বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হেলেন কেলার: দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারিয়েও বিশ্বজুড়ে অধিকার আন্দোলনের কণ্ঠ হয়ে ওঠার ইতিহাস

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

হেলেন কেলার: দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারিয়েও বিশ্বজুড়ে অধিকার আন্দোলনের কণ্ঠ হয়ে ওঠার ইতিহাস
শিক্ষা ও নিজের কণ্ঠ দিয়ে মানুষের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা বদলেছিলেন হেলেন কেলার।

১৮৮৭ সালের এপ্রিলের একদিন আলাবামার একটি বাড়ির পানির কলের পাশে সাত বছরের হেলেন কেলার দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষক অ্যান সুলিভান এক হাতে পানি পড়তে দিলেন, অন্য হাতে আঙুল দিয়ে একটি শব্দের অক্ষর বানালেন। হেলেন বুঝতে শুরু করলেন, হাতে অনুভব করা বস্তুটির একটি নাম আছে। তাঁর জীবনের এই ঘটনাটি বিখ্যাত, কিন্তু এখানে গল্প শেষ করলে হেলেন কেলারকে বোঝা যায় না। এরপর তিনি ভাষা শেখেন, পড়াশোনা করেন, বই লেখেন এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে বহু দেশে কাজ করেন। পানির কলের মুহূর্তটি একটি দরজা খুলেছিল; সেই দরজা দিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটেছিলেন হেলেন নিজে।

১৮৮০ সালের ২৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের টাসকাম্বিয়ায় হেলেন অ্যাডামস কেলারের জন্ম। জন্মের সময় তাঁর দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি ছিল। প্রায় উনিশ মাস বয়সে গুরুতর অসুস্থতার পর তিনি দুটিই হারান। ঠিক কোন রোগে এমন হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তখন তিনি কথা শেখার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলেন। পরিবারের লোকজনকে তিনি স্পর্শ, মুখের অভিব্যক্তি এবং নিজের তৈরি কিছু ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করতেন। অর্থাৎ অ্যান সুলিভান আসার আগে হেলেনের যোগাযোগের কোনো ক্ষমতাই ছিল না—এ কথা ঠিক নয়। তাঁর অসুবিধা ছিল, চারপাশের মানুষের ব্যবহৃত ভাষার নিয়মিত ও বিস্তৃত নাগাল পাচ্ছিলেন না।

পরিবার তাঁর শিক্ষার উপায় খুঁজতে থাকে। দৃষ্টিশ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষকে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব কি না, উনিশ শতকের অনেকের মধ্যেই এ নিয়ে ভুল ধারণা ছিল। অনুসন্ধানের পর পারকিন্স নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ হয়। সেখান থেকে তরুণ শিক্ষক অ্যান সুলিভান ১৮৮৭ সালের মার্চে কেলারদের বাড়িতে আসেন। অ্যান নিজেও দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যার অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়েছিলেন। তিনি হেলেনকে সবকিছু করে দেওয়ার বদলে তাঁর হাতে অক্ষর বানিয়ে বিভিন্ন বস্তু, কাজ ও অনুভূতির নাম শেখাতে শুরু করেন। শিক্ষা শুরু হয়েছিল দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই—খেলনা, খাবার, ঘরের জিনিস আর বাইরে স্পর্শ করা বস্তু দিয়ে।

শুরুর দিকে হেলেন হাতে অক্ষরের বিন্যাস অনুকরণ করতে পারতেন, কিন্তু প্রতিটি বিন্যাস কোনো বস্তু বা ধারণাকে বোঝায়, সেই সম্পর্ক স্পষ্ট ছিল না। পানির কলের কাছে পানি অনুভব করার সময় অ্যান তাঁর হাতে পানির ইংরেজি শব্দটির অক্ষর বানান। হেলেনের উপলব্ধি ছিল হাতের ওই নির্দিষ্ট চিহ্ন একটি অভিজ্ঞতার নাম প্রকাশ করছে। এরপর তিনি অন্য জিনিসের নাম জানতে চান। এই ঘটনাকে জাদুকরী এক মুহূর্ত হিসেবে দেখানোর প্রবণতা আছে; বাস্তবে এর আগে অ্যানের ধৈর্যশীল পাঠদান এবং পরে হেলেনের বছরের পর বছর অনুশীলন ছিল। একটি শব্দ বোঝা আর পূর্ণাঙ্গ ভাষা আয়ত্ত করা এক কাজ নয়।

ভাষা শেখার পর হেলেনের সামনে আরও বড় শিক্ষার পথ খুলে যায়। তিনি হাতে বানানো অক্ষর দিয়ে মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চালাতেন, ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়তেন এবং লেখার বিভিন্ন উপায় শিখতেন। অন্য কেউ কথা বললে অ্যান তা হেলেনের হাতে অক্ষরে প্রকাশ করতেন। বইয়ের বিষয়, শ্রেণিকক্ষের আলোচনা কিংবা পরীক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্য পৌঁছানোর উপযোগী ব্যবস্থা দরকার হতো। হেলেন নিজেও কথা বলার অনুশীলন করেন, যদিও তাঁর উচ্চারণ সবাই সহজে বুঝতে পারতেন না। তাঁর জীবনের সাফল্যকে ‘সব বাধা একা জয়’ বললে এই বাস্তব শিক্ষা-পদ্ধতি, শিক্ষকের শ্রম এবং প্রবেশযোগ্য উপকরণের গুরুত্ব হারিয়ে যায়।

১৮৮৮ সালে হেলেন পারকিন্সে যান এবং অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও দৃষ্টিশ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েন। উচ্চশিক্ষায় তাঁকে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শনসহ বিস্তৃত বিষয় পড়তে হয়েছিল; শ্রেণির পাঠ বুঝতে ও পরীক্ষার উত্তর দিতে সহায়তা এবং প্রস্তুতির বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। ১৯০৪ সালে তিনি র‍্যাডক্লিফ কলেজ থেকে স্নাতক হন। দৃষ্টিশ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে এই অর্জন ছিল ঐতিহাসিক। কিন্তু ডিগ্রির মূল্য শুধু বিরল সাফল্যের রেকর্ডে নয়। সুযোগ, উপযুক্ত শিক্ষা ও যোগাযোগের ব্যবস্থা পেলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় অংশ নিতে পারেন, তাঁর পড়াশোনা তার দৃশ্যমান প্রমাণ হয়ে ওঠে।

ছাত্রী থাকতেই হেলেন নিজের জীবন নিয়ে লিখতে শুরু করেন। তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশের পর বহু পাঠক জানতে পারেন, তিনি কীভাবে ভাষা শিখেছেন এবং পৃথিবীকে কীভাবে অনুভব করেন। জনপ্রিয়তার সঙ্গে একটি সমস্যাও তৈরি হয়: অনেকে তাঁর শৈশবের গল্পেই আটকে যান। যেন পানির কলের পাশে দাঁড়ানো শিশুটিই তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয়। অথচ প্রাপ্তবয়স্ক হেলেন একজন নিয়মিত লেখক, বক্তা ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষ ছিলেন। তিনি যা ভাবতেন, তা সব সময় জনপ্রিয় বা বিতর্কহীন ছিল না। তাঁকে বুঝতে হলে কেবল শিক্ষার্থীর সাফল্য নয়, সমাজ বদলানোর উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তব্যও দেখতে হয়।

হেলেন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য শিক্ষা, কাজ ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ চেয়েছিলেন। তাঁর সময়ে অন্ধ মানুষকে প্রায়ই দানের ওপর নির্ভরশীল হিসেবে দেখা হতো; অনেকের জন্য পড়ার উপকরণ, প্রশিক্ষণ বা জীবিকার পথ ছিল সীমিত। ১৯২৪ সাল থেকে তিনি আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য ব্লাইন্ডের সঙ্গে কাজ করেন। সংগঠনের জন্য বক্তৃতা, জনসচেতনতা ও তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি মানুষের চাহিদা রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে তুলে ধরেন। দৃষ্টিশ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের প্রয়োজনও যেন আলাদাভাবে গুরুত্ব পায়, সে বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। অধিকার নিয়ে তাঁর কাজের লক্ষ্য ছিল সহানুভূতির পাশাপাশি বাস্তব সুযোগ তৈরি করা।

তাঁর অবস্থান আরও বিস্তৃত ছিল। তিনি নারীদের ভোটাধিকার সমর্থন করেন, শ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে কথা বলেন এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্যের সমালোচনা করেন। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিও তাঁর সমর্থন ছিল। এসব মতের কারণে সমালোচকরা কখনো তাঁর রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধিকে খাটো করে দেখতেন। শৈশবে ভাষা শেখার গল্পটি তাঁরা প্রশংসা করলেও সমাজ নিয়ে তাঁর নিজস্ব মতামতকে একই গুরুত্ব দিতে চাইতেন না। এই বৈপরীত্য হেলেনের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: যে নারীকে অনুপ্রেরণার প্রতীক বানানো সহজ ছিল, তাঁর স্বাধীন রাজনৈতিক কণ্ঠ গ্রহণ করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল।

অ্যান সুলিভান কয়েক দশক ধরে হেলেনের শিক্ষক ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। নতুন লেখা পড়া, সফরের সময় কথোপকথন বোঝা এবং জনসমক্ষে যোগাযোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৩৬ সালে অ্যানের মৃত্যুর পর হেলেনের কাজ থেমে যায়নি। তাঁর আরেক সহযোগী পলি থমসন যোগাযোগ ও সফরে সহায়তা করেন। এই দীর্ঘ সম্পর্কগুলোকে হেলেনের স্বাধীনতার বিপরীত হিসেবে দেখার কারণ নেই। মানুষের জীবনেই অন্যের সহায়তা নানা রূপে থাকে; হেলেনের ক্ষেত্রে তা ছিল স্পষ্ট ও পরিকল্পিত। সহায়তা পাওয়া তাঁর চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও লেখার মালিকানা কমিয়ে দেয়নি।

পরবর্তী দশকগুলোতে হেলেন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও বহু দেশে ভ্রমণ করেন। যুদ্ধের সময় আহত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষদের সঙ্গেও দেখা করেন। বিদ্যালয়, সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতাদের সামনে তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন তুলে ধরেন। তাঁর সফরে বিপুল জনসমাগম হতো, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাকে তিনি নিজের জীবনকাহিনি বলার কাজেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। যেসব মানুষ তাঁর মতো পরিচিতি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা শিক্ষার সুযোগ পাননি, তাঁদের জন্য প্রতিষ্ঠান ও পরিষেবার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি খ্যাতি ব্যবহার করেছিলেন।

হেলেনের জীবন নিয়ে আলোচনায় একটি ভাষাগত সতর্কতাও দরকার। তিনি দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারিয়েছিলেন বলে তাঁর পৃথিবী অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে যায়নি। স্পর্শ, ব্রেইল, হাতে অক্ষর বানিয়ে যোগাযোগ এবং অন্য মানুষের সঙ্গে নিয়মিত বিনিময়ের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা ও সম্পর্ক গড়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতাকে সব দৃষ্টিশ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একমাত্র আদর্শ ধরাও ঠিক নয়। পরিবারের সহায়তা, শিক্ষক, বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরে তাঁর খ্যাতি—এসব সুযোগ তাঁর জীবনে বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদের একই সুযোগ না থাকলে তাঁদের সম্ভাবনাকে হেলেনের অর্জনের সঙ্গে মেপে বিচার করা অন্যায়।

১৯৬৮ সালের ১ জুন হেলেন কেলার মারা যান। তাঁর জীবনের সবচেয়ে পরিচিত ছবিতে একটি শিশু নতুন একটি শব্দ বুঝতে শিখছে। কিন্তু তাঁর পূর্ণ ইতিহাসে দেখা যায় একজন নারীকে, যিনি শিক্ষা গ্রহণের পর নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করে শিক্ষা ও অধিকার প্রসারের দাবি তুলেছেন। তাঁকে অনুপ্রেরণার প্রতীক বলা যায়, যদি সেই কথার সঙ্গে তাঁর বাস্তব কাজও মনে রাখা হয়। হেলেন কেলারের ইতিহাস কেবল ব্যক্তিগত অধ্যবসায়ের গল্প নয়; ভাষায় প্রবেশাধিকার, সহযোগিতা এবং সমাজের তৈরি বাধা সরানোর প্রয়োজনীয়তারও গল্প।


আপনার পছন্দ হতে পারে