তেওতিহুয়াকান: মেক্সিকোর ‘দেবতাদের নগরী’ কে নির্মাণ করেছিল?
সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য
অজানা নির্মাতাদের হাতে গড়া মেক্সিকোর প্রাচীন মহানগর।
মেক্সিকো সিটির উত্তর-পূর্বে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন নগর, যার বিশালত্ব আজও দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। প্রশস্ত সড়ক, উঁচু পিরামিড, সুবিন্যস্ত চত্বর এবং অসংখ্য আবাসিক ভবনের ধ্বংসাবশেষ বলে দেয়, এখানে একসময় বিপুল মানুষের জীবন চলত। অথচ এত বড় নগরের প্রতিষ্ঠাতার নাম জানা যায় না। তেওতিহুয়াকানের রহস্য এখানেই: আমরা নগরটির নির্মাণ, অর্থনীতি ও জনজীবনের অনেক প্রমাণ পেয়েছি, কিন্তু তার প্রাথমিক নেতৃত্ব এবং নির্মাতাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারিনি। এই অজানা ইতিহাসই তাকে ‘দেবতাদের নগরী’ হিসেবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তেওতিহুয়াকানের বর্তমান নাম নির্মাতাদের দেওয়া বলে জানা যায় না। নামটি এসেছে পরবর্তী নাহুয়াতলভাষী জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে, বিশেষ করে অ্যাজটেকদের ঐতিহ্যের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছে। সাধারণভাবে এর অর্থ করা হয় ‘যেখানে দেবতাদের সৃষ্টি হয়েছে’ বা ‘দেবতাদের জন্মস্থান’। অ্যাজটেকদের কাছে নগরটির ধ্বংসাবশেষ ছিল পবিত্র অতীতের অংশ; তাদের কাহিনিতে এখানে সূর্য ও চাঁদের জন্মের প্রসঙ্গও রয়েছে। কিন্তু অ্যাজটেকরা তেওতিহুয়াকানের মূল নির্মাতা ছিলেন না। তারা নগরটির প্রধান সমৃদ্ধির যুগ শেষ হওয়ার বহু শতাব্দী পরে এই স্থানের সঙ্গে ধর্মীয় সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
নগরটির শিকড় খ্রিস্টপূর্ব শেষ কয়েক শতাব্দীর বসতিতে পৌঁছায়। খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতাব্দীতে জনসংখ্যা, নির্মাণ ও রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বাড়ে। প্রথম থেকে সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে এটি প্রাচীন আমেরিকার বৃহত্তম নগরগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে। সর্বোচ্চ জনসংখ্যার হিসাব এক নয়; অনেক গবেষণায় প্রায় এক লাখ কিংবা তার কাছাকাছি মানুষের কথা বলা হয়। এই সংখ্যা সরাসরি জনগণনা থেকে আসেনি, বরং বসতির বিস্তার ও আবাসিক ভবনের হিসাব থেকে অনুমান করা হয়েছে। বড় পিরামিডগুলোও একই দিনে তৈরি হয়নি; নগরের বিকাশ ছিল ধারাবাহিক নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠনের ফল।
তাহলে কে নির্মাণ করেছিল? সবচেয়ে সতর্ক উত্তর হলো, মধ্য মেক্সিকোর স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পরে সেখানে বসতি স্থাপনকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বহু প্রজন্ম ধরে নগরটি গড়ে তুলেছিলেন। কোনো এক পরিচিত জাতির নামে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই। তাদের প্রধান ভাষা এবং প্রাথমিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও মতভেদ রয়েছে। নির্মাতাদের পরিচয় অজানা মানে নির্মাণের মানবিক প্রক্রিয়া অজানা নয়। মাটির স্তর, পাথরের কাজ, উৎপাদনকেন্দ্র এবং বসতির পরিবর্তন স্পষ্টভাবে মানুষের পরিকল্পিত শ্রমের ইতিহাস দেখায়; রহস্যটি মূলত সেই মানুষের নাম ও পরিচয়ের সীমাবদ্ধতায়।
তেওতিহুয়াকান ছিল বহুজাতিক ও সম্ভবত বহুভাষিক মহানগর। ওয়াহাকার সাপোতেক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত পাড়া এবং মায়া অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানের মানুষের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। মৃৎপাত্র, সমাধির রীতি, স্থাপত্য ও অন্যান্য নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, কিছু অভিবাসী নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছিলেন। আবার নগরের বৃহত্তর জীবনে অংশও নিয়েছিলেন। তবে পরিণত নগরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপস্থিতি প্রমাণ করলেই প্রতিষ্ঠার সময় তাদের ভূমিকা নিশ্চিত হয় না। নগরটি কারা শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কারা তাকে সম্প্রসারিত করেছিলেন—এই দুটি প্রশ্ন আলাদাভাবে বিচার করতে হয়।
নগরের পরিকল্পনা তার সংগঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য। প্রধান সড়ককে কেন্দ্র করে মন্দির, চত্বর এবং আবাসিক এলাকা নির্দিষ্ট অভিমুখে সাজানো হয়েছিল। আজ ‘মৃতদের সড়ক’ নামে পরিচিত পথটির নামও পরবর্তী যুগের; এটি প্রাচীন অধিবাসীদের দেওয়া নাম নয়। সড়কের পাশের মঞ্চগুলোকে সমাধি হিসেবে ভাবার ঐতিহ্য থেকে নামটি প্রচলিত হয়েছিল, যদিও সব স্থাপনা সমাধি ছিল না। তেওতিহুয়াকানের জ্যামিতিক বিন্যাস দেখায়, ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণের বাইরে নগরব্যাপী পরিকল্পনা কার্যকর ছিল। এর অভিমুখে ভূপ্রকৃতি, ধর্মীয় ধারণা ও আকাশ পর্যবেক্ষণের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা রয়েছে।
সূর্যের পিরামিড নগরটির সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনা। এর বিশাল ভিত্তি এবং প্রায় পঁয়ষট্টি মিটার উচ্চতা বিপুল নির্মাণশ্রমের ধারণা দেয়। কিন্তু ‘সূর্যের পিরামিড’ নাম দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে প্রাচীন নির্মাতারা এটিকে সূর্যদেবতার মন্দির বলতেন। মূল উৎসর্গ ও ধর্মীয় অর্থ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। স্থাপনাটির নিচের সুড়ঙ্গ বা গুহাসদৃশ স্থান গবেষকদের বিশেষ আগ্রহের বিষয়। মেসোআমেরিকান বিশ্বাসে ভূগর্ভস্থ স্থান, উৎপত্তি, পানি ও পবিত্রতার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই পিরামিডটি শুধু উচ্চতার প্রদর্শন নয়, ভূমির নিচের জগতের সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে থাকতে পারে।
প্রধান সড়কের উত্তর প্রান্তে চাঁদের পিরামিড দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ি পটভূমির সামনে। খননে বোঝা গেছে, এটি একাধিক পর্যায়ে বড় করা হয়েছিল; আগের কাঠামো পরের নির্মাণের মধ্যে ঢেকে গেছে। নিবেদনের মধ্যে মানুষ ও প্রাণীর অবশেষ এবং মূল্যবান বস্তু পাওয়া গেছে। এগুলো নির্মাণ, ধর্মীয় আচার এবং ক্ষমতার সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে। তবে আধুনিক নাম দিয়ে তার মূল দেবতা নির্ধারণ করা যায় না। সূর্য ও চাঁদের পিরামিডের পরিচিত নাম যতটা সহজ, তাদের প্রাচীন অর্থ ততটা নিশ্চিত নয়। এই পার্থক্য নগরটির ইতিহাস পড়ার সময় মনে রাখা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো সিউদাদেলা নামে পরিচিত বিশাল আনুষ্ঠানিক প্রাঙ্গণ এবং তার পালকযুক্ত সর্পের মন্দির। মন্দিরের বহির্ভাগে সর্পমস্তক, খোলস ও অন্যান্য জলসম্পর্কিত প্রতীক রয়েছে। ঢালু ভিত্তির ওপর খাড়া আয়তাকার অংশের বিন্যাস তেওতিহুয়াকানের স্থাপত্যের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কিত মানববলির প্রমাণও পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন নগরটিকে নিছক শান্তিপূর্ণ ধর্মকেন্দ্র হিসেবে দেখার সুযোগ কমায়। এখানে আচার, সামরিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল, যদিও প্রতিটি প্রতীকের অর্থ ও প্রতিটি নিবেদনের উদ্দেশ্য সমানভাবে বোঝা যায়নি।
মন্দিরের নিচের সুড়ঙ্গ অনুসন্ধানে মূল্যবান পাথর, খোলস, ভাস্কর্য এবং নানা নিবেদনের সন্ধান মিলেছে। ভূগর্ভস্থ এই বিন্যাসকে ধর্মীয় পাতাললোকের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করা হয়। সুড়ঙ্গটি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার ও পরে বন্ধ করা হয়েছিল বলে প্রমাণ নির্দেশ করে। তবে এসব আবিষ্কার থেকে কোনো নির্দিষ্ট রাজার পরিচয় উদ্ধার হয়নি। রহস্যময় সুড়ঙ্গ মানেই রাজসমাধি—এমন ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। প্রত্নতত্ত্ব এখানে পবিত্র স্থান নির্মাণের প্রক্রিয়া দেখাচ্ছে; সেই স্থানের সব অর্থ বা ব্যবহারকারীর নাম এখনো জানাচ্ছে না।
শাসনব্যবস্থা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। মায়া নগরগুলোর মতো স্পষ্ট রাজবংশীয় নাম ও ইতিহাস তেওতিহুয়াকানে সহজে পাওয়া যায় না। এই পার্থক্যের ভিত্তিতে কেউ সমষ্টিগত নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখেন, আবার কেউ শক্তিশালী শাসক ও অভিজাত গোষ্ঠীর ভূমিকা গুরুত্ব দেন। বড় নির্মাণ ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ রাজনৈতিক সংগঠনের প্রমাণ, কিন্তু তার নির্দিষ্ট কাঠামোর পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। একজন রাজা, একাধিক নেতৃত্বদানকারী গোষ্ঠী কিংবা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ব্যবস্থা—বিভিন্ন সম্ভাবনা আলোচিত। রাজাদের নিশ্চিত নাম না পাওয়া থেকে রাজশক্তি একেবারেই ছিল না, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
সাধারণ মানুষ বহু কক্ষ ও উঠানবিশিষ্ট আবাসিক প্রাঙ্গণে বাস করতেন। এসব ভবনে পরিবারের জীবন, কারুশিল্প ও পাড়াভিত্তিক আচার পাশাপাশি চলতে পারত। দেয়ালচিত্রে জল, উদ্ভিদ, প্রাণী, শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় প্রতীক দেখা যায়। অবসিডিয়ান নামের আগ্নেয় কাচ থেকে ধারালো সরঞ্জাম তৈরির শিল্পও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কৃষি, পণ্য উৎপাদন ও বাণিজ্য মিলেই নগরের বিপুল জনসংখ্যাকে টিকিয়ে রাখত। মায়া অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ তার প্রভাবের বিস্তার দেখায়, তবে দূরে তেওতিহুয়াকানধর্মী বস্তু পাওয়া মানেই সর্বত্র সরাসরি শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল না।
ষষ্ঠ শতকের দিকে নগরের গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আগুন ও ইচ্ছাকৃত ভাঙচুরের প্রমাণ দেখা যায়। বিশেষ করে ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্থাপনায় ক্ষতি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবেশগত সমস্যার মতো কারণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও একটিকে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা বলা যায় না। পতনের পরও মানুষ এলাকায় বসবাস করেছে; পুরো নগর এক রাতে জনশূন্য হয়নি। তেওতিহুয়াকানের নির্মাতাদের পূর্ণ পরিচয় আজও অনিশ্চিত, কিন্তু তাদের অর্জন দৃশ্যমান। নাম হারিয়ে গেলেও পরিকল্পিত নগর, শিল্প ও শ্রমের প্রমাণ টিকে আছে—আর সেই প্রমাণই ‘দেবতাদের নগরী’র মানবিক ইতিহাস আমাদের সামনে ফিরিয়ে আনছে।
নেপোলিয়নের মিশর অভিযান: পিরামিডের বিজয় থেকে একরের ব্যর্থতা
নেপোলিয়নের ইতালি অভিযান: লোদি, আরকোল ও রিভোলির বিজয়ের ইতিহাস
ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের উত্থান: তুলোঁ থেকে প্যারিসে জাতীয় খ্যাতি
রোমুলাস ও রেমাস: নেকড়ের দুধে বেঁচে যাওয়া দুই ভাই ও রোমের জন্ম
এনিয়াস থেকে আলবা লঙ্গা: রোমুলাস ও রেমাসের জন্মের পৌরাণিক ইতিহাস
এনিয়াসের কিংবদন্তি: ট্রয় থেকে ইতালিতে রোমের পূর্বপুরুষের অভিযাত্রা