বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কোর্তেস ও মোকতেজুমার সাক্ষাৎ: সম্রাটের বন্দিত্ব ও অ্যাজটেক সংঘাত

সিরিজ: অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন

কোর্তেস ও মোকতেজুমার সাক্ষাৎ: সম্রাটের বন্দিত্ব ও অ্যাজটেক সংঘাত
টেনোচটিটলানে রাজকীয় অভ্যর্থনা থেকে সম্রাটের বন্দিত্বের সূচনা।

৮ নভেম্বর ১৫১৯ সালে কোর্তেসের বাহিনী টেনোচটিটলানে প্রবেশ করার পর আগের অধ্যায়ের প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে উঠল—সম্রাটের আতিথ্য কতদিন চলবে, আর আগন্তুকেরা সেই সুযোগ কীভাবে ব্যবহার করবে? উপকূল থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসা স্প্যানিশরা এবার অ্যাজটেক শক্তির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে। তাদের সঙ্গে ছিল স্থানীয় মিত্র, রাজধানীর বাইরে যাদের অনেকেই মেশিকাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। মোকতেজুমা তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেও নিজের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন—এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। এই সাক্ষাৎ ছিল দুই ভিন্ন রাজনৈতিক জগতের যোগাযোগ, যার ভেতরে শুরু থেকেই অবিশ্বাস ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ছিল।

দক্ষিণের ইস্তাপালাপা থেকে রাজধানীর দিকে এগোনোর সময় স্প্যানিশরা দেখেছিল হ্রদের ওপর বিস্তৃত সড়ক, চলমান ক্যানো এবং ঘনবসতির নগরী। এই পথ তাদের রাজধানীতে পৌঁছে দিলেও বিপদের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সড়কের সেতু সরিয়ে দিলে বা জলপথ বন্ধ হলে দ্বীপনগরী থেকে বের হওয়া কঠিন হতে পারত। রাজধানীতে প্রবেশ মানেই রাজধানী দখল নয়। চারদিকে বিপুল জনসংখ্যা ও স্থানীয় সামরিক শক্তির মধ্যে কোর্তেসের দল সংখ্যায় সীমিত ছিল। তাঁকে তাই একই সঙ্গে সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজের বাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছিল।

মোকতেজুমা অভিজাত সহচরদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোর্তেসকে স্বাগত জানান। প্রাচীন বিবরণে তাঁর পোশাক, অলংকার, ছাউনি এবং রাজকীয় আচারের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। উপহার বিনিময়ের কথাও পাওয়া যায়। এসব রীতি ছিল শাসকের মর্যাদা ও অতিথির সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের অংশ। কোর্তেসকে আবেগভরে আলিঙ্গন করার চেষ্টা থেকে বিরত রাখার পরিচিত ঘটনাটিও স্প্যানিশ বিবরণে এসেছে। তবে সেই দিনের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি নির্ভুলভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়; পরবর্তী লেখকেরা নিজেদের স্মৃতি ও ব্যাখ্যা দিয়ে দৃশ্যটি উপস্থাপন করেছেন।

কথোপকথনের কেন্দ্রে ছিলেন মালিনৎসিন। নাহুয়াতল ও স্প্যানিশের মধ্যে বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে রাজকীয় ভাষার অর্থও বোঝাতে হতো। এক ভাষার বিনয়সূচক অভ্যর্থনা অন্য ভাষায় ক্ষমতা সমর্পণের বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা হতে পারে। কোর্তেসের বিবরণে মোকতেজুমার কথাকে স্প্যানিশ রাজাধিরাজের কর্তৃত্ব স্বীকারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই লেখা ছিল নিজের অভিযানকে বৈধ ও সফল প্রমাণ করার উপায়ও। সম্রাটের আতিথ্য কিংবা আনুষ্ঠানিক সৌজন্যকে স্বেচ্ছায় সাম্রাজ্য হস্তান্তরের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা তাই সমস্যাজনক।

মোকতেজুমা কোর্তেসকে দেবতা কেতসালকোয়াতলের প্রত্যাবর্তন বলে বিশ্বাস করেছিলেন—এমন গল্পও বহুল প্রচলিত। বাস্তবে এই ব্যাখ্যার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন আছে। ভবিষ্যদ্বাণী ও অশুভ লক্ষণের বহু বিবরণ স্প্যানিশ বিজয়ের পরে লিখিত হয়েছিল। পরবর্তী বিপর্যয়ের আলোকে সাজানো কাহিনি দিয়ে সম্রাটের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। তিনি দূত পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, উপহার দিয়েছিলেন এবং আগন্তুকদের গতিবিধি প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। রাজধানীতে প্রবেশের অনুমতিও নজরদারি, আলোচনা বা সংঘর্ষ এড়ানোর হিসাবের অংশ হতে পারে।

স্প্যানিশদের থাকার ব্যবস্থা হয় মোকতেজুমার পিতা আসায়াকাতলের পুরোনো প্রাসাদে। ভবনের কক্ষ ও আঙিনা তাদের সম্মিলিতভাবে অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা সংগঠনের সুবিধা দেয়। সেখান থেকে কোর্তেস রাজদরবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারেন। খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছিল, ফলে প্রথম কিছুদিন রাজধানীতে সহাবস্থান বজায় থাকে। কিন্তু অতিথিদের কাছে অস্ত্র ছিল এবং তাদের নিজস্ব লক্ষ্যও ছিল। আতিথ্যের আড়ালে একটি সশস্ত্র ঘাঁটি তৈরি হচ্ছিল, যা রাজপ্রাসাদ ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের খুব কাছ থেকে শাসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারত।

মোকতেজুমাকে বন্দি করার প্রচলিত বিবরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল উপকূলের নাউতলা অঞ্চলের সংঘর্ষ। সেখানে মেশিকা কর্মকর্তা কুয়াউহপোপোকা, স্প্যানিশ লেখায় কুয়ালপোপোকা নামে পরিচিত, করদ অঞ্চলে অ্যাজটেক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে উদ্যোগী হন। স্প্যানিশদের তোতোনাক সহযোগীদের সঙ্গে বিরোধে ভেরাক্রুসের কর্মকর্তা হুয়ান দে এসকালান্তে যুদ্ধে জড়ান। তিনি এবং কয়েকজন স্প্যানিশ নিহত হন। এই ঘটনা দেখায়, রাজধানীতে আলোচনা চললেও সাম্রাজ্যের প্রান্তে স্প্যানিশ হস্তক্ষেপের প্রতিরোধ হচ্ছিল। মোকতেজুমার প্রশাসন সর্বত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি।

কোর্তেস এই হত্যার খবরকে সম্রাটের বিরুদ্ধে চাপের উপকরণ করেন। তাঁর দাবি ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মোকতেজুমার নির্দেশের কথা বলেছেন। সম্রাট সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে স্প্যানিশ বিবরণে পাওয়া যায়। ঘটনাটি তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির অজুহাতে কোর্তেস তাঁকে স্প্যানিশদের আবাসে যেতে বলেন। প্রচলিত কালপঞ্জিতে ১৪ নভেম্বর ১৫১৯ বন্দিত্বের দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে এই নির্দিষ্ট তারিখ ও বর্ণনার প্রধান ভিত্তি স্প্যানিশ লেখাগুলো; অন্য বিবরণ এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় বন্দিত্বের সূচনা ও প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সেই অনিশ্চয়তা স্বীকার করেও বোঝা যায়, মোকতেজুমার স্বাধীনতা ক্রমে স্প্যানিশ শক্তির দ্বারা সীমিত হয়েছিল। তাঁকে সাধারণ অপরাধীর মতো কারাগারে রাখা হয়নি। রাজকীয় সেবা, পরিচিত সহচর এবং কিছু প্রশাসনিক কার্যক্রম বজায় ছিল। কিন্তু তাঁর অবস্থান, চলাচল ও সিদ্ধান্তের ওপর সশস্ত্র নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। সম্রাটের মর্যাদা ব্যবহার করেই তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল কোর্তেসের কৌশল। সরাসরি প্রশাসন ভেঙে দেওয়ার বদলে শাসকের মাধ্যমে নির্দেশ জারি করানো গেলে অল্প সৈন্য নিয়েও অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হতো।

কুয়াউহপোপোকা ও তাঁর সহযোগীদের রাজধানীতে আনার পর কোর্তেস তাঁদের আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। ঘটনাটির বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে পার্থক্য থাকলেও এর রাজনৈতিক অর্থ স্পষ্ট। বিদেশি সেনানায়ক সাম্রাজ্যের কর্মকর্তাকে রাজধানীতে শাস্তি দিয়ে নিজেকে বিচারক্ষমতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন। মোকতেজুমাকে সাময়িকভাবে শিকল পরানোর কথাও স্প্যানিশ বিবরণে আছে। এই শাস্তি আতিথ্যের সম্পর্ককে অপমান ও ভয়ের সম্পর্কে বদলে দেয়। সম্রাটের উপস্থিতি তাঁর কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে পারছে না—এমন দৃশ্য রাজকীয় কর্তৃত্বের জন্য গভীর আঘাত ছিল।

অন্যদিকে স্বর্ণ ও মূল্যবান সামগ্রী সংগ্রহ নিয়ে চাপ বাড়তে থাকে। স্প্যানিশদের কাছে রাজকীয় সম্পদ ছিল ব্যক্তিগত পুরস্কার, অভিযানের ব্যয় মেটানোর উপায় এবং স্প্যানিশ রাজমুকুটের প্রাপ্য অংশের উৎস। কিন্তু মেশিকাদের কাছে স্বর্ণের অলংকার, পালকের কাজ ও মূল্যবান পাথরের সামগ্রীর ধর্মীয় এবং সামাজিক অর্থও ছিল। সেগুলো শুধু বিনিময়যোগ্য ধন ছিল না। অলংকার গলিয়ে স্বর্ণে পরিণত করলে তার কারিগরি ও প্রতীকী পরিচয়ও ধ্বংস হতো। সম্পদ সংগ্রহের দাবি তাই অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি রাজদরবারের মর্যাদায় হস্তক্ষেপ করছিল।

ধর্মীয় বিরোধ এই সংকটকে আরও তীব্র করে। কোর্তেস মানববলির বিরোধিতা করেন এবং খ্রিস্টীয় প্রতীক স্থাপনের দাবি তোলেন। তবে টেম্পলো মায়োরে ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্গেও যুক্ত। দেবতাদের উপাসনা, কৃষির সফলতা ও সামরিক বিজয় এক বিশ্বাসব্যবস্থার অংশ ছিল। সব ধর্মীয় পরিবর্তন এক দিনে ঘটেনি; চাপ, আপত্তি ও আলোচনার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি এগিয়েছিল। কয়েকজন বিদেশি সৈন্যের দাবি মেনে প্রধান উপাসনাব্যবস্থা বদলে দেওয়া সম্রাটের পক্ষেও সহজ ছিল না। এতে পুরোহিত ও অভিজাতদের প্রতিরোধের ঝুঁকি ছিল।

মোকতেজুমার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যের অভিজাত মহলেও বিরোধ বাড়ে। তেসকোকোর শাসক কাকামার মতো নেতাদের সঙ্গে সংঘাত এবং তাঁদের আটক করার ঘটনায় কোর্তেস শাসকগোষ্ঠীর ভেতরের ক্ষমতার সম্পর্কেও হস্তক্ষেপ করেন। কিন্তু সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করলেই প্রতিটি নগর বা জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে আসে না। খাদ্য সরবরাহ, স্থানীয় সহযোগিতা ও যোগাযোগ সচল থাকায় সহাবস্থান কিছুদিন চলেছিল। এই কয়েক মাস শান্তিপূর্ণ আনুগত্যের সময় নয়; বরং আলোচনার সঙ্গে জবরদস্তি মিশে থাকা এক অস্থির ভারসাম্য।

১৫২০ সালের বসন্তে কোর্তেসের জন্য নতুন বিপদ আসে কিউবা থেকে। গভর্নর ভেলাসকেস তাঁকে আটক করতে পানফিলো দে নারভায়েসের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠান। প্রতিদ্বন্দ্বীর মোকাবিলায় কোর্তেস রাজধানী ছেড়ে গেলে পেদ্রো দে আলভারাদোর হাতে স্প্যানিশ ঘাঁটির দায়িত্ব থাকে। মে মাসে তোক্সকাতল উৎসব চলাকালে আলভারাদোর লোকেরা মন্দিরের প্রাঙ্গণে সমবেত মেশিকাদের আক্রমণ করে। স্প্যানিশদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিশ্চিত নয়; তবে হত্যাকাণ্ড শহরে প্রকাশ্য প্রতিরোধ উসকে দেয়। সম্রাটকে নজরদারিতে রেখে রাজধানী নিয়ন্ত্রণের কৌশল তখন ভেঙে পড়ে। কোর্তেসের ফিরে আসার আগেই অতিথিদের আবাস অবরুদ্ধ শিবিরে পরিণত হচ্ছিল, আর মোকতেজুমার কর্তৃত্ব সেই সংঘর্ষ থামাতে পারবে কি না, সেটিই হয়ে উঠেছিল পরবর্তী সংকট।