেচনা করলে তত্ত্ব অনুযায়ী কৃষ্ণগহ্বর তাপীয় বিকিরণ ছাড়তে পারে। এতে শক্তি হারিয়ে তার ভর ধীরে কমতে পারে। এটি ঘটনাদিগন্তের ভেতর থেকে সাধারণ আলো বেরিয়ে আসার সরল ঘটনা নয়। জনপ্রিয় কণা-জোড়ার গল্প একটি উপমা, পূর্ণ গাণিতিক ব্যাখ্যা নয়। বাস্তব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক কৃষ্ণগহ্বরের হকিং বিকিরণ সরাসরি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা এখনো অত্যন্ত কঠিন।
তাত্ত্বিকভাবে বড় কৃষ্ণগহ্বরের তাপমাত্রা কম এবং তার বাষ্পীভবনের সময় অত্যন্ত দীর্ঘ। নক্ষত্রের ভরের কৃষ্ণগহ্বরের সম্ভাব্য বাষ্পীভবনকাল মহাবিশ্বের বর্তমান বয়সের তুলনায় অকল্পনীয়ভাবে বেশি। আজকের পরিবেশে আশপাশ থেকে শক্তি ও পদার্থ গ্রহণও বিবেচনা করতে হয়। তাই হকিং বিকিরণের কথা শুনে মনে করা যাবে না যে পরিচিত কৃষ্ণগহ্বরগুলো শিগগির মিলিয়ে যাবে। তবে তত্ত্বটি দেখায়, কৃষ্ণগহ্বর শুধু ভর বাড়ানোর যন্ত্র নয়; উপযুক্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতিতে ভর হারানোর প্রক্রিয়াও থাকতে পারে।
কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে সব পদার্থ একটি অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পৌঁছায়—এমন সরল ছবিও সতর্কভাবে ব্যবহার করা দরকার। সাধারণ আপেক্ষিকতার কিছু সমাধানে এমন চরম অবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে পরিচিত তত্ত্ব যথেষ্ট থাকে না। কিন্তু সম্পূর্ণ কোয়ান্টাম মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ছাড়া সেই অঞ্চলের চূড়ান্ত বাস্তবতা জানা যায়নি। এই অজানা বিষয় কৃষ্ণগহ্বরকে পুরো মহাবিশ্ব গ্রাস করার ক্ষমতা দেয় না। ভেতরের অসম্পূর্ণ বোঝাপড়া এবং বাইরে পর্যবেক্ষিত মাধ্যাকর্ষণগত আচরণকে আলাদা রাখতে হয়।
মহাবিশ্ব একদিন সংকুচিত হয়ে যেতে পারে কি না, সেটিও কৃষ্ণগহ্বরের খাওয়ার প্রশ্নের সমার্থক নয়। মহাবিশ্বের সামগ্রিক সংকোচনের কোনো মডেল থাকলে তা পুরো মহাকাশ-সময়ের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে। একটি ছায়াপথের মধ্যে থাকা কৃষ্ণগহ্বর ক্রমে বড় হয়ে সব অঞ্চল গিলে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা। একইভাবে মহাবিশ্বকে একটি কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর কল্পনা করা কিছু অনুমানমূলক মডেল পরিচিত কৃষ্ণগহ্বরের আক্রমণাত্মক বৃদ্ধির প্রমাণ নয়। আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ধারণা ও প্রতিষ্ঠিত ফলকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
প্রশ্নটির নির্ভরযোগ্য উত্তর তাই হলো, কৃষ্ণগহ্বর একদিন পুরো মহাবিশ্ব গিলে ফেলবে—এমন পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানে নেই। তার মাধ্যাকর্ষণ দূরত্ব ও ভরের নিয়ম মেনে কাজ করে, পদার্থ কক্ষপথে থাকতে পারে এবং বৃদ্ধি নির্ভর করে বাস্তব যোগানের ওপর। মহাবিশ্বের প্রসারণও দূরের অঞ্চলগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না। কিছু নক্ষত্র ও গ্যাস গ্রাস হতে পারে, কিছু কৃষ্ণগহ্বর একীভূত হতে পারে, কিন্তু সেই স্থানীয় ঘটনাগুলোকে সর্বগ্রাসী মহাজাগতিক পরিণতি বলা যায় না। কৃষ্ণগহ্বরের প্রকৃত বিজ্ঞান যথেষ্ট বিস্ময়কর; তাকে বুঝতে সীমাহীন ক্ষুধার কল্পনা যোগ করার প্রয়োজন নেই।
নক্ষত্রগুলো রাতে মিটমিট করে কিন্তু গ্রহগুলো করে না কেন?
পৃথিবী যদি হঠাৎ ঘোরা বন্ধ করে দেয় তাহলে কী ঘটবে? মুহূর্তে বদলে যাবে পৃথিবীর চেহারা
ইউরোপা: বৃহস্পতির বরফঢাকা চাঁদের নিচে কি বিশাল সমুদ্র ও প্রাণ লুকিয়ে আছে?
মহাকাশে সময় কি সত্যিই ধীরে চলে? আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা, মহাকর্ষ ও সময়ের রহস্য
অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ের সংঘর্ষ হলে পৃথিবীর কী হবে? দুই ছায়াপথের মহাজাগতিক ভবিষ্যৎ
মঙ্গল গ্রহে মানুষ বসবাস করতে পারবে কি? লাল গ্রহে মানববসতির বাস্তব সম্ভাবনা ও কঠিন চ্যালেঞ্জ