বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

১৬৬৬ সালের লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের কারণ: পুডিং লেনের বেকারি থেকে বিপর্যয়ের শুরু

সিরিজ: লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ড (১৬৬৬)

১৬৬৬ সালের লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের কারণ: পুডিং লেনের বেকারি থেকে বিপর্যয়ের শুরু
পুডিং লেনের ছোট্ট আগুনেই শুরু হয়েছিল লন্ডনের মহাবিপর্যয়।

১৬৬৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর, রবিবার। মধ্যরাত পেরিয়ে তখন প্রায় একটা। টেমস নদীর কাছাকাছি পুডিং লেনের একটি বেকারিতে আগুন জ্বলে ওঠে। লন্ডনের মানুষের কাছে এমন ঘটনা একেবারে অপরিচিত ছিল না। রান্নার চুলা, মোমবাতি, কর্মশালার আগুন কিংবা গরম ছাই থেকে মাঝেমধ্যেই বাড়িঘরে আগুন লাগত। কিন্তু সেই রাতের ঘটনাটি সাধারণ দুর্ঘটনার সীমায় আটকে থাকেনি। একটি বেকারির আগুন এমন এক নগরে ছড়িয়েছিল, যেখানে ঘনবসতি, শুকনো কাঠ, দাহ্য পণ্য এবং দুর্বল প্রতিরোধব্যবস্থা একই সঙ্গে বিপর্যয়ের অপেক্ষায় ছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি গলির বিপদ হয়ে ওঠে গোটা নগরকেন্দ্রের অস্তিত্বের সংকট।

বেকারিটির মালিক ছিলেন টমাস ফ্যারিনার, যাঁর নামের বানান ঐতিহাসিক নথিতে বিভিন্নভাবে পাওয়া যায়। তিনি নৌবাহিনীর জন্য বিস্কুট সরবরাহের কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তখনকার বেকারি ছিল শুধু বিক্রির দোকান নয়; একই ভবনে উৎপাদন, জ্বালানি রাখা এবং বসবাসের ব্যবস্থাও থাকতে পারত। নিচে রুটি তৈরির চুল্লি, ওপরে মানুষের ঘুমানোর ঘর—এই বিন্যাসে আগুন লাগলে কর্মস্থল ও বাড়ি একসঙ্গে বিপন্ন হতো। দিনের কাজ শেষ হয়ে গেলেও চুল্লির ভেতর বা আশপাশে অবশিষ্ট তাপ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত।

তবে বহুল প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা সতর্কভাবে বোঝা দরকার। প্রায়ই বলা হয়, ফ্যারিনার চুল্লির আগুন নেভাতে ভুলে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। বাস্তবে প্রথম আগুনটি ঠিক কীভাবে জ্বলে উঠেছিল, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। চুল্লির অবশিষ্ট অঙ্গার বা তাপ সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলেও কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য বিবরণ নেই। ফ্যারিনার আগুন নিরাপদ অবস্থায় রেখে ঘুমাতে যাওয়ার দাবি করেছিলেন। ফলে বেকারিটি অগ্নিকাণ্ডের সূচনাস্থল ছিল বলা এবং মালিকের নির্দিষ্ট অবহেলা প্রমাণিত বলা এক বিষয় নয়।

আগুন ধরা পড়ার সময় ভবনের ভেতরে থাকা মানুষের জন্য নিচের স্বাভাবিক বেরোনোর পথ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ফ্যারিনার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওপরের দিক দিয়ে পাশের বাড়িতে পৌঁছে বেঁচে যান। একজন গৃহকর্মী পালাতে পারেননি এবং তাঁকে অগ্নিকাণ্ডের প্রথম নিহত ব্যক্তি হিসেবে ধরা হয়। রাতের সেই ঘরে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কে প্রথম আগুন দেখেছিলেন, এসব বিষয়ে নথিতে অস্পষ্টতা রয়েছে। কিন্তু ঘটনাটি একটি বাস্তব দুর্বলতা দেখায়: বসতঘরের নিচে আগুন লাগলে সরু সিঁড়িই প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হতে পারত।

পুডিং লেনের অবস্থানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছিল লন্ডনের ঐতিহাসিক বাণিজ্যকেন্দ্রের মধ্যে, নদীতীরের ব্যস্ত এলাকার কাছাকাছি। আজকের বৃহত্তর লন্ডনের সঙ্গে তখনকার সিটি অব লন্ডনকে এক করে দেখলে বিপর্যয়ের ভূগোল বোঝা কঠিন হয়। আগুন প্রধানত আঘাত করেছিল এই ঘনবসতিপূর্ণ পুরোনো নগরকেন্দ্রকে। সরু রাস্তা, কাছাকাছি দোকান, কর্মশালা, বসতবাড়ি ও গুদামের মধ্যে আগুনের সামনে বড় কোনো খোলা বাধা ছিল না। একটি ভবন পুড়লে পাশের ভবনও দ্রুত তাপ ও অঙ্গারের নাগালে চলে আসত।

অনেক বাড়ির কাঠের কাঠামো ছিল আগুনের বড় সহায়ক। ওপরের তলা নিচের তলার তুলনায় রাস্তার দিকে বাড়িয়ে নির্মাণ করা হতো। এতে সীমিত জমিতে ব্যবহারযোগ্য জায়গা বাড়ত, কিন্তু গলির দুই পাশের ভবনের মধ্যকার দূরত্ব কমে যেত। কোথাও ওপরের অংশগুলো প্রায় মুখোমুখি এসে দাঁড়াত। এমন পরিবেশে আগুন শুধু মাটির সমতলে ছড়াত না; জানালা, কার্নিশ, কাঠের কড়ি ও ওপরের তলা দিয়েও এগোতে পারত। নিচে দাঁড়িয়ে বালতির পানি ছুড়ে এই বহুস্তরীয় বিস্তার আটকানো অত্যন্ত কঠিন ছিল।

এখানে খড়ের ছাদ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাটিও সংশোধন করা জরুরি। ১৬৬৬ সালের লন্ডনকে সর্বত্র খড়ের ছাউনিতে ঢাকা শহর হিসেবে দেখানো যথাযথ নয়। আগের অগ্নিকাণ্ডের অভিজ্ঞতায় খড়ের ছাদের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ ছিল এবং বহু বাড়িতে টালির ছাদ ব্যবহৃত হতো। কিন্তু টালি থাকলেই একটি ভবন আগুন থেকে নিরাপদ হয়ে যায় না। ছাদের নিচের কাঠ, মেঝে, সিঁড়ি, দরজা, ঘরের আসবাব এবং পরস্পরসংলগ্ন নির্মাণ আগুনকে যথেষ্ট জ্বালানি জুগিয়েছিল।

প্রাকৃতিক পরিস্থিতি এই নগরগত দুর্বলতাকে আরও মারাত্মক করে তোলে। সেই বছরের গ্রীষ্ম ছিল দীর্ঘ ও শুষ্ক। কাঠের ভবন ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ শুকিয়ে যাওয়ায় সেগুলো সহজে জ্বলে উঠতে পারছিল। একটি স্যাঁতসেঁতে দেয়াল বা ভেজা কাঠ যতটা প্রতিরোধ দিতে পারে, দীর্ঘদিন শুকিয়ে থাকা কাঠ ততটা পারে না। ফলে আগুন লাগার পর তাকে ছড়াতে সাহায্য করার মতো পরিবেশ আগে থেকেই তৈরি ছিল। বেকারি আগুনের সূচনা দিয়েছিল; শুষ্ক নগরটি তাকে টিকে থাকার উপকরণ দিয়েছিল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রবল পূর্বা বাতাস। বাতাস আগুনকে শুধু একদিকে হেলিয়ে দেয়নি, জ্বলন্ত ছোট টুকরা ও অঙ্গারও সামনে বহন করছিল। ফলে কোনো বাড়ির গায়ে সরাসরি শিখা পৌঁছানোর আগেই তার অন্য অংশে আগুন ধরার ঝুঁকি তৈরি হতো। এক জায়গায় আগুন ঠেকাতে গিয়ে মানুষ দেখত, আরও সামনে নতুন ধোঁয়া উঠছে। এতে অগ্নিনির্বাপণকারীদের পক্ষে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা ধরে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগুন ক্রমে বাড়ির পর বাড়ি জড়িয়ে বিস্তৃত হতে থাকে।

নদীর দিকে এগিয়ে আগুন দাহ্য পণ্যের গুদামের কাছে পৌঁছায়। টেমস ছিল লন্ডনের বাণিজ্যের প্রধান পথ; তার তীরে বিপুল পণ্য ওঠানামা করত এবং মজুত থাকত। তেল, চর্বিজাত পদার্থ ও অন্যান্য দাহ্য সামগ্রী আগুনের তীব্রতা বাড়াতে পারত। ঘরবাড়ির কাঠের আগুন যখন এমন মজুতে পৌঁছায়, তখন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়। নদী কাছে থাকলেও তার পানি নিজে থেকে রাস্তায় এসে আগুন নেভায় না। পানির উৎস থাকা এবং সেই পানি যথাসময়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

তখন লন্ডনে আধুনিক অর্থে সংগঠিত পেশাদার অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী ছিল না। স্থানীয় মানুষ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা চামড়ার বালতি, কুড়াল, হাতচালিত সরঞ্জাম ও লম্বা হুক ব্যবহার করতেন। এসব দিয়ে ছোট আগুন সামলানো সম্ভব হলেও প্রবল বাতাসে একাধিক ভবনে ছড়িয়ে পড়া আগুনের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা সীমিত ছিল। সরু গলিতে মানুষ, সরঞ্জাম ও পানি পৌঁছানোও সহজ ছিল না। আগুন বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে মালপত্র সরানোর চেষ্টা শুরু হলে চলাচলের জট আরও বাড়ে।

সেই সময় আগুন ঠেকানোর একটি পরিচিত উপায় ছিল সামনের কিছু বাড়ি ভেঙে ফাঁকা জায়গা তৈরি করা। এতে আগুনের ধারাবাহিক জ্বালানির পথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু অক্ষত বাড়ি ভাঙা মানে কারও বাসস্থান ও সম্পত্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা। মালিকানা, ক্ষতিপূরণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তৃত্বের প্রশ্ন তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। অথচ এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে আগুন পৌঁছানোর আগেই যথেষ্ট প্রশস্ত জায়গা খালি করা দরকার। বিলম্ব হলে একই কাজ অনেক বেশি বিপজ্জনক ও কঠিন হয়ে পড়ত।

লর্ড মেয়র স্যার টমাস ব্লাডওয়ার্থের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া এই কারণে বিশেষভাবে সমালোচিত। তিনি শুরুর দিকে আগুনের বিপদ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি করতে পারেননি। বাড়ি ভেঙে প্রতিরোধ গড়ার সিদ্ধান্তেও দ্রুততা ছিল না। তবে সমস্ত বিপর্যয়কে একজনের ভুলে সীমাবদ্ধ করলে ঘিঞ্জি নগর, সীমিত সরঞ্জাম ও প্রতিকূল আবহাওয়ার সম্মিলিত ভূমিকা আড়াল হয়। তাঁর ব্যর্থতা ছিল একটি বড় দুর্বল ব্যবস্থার মধ্যে সময়মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে না পারা—যে সময়টুকু হারিয়ে গেলে আর ফেরত পাওয়া সম্ভব ছিল না।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ বোঝার ক্ষেত্রে পরবর্তী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকেও দূরত্ব রাখা দরকার। বিদেশি বা ধর্মীয় শত্রুরা পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়েছিল—এমন গুজব আতঙ্কের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সন্দেহ নিজে প্রমাণ নয়। পুডিং লেনের দুর্ঘটনাকে নগরব্যাপী বিপর্যয়ে পরিণত করার ব্যাখ্যা খুঁজতে দৃশ্যমান পরিস্থিতিই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ: দাহ্য ভবন, শুষ্কতা, বাতাস, গুদাম এবং বিলম্বিত প্রতিরোধ। আগুনের প্রথম স্ফুলিঙ্গের অনিশ্চয়তা কোনো ষড়যন্ত্রকে সত্য করে তোলে না।

২ সেপ্টেম্বরের সকাল এগোতে এগোতে পুডিং লেনের স্থানীয় দুর্ঘটনা আর স্থানীয় থাকেনি। ঘুম ভাঙা মানুষ বুঝতে শুরু করেন, পাশের বাড়ি বাঁচানো কিংবা কয়েক বালতি পানি আনার চেয়ে অনেক বড় সংকট সামনে এসেছে। নদীতীরের বাণিজ্যপাড়া ও ঘনবসতির দিকে আগুন ছুটছিল, আর প্রতিটি নতুন দাহ্য ভবন তাকে আরও শক্তি দিচ্ছিল। তখন প্রশ্ন শুধু আগুন কোথায় লেগেছে তা ছিল না; প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল, লন্ডনের বুক দিয়ে এগিয়ে চলা আগুনকে কোথায় থামানো যাবে। সেই উত্তর খুঁজতে গিয়েই শহরটি প্রবেশ করল তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কয়েকটি দিনের মধ্যে।


আপনার পছন্দ হতে পারে