কোর্তেসের মেক্সিকো অভিযান: ১৫১৯ সালের আগমন ও স্থানীয় জোট
সিরিজ: অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন
স্থানীয় জোটের সহায়তায় টেনোচটিটলানের পথে কোর্তেসের বাহিনী।
১৫১৯ সালে মেক্সিকোর উপকূলে হার্নান কোর্তেস পৌঁছানোর পর দ্বিতীয় মোকতেজুমার সামনে যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছিল, তার উত্তর শুধু আগন্তুকদের অস্ত্র দেখে পাওয়া সম্ভব ছিল না। সমুদ্রপথে আসা দলটি সংখ্যায় ছোট, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিপজ্জনক। রাজধানীর বাইরে অ্যাজটেকদের করদ অঞ্চল ও স্বাধীন শত্রুরা এই উপস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে বিচার করতে শুরু করেছিল। কোর্তেসের টেনোচটিটলানে পৌঁছানোর কাহিনি তাই কয়েকশ স্প্যানিশ সৈন্যের অভিযানমাত্র নয়; এটি স্থানীয় বিরোধ, অনুবাদ, দরকষাকষি ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক বহুপক্ষীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন।
এই অভিযানের পেছনে ছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলে স্প্যানিশ উপনিবেশ বিস্তারের অভিজ্ঞতা। ১৫১৭ সালে ফ্রান্সিসকো এরনান্দেস দে কর্দোবা এবং ১৫১৮ সালে হুয়ান দে গ্রিহালভার অভিযানে ইউকাতান ও মেক্সিকোর উপকূল সম্পর্কে খবর আসে। সেখানে জনবহুল বসতি, সুসংগঠিত বাণিজ্য এবং মূল্যবান সামগ্রীর সন্ধান স্প্যানিশদের আগ্রহ বাড়ায়। কিউবার গভর্নর দিয়েগো ভেলাসকেস পরবর্তী অভিযানের দায়িত্ব দেন কোর্তেসকে। কিন্তু প্রস্তুতির সময় তাঁর স্বাধীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ভেলাসকেস তাঁকে থামাতে চাইলেও কোর্তেস শেষ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যান।
১৫১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিউবা ছাড়ার সময় তাঁর বহরে ছিল এগারোটি জাহাজ, পাঁচশের বেশি সৈন্য, নাবিক, অল্পসংখ্যক ঘোড়া এবং কামান। বিভিন্ন বিবরণে লোকসংখ্যা কিছুটা আলাদা। বাহিনীতে তলোয়ারধারী সৈন্যের পাশাপাশি ক্রসবো ও প্রাথমিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীরাও ছিল। এই অস্ত্রসম্ভার সুবিধা দিলেও বিশাল ভূখণ্ড দখলের জন্য যথেষ্ট ছিল না। খাদ্য, পথনির্দেশ, তথ্য ও স্থানীয় জনবল ছাড়া দলটি দীর্ঘদিন ভেতরের অঞ্চলে অভিযান চালাতে পারত না। আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ ও ঘোড়ার উপস্থিতি প্রথম সাক্ষাতে বিস্ময় সৃষ্টি করলেও স্থানীয় যোদ্ধারা দ্রুত তাদের কার্যক্ষমতা বুঝতে শিখেছিল।
ইউকাতানের কাছে কোসুমেল দ্বীপে কোর্তেসের সঙ্গে যোগ দেন হেরোনিমো দে আগিলার। কয়েক বছর আগে জাহাজডুবির পর তিনি মায়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন এবং তাদের ভাষা শিখেছিলেন। ফলে স্প্যানিশদের সঙ্গে মায়াভাষী সমাজের কথাবার্তায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তবে মধ্য মেক্সিকোর রাজনৈতিক আলোচনায় প্রধান ভাষা ছিল নাহুয়াতল। শুধু আগিলারের দক্ষতা দিয়ে সেই বাধা দূর হতো না। অভিযানের পরবর্তী পর্যায়ে এক দাসত্বে আবদ্ধ তরুণীর উপস্থিতি এই ভাষাগত সীমাবদ্ধতা বদলে দেয়।
মার্চে তাবাস্কো অঞ্চলে স্প্যানিশদের সঙ্গে স্থানীয় বাহিনীর যুদ্ধ হয়। সেন্তলার সংঘর্ষে পরাজয়ের পর স্থানীয় নেতারা খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে কয়েকজন নারীকে স্প্যানিশদের হাতে তুলে দেন। তাঁদের একজন ছিলেন মালিনৎসিন, যিনি মালিনচে ও খ্রিস্টীয় নাম দোনিয়া মারিনা হিসেবেও পরিচিত। তিনি নাহুয়াতল এবং একটি মায়া ভাষা জানতেন। প্রথমদিকে কোর্তেস স্প্যানিশে বলতেন, আগিলার তা মায়া ভাষায় অনুবাদ করতেন, আর মালিনৎসিন নাহুয়াতলে পৌঁছে দিতেন। জবাব আসত বিপরীত পথে। পরে মালিনৎসিন স্প্যানিশ শেখায় যোগাযোগ আরও সরাসরি হয়।
মালিনৎসিনের ভূমিকা শব্দ বদলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্থানীয় নেতাদের অবস্থান, আলোচনার অর্থ এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক বুঝতেও তিনি সহায়তা করতেন। তবে তাঁকে শুধু ‘বিশ্বাসঘাতক’ বললে তাঁর দাসত্ব ও সীমিত স্বাধীনতার বাস্তবতা আড়াল হয়। তখন কোনো ঐক্যবদ্ধ মেক্সিকান জাতিরাষ্ট্র ছিল না, যার প্রতি সব জনগোষ্ঠীর একই আনুগত্য থাকার কথা। মালিনৎসিনের নিজের সুযোগ ও নিরাপত্তার প্রশ্নও ছিল। তাঁর দক্ষতা কোর্তেসের অভিযানের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল, কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তকে পরবর্তী যুগের জাতীয় পরিচয় দিয়ে বিচার করা ইতিহাসকে সরল করে ফেলে।
এপ্রিলে সান হুয়ান দে উলুয়ার কাছে পৌঁছে স্প্যানিশরা মোকতেজুমার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দূতেরা উপহার আনেন এবং আগন্তুকদের সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করেন। কোর্তেস সম্রাটের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের দাবি তোলেন। উপহার তাঁর আগ্রহ কমায়নি; বরং রাজধানীর সম্পদ সম্পর্কে প্রত্যাশা বাড়িয়েছিল। মোকতেজুমার দূত পাঠানোকে নির্বিচারে আতঙ্ক বা আত্মসমর্পণ বলা ঠিক নয়। এটি ছিল অজানা শক্তিকে বোঝা ও তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। একইভাবে স্প্যানিশদের সবাই দেবতা মনে করেছিল—এমন জনপ্রিয় ধারণাও নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য নয়।
উপকূলে কোর্তেস ভিয়া রিকা দে লা ভেরাক্রুস নামে একটি পৌর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পরিষদের মাধ্যমে তিনি নিজের নেতৃত্বের বৈধতা দাবি করে ভেলাসকেসের কর্তৃত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেন এবং সরাসরি স্প্যানিশ রাজমুকুটের অধীনে কাজ করার যুক্তি দাঁড় করান। স্পেনে দূত ও মূল্যবান সামগ্রী পাঠানো হয়। অর্থাৎ অ্যাজটেকদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি কোর্তেস স্প্যানিশ শাসনব্যবস্থার ভেতরেও নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করছিলেন। অভিযানের সাফল্য তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল।
এরপর উপকূলীয় সেম্পোয়ালায় তোতোনাক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অভিযানের দিক বদলে দেয়। অ্যাজটেকদের করদায়িত্ব ও রাজনৈতিক চাপ নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ ছিল। কিন্তু সব তোতোনাক বসতির অবস্থান এক ছিল না; স্থানীয় নেতৃত্বের নিজস্ব হিসাব ছিল। কোর্তেস সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার আশ্বাস দেন। তাঁর উপস্থিতিতে অ্যাজটেক কর সংগ্রাহকদের আটক করার ঘটনাও ঘটে। স্প্যানিশ বিবরণে পরে কয়েকজনকে গোপনে মুক্ত করে মোকতেজুমার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টার কথা আছে। এই দ্বিমুখী কৌশলে কোর্তেস স্থানীয় সহযোগীদের কাছে রক্ষক এবং সম্রাটের কাছে আলোচনাযোগ্য পক্ষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছিলেন।
তোতোনাকদের সহায়তায় স্প্যানিশরা খাদ্য, আশ্রয়, পথপ্রদর্শক, বাহক ও যোদ্ধা পায়। এসব সুবিধা অভিযানের কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়ায়। তবু কোর্তেসের নিজের দলে কিউবায় ফেরার আকাঙ্ক্ষা ও ভেলাসকেসপন্থীদের বিরোধ ছিল। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের মধ্যে অধিকাংশ জাহাজ অচল বা ডুবিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়ে। তিনি সব জাহাজ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন—প্রচলিত এই গল্প নির্ভরযোগ্য নয়। জাহাজ অচল করার ফলে পালিয়ে ফেরার সুযোগ কমে এবং নাবিকদেরও স্থল অভিযানে কাজে লাগানো সম্ভব হয়।
আগস্টের মাঝামাঝি কোর্তেস উপকূল ছেড়ে পাহাড়ি অভ্যন্তরের দিকে অগ্রসর হন। সঙ্গে স্প্যানিশদের পাশাপাশি স্থানীয় সহযাত্রী ও বাহকেরা ছিল। ত্লাসকালার কাছে পৌঁছালে তাঁদের স্বাগত জানানো হয়নি; বরং সেপ্টেম্বরের শুরুতে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। ত্লাসকালা ছিল কয়েকটি প্রধান নগররাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীন শক্তি, অ্যাজটেকদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। অজানা বিদেশি বাহিনী তাদের জন্যও বিপদ হতে পারত। অ্যাজটেকদের শত্রু হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্প্যানিশদের বন্ধু হওয়া ছিল না। ত্লাসকালানরা প্রথমে আগন্তুকদের সামরিক শক্তি পরীক্ষা ও প্রতিরোধ করেছিল।
যুদ্ধ চলার পাশাপাশি আলোচনাও হয়। ত্লাসকালার নেতৃত্বের মধ্যে মতভেদ ছিল; তরুণ সেনানায়ক শিকোতেনকাতল প্রতিরোধের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, আর মাশিশকাতসিনসহ অন্য নেতারা সমঝোতার সুযোগ দেখেন। সেপ্টেম্বরের শেষভাগে শান্তি ও জোট প্রতিষ্ঠিত হয়। ত্লাসকালানদের লক্ষ্য ছিল মেশিকা আধিপত্যের মোকাবিলা ও নিজেদের অবস্থান শক্ত করা। স্প্যানিশরা পেল বিশ্রাম, রসদ এবং নতুন সামরিক সহযোগী। এই জোটকে স্থানীয়দের সরলভাবে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা বললেও তাদের সক্রিয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আড়াল হয়; তারা তখন নিজেদের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী হিসাব করছিল।
অক্টোবরে কোর্তেস চোলুলায় পৌঁছান। গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও বাণিজ্যকেন্দ্রটির সঙ্গে ত্লাসকালার বিরোধ এবং মেশিকাদের যোগাযোগ পরিস্থিতিকে উত্তেজিত করে। কোর্তেস দাবি করেন, স্প্যানিশদের হত্যার ষড়যন্ত্রের খবর পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই অভিযোগের সত্যতা বিতর্কিত। তাঁর নির্দেশে আক্রমণ শুরু হলে বহু মানুষ নিহত হয় এবং স্থানীয় মিত্ররাও সহিংসতায় অংশ নেয়। চোলুলার গণহত্যাকে নিশ্চিত ষড়যন্ত্র ঠেকানোর অনিবার্য ব্যবস্থা হিসেবে দেখানো যায় না। এই হত্যাকাণ্ড একই সঙ্গে আশপাশের সমাজকে জানিয়ে দেয়, আলোচনার পাশাপাশি অভিযাত্রীরা ব্যাপক সহিংসতা ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
চোলুলা পেরিয়ে বাহিনী পাহাড়ি গিরিপথ ধরে মেক্সিকো উপত্যকায় নামে। তত দিনে কোর্তেসের শক্তি শুধু তাঁর স্প্যানিশ সৈন্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; স্থানীয় জোট ও যোগাযোগই রাজধানীর পথ খুলেছিল। ৮ নভেম্বর ১৫১৯ সালে তাঁরা টেনোচটিটলানে প্রবেশ করেন, এবং মোকতেজুমা কোর্তেসকে অভ্যর্থনা জানান। আগন্তুকদের আসায়াকাতলের পুরোনো প্রাসাদে থাকার ব্যবস্থা হয়। এটি তখনও সাম্রাজ্যের পতন ছিল না। কিন্তু রাজধানীর ভেতরে সশস্ত্র বিদেশি দল এবং বাইরে তাদের স্থানীয় মিত্রদের উপস্থিতি ক্ষমতার সম্পর্ক বদলে দিয়েছিল। এবার প্রশ্ন ছিল, আতিথ্য ও আলোচনা কতদিন চলবে—এবং কোর্তেস সম্রাটের সান্নিধ্যকে কীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করবেন।
টেনোচটিটলানের বিদ্রোহ ও বিষাদের রাত্রি: ১৫২০ সালে স্প্যানিশ পরাজয়
নানকিং চুক্তি ও হংকং: চীনে ব্রিটিশ প্রভাব ও অসম চুক্তির সূচনা
প্রথম আফিম যুদ্ধ: ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কাছে চিং সাম্রাজ্য কেন পরাজিত হয়েছিল?
লিন জেশু ও হুমেনে আফিম ধ্বংস: প্রথম আফিম যুদ্ধের সূচনা