বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পিস্তল চিংড়ি কীভাবে পানির নিচে বিস্ফোরণের মতো শব্দ তৈরি করে?

পিস্তল চিংড়ি কীভাবে পানির নিচে বিস্ফোরণের মতো শব্দ তৈরি করে?
ক্ষুদ্র নখরের তৈরি জলধারায় জন্ম নেওয়া বুদ্‌বুদের পতনেই ছড়ায় প্রবল শব্দ।

সমুদ্রের প্রবালপ্রাচীরের কাছে পানির নিচের শব্দ শুনলে কখনো মনে হতে পারে, চারদিকে অসংখ্য ছোট পটকা ফুটছে। অথচ সেই শব্দের একটি বড় উৎস এমন প্রাণী, যার শরীর মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা। পিস্তল চিংড়ি নামে পরিচিত এই ক্ষুদ্র প্রাণী বিশেষ একটি নখর বন্ধ করে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ শব্দ তৈরি করতে পারে। নামের সঙ্গে বন্দুকের মিল থাকলেও সে কোনো গুলি ছোড়ে না। তার আসল কৌশল হলো পানিকে দ্রুত ঠেলে এমন একটি বুদ্‌বুদ তৈরি করা, যার আকস্মিক পতন প্রবল চাপতরঙ্গ ও শব্দ সৃষ্টি করে।

পিস্তল চিংড়ি কোনো একক প্রজাতির নাম নয়। বিশেষ নখর দিয়ে শব্দ তৈরি করতে সক্ষম বহু চিংড়িকে এই নামে ডাকা হয়। এদের বিভিন্ন প্রজাতি প্রবাল, পাথরের ফাঁক, সামুদ্রিক ঘাসের এলাকা এবং অন্য উপকূলীয় আবাসে থাকে। অনেকের একটি সামনের নখর অন্যটির তুলনায় অনেক বড়। ছোট নখরটি খাবার ধরা বা সাধারণ কাজে ব্যবহৃত হতে পারে; বড়টির গঠন শব্দ তৈরির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এই অসম নখর তাদের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

বড় নখরটি শুধু শক্ত করে চেপে ধরার যন্ত্র নয়। বহু প্রজাতিতে এর নড়তে সক্ষম অংশে একটি উঁচু গঠন থাকে, যা বিপরীত অংশের খাঁজে দ্রুত ঢুকে যায়। এতে মাঝের পানি সংকীর্ণ পথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। কিছুটা পিস্টন দিয়ে পানি ঠেলার মতো কাজ হয়, যদিও প্রাণীর অঙ্গের গঠন আরও জটিল। নখর বন্ধ হওয়ার অতি দ্রুত গতি এবং এই বিশেষ আকৃতির সমন্বয়ে শক্তিশালী জলধারা তৈরি হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রধান শব্দটি নখরের দুই অংশের সরাসরি ঠোকাঠুকি থেকে আসে না। অনেক দিন এমন ধারণা থাকলেও দ্রুতগতির ছবি ও পানির নিচের শব্দ পরিমাপ অন্য ব্যাখ্যা দেখায়। ২০০০ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, নখর বন্ধ হওয়ার পরে তৈরি বুদ্‌বুদটি যখন ভেঙে পড়ে, তখনই প্রবল শব্দের প্রধান অংশ উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ নখর ঘটনাটি শুরু করে, আর বুদ্‌বুদের পতন তার শব্দময় পরিণতি তৈরি করে।

জলধারা এত দ্রুত বের হয় যে তার আশপাশের কিছু অঞ্চলে চাপ খুব কমে যায়। নির্দিষ্ট অবস্থায় সেই চাপ পানির বাষ্পচাপের নিচে নামলে পানির মধ্যে বাষ্পপূর্ণ ক্ষুদ্র গহ্বর তৈরি হতে পারে। এই ঘটনাকে গহ্বর সৃষ্টি বলা যায়। এটি বাতাস ফুঁ দিয়ে পানিতে সাধারণ বুদ্‌বুদ বানানোর মতো নয়। চিংড়ির মুখ বা নখর থেকে বাতাস বেরিয়ে আসছে না; তরলের চাপের পরিবর্তনই এখানে বুদ্‌বুদ তৈরির মূল কারণ।

সাধারণভাবে আমরা পানিকে বাষ্প করতে তাপ বাড়ানোর কথা ভাবি। কিন্তু পানি কোন অবস্থায় বাষ্প হবে, তা চাপের ওপরও নির্ভর করে। চাপ যথেষ্ট কমে গেলে পুরো পানি গরম না করেও স্থানীয়ভাবে বাষ্পপূর্ণ গহ্বর তৈরি হতে পারে। পিস্তল চিংড়ির নখরের কাছে অতি দ্রুত জলপ্রবাহ সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তাই ঘটনাটি বুঝতে শুধু প্রাণীর পেশির শক্তি দেখলে হবে না; পানির ভৌত বৈশিষ্ট্যও দেখতে হবে।

বুদ্‌বুদটি বড় হওয়ার পরে আশপাশের পানির চাপ তাকে আবার সংকুচিত করতে শুরু করে। পানি দ্রুত ভেতরের দিকে এগিয়ে আসে এবং অতি ক্ষুদ্র অঞ্চলে শক্তি কেন্দ্রীভূত হয়। এই আকস্মিক পতন চারপাশে তীব্র চাপের পরিবর্তন ছড়িয়ে দেয়। সেই পরিবর্তনের একটি অংশ আমরা শব্দ হিসেবে শনাক্ত করি। বাইরে বিস্তৃত হয়ে যাওয়া রাসায়নিক বিস্ফোরণের পরিবর্তে এখানে প্রথমে বুদ্‌বুদের ভেতরের দিকে ধস ঘটে। শব্দ বিস্ফোরণের মতো হলেও প্রক্রিয়া আলাদা।

চিংড়ির শরীরের তুলনায় এই ঘটনা অত্যন্ত শক্তিশালী। নখরের কাছে তৈরি জলধারার গতি কিছু পরীক্ষায় সেকেন্ডে কয়েক দশ মিটার পর্যন্ত হতে দেখা গেছে। কিন্তু সব প্রজাতি, সব আকারের নখর এবং সব পরিবেশে একই গতি হয় না। শব্দের মাত্রাও মাপার দূরত্ব ও পদ্ধতি অনুযায়ী বদলায়। তাই একটি জনপ্রিয় সংখ্যা দিয়ে প্রতিটি পিস্তল চিংড়ির ক্ষমতা বোঝানো বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।

এই প্রাণীর শব্দ নিয়ে প্রায়ই বলা হয়, তা বন্দুকের গুলির চেয়েও জোরে। তুলনাটি সতর্কতার সঙ্গে বুঝতে হয়। পানির নিচে ও বাতাসে শব্দের মাত্রা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত ভিত্তিমানের পার্থক্য আছে। শুধু দুই পরিবেশের ডেসিবেল সংখ্যা পাশাপাশি রেখে শ্রবণগত অনুভূতি বা ক্ষতিকর ক্ষমতার সরাসরি তুলনা করা যায় না। চিংড়ির শব্দ যে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও উচ্চচাপের ক্ষণস্থায়ী সংকেত, সেটি সত্য; কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী বিস্ফোরণের সমান নয়।

বুদ্‌বুদের পতনের সময় আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটতে পারে—অতি ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলক। ২০০১ সালে প্রকাশিত গবেষণায় এই আলো শনাক্ত করা হয়। পতনের শেষ মুহূর্তে ক্ষুদ্র অঞ্চলে প্রবল সংকোচন ও উচ্চ তাপমাত্রার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সঙ্গে ঘটনাটি সম্পর্কিত। গবেষকেরা কয়েক হাজার ডিগ্রির সমতুল্য তাপমাত্রার সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এটি চিংড়ির পুরো শরীরের তাপমাত্রা নয়, আশপাশের সমুদ্রও সেই তাপমাত্রায় পৌঁছায় না। ঘটনাটি অত্যন্ত ছোট স্থান ও অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

তাই পিস্তল চিংড়ি সমুদ্রের মধ্যে আগুন জ্বালায় বা সূর্যের মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—এমন বর্ণনা বিভ্রান্তিকর। আলোর ঝলক এত ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল যে তা শনাক্ত করতে সংবেদনশীল যন্ত্রের প্রয়োজন হয়। এটি জোনাকির মতো রাসায়নিক আলো তৈরি করাও নয়। পিস্তল চিংড়ির ক্ষেত্রে পানির মধ্যে তৈরি বুদ্‌বুদের ভৌত পরিবর্তন আলো উৎপন্ন করে। একই ছোট ঘটনায় শব্দ, চাপ ও আলোর সম্পর্ক দেখা যায় বলেই এটি বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

চিংড়ি এই ক্ষমতা কেন ব্যবহার করে? প্রজাতি ও পরিস্থিতিভেদে শিকার ধরা, প্রতিরক্ষা, আশ্রয়ের নিয়ন্ত্রণ এবং অন্য চিংড়ির সঙ্গে যোগাযোগে নখরের শব্দ ভূমিকা রাখতে পারে। কাছাকাছি ছোট প্রাণী চাপতরঙ্গের প্রভাবে হতবিহ্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এটি দূর থেকে লক্ষ্যভেদ করা বন্দুক নয়। প্রভাবের দূরত্ব, লক্ষ্য প্রাণীর আকার এবং পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। আবার প্রতিটি শব্দ শিকার আক্রমণের প্রমাণও নয়; সামাজিক যোগাযোগের সময়ও শব্দ তৈরি হয়।

অসংখ্য চিংড়ি একসঙ্গে বাস করলে তাদের বিচ্ছিন্ন শব্দ মিলিয়ে প্রায় অবিরাম খসখসে আওয়াজ তৈরি হয়। প্রবালপ্রাচীরের শব্দপরিবেশে এই আওয়াজ গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা পানির নিচের শব্দ রেকর্ড করে চিংড়ির সক্রিয়তা ও পরিবেশের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। কিছু গবেষণায় উষ্ণ পানিতে শব্দ করার হার ও মাত্রা বাড়তে দেখা গেছে। তবে বেশি শব্দ মানেই ভালো পরিবেশ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তাপমাত্রা, প্রাণীর সংখ্যা এবং আচরণ একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

পিস্তল চিংড়ির কৌশল প্রকৌশল গবেষণাকেও অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষ নখরের আদলে যন্ত্র তৈরি করে জলধারা ও বুদ্‌বুদের পতন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছে। যে গহ্বর সৃষ্টি জাহাজের ঘূর্ণায়মান পাখা বা অন্য যন্ত্রে ক্ষতির কারণ হতে পারে, একটি ক্ষুদ্র প্রাণী সেটিকেই ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতায় পরিণত করেছে। তার নখর শুধু শব্দ করে না; পানির চাপ বদলে একটি সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ শুরু করে। ছোট শরীর, দ্রুত নড়াচড়া এবং তরলের বৈশিষ্ট্যের এই সমন্বয়ই পিস্তল চিংড়িকে সমুদ্রের অসাধারণ শব্দস্রষ্টা করে তুলেছে।