বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ম্যারি স্টোপস: জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের বিপ্লব ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

ম্যারি স্টোপস: জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের বিপ্লব ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার
নারীর প্রজননস্বাধীনতার আন্দোলনে ম্যারি স্টোপসের আলো ও অন্ধকার।

বিশ শতকের শুরুর ব্রিটেনে একজন বিবাহিত নারী যদি জানতে চাইতেন কীভাবে বারবার গর্ভধারণ এড়ানো যায়, তাঁর জন্য নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া সহজ ছিল না। যৌনতা নিয়ে কথা বলা ছিল অস্বস্তিকর, জন্মনিয়ন্ত্রণকে অনেকেই অনৈতিক ভাবতেন, আর সংসারের ভেতরে নারীর শারীরিক ক্লান্তি প্রায়ই ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে চাপা পড়ে যেত। এই পরিবেশে ম্যারি স্টোপস এমন কিছু প্রশ্ন প্রকাশ্যে তুললেন, যা ভদ্রসমাজ এড়িয়ে চলত। দাম্পত্যে নারীর আনন্দ কি গুরুত্বপূর্ণ? সন্তান নেওয়ার সময় নির্ধারণ করা কি সম্ভব? মাতৃত্ব কি অবিরাম গর্ভধারণের সমার্থক? তাঁর উত্তর জনজীবনে আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের প্রজননক্ষমতাকে শ্রেণিবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করার বিপজ্জনক বিশ্বাসও।

১৮৮০ সালের ১৫ অক্টোবর স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় জন্ম নেওয়া স্টোপস প্রথম জীবনে জন্মনিয়ন্ত্রণকর্মী ছিলেন না। তিনি ছিলেন উদ্ভিদবিদ ও প্রাচীন উদ্ভিদের জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানী। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এমন সময়ে, যখন নারীর জন্য বৈজ্ঞানিক পেশায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া কঠিন ছিল। এই পরিচয় পরবর্তীকালে তাঁর প্রচারকে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল। তবে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষিত হওয়া আর চিকিৎসক হওয়া এক বিষয় নয়। স্টোপসের গবেষণাগত দক্ষতা তাঁর সব যৌনস্বাস্থ্যবিষয়ক বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভুল করে দেয়নি।

তাঁর ব্যক্তিগত দাম্পত্য অভিজ্ঞতাও আন্দোলনের পটভূমিতে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১১ সালে তিনি বংশগতিবিদ রেজিনাল্ড রাগলস গেটসকে বিয়ে করেন। সম্পর্কটি ব্যর্থ হয় এবং পরে বিবাহ বাতিল হয়। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে দাম্পত্যে যৌন অজ্ঞতা, ক্ষমতার অসমতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তবে তাঁর আন্দোলনকে শুধু একটি ব্যর্থ বিয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা আড়াল হয়। অসংখ্য নারী তখন একই সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ, সংসারের অর্থনৈতিক চাপ এবং নিজের শরীর সম্পর্কে তথ্যের অভাবের মুখোমুখি হচ্ছিলেন।

১৯১৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ম্যারিড লাভ’, অর্থাৎ দাম্পত্য প্রেমবিষয়ক বইটি এই নীরবতায় আঘাত করে। বইটির আলোচনায় স্ত্রীকে কেবল সন্তান জন্মদানের উপায় হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল। নারীর যৌন অনুভূতি, শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং দাম্পত্যে পারস্পরিক তৃপ্তির প্রয়োজনকে তিনি গুরুত্ব দেন। তখনকার পাঠকের কাছে এসব বক্তব্য ছিল বিস্ময়কর। ধর্মীয় মহল, সংবাদমাধ্যম ও চিকিৎসাজগতের একাংশ বইটির বিরোধিতা করলেও সেটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়। নারীদের পাঠানো বিপুল চিঠি দেখিয়ে দেয়, ঘরের দরজার আড়ালে যে সমস্যাগুলো অদৃশ্য ছিল, সেগুলো আসলে ব্যাপক সামাজিক অভিজ্ঞতা।

একই বছরে প্রকাশিত ‘ওয়াইজ প্যারেন্টহুড’, অর্থাৎ বিবেচনাপূর্ণ পিতামাতৃত্ববিষয়ক বইয়ে তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা করেন। দুটি বইয়ের ভূমিকা আলাদা ছিল: প্রথমটি দাম্পত্য সম্পর্কে নতুন ভাষা তৈরি করেছিল, দ্বিতীয়টি সন্তানধারণ নিয়ন্ত্রণের তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে এসব লেখা মূলত বিবাহিত নারী ও পুরুষকে কেন্দ্র করে তৈরি। ফলে তাঁর চিন্তায় নারীর স্বাধীনতার বিস্তার থাকলেও তা বিবাহপ্রথার সীমা পুরোপুরি অতিক্রম করেনি। অবিবাহিত নারীর যৌনস্বাস্থ্য ও প্রজননসংক্রান্ত প্রয়োজন সেই কাঠামোতে সমান স্থান পায়নি।

লেখালেখি থেকে বাস্তব সেবায় যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে ১৯২১ সালের ১৭ মার্চ। দ্বিতীয় স্বামী হামফ্রি ভারডন রোর সহযোগিতায় স্টোপস উত্তর লন্ডনের শ্রমজীবী এলাকা হলোওয়েতে ব্রিটেনের প্রথম জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বিশ্বের প্রথম এমন কেন্দ্র ছিল না; অন্য দেশে আগেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সমাজে এর গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। বিবাহিত নারীরা বিনা খরচে পরামর্শ নিতে পারতেন। জন্মনিয়ন্ত্রণ এখানে গোপন বাজারের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থেকে বেরিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তথ্য ও সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে পরিণত হয়।

কেন্দ্রটির কাজ শুধু কোনো উপকরণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রশিক্ষিত নারী কর্মীরা ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলতেন এবং জরায়ুমুখ ঢেকে রাখার উপকরণের মতো পদ্ধতি ব্যবহারে সহায়তা করতেন। পরিচিত বসার ঘরের মতো পরিবেশ তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল লজ্জা ও ভয় কমানো। তখন আজকের মতো জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ছিল না, আর প্রচলিত পদ্ধতির কার্যকারিতা ও ব্যবহারের সুবিধা নিয়েও সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই এই উদ্যোগের মূল্য বুঝতে হবে তৎকালীন পরিস্থিতিতে: নারীরা প্রথমবারের মতো এমন একটি দরজা পাচ্ছিলেন, যেখানে তাঁদের প্রশ্নকে অন্তত গুরুত্ব দিয়ে শোনা হতো।

১৯২৫ সালে কেন্দ্রটি লন্ডনের আরও কেন্দ্রীয় এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে অন্য শহরে সেবাকেন্দ্র এবং ছোট জনপদে পৌঁছানোর জন্য ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে। এই বিস্তার একটি সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ আর শুধু বই পড়তে সক্ষম সচ্ছল মানুষের আলোচনা থাকল না; বাস্তব সেবার মাধ্যমে তা আরও মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করল। তবে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে সমগ্র দেশের নারীস্বাস্থ্যের উন্নতির একমাত্র কারণ বলা যাবে না। বৃহত্তর পরিবর্তনের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, নারীর শিক্ষা এবং অন্য সংস্কারকদের উদ্যোগও জড়িত ছিল।

বিরোধিতার একটি আলোচিত অধ্যায় ছিল চিকিৎসক হ্যালিডে সাদারল্যান্ডের সঙ্গে মানহানির মামলা। জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলন ও দরিদ্র নারীদের ওপর তার প্রয়োগ নিয়ে সাদারল্যান্ডের সমালোচনার বিরুদ্ধে স্টোপস আদালতে যান। বিভিন্ন পর্যায়ে মামলার ফল বদলালেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে তিনি পরাজিত হন। এই সংঘাত জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে ধর্মীয় আপত্তি, চিকিৎসাগত কর্তৃত্ব এবং সামাজিক সংস্কারের দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। পাশাপাশি একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্নও সামনে আসে: নতুন সেবা চালু করলেই তার প্রতিটি দাবি প্রমাণিত হয়ে যায় না; কার্যকারিতা ও ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা যাচাই করাও জরুরি।

তাঁর অবস্থান সম্পর্কে আরেকটি বিভ্রান্তি দূর করা দরকার। স্টোপস জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রবল সমর্থক হলেও গর্ভপাতের বিরোধী ছিলেন। তিনি গর্ভধারণ প্রতিরোধকেই নারীর সন্তানধারণ নিয়ন্ত্রণের পথ হিসেবে গুরুত্ব দিতেন। পরবর্তীকালে তাঁর নাম ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক সংস্থার সেবার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান তাই সম্পূর্ণ এক ছিল না। ঐতিহাসিক ব্যক্তির বিশ্বাস এবং বহু দশক পরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের নীতিকে এক করে দেখলে সময়ের পরিবর্তন ও প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র পরিচয় দুটোই হারিয়ে যায়।

স্টোপসের উত্তরাধিকারের সবচেয়ে গুরুতর বিতর্ক তাঁর সুপ্রজননবাদে বিশ্বাস। এই মতবাদে মানুষের বংশগত বৈশিষ্ট্যকে তথাকথিত উন্নত ও অনুন্নত স্তরে ভাগ করে জনসংখ্যাকে বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হতো। দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধিতা কিংবা সামাজিকভাবে অপছন্দনীয় আচরণকে অনেক সময় বংশগত অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হতো। এতে জীবনের বাস্তব পরিবেশ, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুযোগের বৈষম্য উপেক্ষিত থাকত। স্টোপস এই ধারণার নিছক দর্শক ছিলেন না; তিনি নির্দিষ্ট মানুষকে পিতামাতৃত্বের অযোগ্য মনে করে বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এখানেই তাঁর আন্দোলনের গভীর নৈতিক দ্বন্দ্ব। একজন নারী নিজের ইচ্ছায় সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিতে চাইলে তাঁকে সহায়তা করা তাঁর সিদ্ধান্তের অধিকার বাড়ায়। কিন্তু অন্য কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করে তাঁর সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার দাবি সেই অধিকার ধ্বংস করে। স্টোপসের কাজের মধ্যে এই বিপরীত প্রবণতা পাশাপাশি উপস্থিত ছিল। তাঁর সময়ে সুপ্রজননবাদ প্রভাবশালী ছিল—এটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, নৈতিক অব্যাহতি নয়। নারীস্বাস্থ্যে অবদান স্বীকার করার জন্য তাঁর বৈষম্যমূলক বিশ্বাসকে ছোট করে দেখার প্রয়োজন নেই।

১৯৫৮ সালে স্টোপসের মৃত্যুর পরে তাঁর নাম দীর্ঘদিন পরিবার পরিকল্পনার পরিচিত প্রতীক হয়ে থাকে। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ম্যারি স্টোপস ইন্টারন্যাশনাল’ তাঁর নাম গ্রহণ করলেও তিনি সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি নাম বদলে ‘এমএসআই রিপ্রোডাক্টিভ চয়েসেস’ হয়। পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় স্টোপসের সুপ্রজননবাদী মতামতের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের অসামঞ্জস্য স্পষ্ট করা হয়। এই ঘটনা দেখায়, কোনো ঐতিহাসিক নামের জনপ্রিয়তা তার সঙ্গে যুক্ত বিশ্বাসগুলো পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন দূর করে না।

ম্যারি স্টোপসের ইতিহাস তাই শুধু একজন সাহসী সংস্কারকের বিজয়গাথা নয়। তিনি দাম্পত্য ও জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে নীরবতা ভেঙেছিলেন, নারীর প্রশ্নকে জনসমক্ষে এনেছিলেন এবং ব্যবহারিক সেবার গুরুত্বপূর্ণ পথ খুলেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এমন বিশ্বাস ধারণ করেছিলেন, যা অন্য মানুষের মর্যাদা ও প্রজননস্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায়। তাঁর জীবন থেকে সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা হলো, নারীস্বাস্থ্যের উন্নতি তখনই স্বাধীনতার আন্দোলন হয়ে ওঠে, যখন তা প্রত্যেক মানুষের সম্মতি, সমান মর্যাদা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে স্বীকার করে।


আপনার পছন্দ হতে পারে