বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

টেনোচটিটলান অবরোধ: ১৫২১ সালে অ্যাজটেক পতন ও কুয়াউতেমোকের প্রতিরোধ

সিরিজ: অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন

টেনোচটিটলান অবরোধ: ১৫২১ সালে অ্যাজটেক পতন ও কুয়াউতেমোকের প্রতিরোধ
জল-স্থল অবরোধে বিপর্যস্ত টেনোচটিটলানে কুয়াউতেমোকের শেষ প্রতিরোধ।

ত্লাসকালায় আশ্রয় নিয়ে কোর্তেস যখন পরাজিত বাহিনীকে পুনর্গঠন করছিলেন, টেনোচটিটলানে তখন রাজধানী উদ্ধারের বিজয় ধরে রাখার চেষ্টা চলছিল। ‘বিষাদের রাত্রি’ স্প্যানিশদের বিতাড়িত করেছিল, কিন্তু তাদের স্থানীয় জোট ভাঙেনি। কোর্তেস এবার বুঝেছিলেন, সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করে দ্বীপনগরী ধরে রাখার পরিবর্তে তার চারপাশের অঞ্চল, জলপথ ও খাদ্য সরবরাহ দখল করতে হবে। ১৫২১ সালের অভিযান তাই আগেরবারের মতো রাজধানীতে প্রবেশের চেষ্টা ছিল না; এটি ছিল টেনোচটিটলানকে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধীরে ধীরে পরাস্ত করার পরিকল্পনা।

পুনর্গঠনের ভিত্তি ছিল ত্লাসকালানদের অব্যাহত সহযোগিতা। তারা আহতদের আশ্রয়, খাদ্য ও সামরিক সহায়তা দেয়। কিন্তু কোর্তেস শুধু পুরোনো মিত্রদের ওপর নির্ভর করেননি। ১৫২০ সালের দ্বিতীয়ার্ধে তেপেয়াকা ও আশপাশের অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে পথ এবং যোগাযোগের ওপর প্রভাব বাড়ানো হয়। প্রতিরোধকারী বসতিতে সহিংসতা, বন্দিত্ব ও দাসত্ব আরোপও এই বিস্তারের অংশ ছিল। আলোচনার পাশাপাশি জবরদস্তি দিয়েও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছিল। কোনো সমাজ সহযোগিতা করেছে বলেই তার সব সদস্য স্বেচ্ছায় বা একই উদ্দেশ্যে অংশ নিয়েছিল, এমন ধরে নেওয়া যায় না।

ত্লাসকালা ছাড়াও তেসকোকো, চালকো, হুয়েহোৎসিনকো এবং অন্য অঞ্চলের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তেসকোকোর রাজপরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্বে একটি পক্ষ স্প্যানিশদের সঙ্গে মিলিত হয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। ফলে অ্যাজটেক ত্রিপক্ষীয় জোটের পুরোনো অংশীদারই রাজধানী আক্রমণের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। আদিবাসী মিত্রদের লক্ষ্য ছিল করদায়িত্ব, আঞ্চলিক বিরোধ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় নিজেদের সুবিধা অর্জন। তারা ভবিষ্যৎ স্প্যানিশ উপনিবেশের সব পরিণতি জেনে সিদ্ধান্ত নেয়নি। আবার তাদের নিছক নিষ্ক্রিয় সহকারী বললেও এই যুদ্ধের প্রকৃত শক্তিসমীকরণ বোঝা যায় না।

এই সামরিক পরিবর্তনের মধ্যে ১৫২০ সালের শেষভাগে মেক্সিকো উপত্যকায় গুটিবসন্ত ভয়াবহ আঘাত হানে। স্প্যানিশ উপনিবেশ বিস্তারের সঙ্গে আসা সংক্রমণ উপকূল থেকে বিভিন্ন সমাজে ছড়িয়ে রাজধানীতে পৌঁছায়। প্রচলিত বিবরণে নারভায়েসের অভিযাত্রী দলের সঙ্গে রোগটির আগমন যুক্ত করা হয়; তবে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পুরো মহামারির একমাত্র উৎস বলা অতিরিক্ত সরলীকরণ। এই রোগ তখন মেশিকাদের কাছে নতুন ছিল, এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে পূর্বসংক্রমণ থেকে অর্জিত সুরক্ষা ছিল না। অসংখ্য পরিবারের পরিচর্যা ও দৈনন্দিন কাজ একসঙ্গে ব্যাহত হয়।

গুটিবসন্তের ক্ষতি শুধু যোদ্ধাদের মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষক, খাদ্য পরিবহনকারী, কারিগর ও পরিচর্যাকারীদের অসুস্থতা নগরীর পুনরুদ্ধারক্ষমতা কমিয়ে দেয়। রোগীরা চলাফেরা করতে না পারলে পরিবারের অন্যদের ওপর চাপ বাড়ত; একই বাড়িতে বহুজন আক্রান্ত হলে সেবা দেওয়াও কঠিন হতো। মৃতের নির্ভরযোগ্য মোট সংখ্যা নেই। মহামারি শত্রু-মিত্রের রাজনৈতিক সীমা মানেনি, অন্য আদিবাসী সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে টেনোচটিটলানের জন্য এই আঘাত বিশেষ বিপজ্জনক ছিল, কারণ তার পরেই দীর্ঘ অবরোধের মুখোমুখি হতে হয়।

কুইতলাহুয়াকের মৃত্যু সাধারণভাবে এই মহামারির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তাঁর পর কুয়াউতেমোক শাসনভার গ্রহণ করেন। বয়স নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তিনি ছিলেন তরুণ রাজবংশীয় নেতা, ত্লাতেলোলকোর সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁকে যে রাষ্ট্র রক্ষা করতে হয়, তা ইতিমধ্যে যুদ্ধ, শাসক পরিবর্তন ও মহামারিতে বিপর্যস্ত। কুয়াউতেমোকের প্রতিরোধ ছিল ক্ষয়প্রাপ্ত জনবল ও সংকুচিত মিত্রসমর্থনের মধ্যে রাজধানী ধরে রাখার সংগ্রাম। তিনি প্রতিরক্ষা সংগঠিত করেন, জলপথ ও সড়কের বাধা ব্যবহার করেন এবং নগরীর প্রতিরোধ চালিয়ে যান।

কোর্তেসের পরিকল্পনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ছিল হ্রদের জন্য তেরোটি ব্রিগ্যান্টিন নির্মাণ। এগুলো বিশাল সমুদ্রগামী জাহাজ নয়, পাল ও দাঁড়ে চলা ছোট যুদ্ধোপযোগী নৌযান। মার্তিন লোপেসের তত্ত্বাবধানে তৈরি কাঠামোর অংশ ত্লাসকালা থেকে বহন করে তেসকোকোতে এনে জোড়া লাগানো হয়। আদিবাসী কাঠমিস্ত্রি, শ্রমিক ও বাহকদের কাজ ছিল অপরিহার্য। ১৫২১ সালের এপ্রিলের শেষে নৌযানগুলো পানিতে নামানো হয়। ইউরোপীয় নৌপ্রযুক্তি স্থানীয় শ্রম, উপকরণ ও অবকাঠামোর সাহায্যেই হ্রদে কার্যকর যুদ্ধশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

মে মাসে অবরোধের প্রস্তুতি পূর্ণতা পায়। ত্লাকোপান, কোয়োয়াকান ও ইস্তাপালাপামুখী প্রবেশপথে পৃথক বাহিনী অবস্থান নেয়; নেতৃত্বে ছিলেন আলভারাদো, ক্রিস্তোবাল দে অলিদ ও গনসালো দে সান্দোভাল। কোর্তেস জলপথের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্প্যানিশ সৈন্য ছিল আনুমানিক এক হাজারের কাছাকাছি, আর স্থানীয় মিত্রের সংখ্যা ছিল বহুগুণ বেশি, যদিও হিসাবগুলো একমত নয়। বিরাট আদিবাসী বাহিনী ছাড়া সড়ক ধরে আক্রমণ, রসদ বহন এবং দখল করা অবস্থান রক্ষা করা সম্ভব হতো না। এই যুদ্ধ কয়েকশ ইউরোপীয়ের একক জয় ছিল না।

অবরোধের শুরুতে চাপুলতেপেক থেকে আসা মিঠা পানির সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা হয়। হ্রদের চারপাশে অভিযান ও নৌ টহল খাদ্যবাহী ক্যানোর চলাচল বিপজ্জনক করে তোলে। টেনোচটিটলানের খাল ও জলপথ এতদিন নগরীর শক্তি ছিল; এখন সেগুলোর বাইরের সংযোগ নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিল আক্রমণকারীরা। পানি ও খাদ্যের সংকট যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজয় ছাড়াই প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করছিল। মেশিকারা বিকল্প সরবরাহ ও চলাচল বজায় রাখার চেষ্টা করলেও দীর্ঘ অবরোধে সুযোগ কমতে থাকে। নগরীর বেসামরিক মানুষও একই চাপে পড়ে।

ব্রিগ্যান্টিনের কামান, তুলনামূলক শক্ত কাঠামো ও চলাচলের সুবিধা মেশিকা ক্যানোর বিরুদ্ধে কার্যকর হয়। কিন্তু জলযুদ্ধ একতরফা ছিল না। প্রতিরক্ষাকারীরা অগভীর জল, সংকীর্ণ পথ ও প্রতিবন্ধকতা ব্যবহার করে নৌযানকে আটকে বা অসুবিধায় ফেলার চেষ্টা করেছিল। ক্যানো থেকে আক্রমণ এবং তীরের কাছের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নৌ নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; জাহাজ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে হ্রদ সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যায়নি। স্থলবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নৌযানগুলো সরবরাহ বাধা দেওয়া ও আক্রমণে সহায়তা করত।

স্থলযুদ্ধে প্রতিটি সড়ক ও জলপথের ফাঁক ছিল নতুন প্রতিরক্ষা অবস্থান। স্প্যানিশ-মিত্রবাহিনী দিনে এগিয়ে কোনো বাধা পার হলেও পিছিয়ে গেলে মেশিকারা আবার তা দখল বা পুনর্নির্মাণ করতে পারত। জুনের শেষদিকে এক বড় আক্রমণে পথ ও পারাপার যথেষ্ট সুরক্ষিত না রেখে এগোনোর ফলে কোর্তেসের দল বিপর্যস্ত হয়; বহু সৈন্য নিহত বা বন্দি হয়। দীর্ঘ অবরোধের মধ্যেও মেশিকারা পাল্টা আঘাত দেওয়ার ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। বন্দিদের মধ্যে কয়েকজনকে বলি দেওয়া আক্রমণকারীদের মনে ভয় এবং তাদের জোটে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।

এরপর অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। দখল করা এলাকার বাড়িঘর ভেঙে এবং খালের ফাঁক ভরাট করে পথ নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা হয়। এই কৌশলে প্রতিরক্ষাকারীদের পুনরায় অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়, কিন্তু নগরজীবনের অবকাঠামোও ধ্বংস হতে থাকে। টেনোচটিটলান শুধু দখল হচ্ছিল না; তার বাসস্থান ও চলাচলের ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছিল। খাদ্যাভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ক্ষত ও অসুস্থতা মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। মূল গুটিবসন্ত মহামারির আঘাত আগেই এসেছিল; অবরোধ সেই ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ কেড়ে নেয়।

জুলাই ও আগস্টে প্রতিরক্ষা ক্রমে উত্তরের ত্লাতেলোলকো অঞ্চলে সংকুচিত হয়। যোদ্ধা ও আশ্রয়হীন সাধারণ মানুষ সীমিত এলাকায় জমা হতে থাকে। কুয়াউতেমোক প্রতিরোধ চালিয়ে গেলেও নৌপথ, খাদ্য ও জনবলের ক্ষতি পূরণ করার উপায় ছিল না। হতাহতের বিপুল সংখ্যা বিভিন্ন বিবরণে পাওয়া যায়, কিন্তু নির্ভরযোগ্য মোট হিসাব স্থির করা কঠিন। নগরীর পতনকে শুধু সম্রাটের ব্যক্তিগত সাহসের সীমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একটি জনবহুল শহরকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন রাখার সম্মিলিত সামরিক ও মানবিক চাপ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

১৩ আগস্ট ১৫২১ সালে কুয়াউতেমোক ক্যানোতে থাকা অবস্থায় স্প্যানিশ নৌবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁর সঙ্গে অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও ছিলেন। তিনি পালাচ্ছিলেন, নতুন অবস্থানে যাচ্ছিলেন, না অন্য উদ্দেশ্য ছিল—তাঁর মনের পরিকল্পনা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তাঁকে কোর্তেসের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে সংগঠিত প্রতিরোধের অবসান ঘটে। তাঁর বন্দিত্বই টেনোচটিটলানের পতনের প্রচলিত নির্ধারক মুহূর্ত। তাঁকে সেদিন হত্যা করা হয়নি; পরে বন্দিত্ব ও নির্যাতনের মুখে পড়েন এবং ১৫২৫ সালে কোর্তেসের নির্দেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এই পতন ঘটেছিল মহামারির ক্ষতি, স্থানীয় জোটের বিস্তার, জল-স্থল অবরোধ এবং রসদ বিচ্ছিন্নতার সম্মিলিত প্রভাবে। কোনো একক অস্ত্র, রোগ বা সেনানায়ক পুরো ফল নির্ধারণ করেনি। অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের স্বাধীন কেন্দ্র ধ্বংস হলেও মেশিকা জনগোষ্ঠী, নাহুয়াতল ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়নি। ১৩ আগস্ট ছিল একটি সাম্রাজ্যের পতন, সমগ্র মেক্সিকো একই দিনে জয় করার ঘটনা নয়। বিধ্বস্ত রাজধানীতে স্প্যানিশ শাসন ও নতুন মেক্সিকো সিটি গড়ে উঠতে শুরু করে; অন্যদিকে আদিবাসী সমাজগুলোর সামনে আসে জমি, শ্রম, ধর্ম ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক সংগ্রাম।