বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গ্রিনল্যান্ড: পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপের অধিকাংশ বরফে ঢাকা কেন?

গ্রিনল্যান্ড: পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপের অধিকাংশ বরফে ঢাকা কেন?
তুষার, শীতলতা ও সময়ের মিলিত প্রভাবে গড়ে ওঠা গ্রিনল্যান্ডের বিশাল বরফচাদর।

পৃথিবীর মানচিত্রে উত্তর আটলান্টিক ও উত্তর মহাসাগরের মাঝখানে তাকালে একটি বিশাল দ্বীপ চোখে পড়ে—গ্রিনল্যান্ড। নাম শুনে মনে হতে পারে, এটি বুঝি সবুজ বনভূমি ও ঘাসে ঢাকা কোনো দেশ। বাস্তবে এর অধিকাংশ ভূভাগের ওপর বিছিয়ে আছে বিস্তৃত বরফচাদর। উপকূলের কিছু অংশে পাথুরে পাহাড়, তৃণভূমি, বসতি ও গ্রীষ্মের সবুজ দেখা গেলেও ভেতরের ভূদৃশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে অনেক দূর পর্যন্ত শুধু বরফ, তুষার এবং আকাশ। এই সাদা বিস্তার এক মৌসুমের শীতের ফল নয়। এর জন্ম ও টিকে থাকার পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ সময়ের তুষার সঞ্চয়, ভূমির উচ্চতা এবং জলবায়ুর পারস্পরিক প্রভাব।

গ্রিনল্যান্ডকে পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ বলা হয় মহাদেশগুলোকে দ্বীপের হিসাব থেকে বাদ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন আরও বড় হলেও সেটি একটি মহাদেশ। গ্রিনল্যান্ডের মোট আয়তন প্রায় একুশ লাখ ষাট হাজার বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় আশি শতাংশ বরফচাদরে ঢাকা। তবে এই সংখ্যা থেকে এমন ধারণা করা ঠিক হবে না যে দ্বীপটির সর্বত্র একই ধরনের বরফ রয়েছে। মধ্যভাগে বরফ অত্যন্ত পুরু ও বিস্তৃত, আর প্রান্তে তা হিমবাহের মাধ্যমে পাহাড়ি উপত্যকা ধরে নেমে আসে। বরফচাদরের বাইরেও রয়েছে স্বতন্ত্র হিমবাহ এবং স্থায়ী বরফক্ষেত্র। আবার বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলে মূল বরফচাদর পৌঁছায়নি।

এখানকার বরফ বুঝতে প্রথমেই সমুদ্রের বরফ এবং স্থলভাগের বরফের পার্থক্য জানা দরকার। গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে থাকা সমুদ্রের কিছু অংশ শীতে জমে যায়। সেই বরফ তৈরি হয় সমুদ্রের পানি থেকে এবং তা পানির ওপর ভাসে। কিন্তু দ্বীপের বিশাল বরফচাদর দাঁড়িয়ে আছে স্থলভাগের ওপর। এর প্রধান উৎস আকাশ থেকে পড়া তুষার। হাজার হাজার বছর ধরে জমা হওয়া তুষার নিজের ওজনের চাপে ধীরে ধীরে ঘন বরফে পরিণত হয়েছে। তাই গ্রিনল্যান্ডের সাদা আবরণকে শুধু জমে যাওয়া সমুদ্রের সম্প্রসারণ ভাবলে এর প্রকৃত ইতিহাস বোঝা যায় না।

দ্বীপটির অবস্থান এই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কারণ। গ্রিনল্যান্ডের বড় অংশ উত্তর মেরুবৃত্তের উত্তরে অবস্থিত। পৃথিবীর এই অঞ্চলে সূর্যের আলো সাধারণত নিচু কোণে পড়ে। একই পরিমাণ সৌরশক্তি বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় বড় এলাকায় ছড়িয়ে যায়, ফলে প্রতি একক ভূমি তুলনামূলক কম শক্তি পায়। নিচু কোণের আলোকে বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়েও দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঋতুভেদে দিনের দৈর্ঘ্যের বিশাল পরিবর্তন। উত্তরের কিছু এলাকায় শীতকালে দীর্ঘ সময় সূর্য দিগন্তের ওপরে ওঠে না। ফলে ভূমি ও বরফপৃষ্ঠের উত্তপ্ত হওয়ার সুযোগ খুব সীমিত থাকে।

তবে শুধু উত্তর দিকে অবস্থিত বলেই কোনো অঞ্চল বিশাল বরফচাদরে ঢেকে যাবে, এমন নয়। উত্তর মেরুর কাছাকাছি আরও অনেক স্থলভাগে গ্রিনল্যান্ডের মতো পুরু বরফ নেই। স্থায়ী বরফ তৈরির জন্য মূল প্রশ্ন হলো, বছরে যত তুষার পড়ছে তার কতটা গ্রীষ্ম শেষে টিকে থাকছে। যদি শীতে জমা তুষারের সবটাই পরের গ্রীষ্মে গলে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বরফচাদর তৈরি হবে না। কিন্তু তুষারের কিছু অংশ বছরের পর বছর থেকে গেলে তার ওপর নতুন তুষার জমতে থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী উদ্বৃত্তই বরফচাদরের ভিত্তি। গ্রিনল্যান্ডের বিস্তৃত অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিবেশ বিদ্যমান ছিল।

উত্তরের গ্রীষ্মে দীর্ঘ দিনের আলো থাকা সত্ত্বেও কেন সব তুষার গলে যায় না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো স্থানে গ্রীষ্মে সূর্য প্রায় সারাক্ষণ দৃশ্যমান থাকে, কিন্তু আলো পড়ার কোণ তখনও তুলনামূলক নিচু। আরও বড় বিষয় হলো, গ্রিনল্যান্ডের মধ্যভাগের বরফপৃষ্ঠ অনেক উঁচু। সমুদ্রের ধারের কোনো বসতিতে গ্রীষ্মের দিনে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ওপরে উঠলেও কয়েক হাজার মিটার উঁচু অভ্যন্তরে পরিস্থিতি অনেক শীতল থাকতে পারে। তাই উপকূলের আবহাওয়া দেখে পুরো দ্বীপের বরফের অবস্থা বিচার করা যায় না। একই দিনে উপকূলে ঘাসের ওপর বৃষ্টি এবং উঁচু বরফপৃষ্ঠে তুষারপাত হওয়া সম্ভব।

তুষার থেকে বরফ তৈরির প্রক্রিয়াটিও ধীর ও স্তরভিত্তিক। সদ্য পড়া তুষার তুলনামূলক হালকা, কারণ এর কণাগুলোর মধ্যে অনেক বাতাস থাকে। ওপর থেকে নতুন তুষার জমলে নিচের স্তরে চাপ বাড়ে। তুষারের কণাগুলো আরও ঘনভাবে সাজতে থাকে, তাদের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা ছোট হয় এবং পুরোনো তুষার শক্ত দানাদার স্তরে পরিণত হয়। আরও গভীরে গিয়ে এই স্তর ঘন বরফ হয়ে ওঠে। কিছু বাতাস ক্ষুদ্র বুদ্‌বুদের মধ্যে আটকা পড়ে। এই পরিবর্তনের সময়কাল স্থানভেদে ভিন্ন হয়, কারণ তাপমাত্রা ও তুষারপাতের পরিমাণ সর্বত্র সমান নয়।

এই কারণেই গ্রিনল্যান্ডের বরফচাদরকে একটি বিশাল প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার বলা যায়। এর গভীর স্তরগুলোতে জমা আছে অতীতের তুষার, ধুলিকণা এবং বায়ুর নমুনা। বিজ্ঞানীরা বরফের দীর্ঘ নলাকার নমুনা তুলে স্তরগুলো পরীক্ষা করেন। আটকে থাকা বাতাস থেকে অতীতের বায়ুমণ্ডলের উপাদান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বরফের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য থেকে বোঝা যায় তুষার পড়ার সময়কার পরিবেশ কেমন ছিল। অর্থাৎ আজ যে সাদা পৃষ্ঠ দেখা যায়, তার নিচে বহু পুরোনো জলবায়ুর ইতিহাস জমা রয়েছে। বরফচাদর শুধু বর্তমানের শীতলতার নিদর্শন নয়, অতীতের পরিবর্তনেরও সাক্ষী।

গ্রিনল্যান্ডে বড় আকারের বরফায়ন একদিনে শুরু হয়নি। পৃথিবীর দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে জলবায়ু বারবার বদলেছে। উত্তরের জলবায়ু শীতল হওয়া, বায়ুমণ্ডলের তাপধারণকারী গ্যাসের পরিমাণের পরিবর্তন এবং সমুদ্র ও বায়ুর মাধ্যমে তাপ পরিবহনের পরিবর্তন বরফ বিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। আবার পৃথিবীর কক্ষপথের আকৃতি, অক্ষের হেলন এবং অক্ষের দিকের ধীর পরিবর্তনের ফলে উত্তরের গ্রীষ্মে পাওয়া সৌরশক্তিও বদলেছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম তুলনামূলক শীতল হলে আগের শীতের তুষার বেশি টিকে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চললে বরফের বিস্তার বাড়তে পারে।

অতীতের বরফায়নকে অবশ্য সরল একটি সোজা রেখার মতো ভাবা উচিত নয়। কখনো বরফ বেড়েছে, কখনো কমেছে, আবার কিছু অঞ্চলে অবস্থান বদলেছে। গ্রিনল্যান্ডের বর্তমান বরফচাদর সেই জটিল ইতিহাসের ফল। কোনো সময়ে একটি অঞ্চল বরফমুক্ত ছিল মানেই পুরো দ্বীপ একই সময়ে বরফমুক্ত ছিল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। দ্বীপটি এত বড় এবং এর ভূপ্রকৃতি এত বৈচিত্র্যময় যে বিভিন্ন অংশ আলাদা গতিতে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই বরফের বয়স, বিস্তার ও স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অঞ্চলভেদ এবং সময়ের পার্থক্য মনে রাখতে হয়।

বরফচাদর একবার যথেষ্ট বড় হয়ে গেলে তার নিজের উপস্থিতিই তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে। এর একটি হলো সাদা পৃষ্ঠের আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা। তাজা তুষার সূর্যের আলোয়ের বড় অংশ মহাশূন্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়। ফলে কালো পাথর বা গাঢ় সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় তুষার কম শক্তি শোষণ করে। এই বৈশিষ্ট্য বরফপৃষ্ঠকে তুলনামূলক ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তবে সব বরফ সমান উজ্জ্বল নয়। পুরোনো বরফ, ভেজা তুষার বা ধুলায় ময়লা হওয়া পৃষ্ঠ বেশি আলো শোষণ করতে পারে। তাই পৃষ্ঠের অবস্থাও গলনের ওপর প্রভাব ফেলে।

দ্বিতীয় প্রভাবটি আসে উচ্চতা থেকে। বরফ জমে পুরু হলে তার ওপরের পৃষ্ঠ ক্রমে উঁচুতে উঠে যায়। গ্রিনল্যান্ডের বরফচাদরের কিছু অংশ প্রায় তিন কিলোমিটার বা তারও বেশি পুরু, এবং মধ্যভাগের বরফপৃষ্ঠ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে অবস্থান করে। সাধারণভাবে উচ্চতা বাড়লে বায়ুর তাপমাত্রা কমে। ফলে উঁচু বরফপৃষ্ঠে তুষার টিকে থাকার সুযোগ বাড়ে। আবার বরফ ক্ষয় হয়ে পৃষ্ঠ নিচে নামলে তা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বায়ুর সংস্পর্শে আসতে পারে। সেই পরিবর্তন আরও গলন ঘটাতে সাহায্য করতে পারে। এখানে বরফের পুরুত্ব এবং স্থানীয় তাপমাত্রা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

এই বিশাল বরফচাদর দেখতে স্থির মনে হলেও আসলে তা ধীরে ধীরে চলমান। ওপরের বরফের ওজন নিচের স্তরে চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময়ের চাপের অধীনে বরফ বিকৃত হতে পারে এবং উঁচু মধ্যভাগ থেকে অপেক্ষাকৃত নিচু প্রান্তের দিকে প্রবাহিত হয়। কোথাও এই চলাচল খুব ধীর, আবার সরু উপত্যকায় কেন্দ্রীভূত হিমবাহ তুলনামূলক দ্রুত এগোতে পারে। কিছু স্থানে বরফের নিচে থাকা পানি ও ভূমির বৈশিষ্ট্য চলাচলকে প্রভাবিত করে। তাই বরফচাদর একটি জমাট, অচল ঢাকনা নয়। এর ভেতরে তুষার সঞ্চয়, চাপ, প্রবাহ ও ক্ষয়ের অবিরাম প্রক্রিয়া চলছে।

বরফ উপকূলের দিকে পৌঁছালে তার পরিণতি অঞ্চলভেদে আলাদা হয়। কোনো হিমবাহ স্থলভাগেই শেষ হয়, যেখানে গলিত পানি নদী হয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। কোনো হিমবাহ সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছায়। সেখানে প্রান্ত থেকে বড় বরফখণ্ড ভেঙে পানিতে পড়ে ভাসমান বরফপাহাড় তৈরি করে। সমুদ্রের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পানি হিমবাহের নিমজ্জিত অংশ গলাতেও পারে। ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফক্ষয় শুধু ওপরের পৃষ্ঠে রোদ পড়ে গলে যাওয়ার ঘটনা নয়। সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ, হিমবাহের প্রবাহ এবং প্রান্তের ভাঙনও বরফের মোট পরিমাণ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে, বরফচাদরের কেন্দ্রীয় অংশ খুব ঠান্ডা হলেও সেখানে সর্বত্র প্রচুর তুষারপাত হয় না। ঠান্ডা বাতাস তুলনামূলক কম জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। সমুদ্র থেকে আসা আর্দ্র বায়ু উপকূলীয় পাহাড়ে বাধা পেয়ে ওঠার সময় তুষারপাত ঘটায়, ফলে ভেতরে পৌঁছানোর আগেই তার কিছু আর্দ্রতা হারিয়ে যায়। এই জন্য বরফচাদরের কিছু অভ্যন্তরীণ অঞ্চল বেশ শুষ্ক। বিপুল বরফের উপস্থিতি দেখে সেখানে প্রতিদিন প্রচণ্ড তুষারঝড় হয় বলে ধরে নেওয়া ভুল। অনেক সময় অল্প অল্প তুষারও দীর্ঘদিন ধরে টিকে থেকে বিশাল সঞ্চয় তৈরি করতে পারে।

উপকূলের বরফমুক্ত ভূদৃশ্য এই ভৌগোলিক পার্থক্যকে স্পষ্ট করে। নিচু উচ্চতা, গ্রীষ্মের তুলনামূলক বেশি উষ্ণতা এবং স্থানীয় আবহাওয়ার কারণে কিছু অঞ্চলে মৌসুমি তুষার গলে যায়। সেখানে শ্যাওলা, ঘাস, ছোট গুল্ম এবং মেরু অঞ্চলের উপযোগী উদ্ভিদ জন্মায়। দক্ষিণের অনুকূল কিছু এলাকায় সীমিত কৃষিকাজ ও পশুপালনও সম্ভব। তাই গ্রিনল্যান্ডকে সম্পূর্ণ প্রাণহীন সাদা মরুভূমি হিসেবে দেখানো যথার্থ নয়। এর উপকূলীয় পরিবেশ, মানুষের জীবন এবং অভ্যন্তরের বরফজগতের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। দ্বীপটির বৈচিত্র্য বুঝতে এই দুই ভূদৃশ্যকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

এর নামের সঙ্গে বরফের বিস্তারের আপাত বিরোধও কৌতূহল জাগায়। মধ্যযুগীয় নর্স বর্ণনায় এরিক দ্য রেডের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড নামের সম্পর্ক পাওয়া যায়। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বসতি স্থাপনে মানুষকে আকৃষ্ট করতে তিনি সুন্দর নাম বেছে নিয়েছিলেন। পাশাপাশি দক্ষিণের কিছু উপকূলীয় অঞ্চল গ্রীষ্মে বাস্তবেই সবুজ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই নাম থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে মধ্যযুগে পুরো দ্বীপ ঘন সবুজে ঢাকা ছিল এবং পরে হঠাৎ বরফে ঢেকে গেছে। নামের ইতিহাস, সীমিত উপকূলের পরিবেশ এবং বিশাল অভ্যন্তরের বরফচাদর—তিনটি আলাদা বিষয়।

বর্তমান উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে এই বরফচাদরকে বোঝার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বায়ু উষ্ণ হলে পৃষ্ঠে গলনের সুযোগ বাড়ে। সমুদ্রের পানির পরিবর্তন উপকূলীয় হিমবাহকেও প্রভাবিত করতে পারে। তবে কোনো একটি গরম দিন, একটি শীতল বছর বা একটি অঞ্চলে ভারী তুষারপাত দিয়ে পুরো বরফচাদরের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা বোঝা যায় না। তার জন্য দেখতে হয় মোট কত বরফ যোগ হচ্ছে এবং কত বরফ হারিয়ে যাচ্ছে। এই হিসাবের মধ্যে তুষারপাত, গলিত পানির পুনরায় জমে যাওয়া, সমুদ্রে পানি বেরিয়ে যাওয়া এবং হিমবাহ থেকে বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়া—সবই অন্তর্ভুক্ত।

স্থলভাগের বরফ হারিয়ে সমুদ্রে পানি যোগ হলে সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হয়। গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব এখানেই: এর বরফচাদরে এমন বিপুল পরিমাণ পানি রয়েছে, যা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেলে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় সাত মিটার বাড়াতে পারে। এটি দ্রুত ঘটে যাবে এমন পূর্বাভাস নয়; বরং জমা বরফের সম্ভাব্য সমুদ্রপৃষ্ঠগত প্রভাব বোঝানোর একটি হিসাব। পুরো বরফচাদরের পরিবর্তন দীর্ঘ সময়ের বিষয়, এবং তার গতি নির্ভর করে উষ্ণায়নের মাত্রা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবু আংশিক বরফক্ষয়ও উপকূলীয় জনপদগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ বরফে ঢাকা থাকার উত্তর তাই শুধু “সেখানে খুব ঠান্ডা” বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঠান্ডা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু তার সঙ্গে দরকার গ্রীষ্মে টিকে থাকা তুষার, দীর্ঘ সময়ের সঞ্চয়, উঁচু বরফপৃষ্ঠ এবং আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা। অতীতের জলবায়ু এই বরফচাদর গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করেছে, আর বরফচাদর নিজেও স্থানীয় পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। সমুদ্রের ধারে সবুজ ঘাসের পাশে দাঁড়িয়ে দূরের সাদা পাহাড়ের দিকে তাকালে এই সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়। একই দ্বীপে জীবন্ত উপকূল এবং গভীর বরফের বিস্তার পাশাপাশি রয়েছে—যেখানে পৃথিবীর ভূগোল, জলবায়ু ও সময় একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।