বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ঘুমের সময় নাক ডাকা কেন হয়? বিপদের লক্ষণ ও করণীয়

ঘুমের সময় নাক ডাকা কেন হয়? বিপদের লক্ষণ ও করণীয়
নাক ডাকার সঙ্গে শ্বাসের বিরতি ও দিনের তন্দ্রা থাকলে মূল্যায়ন জরুরি।

নাক ডাকার শব্দ আসলে কোথা থেকে তৈরি হয়?

ঘুমের সময় নাক ডাকা অনেক পরিবারেই পরিচিত ঘটনা। কেউ শুধু সর্দি হলে নাক ডাকেন, কারও প্রায় প্রতি রাতেই শব্দ হয়। বিষয়টি কখনো সাময়িক অসুবিধা, আবার কখনো ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রবাহে বাধার সংকেত। পার্থক্য বুঝতে শব্দের পাশাপাশি শ্বাসের ধরন ও দিনের উপসর্গ দেখতে হয়।

ঘুমালে জিহ্বা, গলার দেয়াল ও মুখের পেছনের নরম অংশের পেশি শিথিল হয়। শ্বাস যাওয়ার পথ সরু হয়ে এলে বাতাস চলাচলের সময় এসব টিস্যু কাঁপে। সেই কম্পন থেকেই নাক ডাকার শব্দ তৈরি হয়।

শুধু নাকের সমস্যা নয়

নাম নাক ডাকা হলেও শব্দের উৎস সব সময় নাক নয়। মুখের তালুর পেছনের অংশ, জিহ্বার অবস্থান এবং গলার গঠনও ভূমিকা রাখে। তাই শুধু নাক পরিষ্কার করলেই সবার সমস্যা সারে না।

শব্দ কত জোরে হচ্ছে, সেটি দিয়েও রোগের তীব্রতা নিশ্চিত করা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘুমের মধ্যে শ্বাস বারবার কমছে বা বন্ধ হচ্ছে কি না এবং ঘুমের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না।

কোন কারণে নাক ডাকার প্রবণতা বাড়ে?

সর্দি বা অ্যালার্জিতে নাক বন্ধ থাকলে শ্বাস নিতে অসুবিধা হয় এবং নাক ডাকা বাড়তে পারে। আবার চিৎ হয়ে ঘুমালে জিহ্বা ও নরম টিস্যু পেছনের দিকে সরে শ্বাসপথ আরও সরু করতে পারে।

ওজন, গঠন ও বয়সের ভূমিকা

অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে গলার আশপাশে বাড়তি টিস্যু, শ্বাসপথে বাধার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে স্বাভাবিক ওজনের মানুষেরও নাক ডাকা ও ঘুমে শ্বাস বন্ধ হওয়ার সমস্যা থাকতে পারে। চোয়াল, জিহ্বা, টনসিল এবং ওপরের শ্বাসপথের গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির পরিবর্তনেও প্রবণতা বাড়তে পারে। ফলে শুধু ওজন দেখে কাউকে ঝুঁকিমুক্ত বলা যায় না।

মদ্যপান ও কিছু ওষুধ

মদ্যপান এবং কিছু ঘুমের বা অবসাদক ওষুধ গলার পেশি আরও শিথিল করতে পারে। নিজের উদ্যোগে ঘুমের ওষুধ খেয়ে নাক ডাকার সঙ্গে জড়িত খারাপ ঘুম সামলানো তাই যথাযথ নয়।

চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিজে থেকে বন্ধও করবেন না। কোন ওষুধ নিচ্ছেন, কী পরিমাণে এবং কখন নিচ্ছেন—মূল্যায়নের সময় তা জানান। ধূমপানও নাক ডাকার সমস্যা বাড়াতে পারে।

কখন নাক ডাকা উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে?

নিয়মিত নাক ডাকার সঙ্গে শ্বাসের বিরতি থাকলে ঘুমের মধ্যে শ্বাসপথে বাধাজনিত শ্বাসরোধের সন্দেহ হয়। এতে গলার পথ বারবার আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে শ্বাস কমে যায় বা থামে। মস্তিষ্ক তখন ঘুমের গভীরতা কমিয়ে শ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।

পরিবারের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ

পাশে ঘুমানো কেউ লক্ষ্য করতে পারেন—কিছুক্ষণ জোরে নাক ডাকার পর হঠাৎ নীরবতা, তারপর হাঁসফাঁস বা দম আটকে আসার শব্দ। ব্যক্তি নিজে প্রতিবার জেগে ওঠার কথা মনে নাও রাখতে পারেন।

চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যদি থাকে:

  • ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস থেমে যাওয়ার পর্যবেক্ষণ।
  • হাঁসফাঁস করে বা দম আটকে জেগে ওঠা।
  • পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থেকেও দিনের অতিরিক্ত তন্দ্রা।
  • সকালে মাথাব্যথা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা সতেজ না লাগা।
  • মনোযোগ কমা, কাজে ভুল বেড়ে যাওয়া বা রাতে বারবার প্রস্রাব।

সব উপসর্গ একসঙ্গে থাকতেই হবে না। কারও ক্ষেত্রে ঘুমঘুম ভাবের বদলে ক্লান্তি বা অনিদ্রা বেশি চোখে পড়ে।

উপেক্ষা করার ঝুঁকি

চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় এই সমস্যা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও পক্ষাঘাতের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। দিনের তন্দ্রা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ায়। গাড়ি চালাতে বা যন্ত্র পরিচালনার সময় ঘুম পেলে কাজ বন্ধ করে নিরাপদ ব্যবস্থা নিন; শুধু চা-কফি দিয়ে চালিয়ে যাওয়া নিরাপদ সমাধান নয়।

চিকিৎসক কীভাবে কারণ নির্ণয় করেন?

চিকিৎসক নাক ডাকার সময়কাল, শ্বাসের বিরতি, দিনের তন্দ্রা, ঘুমের সময়সূচি এবং অন্যান্য রোগ সম্পর্কে জানতে চাইবেন। নাক, মুখ ও গলা পরীক্ষা এবং ওজন ও রক্তচাপ মূল্যায়নও প্রয়োজন হতে পারে।

দেখা তথ্য নিয়ে যান

সঙ্গীর বর্ণনা, নিজের ঘুমের দিনলিপি এবং ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা কাজে লাগে। সম্মতি নিয়ে করা ছোট শব্দ বা দৃশ্যধারণ চিকিৎসককে ঘটনা বোঝাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সেটি রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়।

মুঠোফোনের প্রয়োগ বা ঘড়ি নাক ডাকার প্রবণতার আভাস দিতে পারে। এগুলোর স্বাভাবিক ফল দিয়ে শ্বাসরোধের সমস্যা বাদ দেওয়া যায় না।

ঘুমের পরীক্ষা কেন লাগে?

প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়িতে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে অথবা ঘুম পরীক্ষাকেন্দ্রে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরীক্ষায় শ্বাসপ্রবাহ, শ্বাসের প্রচেষ্টা, রক্তের অক্সিজেনসহ বিভিন্ন তথ্য দেখা হতে পারে। পরীক্ষাগারের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষায় মস্তিষ্কের ঘুমসংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।

কোন পরীক্ষা উপযুক্ত, তা ব্যক্তির উপসর্গ ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। শুধু নাক ডাকার শব্দ শুনে রোগের ধরন বা তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না।

ঘরে কী পরিবর্তন করবেন, আর চিকিৎসায় কী থাকে?

শ্বাসের বিরতি বা দিনের তন্দ্রা থাকলে অভ্যাস বদলানোর পাশাপাশি মূল্যায়ন করান। ওজন কমলে সারে কি না দেখার জন্য পরীক্ষা অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেবেন না।

সহায়ক দৈনন্দিন পরিবর্তন

চিৎ হয়ে শুলে সমস্যা বাড়লে কাত হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ও টেকসইভাবে ওজন কমানো উপকারী হতে পারে। নিয়মিত ঘুম, ধূমপান ছাড়া এবং মদ্যপান এড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

নাক বন্ধ থাকলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন। নাকের বিশেষ ফিতা কিছু মানুষের নাসাপথের বাধায় সাহায্য করতে পারে, কিন্তু গলার ভেতরের বাধা বা ঘুমে শ্বাসরোধের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নয়। মুখে আঠালো ফিতা লাগিয়ে নিজে চিকিৎসা শুরু করবেন না।

চাপযুক্ত বাতাস ও মুখের যন্ত্র

শ্বাসরোধ ধরা পড়লে অনেকের জন্য মুখোশের মাধ্যমে চাপযুক্ত বাতাস দেওয়ার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত অক্সিজেন দেওয়ার যন্ত্র নয়; বাতাসের চাপ দিয়ে শ্বাসপথ খোলা রাখে।

নির্বাচিত ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তৈরি চোয়ালের যন্ত্র ব্যবহার করা যায়। কারও গঠনগত বাধায় অস্ত্রোপচার বিবেচিত হয়। সবার জন্য একই চিকিৎসা উপযুক্ত নয়, এবং অস্ত্রোপচারেও স্থায়ীভাবে নাক ডাকা বন্ধের নিশ্চয়তা নেই। মুখোশে অস্বস্তি হলে চিকিৎসাদলের সাহায্যে মাপ ও ব্যবহার ঠিক করানো উচিত।

শিশুদের নিয়মিত নাক ডাকা কেন আলাদাভাবে দেখতে হবে?

শিশু নিয়মিত নাক ডাকলে তাকে “গভীর ঘুমের লক্ষণ” ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বড় টনসিল ও নাকের পেছনের অ্যাডেনয়েড শিশুদের শ্বাসপথ সরু করার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

দিনের লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে

প্রাপ্তবয়স্কের মতো শুধু তন্দ্রা নয়, শিশুর অতিচঞ্চলতা, মনোযোগের সমস্যা, অস্থির ঘুম বা বিছানা ভেজানোর ঘটনাও দেখা যেতে পারে। মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাসের বিরতি থাকলে বিশেষভাবে জানান।

নিয়মিত নাক ডাকা, হাঁসফাঁস বা শ্বাসের বিরতিতে শিশুর চিকিৎসক কিংবা নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন দরকার। সব শিশুর অস্ত্রোপচার লাগে না; কারণ ও পরীক্ষার ফল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়।

যেকোনো বয়সে তীব্র শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট নীলচে হওয়া বা জাগানো কঠিন হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। নাক ডাকা সাধারণ হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে শ্বাসের অস্বাভাবিকতা ও দিনের কার্যক্ষমতার পরিবর্তন থাকলে সেটিই গুরুত্ব দেওয়ার সংকেত।