অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট: আটলান্টিকজয়ী নারী বৈমানিকের জীবন ও অন্তর্ধানের রহস্য
সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা
আকাশ জয়ের সাহস থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের অমীমাংসিত রহস্য—অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট।
১৯৩৭ সালের ২ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর উড়তে থাকা একটি বিমান থেকে বেতারবার্তা আসছিল। বৈমানিক জানাচ্ছিলেন, তাঁরা নির্ধারিত গন্তব্যের কাছাকাছি থাকার কথা, কিন্তু দ্বীপ বা সহায়ক জাহাজ দেখতে পাচ্ছেন না। জ্বালানিও কমে আসছিল। তারপর যোগাযোগ থেমে যায়। বিমানে ছিলেন অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট এবং পথনির্ণয়কারী ফ্রেড নুনান। যে নারী কয়েক বছর আগে একা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন, তাঁর শেষ পরিণতি আর নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে এই রহস্যের আড়ালে রয়েছে এমন একটি জীবন, যা নারীর সক্ষমতা সম্পর্কে তৎকালীন সমাজের ধারণাকে বদলে দিয়েছিল।
অ্যামেলিয়ার জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের অ্যাচিসনে। পরিবারের স্থানান্তর ও আর্থিক অস্থিরতার কারণে তাঁর বেড়ে ওঠা এক জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কানাডার টরন্টোতে আহত সৈনিকদের সেবায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। সেখানে বিমানঘাঁটি ও উড্ডয়নের পরিবেশ তাঁর আগ্রহ বাড়ায়। পরে চিকিৎসাবিষয়ক পড়াশোনা শুরু করলেও সেই পথে স্থায়ী হননি। তাঁর জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে আকাশে ওঠার অভিজ্ঞতা।
১৯২০ সালের ডিসেম্বরে বৈমানিক ফ্র্যাঙ্ক হকসের সঙ্গে প্রথমবার বিমানে চড়েন অ্যামেলিয়া। পরের মাসেই নারী বৈমানিক নেটা স্নুকের কাছে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। উড্ডয়ন শেখা তখন ব্যয়বহুল ছিল; বিমান, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের খরচ সামলাতে কাজ এবং পারিবারিক সহায়তার প্রয়োজন হয়েছিল। প্রথম বিমান কেনার পরে তিনি অনুশীলন ও উচ্চতায় ওঠার পরীক্ষায় মন দেন। তাঁর অগ্রগতি দেখায়, সাহসের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন, অর্থের ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতিও বিমানচালনার অপরিহার্য অংশ।
১৯২৮ সালে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার একটি অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাঁর জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। উইলমার স্টাল্টজ ও লুই গর্ডনের সঙ্গে নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে ওয়েলসে পৌঁছে তিনি আকাশপথে আটলান্টিক অতিক্রমকারী প্রথম নারী হন। কিন্তু এই উড্ডয়নে বিমানটি তিনি চালাননি। যাত্রী হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী একক উড্ডয়নের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম তাঁকে খ্যাতি এনে দিলেও অ্যামেলিয়া নিজের বিমানচালনার দক্ষতা দিয়ে একটি স্বতন্ত্র অর্জন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
সেই সুযোগ আসে ১৯৩২ সালের ২০ মে। লাল রঙের এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট লকহিড ভেগা নিয়ে তিনি নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে একা যাত্রা শুরু করেন। গন্তব্য হিসেবে প্যারিসের পরিকল্পনা থাকলেও খারাপ আবহাওয়া ও যান্ত্রিক সমস্যায় পথ পরিবর্তন করতে হয়। প্রায় পনেরো ঘণ্টার উড্ডয়নের পরে ২১ মে উত্তর আয়ারল্যান্ডের একটি মাঠে অবতরণ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন একা ও বিরতিহীন উড্ডয়নে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া প্রথম নারী। এই অর্জনে বিমানের নিয়ন্ত্রণ, বিপদের মধ্যে সিদ্ধান্ত এবং সমুদ্রের ওপর দীর্ঘ সময় একা থাকার দায়িত্ব সম্পূর্ণ তাঁর নিজের ছিল।
অ্যামেলিয়ার কৃতিত্ব বোঝার জন্য তখনকার বিমানচালনার সীমাবদ্ধতা মনে রাখা দরকার। আজকের মতো নির্ভুল অবস্থান জানা, আবহাওয়ার বিস্তৃত পূর্বাভাস কিংবা সর্বক্ষণ নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের সুবিধা ছিল না। মেঘ, বরফ, যন্ত্রের ত্রুটি এবং পথ নির্ধারণের সমস্যা ছোট বিমানকে দ্রুত বিপদে ফেলতে পারত। আটলান্টিকের ওপর কোথাও জরুরি অবতরণ করার সুযোগও প্রায় ছিল না। ফলে তাঁর সাফল্য শুধু দূরত্ব অতিক্রম নয়; অনিশ্চিত পরিবেশে প্রশিক্ষণ ও বিচারবুদ্ধি কাজে লাগানোর প্রমাণ।
১৯৩৫ সালে হাওয়াই থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে একা উড়ে তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম অর্জন করেন। এটিকে পুরো প্রশান্ত মহাসাগর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অতিক্রম বলা যথাযথ নয়; তাঁর নির্দিষ্ট রেকর্ড ছিল হাওয়াই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে প্রথম একক উড্ডয়ন। আরও দূরপাল্লার অভিযান ও রেকর্ডের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠিত হন। প্রকাশক জর্জ পুটনামের সঙ্গে তাঁর বিবাহ ও পেশাগত সহযোগিতা প্রচার, বই প্রকাশ এবং অভিযানের অর্থ সংগ্রহেও ভূমিকা রেখেছিল।
খ্যাতিকে অ্যামেলিয়া নারীদের জন্য সুযোগ তৈরির কাজে ব্যবহার করেন। ১৯২৯ সালে নারী বৈমানিকদের সংগঠন ‘নাইনটি নাইনস’ প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন এবং পরে তার প্রথম সভাপতি হন। তিনি মনে করতেন, নারীর পিছিয়ে থাকার কারণকে শুধু সক্ষমতার অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; প্রশিক্ষণ, অর্থ, চাকরি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বাধাও বিবেচনা করতে হয়। পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের পেশা নির্বাচনে পরামর্শ দেওয়ার কাজ করেন। তাঁর কাছে আকাশে ওঠা ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি অন্য নারীর ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সুযোগ ছিল।
১৯৩৭ সালের বিশ্বপরিক্রমা ছিল তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অভিযান। পারডু রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে কেনা দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট লকহিড ইলেকট্রা বিমানে দীর্ঘ পথের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম প্রচেষ্টায় হাওয়াই থেকে উড্ডয়নের সময় দুর্ঘটনায় বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেরামতের পরে পূর্বমুখী নতুন পরিকল্পনায় যাত্রা শুরু হয়। ফ্রেড নুনানের পথনির্ণয় দক্ষতা নিয়ে তাঁরা দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়া অতিক্রম করেন। জুনের শেষে নিউগিনির লায়ে পৌঁছানোর সময় অভিযানের বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছিল।
পরবর্তী গন্তব্য হাওল্যান্ড দ্বীপ ছিল প্রায় চার হাজার একশ কিলোমিটার দূরে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই ক্ষুদ্র দ্বীপ খুঁজে পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। স্থলভাগের পরিচিত চিহ্ন ছাড়া দীর্ঘ উড্ডয়নে বাতাসের হিসাব, সময়, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং বেতার সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতো। সামান্য বিচ্যুতিও দ্বীপকে দৃষ্টিসীমার বাইরে নিয়ে যেতে পারত। হাওল্যান্ডের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলরক্ষী জাহাজ ইটাস্কা অপেক্ষা করছিল, যাতে যোগাযোগ ও পথনির্দেশে সাহায্য করা যায়।
২ জুলাই লায়ে থেকে উড্ডয়নের পরে তাঁদের আর নিশ্চিতভাবে দেখা যায়নি। ইটাস্কা অ্যামেলিয়ার কিছু বার্তা পেলেও কার্যকর দুই পক্ষের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শেষ দিকের বার্তায় জ্বালানির ঘাটতি এবং গন্তব্য দেখতে না পাওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ পায়। একটি বার্তায় নির্দিষ্ট অবস্থানরেখা বরাবর অনুসন্ধানের কথাও ছিল। তবে এসব তথ্য থেকে তাঁদের শেষ অবস্থান নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায় না। যোগাযোগের সমস্যাকে একটি মাত্র যন্ত্রের ত্রুটি বা একজনের ভুল দিয়ে চূড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করাও প্রমাণের সীমা অতিক্রম করে।
বিস্তৃত নৌ ও আকাশ অনুসন্ধান চালিয়েও তাঁদের কিংবা বিমানের নিশ্চিত চিহ্ন পাওয়া যায়নি। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সরকারি অনুসন্ধান শেষ হয়; পুটনাম পরে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। ১৯৩৯ সালে অ্যামেলিয়াকে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার অর্থ ছিল তাঁর অনুপস্থিতির আইনি নিষ্পত্তি, মৃত্যুর নির্দিষ্ট স্থান বা পরিস্থিতি আবিষ্কার নয়। সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যায়, হাওল্যান্ড খুঁজে না পেয়ে জ্বালানি ফুরিয়ে বিমানটি সমুদ্রে নেমে বা বিধ্বস্ত হয়ে ডুবে যায়। এটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হলেও নিশ্চিত ধ্বংসাবশেষ দিয়ে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।
অন্য একটি তত্ত্বে বলা হয়, তাঁরা হাওল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বের নিকুমারোরো দ্বীপে পৌঁছে কিছুদিন বেঁচে ছিলেন। সেখানে পাওয়া বিভিন্ন বস্তু ও পুরোনো তথ্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে, কিন্তু অ্যামেলিয়া ও তাঁর বিমানের সঙ্গে নিশ্চিত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাপানি বন্দিত্ব কিংবা গোপন পরিচয়ে বেঁচে থাকার গল্পও প্রচলিত; সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস বলা যায় না। ২০২৬ সালের অক্টোবরে নিকুমারোরোর কাছে সন্দেহজনক একটি বস্তু পরীক্ষা করতে নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। তবে নতুন অনুসন্ধান শুরু হওয়া আর রহস্যের সমাধান হওয়া এক বিষয় নয়।
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টকে শুধু হারিয়ে যাওয়া নারী হিসেবে মনে রাখলে তাঁর জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশটি চাপা পড়ে যায়। তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, ব্যর্থতার পরে ফিরেছেন, নিজের দক্ষতা দিয়ে রেকর্ড গড়েছেন এবং নারীর পেশাগত সুযোগের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর শেষ যাত্রা বিমানচালনায় যোগাযোগ ও পথনির্ণয়ের গুরুত্বের কঠিন স্মারক। আর তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, কোনো মানুষের শেষ পরিণতি অজানা থাকলেও তাঁর অর্জনের অর্থ অস্পষ্ট হয়ে যায় না।
কন্টিনেন্টাল সিস্টেম: ব্রিটেনকে দুর্বল করার পরিকল্পনায় নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য কেন বিপদে পড়েছিল?
ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান
ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎস: সমুদ্রে পরাজয়, স্থলে নেপোলিয়নের আধিপত্য
প্রথম কনসাল থেকে সম্রাট: নেপোলিয়নিক কোড, সংস্কার ও ১৮০৪ সালের অভিষেক