বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ডোজেস প্যালেস: ভেনিসের শাসক, গোপন আদালত ও ব্রিজ অব সাইজের অন্ধকার ইতিহাস

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

ডোজেস প্যালেস: ভেনিসের শাসক, গোপন আদালত ও ব্রিজ অব সাইজের অন্ধকার ইতিহাস
ভেনিসের রাজকীয় সৌন্দর্যের আড়ালে বিচার ও বন্দিত্বের ইতিহাস

ভেনিসের সান মার্কোর জলরাশির পাশে ডোজেস প্যালেসকে দেখলে প্রথমে তার সৌন্দর্যই চোখে পড়ে। নিচের খোলা খিলান, সূক্ষ্ম পাথরের জালি এবং গোলাপি-সাদা নকশার দেয়াল ভারী ভবনটিকে আশ্চর্য হালকা অনুভূতি দেয়। অথচ এই মার্জিত স্থাপত্যের ভেতরেই যুদ্ধ, বাণিজ্য, কূটনীতি ও বিচারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। কাছেই ছিল বন্দিদের কক্ষ এবং গোপন নথির দপ্তর। ডোজেস প্যালেস শুধু শাসকের বাসভবন নয়; ভেনিস প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতার কেন্দ্র। তার সৌন্দর্য বুঝতে হলে এই কঠোর বাস্তবতাও জানতে হয়।

ইতালীয় ভাষায় ভবনটি পালাত্ৎসো দুকালে নামে পরিচিত। এখানে ‘ডোজ’ বলতে বংশানুক্রমিক রাজাকে বোঝায় না। তিনি ছিলেন প্রজাতন্ত্রের নির্বাচিত সর্বোচ্চ পদাধিকারী, যিনি সাধারণভাবে আজীবন দায়িত্ব পালন করতেন। তবে তাঁর ক্ষমতা বিভিন্ন পরিষদ ও বিধিনিষেধের অধীন ছিল। ডোজকে সর্বময় সম্রাট ভাবলে ভেনিসের শাসনব্যবস্থা ভুল বোঝা হবে। রাজকীয় পোশাক, অনুষ্ঠান ও অভ্যর্থনায় তিনি রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রকাশ করতেন, কিন্তু নীতিনির্ধারণে অন্য প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। প্রাসাদের বহু সভাকক্ষ সেই বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার স্থাপত্যরূপ।

ডোজের আবাসের ইতিহাস নবম শতক পর্যন্ত পৌঁছালেও বর্তমান প্রাসাদ একবারে নির্মিত হয়নি। আগে এখানে প্রাচীরবেষ্টিত একাধিক ভবন ছিল। পরে নগরের দিকে খোলা প্রাসাদসমষ্টি গড়ে ওঠে। জলমুখী অংশের পরিচিত গথিক রূপ চতুর্দশ শতকে এবং প্রধান চত্বরমুখী অংশ পঞ্চদশ শতকে সম্প্রসারিত হয়। খালের পাশের অংশে পরবর্তী নবজাগরণধর্মী নির্মাণ রয়েছে। ফলে বাইরে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলেও ভবনটি বিভিন্ন সময়ের সংযোজন। ভেনিসের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যেমন ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে, প্রাসাদও তেমনি পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী বড় হয়েছে।

স্থাপত্যের প্রকাশ্য সৌন্দর্য ভেনিসের আত্মপরিচয়ের অংশ ছিল। সামুদ্রিক বাণিজ্যনির্ভর ধনী রাষ্ট্রটি নিজেকে শৃঙ্খলাপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান প্রজাতন্ত্র হিসেবে তুলে ধরত। প্রাসাদের অলংকরণ, ভাস্কর্য ও চিত্রে ন্যায়বিচার, ধর্মবিশ্বাস এবং সুশাসনের ধারণা দেখা যায়। বিদেশি দূতের কাছে এসব দৃশ্য রাষ্ট্রের শক্তির পরিচয় দিত। তবে সুশাসনের চিত্র আর প্রতিটি মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক বিষয় নয়। প্রাসাদের শিল্প রাষ্ট্র নিজের সম্পর্কে কী বলতে চাইত, সেটি জানায়; কারাগার ও বিচারব্যবস্থা সেই দাবির অন্য দিক পরীক্ষা করতে সাহায্য করে।

বৃহৎ পরিষদ বা গ্রেট কাউন্সিল ছিল রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এতে নির্দিষ্ট অভিজাত পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যরা অংশ নিতেন। তাই ভেনিস প্রজাতন্ত্র হলেও আধুনিক সর্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক গণতন্ত্র ছিল না। ক্ষমতার প্রবেশাধিকার বংশপরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। পাশাপাশি সেনেট বাণিজ্য, অর্থ ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখত; অন্যান্য পরিষদ প্রশাসনের পৃথক কাজ করত। একজন শাসককে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। এই পার্থক্য প্রাসাদের ইতিহাস বোঝার জন্য জরুরি।

বৃহৎ পরিষদের হলের বিশাল আকার ও জাঁকজমক এই অভিজাত শাসনকে দৃশ্যমান করেছিল। দেয়াল ও ছাদের চিত্রগুলো রাষ্ট্রের গৌরব, বিজয় এবং নৈতিক আদর্শ প্রকাশ করে। তিন্তোরেত্তো ও ভেরোনেজের মতো শিল্পীদের কাজ প্রাসাদের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বর্তমান শিল্পসম্ভার সবটাই প্রাথমিক নির্মাণপর্বের নয়। ১৫৭৭ সালের অগ্নিকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ সভাকক্ষ এবং বহু পুরোনো শিল্পকর্ম ধ্বংস হয়। পুনর্নির্মাণের পর নতুন চিত্রসজ্জা যুক্ত হয়, ফলে আজকের সৌন্দর্যের মধ্যেও বিপর্যয় ও পুনর্গঠনের ইতিহাস রয়েছে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে আলোচিত প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অব টেন বা দশজনের পরিষদ। এর ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু একে ভেনিসের সব ধরনের মামলার একমাত্র আদালত বলা ভুল। দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার পরিচালনার জন্য পৃথক প্রতিষ্ঠানও ছিল। ‘গোপন আদালত’ কথাটি বাস্তব ইতিহাসের একটি অংশ বোঝায়, পুরো বিচারব্যবস্থা নয়। জনসমক্ষে প্রচার না করা তদন্ত এবং গোপন নথির ব্যবহার রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে বিশেষ ক্ষমতার পরিবেশ তৈরি করেছিল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ছিল রাষ্ট্রের ইনকুইজিটরদের দপ্তর, যা ১৫৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রের গোপন তথ্য রক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তে এটি বিস্তৃত কর্তৃত্ব পায়। এখানে ‘ইনকুইজিটর’ শব্দ দেখে একে সরাসরি স্প্যানিশ ধর্মীয় ইনকুইজিশনের সমতুল্য ভাবা উচিত নয়। ভেনিসের এই দপ্তরের প্রধান ক্ষেত্র ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। গোপনীয়তার কারণে তদন্তের কিছু অংশ সাধারণ মানুষের দৃষ্টির বাইরে থাকত। যে ব্যবস্থা শাসকের কাছে সুরক্ষা, অভিযুক্তের কাছে সেটিই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের উৎস হতে পারত।

প্রাসাদের দেয়ালে থাকা মুখাকৃতির অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার স্থানগুলো সাধারণভাবে ‘সিংহের মুখ’ নামে পরিচিত। এসব ছিদ্র দিয়ে অপরাধ বা দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো যেত। এগুলো তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থার অংশ ছিল। তবে প্রতিটি জমা দেওয়া অভিযোগ থেকেই সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার বা শাস্তি হতো—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। অভিযোগ, তদন্ত ও রায় আলাদা পর্যায়। সিংহমুখের বাক্সকে সীমাহীন আতঙ্কের যন্ত্র হিসেবে দেখানোর বদলে প্রশাসনিক নজরদারি ও নাগরিক অভিযোগের জটিল সম্পর্কের মধ্যে দেখা বেশি অর্থবহ।

গোপন প্রশাসনিক পরিসরে শুধু বিচারক বা জিজ্ঞাসাবাদকারী ছিলেন না। নোটারি, সচিব ও নথির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতেন। দলিল সংরক্ষণের আলমারি এবং ছোট দপ্তরগুলো দেখায়, সামুদ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় লিখিত তথ্য কতটা জরুরি ছিল। একই অঞ্চলে জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষও ছিল, যেখানে নির্যাতন ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। স্বীকারোক্তি আদায়ে শারীরিক চাপ ছিল বিচারব্যবস্থার অন্ধকার দিক, যদিও এর ব্যবহার সময়ের সঙ্গে বদলেছে। এই ইতিহাসকে চমকপ্রদ দৃশ্যে নামিয়ে আনলে অভিযুক্ত মানুষের অভিজ্ঞতা এবং প্রক্রিয়ার সমস্যা আড়াল হয়ে যায়।

পুরোনো কারাগারের নিচের দিকের কক্ষগুলো ‘পোৎসি’ নামে পরিচিত। শব্দটির অর্থ কূপ হলেও এগুলোকে সরাসরি পানিভরা কূপ ভাবা ঠিক নয়। অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং সীমিত সুবিধা বন্দিত্বকে কঠিন করত। ওপরের ছাদের কাছের ‘পিওম্বি’ নাম এসেছে সিসার ছাদ থেকে। সেখানকার পরিবেশও সুখকর ছিল না, তবে নিচের পোৎসির তুলনায় ভালো হতে পারত। বিখ্যাত জিয়াকোমো কাসানোভা পিওম্বিতে বন্দি ছিলেন এবং ১৭৫৬ সালে পালিয়ে যান। তাঁর স্মৃতিকথা ঘটনাটিকে জনপ্রিয় করেছে, যদিও নিজের লেখা বিবরণও সমালোচনামূলকভাবে পড়তে হয়।

পরবর্তী সময়ে খালের অপর পাশে নতুন কারাগার নির্মিত হয়। বড় কক্ষ, বেশি আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্য থাকলেও বাস্তবে সব অংশ সেই লক্ষ্য পূরণ করেনি। এই কারাগারকে প্রাসাদের বিচারিক কক্ষের সঙ্গে যুক্ত করে ব্রিজ অব সাইজ বা দীর্ঘশ্বাসের সেতু। ঢাকা সেতুটির ভেতরে পাশাপাশি দুটি পৃথক করিডর রয়েছে। বাইরে থেকে তার সাদা পাথরের সৌন্দর্য যতটা আকর্ষণীয়, ভেতরে তার কাজ ছিল নিয়ন্ত্রিত চলাচল। অভিযুক্ত ও বন্দিদের বিচারিক প্রতিষ্ঠান এবং কারাগারের মধ্যে আনা-নেওয়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হতো।

সেতুর নামকে ঘিরে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্প হলো, বন্দিরা জানালা দিয়ে ভেনিসকে শেষবার দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। কিন্তু ‘ব্রিজ অব সাইজ’ নামটির পরিচিতি রোমান্টিক যুগের কল্পনাপ্রসূত ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি মানুষ মৃত্যুদণ্ডের পথে যেতেন বা কেউ আর স্বাধীনতা ফিরে পেতেন না—এমন দাবি সত্য নয়। সেতু পেরোনোর সঙ্গে কারাবাসের দুঃখের সম্পর্ক বাস্তব হতে পারে, কিন্তু সব বন্দির ভাগ্য এক ছিল না। আর গন্ডোলায় সেতুর নিচে প্রেমের গল্প তার বিচারিক ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পর্যটক-কল্পনা।

১৭৯৭ সালে ভেনিস প্রজাতন্ত্রের অবসানের পর প্রাসাদের পুরোনো শাসনগত ভূমিকা শেষ হয়। বিভিন্ন ব্যবহার ও সংরক্ষণের পর্যায় পেরিয়ে এটি জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। আজ একই ভবনে রাষ্ট্রের প্রদর্শিত মহিমা, দপ্তরের নীরব কাজ এবং বন্দিদের সীমাবদ্ধ জীবন দেখা যায়। ডোজেস প্যালেসের গভীরতম ইতিহাস সৌন্দর্য ও নিষ্ঠুরতার সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ক্ষমতা কীভাবে নিজেকে সাজায়, নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিচার পরিচালনা করে, তার ইতিহাস। ব্রিজ অব সাইজ সেই বৃহত্তর ব্যবস্থার একটি ছোট কিন্তু স্মরণীয় সংযোগ।