বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো: রোমান সম্রাটের সমাধি কীভাবে পোপদের দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হলো?

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো: রোমান সম্রাটের সমাধি কীভাবে পোপদের দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হলো?
সম্রাটের সমাধির ওপর গড়ে ওঠা পোপদের নিরাপত্তার দুর্গ

রোমের তিবের নদীর তীরে কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলোকে দেখলে প্রথমে একটি বিশাল দুর্গ বলেই মনে হয়। গোলাকার উঁচু কাঠামো, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা এবং মাথার ওপর তলোয়ারধারী দেবদূতের মূর্তি তার পরিচিত অবয়ব তৈরি করেছে। অথচ ভবনটি নির্মিত হয়েছিল মৃত সম্রাটের স্মৃতি রক্ষার জন্য। যে স্থানে রোমান রাজপরিবারের দেহাবশেষ রাখার পরিকল্পনা ছিল, সেটিই পরে জীবিত পোপদের প্রাণরক্ষার আশ্রয়ে পরিণত হয়। সমাধি, দুর্গ, প্রাসাদ, কারাগার ও জাদুঘর—এই দীর্ঘ রূপান্তরের মধ্যে রোমের ক্ষমতার ইতিহাসও ধরা রয়েছে।

এর সূচনা সম্রাট হাদ্রিয়ানের সময়, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে। তিনি নিজের এবং পরিবারের জন্য একটি মহিমান্বিত সমাধিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। নির্মাণ শুরুর সুনির্দিষ্ট বছর নিয়ে বিবরণে পার্থক্য থাকলেও ১৩৯ সালে তাঁর উত্তরসূরি আন্তোনিনুস পিয়ুসের সময় ভবনটি সম্পন্ন হয়, হাদ্রিয়ানের মৃত্যুর এক বছর পর। নদীর অপর তীরের নগরাঞ্চল থেকে সমাধিতে পৌঁছানোর জন্য সেতুও নির্মিত হয়েছিল। আজকের পোন্তে সান্ত’আঞ্জেলোর পূর্বসূরি সেই পোন্তে এলিও সমাধিসৌধকে রোমের দৃশ্যমান নগরপরিসরের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

মূল ভবনের কেন্দ্র ছিল বিশাল বৃত্তাকার কাঠামো। ভেতরের ঢালু সর্পিল পথ সমাধির কেন্দ্রীয় অংশে নিয়ে যেত। এই পথ এখনো প্রাচীন নির্মাণের অভিজ্ঞতা বুঝতে সাহায্য করে। বাইরে আজ যে সামরিক অবয়ব দেখা যায়, তা মূল সমাধির সম্পূর্ণ চেহারা নয়; পরে বহু স্তর যুক্ত হয়েছে। প্রাথমিক নির্মাণে সাম্রাজ্যিক মর্যাদা ও স্মৃতির প্রকাশই প্রধান ছিল। দুর্গের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় তাই একই পাথরের মধ্যে দুটি ভিন্ন উদ্দেশ্য অনুভব করা যায়—মৃতের স্মরণ এবং জীবিতের নিরাপত্তা।

সমাধি থেকে দুর্গে পরিবর্তন এক দিনে ঘটেনি। প্রাচীন রোমের শেষপর্বে নগরের প্রতিরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে ভবনটি প্রাচীরব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। নদীর পাশে অবস্থান, বিশাল আকার এবং বন্ধ পাথুরে কাঠামো তাকে সামরিক ব্যবহারের উপযোগী করে। যেখানে নতুন দুর্গ নির্মাণ ব্যয়বহুল হতো, সেখানে বিদ্যমান সমাধিকে অভিযোজিত করা বাস্তবসম্মত ছিল। এই রূপান্তর রোমের বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ: সাম্রাজ্যের স্মৃতিস্তম্ভ নতুন যুগে নিরাপত্তার অবকাঠামো হয়ে উঠছিল। পরবর্তী শাসকেরা সেই সুবিধাকে আরও বিস্তৃত করেন।

কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ধর্মীয় কিংবদন্তি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, ৫৯০ সালে রোমে মহামারির সময় পোপ প্রথম গ্রেগরি ভবনের ওপর আর্চএঞ্জেল মাইকেলকে তলোয়ার খাপে ঢোকাতে দেখেন। ঘটনাটি মহামারি শেষ হওয়ার সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এর সঙ্গে ভবনের দেবদূতসংক্রান্ত নাম ও প্রতীকী পরিচয় যুক্ত হয়েছে। তবে এই দর্শন ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ; নিশ্চিত প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। আজকের মূর্তিটিও সেই কথিত ঘটনার সমসাময়িক স্মারক নয়।

মধ্যযুগে রোমের রাজনীতি ছিল অস্থির। পোপ, প্রভাবশালী পরিবার এবং বিভিন্ন সামরিক শক্তির মধ্যে কর্তৃত্বের প্রতিযোগিতা চলত। সেন্ট পিটার্সের কাছে এই শক্তিশালী ভবন দখলে রাখা তাই বিশেষ সুবিধা দিত। পোপের ধর্মীয় মর্যাদা থাকলেই তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো না; নগরের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা ছিল। ১৩৬৭ সালে পোপ পঞ্চম আরবানের কাছে ভবনের চাবি হস্তান্তরের ঘটনা চার্চের সঙ্গে দুর্গটির সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এরপর প্রতিরক্ষা ও পোপীয় আবাস হিসেবে এর উন্নয়ন আরও সুস্পষ্ট হয়।

এই নিরাপত্তাব্যবস্থার সবচেয়ে পরিচিত অংশ পাসেত্তো দি বোরগো, ভ্যাটিকান থেকে দুর্গে যাওয়ার সুরক্ষিত পথ। একে অনেক সময় গোপন সুড়ঙ্গ বলা হয়, কিন্তু সেটি ভুল ধারণা। এটি মূলত প্রাচীরের সঙ্গে যুক্ত উঁচু করিডর। তার বিভিন্ন অংশ দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি ও পরিবর্তিত হয়েছে। ১২৭৭ সালে তৃতীয় নিকোলাসের সময় দুর্গের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপিত হয়; পরে ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের আমলে ঢাকা পথ যুক্ত করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বিপদের সময় পোপকে খোলা রাস্তা এড়িয়ে দুর্গে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া।

পথটির গুরুত্ব সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে প্রকাশ পায় ১৫২৭ সালের রোম লুণ্ঠনের সময়। সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সাম্রাজ্যিক বাহিনী রোমে প্রবেশ করলে পোপ সপ্তম ক্লেমেন্ট ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েন। তিনি পাসেত্তো দিয়ে কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলোতে আশ্রয় নেন। বাইরে লুটপাট ও সহিংসতার মধ্যে দুর্গ তাঁর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই ঘটনায় বোঝা যায়, পোপীয় প্রতিরক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। বহু বছর ধরে তৈরি পথ ও দুর্গ বাস্তব সংকটে শাসক এবং তাঁর সহযোগীদের রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছিল।

তবে ‘দুর্ভেদ্য’ শব্দটিকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত নয়। ক্লেমেন্ট দুর্গে পৌঁছে প্রাণরক্ষা করলেও রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ থেকে মুক্ত হননি। অবরোধের পর তাঁকে কঠিন আত্মসমর্পণের শর্ত মেনে নিতে হয়। একটি দুর্গ আক্রমণ বিলম্বিত করতে এবং আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু খাদ্য, সৈন্য ও বাইরের সহায়তার অভাব পূরণ করতে পারে না। রোমের ওই বিপর্যয় তাই একই সঙ্গে কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলোর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দেখায়। পোপের পরবর্তী মুক্তি ও নিরাপদ স্থানে যাওয়া ছিল পৃথক রাজনৈতিক অধ্যায়।

অস্ত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্গের প্রতিরক্ষাও বদলেছে। মূল গোলাকার রোমান কাঠামোর চারপাশে নতুন প্রাচীর, বুরুজ এবং কামান ব্যবহারের উপযোগী অবস্থান যোগ করা হয়। পঞ্চভুজাকার প্রতিরক্ষাবেষ্টনী পুরোনো সমাধিকে বৃহত্তর সামরিক কাঠামোর কেন্দ্র করে তোলে। নতুন অংশগুলো শুধু উঁচু দেয়াল বাড়ানোর কাজ করেনি; আক্রমণের দিক পর্যবেক্ষণ ও পাল্টা প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি করেছে। প্রাচীন সমাধির স্থায়িত্ব এবং পরবর্তী সামরিক প্রকৌশল একত্রে দুর্গটির কার্যকারিতা গড়ে তুলেছিল। দৃশ্যমান অমিলগুলো আসলে তার অভিযোজনের সাক্ষ্য।

ভেতরের পোপীয় কক্ষগুলো আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ প্রকাশ করে। তৃতীয় পল ফারনেসের সময় আবাসিক সৌন্দর্য বিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করে। সালা পাওলিনার মতো কক্ষে চিত্রসজ্জা ও অলংকরণ প্রমাণ করে, পোপদের জন্য শুধু নিরাপদ আশ্রয় নয়, মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের ব্যবস্থাও দরকার ছিল। রোমান ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজকীয় প্রতিনিধিত্ব এখানে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বাইরের সামরিক কঠোরতা ও ভেতরের প্রাসাদসুলভ সৌন্দর্য পরস্পরের পরিপূরক ছিল—একটি শরীর রক্ষা করত, অন্যটি শাসকের অবস্থান ও কর্তৃত্ব বজায় রাখত।

একই ভবনের কারাগার এই বিলাসিতার বিপরীত ইতিহাস বহন করে। রাজনৈতিক বন্দি এবং বিচারব্যবস্থায় আটক ব্যক্তিদের এখানে রাখা হতো। শিল্পী বেনভেনুতো চেল্লিনির বন্দিত্ব দুর্গটির পরিচিত ঘটনাগুলোর একটি। তবে সব বন্দির অভিজ্ঞতা একই ছিল না; অবস্থান, অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিস্থিতি বদলাত। এই কারাগার মনে করিয়ে দেয়, পোপীয় রাষ্ট্রের ক্ষমতা শুধু ধর্মীয় ছিল না। আইন প্রয়োগ, শাস্তি এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও তার অংশ ছিল। যে প্রাচীর একজনকে বাইরের বিপদ থেকে বাঁচাত, অন্যজনকে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করত।

ভবনের সর্বোচ্চ অংশে দেবদূতের মূর্তি এবং সামনে সেতু আজ দুর্গটির পরিচিত দৃশ্য তৈরি করেছে। কিন্তু এগুলোও বিভিন্ন সময়ের সংযোজন। বর্তমান সেতুর দেবদূতসমূহকে হাদ্রিয়ানের যুগের সঙ্গে মেলানো যায় না। নিচের রোমান কাঠামো, ওপরের পোপীয় কক্ষ এবং বাইরের প্রতিরক্ষাবেষ্টনী আলাদা সময়ের ইতিহাস বহন করে। কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো দেখার সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় হলো এই স্তরগুলো আলাদা করে চিনতে শেখা। তাতে ভবনটি একটি অদ্ভুত আকৃতির দুর্গ থেকে রোমের দীর্ঘ পরিবর্তনের পাঠে পরিণত হয়।

১৮৭০ সালে ইতালীয় রাষ্ট্রের অধীনে আসার পরও এখানে সামরিক ব্যবহার চলেছিল; ১৯২৫ সালে এটি জাতীয় জাদুঘরে পরিণত হয়। আজ দর্শক সমাধির পথ, প্রতিরক্ষা, পোপীয় আবাস ও বন্দিত্বের স্মৃতি একই স্থানে দেখতে পারেন। এই ভবন টিকে আছে মূল উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত থাকার কারণে নয়, বরং নতুন প্রয়োজনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ফলে। হাদ্রিয়ান নিজের মৃত্যুর পর স্মৃতি অক্ষয় করতে যে সৌধ নির্মাণ করেছিলেন, সেটি শেষ পর্যন্ত বহু জীবিত মানুষের আশ্রয়, ক্ষমতা ও ভয়ের ইতিহাস ধারণ করেছে। রোমের ধারাবাহিকতা এখানে পাথরের মধ্যেই দৃশ্যমান।