বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মন্টে আলবান: পাহাড়চূড়ায় জাপোটেক সভ্যতার প্রাচীন রাজধানীর রহস্য

সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

মন্টে আলবান: পাহাড়চূড়ায় জাপোটেক সভ্যতার প্রাচীন রাজধানীর রহস্য
পাহাড়ের চূড়ায় জাপোটেক ক্ষমতা ও স্মৃতির প্রাচীন নগর।

মেক্সিকোর ওয়াহাকা উপত্যকার ওপর উঠে থাকা পাহাড়ে দাঁড়ালে নিচের বিস্তৃত জনপদ যেন একটি মানচিত্রের মতো দেখা যায়। এই উঁচু স্থানেই প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মানুষ পাহাড়ের চূড়া বদলে একটি নগর গড়ে তুলেছিল। সমতল চত্বর, সিঁড়িযুক্ত মঞ্চ, মন্দির, আবাসিক সোপান এবং সমাধি মিলিয়ে তৈরি হয় মন্টে আলবান। আজ তার প্রাচীন রাজদরবার নেই, কিন্তু স্থাপত্যে সংগঠিত ক্ষমতার উপস্থিতি স্পষ্ট। মন্টে আলবান ছিল জাপোটেক সমাজের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিক রাজধানী, যার ইতিহাস নগর নির্মাণের পাশাপাশি যুদ্ধ, ধর্ম এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।

নগরটির প্রতিষ্ঠা সাধারণভাবে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালের কাছাকাছি ধরা হয়। তবে তার আগে থেকেই ওয়াহাকা উপত্যকায় কৃষিভিত্তিক জনপদ ও সামাজিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছিল। সান হোসে মোগোতে ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে আনুষ্ঠানিক স্থাপনা এবং প্রাথমিক লিখনচিহ্নের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মন্টে আলবানের উত্থান তাই শূন্য থেকে সভ্যতার জন্ম নয়; আগে গড়ে ওঠা সমাজের নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস। উপত্যকার মানুষ কেন পাহাড়ের এই স্থানে একত্র হলেন, সে প্রশ্নে নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আলোচিত হয়।

‘মন্টে আলবান’ নামটি প্রাচীন অধিবাসীদের নিশ্চিতভাবে জানা নিজস্ব নাম নয়। বর্তমান নামের উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে; মূল নাম নিয়েও প্রস্তাব আছে, কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেই। একইভাবে জাপোটেক ইতিহাসকে কেবল এই একটি নগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। উপত্যকার নানা বসতি, কৃষিজমি এবং আঞ্চলিক কেন্দ্রের সঙ্গে রাজধানীর সম্পর্ক ছিল। মন্টে আলবান হারিয়ে যাওয়া রাজধানী হলেও জাপোটেক জনগোষ্ঠী হারিয়ে যায়নি। আজও ওয়াহাকায় জাপোটেক ভাষাভাষী মানুষ ও তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জীবিত, যা প্রাচীন নগরের ইতিহাসকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

পাহাড়চূড়ায় রাজধানী তৈরির সিদ্ধান্ত ছিল সুবিধা ও অসুবিধার সমন্বয়। উঁচু অবস্থান থেকে উপত্যকার বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করা যেত এবং আক্রমণকারীর অগ্রসর হওয়া কঠিন হতো। আবার নিচের কৃষিজমি থেকে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী ওপরে আনতে হতো। পাহাড়ের ঢালে বাসযোগ্য জায়গা তৈরিতেও শ্রম দরকার ছিল। ফলে স্থান নির্বাচন শুধু প্রাকৃতিক আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা নয়; এটি এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত, যা পরিবহন, নির্মাণ ও সরবরাহ সংগঠিত করতে পারত। নিরাপত্তার পাশাপাশি দূর থেকে দৃশ্যমান নগরটি ক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও কাজ করেছিল বলে অনুমান করা যায়।

মন্টে আলবানের নির্মাতারা দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ের ভূমিরূপ পরিবর্তন করেছিলেন। চূড়া সমান করা, মাটি ভরাট এবং ঢালে সোপান তৈরি করে আনুষ্ঠানিক ও আবাসিক স্থান বাড়ানো হয়। আজকের বিস্তৃত সমতল চত্বর প্রকৃতির তৈরি কোনো প্রস্তুত মঞ্চ নয়; বহু প্রজন্মের মানুষের শ্রমে গড়া নগরভূমি। সব পাথুরে অংশ সরানো সম্ভব ছিল না, তাই কিছু স্থাপনার বিন্যাসে প্রাকৃতিক শিলার অবস্থানও প্রভাব ফেলেছিল। এই নগর পরিকল্পনা দেখায়, নির্মাতারা ভূপ্রকৃতিকে সম্পূর্ণ মুছে না দিয়ে পরিবর্তন ও ব্যবহার—দুই পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিলেন।

প্রধান চত্বর ছিল নগরের নাগরিক ও আনুষ্ঠানিক কেন্দ্র। এর চারপাশে বড় মঞ্চ, মন্দির এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবন নির্মিত হয়েছিল। খোলা স্থানটি সমাবেশ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপযোগী হলেও নির্দিষ্ট সময়ে কী ধরনের কর্মকাণ্ড হতো, তার সব বিস্তারিত জানা নেই। চত্বরের ভূমিকা সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলেছিল, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। নগরের উত্তর ও দক্ষিণের উঁচু মঞ্চ স্থাপত্যে আলাদা গুরুত্ব তৈরি করেছিল। এখানে দাঁড়ালে বোঝা যায়, মানুষের চলাচল, দৃশ্যমানতা এবং আনুষ্ঠানিক স্থানের সম্পর্ক বিবেচনা করে রাজধানীর কেন্দ্র সাজানো হয়েছিল।

নগরটির সবচেয়ে আলোচিত নিদর্শনের একটি হলো ‘দানসান্তেস’, অর্থাৎ ‘নৃত্যরত মানুষ’ নামে পরিচিত পাথরখোদাই। নামটি এসেছে অবয়বগুলোর অস্বাভাবিক ও বাঁকানো ভঙ্গি থেকে। কিন্তু গবেষকেরা এগুলোকে সাধারণ নাচের দৃশ্য হিসেবে দেখেন না। অনেক অবয়ব নগ্ন, নিথর কিংবা আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছে; সঙ্গে বিভিন্ন চিত্রলিপিও দেখা যায়। এগুলোর বহুল স্বীকৃত ব্যাখ্যা হলো পরাজিত বন্দি বা নিহত শত্রুর উপস্থাপন। তবে প্রতিটি অবয়বের পরিচয় ও অর্থ সমানভাবে নিশ্চিত নয়। খোদাইগুলো রাজধানীর প্রাথমিক রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সংঘাতের ইতিহাস বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

এ ধরনের ছবি জনসমক্ষে প্রদর্শন শাসকের শক্তির বার্তা বহন করতে পারত। চত্বরের পশ্চিম পাশে এল ভবনের সঙ্গে যুক্ত পাথরগুলো দর্শনার্থী ও অধিবাসীদের সামনে বন্দি এবং পরাজয়ের স্মৃতি তুলে ধরত। কিছু খোদাই পরে সরানো বা অন্য নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে আজ যে অবস্থানে একটি পাথর দেখা যায়, সেটি সবসময় তার প্রথম অবস্থান নয়। এই পুনর্ব্যবহার ইতিহাস পাঠে গুরুত্বপূর্ণ: একই নিদর্শন বিভিন্ন সময়ে নতুন স্থাপত্যের অংশ হতে পারে, আর তার মূল দৃশ্যগত সম্পর্ক বদলে যেতে পারে।

চত্বরের জে ভবন আরেকটি বড় রহস্য। এর ভূমিনকশা তিরের ফলার মতো এবং অভিমুখ নগরের অধিকাংশ স্থাপনার সঙ্গে মেলে না। ভবনের পাথরে খোদাই করা চিহ্নগুলোকে প্রায়ই বিজিত জনপদের নাম ও রাজনৈতিক অধীনতার বিবরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এসব পাঠের প্রতিটি অংশ নিয়ে সমান নিশ্চয়তা নেই। ভবনটিকে পর্যবেক্ষণাগারও বলা হয়, কারণ তার স্বতন্ত্র অভিমুখের সঙ্গে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক প্রস্তাব করা হয়েছে। জে ভবনের অস্বাভাবিক নকশা নিশ্চিত তথ্য; তার সমস্ত ব্যবহার ও প্রতীকী অর্থ এখনো আলোচনার বিষয়।

জাপোটেক লিখন ও দিনপঞ্জির ঐতিহ্য মন্টে আলবানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। পাথরে ব্যক্তির নাম, দিনসংক্রান্ত চিহ্ন এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলির সম্ভাব্য উল্লেখ রয়েছে। কিছু শাসকের পরিচয় দিনপঞ্জিভিত্তিক নামে বোঝানো হয়েছে। এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, স্মৃতি সংরক্ষণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় লিখিত প্রতীকের ব্যবহার ছিল। কিন্তু সব চিহ্নের পাঠ সম্পূর্ণ উদ্ধার হয়নি। তাই মন্টে আলবানের ইতিহাস কেবল শিলালিপি পড়ে তৈরি করা যায় না; স্থাপত্যের পর্যায়, বসতির বিস্তার, মৃৎপাত্র ও সমাধির তথ্য পাশাপাশি বিচার করতে হয়।

সমাধিগুলো নগরটির অভিজাত জীবন ও পূর্বপুরুষের ধারণা বোঝার অসাধারণ উৎস। কিছু সমাধি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ভবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং দেয়ালচিত্র, খোদাই ও নিবেদন দিয়ে সাজানো হয়েছিল। মানবাকৃতির অলংকৃত মৃৎপাত্রও পাওয়া গেছে, যেগুলোকে প্রচলিতভাবে সমাধির পাত্র বলা হয়। তবে সব পাত্রে দেহাবশেষ রাখা হতো, এমন নয়। তাদের অবয়ব ও প্রতীক ধর্মীয় পরিচয় বা পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মন্টে আলবানে মৃতদের স্থান জীবিতদের পরিবার, মর্যাদা ও উত্তরাধিকারের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না।

বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে সপ্তম সমাধি, যা আলফোনসো কাসো ১৯৩২ সালে আবিষ্কার করেন। সেখানে পাওয়া মূল্যবান অলংকার ও অন্যান্য নিবেদন মেক্সিকোর প্রত্নতত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। কিন্তু একটি জরুরি সময়গত পার্থক্য আছে: সমাধিটি জাপোটেক নির্মাণের হলেও তার বিখ্যাত সম্পদের বড় অংশ পরবর্তী মিশতেক ব্যবহার ও নিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সব নিদর্শনকে রাজধানীর সমৃদ্ধির একই যুগের সম্পদ বলা ভুল। এই পুনর্ব্যবহার দেখায়, রাজনৈতিক কেন্দ্র দুর্বল হওয়ার পরও স্থানটি পবিত্র স্মৃতি ও বংশীয় সম্পর্কের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব ধরে রেখেছিল।

মন্টে আলবানের যোগাযোগ ওয়াহাকার বাইরেও বিস্তৃত ছিল। তেওতিহুয়াকানে জাপোটেক সম্প্রদায়ের পাড়া এবং স্বতন্ত্র মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। মন্টে আলবানের কিছু খোদাইয়েও দূরবর্তী যোগাযোগের ইঙ্গিত রয়েছে। এগুলো মানুষ, পণ্য ও ধারণার চলাচল বোঝায়, কিন্তু সরলভাবে একটি নগরের অধীনে অন্য নগরের শাসন প্রমাণ করে না। একইভাবে রাজধানীর নিজের প্রভাবও যুগভেদে বদলেছিল। আনুমানিক অষ্টম শতকের শেষ থেকে নবম শতকে উপত্যকার প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে তার কর্তৃত্ব দুর্বল হয়; নতুন আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর গুরুত্ব বাড়তে থাকে।

এই পতনের একক নিশ্চিত কারণ জানা যায়নি। রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা রয়েছে; তবে নগরের অবক্ষয়কে একটি আকস্মিক ধ্বংসের গল্পে নামিয়ে আনা যায় না। রাজধানীর ক্ষমতা কমা, জনসংখ্যার পরিবর্তন এবং পবিত্র স্থানের পরবর্তী ব্যবহার আলাদা প্রক্রিয়া। মন্টে আলবান তাই শুধু পরিত্যক্ত পাথরের শহর নয়, দীর্ঘ সামাজিক রূপান্তরের সাক্ষ্য। পাহাড়চূড়ার চত্বর আজ নীরব হলেও তার নির্মাণে মানুষের সংগঠন, খোদাইয়ে ক্ষমতার দাবি এবং সমাধিতে স্মৃতি ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা এখনো স্পষ্ট।