বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নাৎসি জার্মানিতে জীবন: গেস্টাপো, এসএস, প্রচারণা ও বিরোধী দমনের ইতিহাস

সিরিজ: নাৎসি জার্মানির উত্থান ও পতন

নাৎসি জার্মানিতে জীবন: গেস্টাপো, এসএস, প্রচারণা ও বিরোধী দমনের ইতিহাস
ভয় ও প্রচারণায় নিয়ন্ত্রিত সমাজ

১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসার পর জার্মানিতে কেবল সরকার পরিবর্তন হয়নি; মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং চিন্তার ওপরও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। নাৎসি নেতৃত্ব এমন একটি সমাজ গড়তে চেয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্র ও দলের বাইরে কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিককে তথাকথিত জাতীয় সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য দেখাতে হবে। যারা নাৎসি মতাদর্শের জাতিগত, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য ছিল, তারা কর্মসংস্থান, সামাজিক অনুষ্ঠান ও জাতীয় পুনরুত্থানের প্রচারে আকৃষ্ট হতে পারত। কিন্তু ইহুদি, রাজনৈতিক বিরোধী, রোমা জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, সমকামী এবং আরও বহু মানুষকে সেই সমাজ থেকে পরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন, নিপীড়িত ও ধ্বংস করা হয়। নাৎসি জার্মানির বাহ্যিক শৃঙ্খলার নিচে ছিল ভয়, বৈষম্য, নজরদারি ও রাষ্ট্রসমর্থিত সহিংসতার বিস্তৃত ব্যবস্থা।

ক্ষমতা দখলের পর নাৎসিরা জার্মানির রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রথম লক্ষ্য বানায়। কমিউনিস্ট ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়, দলীয় কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন বিলুপ্ত করা হয়। বহু উদারপন্থী, ধর্মীয় সমালোচক ও রক্ষণশীল বিরোধীকেও আটক করা হয়। আদালতের বিচার ছাড়াই মানুষকে “সুরক্ষামূলক হেফাজত” নামের ব্যবস্থায় অনির্দিষ্টকাল বন্দী রাখা যেত। শব্দটি নিরাপত্তার আভাস দিলেও বাস্তবে এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের শত্রু বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা।

১৯৩৩ সালের মার্চে মিউনিখের কাছে ডাকাউ বন্দিশিবির প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি শুরুতে প্রধানত রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য তৈরি হলেও পরে নাৎসি নিপীড়নের বৃহত্তর ব্যবস্থার আদর্শ হয়ে ওঠে। অন্যান্য স্থানে এসএ পরিচালিত অসংখ্য অনানুষ্ঠানিক আটক ও নির্যাতনকেন্দ্রও গড়ে উঠেছিল। বন্দীদের মারধর, অপমান, কঠোর শ্রম এবং নিয়মতান্ত্রিক শাস্তির মাধ্যমে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হতো। বন্দিশিবিরের অস্তিত্ব সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ গোপন ছিল না। বরং বিরোধিতা করলে কী ঘটতে পারে—এই বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে এগুলো সমাজে আতঙ্ক তৈরির কাজও করত।

গেস্টাপো বা গোপন রাষ্ট্র পুলিশ নাৎসি দমনব্যবস্থার সবচেয়ে ভীতিকর প্রতিষ্ঠানের একটি হয়ে ওঠে। ১৯৩৩ সালে হারমান গ্যোরিং প্রুশিয়ায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন; পরে হাইনরিখ হিমলারের নিয়ন্ত্রণে এনে সারা জার্মানিতে সম্প্রসারিত করা হয়। গেস্টাপো রাজনৈতিক বিরোধিতা, রাষ্ট্রবিরোধী মন্তব্য, নিষিদ্ধ সংগঠন, বিদেশি বেতার শোনা, ইহুদিদের সহায়তা এবং নাৎসি নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন কাজ তদন্ত করত। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আদালতের কার্যকর তদারকি ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন অথবা বন্দিশিবিরে পাঠানো সম্ভব ছিল।

তবে গেস্টাপো সর্বত্র অসংখ্য গুপ্তচর ছড়িয়ে দেওয়া সর্বজ্ঞ কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। এর কর্মীসংখ্যা পুরো সমাজকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাদের কার্যক্রমের বড় অংশ নির্ভর করত সাধারণ নাগরিক, প্রতিবেশী, সহকর্মী, আত্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুর অভিযোগের ওপর। পারিবারিক বিরোধ, পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা অথবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ থেকেও অনেকে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করত। নাৎসি সন্ত্রাসের কার্যকারিতা শুধু রাষ্ট্রের শক্তি থেকে আসেনি; মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সংস্কৃতিও তাকে শক্তিশালী করেছিল। কে সত্যিই দলকে সমর্থন করছে আর কে গোপনে খবর দিচ্ছে—এই অনিশ্চয়তা মানুষকে প্রকাশ্যে কথা বলা থেকে বিরত রাখত।

এসএস প্রথমে হিটলারের ছোট ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবাহিনী হিসেবে গঠিত হলেও হিমলারের নেতৃত্বে এটি একটি বিশাল আদর্শিক ও দমনমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কালো ইউনিফর্মধারী এসএস নিজেদের নাৎসি জাতিগত রাষ্ট্রের বিশেষ রক্ষক বলে মনে করত। এর অধীনে গোয়েন্দা সংস্থা এসডি, বন্দিশিবির পরিচালনাকারী বাহিনী এবং পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র সামরিক শাখা গড়ে ওঠে। এসএস সদস্য নির্বাচনে তথাকথিত আর্য বংশপরিচয় ও জাতিগত শুদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। পুলিশ ও এসএসের ক্ষমতা একত্রিত হওয়ার ফলে প্রচলিত আইনপ্রয়োগ এবং দলীয় সন্ত্রাসের মধ্যকার সীমা কার্যত বিলীন হয়ে যায়।

নাৎসি নিয়ন্ত্রণ শুধু গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। জোসেফ গোয়েবলসের নেতৃত্বাধীন প্রচার মন্ত্রণালয় সংবাদপত্র, বেতার, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নাটক, সংগীত ও শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করত। সাংবাদিকদের কীভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হতো। বিরোধী সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায় এবং ইহুদি সাংবাদিক, লেখক ও শিল্পীদের পেশা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৩৩ সালের মে মাসে জার্মানির বিভিন্ন শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নাৎসি সংগঠনগুলো “অজার্মান” বলে চিহ্নিত লেখকদের বই আগুনে পোড়ায়। যে শাসন বইকে ভয় পায়, সে প্রথমে চিন্তার বৈচিত্র্যকেই অপরাধে পরিণত করে।

বেতার ছিল প্রচারণার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর একটি। কম দামে তৈরি “জনগণের রেডিও” সাধারণ পরিবারের নাগালে পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে হিটলারের ভাষণ ও সরকারি অনুষ্ঠান ঘরে ঘরে শোনা যায়। বিশাল সমাবেশ, পতাকা, মশালমিছিল, সংগীত এবং সুচারুভাবে নির্মিত দৃশ্যের মাধ্যমে নাৎসিরা ব্যক্তিকে জনতার অংশে পরিণত করার চেষ্টা করত। হিটলারকে জাতির ত্রাণকর্তা, যুদ্ধফেরত সৈনিক, সাধারণ মানুষের বন্ধু এবং জার্মান পুনর্জন্মের একমাত্র নেতা হিসেবে তুলে ধরা হতো। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৃতিত্ব তার ব্যক্তিগত নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও শ্রমিক অধিকার বিলোপ, অস্ত্র উৎপাদন, বাধ্যতামূলক সামরিক প্রস্তুতি এবং আগের অর্থনৈতিক নীতির অবদান আড়াল করা হতো।

বিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থাকেও নাৎসি মতাদর্শের উপযোগী করে পরিবর্তন করা হয়। পাঠ্যপুস্তকে বর্ণবাদী ধারণা, ইহুদিবিদ্বেষ, সামরিক বীরত্ব এবং হিটলারের প্রতি আনুগত্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইতিহাসকে জার্মান জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিতে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হতো; জীববিজ্ঞানের ক্লাসে তথাকথিত জাতিগত বিজ্ঞান শেখানো হতো। ইহুদি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ধাপে ধাপে বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষকরা নাৎসি শিক্ষক সংগঠনে যোগ দেওয়ার চাপের মুখে পড়তেন। ফলে বিদ্যালয় স্বাধীন জ্ঞানচর্চার স্থানের বদলে অনুগত নাগরিক তৈরির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

ছেলেদের জন্য হিটলার ইয়ুথ এবং মেয়েদের জন্য লীগ অব জার্মান গার্লস নাৎসি তরুণ সমাজ গঠনের প্রধান মাধ্যম ছিল। ছেলেদের শারীরিক অনুশীলন, দীর্ঘ পদযাত্রা, মানচিত্র পড়া, শিবিরজীবন ও প্রাথমিক সামরিক দক্ষতা শেখানো হতো। মেয়েদের শরীরচর্চা, গৃহব্যবস্থাপনা, মাতৃত্ব এবং তথাকথিত জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ পরিবার গঠনের আদর্শে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। খেলাধুলা, ভ্রমণ ও দলগত কার্যক্রম অনেক তরুণের কাছে আকর্ষণীয় ছিল, কিন্তু এগুলোর ভেতরেই আনুগত্য, সামরিকতা এবং বর্ণবাদী চিন্তা প্রবেশ করানো হয়। ১৯৩৬ সালে হিটলার ইয়ুথকে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক যুবসংগঠন করা হয় এবং ১৯৩৯ সালে সদস্যপদ কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। শিশুদের দল ও নেতার প্রতি আনুগত্যকে কখনো কখনো পরিবারের আনুগত্যের ঊর্ধ্বে রাখতেও উৎসাহিত করা হতো।

প্রাপ্তবয়স্কদের কর্মজীবনও স্বাধীন ছিল না। ট্রেড ইউনিয়ন বিলুপ্ত করে জার্মান লেবার ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। শ্রমিকেরা ধর্মঘট বা স্বাধীনভাবে মজুরি নিয়ে দর-কষাকষির অধিকার হারায়। একই সঙ্গে “শক্তির মাধ্যমে আনন্দ” কর্মসূচিতে সাশ্রয়ী ভ্রমণ, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অবকাশের ব্যবস্থা করে শাসন শ্রমিকদের সমর্থন আকর্ষণের চেষ্টা করেছিল। বেকারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও এর পেছনে অস্ত্র উৎপাদন, বাধ্যতামূলক শ্রম ও সামরিক নিয়োগের বড় ভূমিকা ছিল। নারীদের মাতৃত্ব ও পরিবারকেন্দ্রিক ভূমিকায় উৎসাহিত করা হতো, যদিও যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য শ্রমিকের চাহিদা বাড়লে এই নীতিতে বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আসে।

নাৎসি রাষ্ট্রের কেন্দ্রে ছিল জাতিগত বৈষম্য। ১৯৩৫ সালের ন্যুরেমবার্গ আইন ইহুদিদের পূর্ণ নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় এবং ইহুদি ও তথাকথিত জার্মান রক্তের মানুষের মধ্যে বিবাহ ও যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করে। ইহুদি চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও পেশাগত জীবন ক্রমে সংকুচিত করা হয়। দোকান বর্জন, অপমানজনক প্রচারণা এবং প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তাদের প্রতিবেশী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ১৯৩৮ সালের নভেম্বরে ক্রিস্টালনাখটের সময় সিনাগগে আগুন দেওয়া, ইহুদি ব্যবসা ধ্বংস, মানুষ হত্যা এবং প্রায় ৩০ হাজার ইহুদি পুরুষকে বন্দিশিবিরে পাঠানো প্রমাণ করে যে আইনি বৈষম্য প্রকাশ্য গণসহিংসতায় পরিণত হয়েছে।

সব জার্মান নাগরিক নাৎসিবাদে বিশ্বাস করত না। কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক কর্মীরা গোপন প্রচার চালিয়েছিল, কিছু ধর্মযাজক রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন এবং কিছু তরুণ সরকারি যুবসংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করেছিল। সাধারণ মানুষও নিষিদ্ধ খবর শোনা, নিপীড়িত প্রতিবেশীকে সাহায্য করা অথবা ব্যক্তিগতভাবে কৌতুক ও সমালোচনার মাধ্যমে অনাগ্রহ প্রকাশ করত। তবে বিরোধিতা ছিল বিচ্ছিন্ন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই আদর্শিক সমর্থন, ব্যক্তিগত সুবিধা, ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা নীরব মানিয়ে নেওয়ার কারণে শাসনের সঙ্গে চলেছিল।

নাৎসি জার্মানিতে নিয়ন্ত্রণের শক্তি ছিল সন্ত্রাস ও সম্মতির মিলিত ব্যবহারে। গেস্টাপো ও এসএস মানুষকে শাস্তির ভয় দেখিয়েছিল, প্রচারণা বাস্তবতাকে বিকৃত করেছিল, শিক্ষা ও যুবসংগঠন নতুন প্রজন্মকে মতাদর্শের অধীন করেছিল এবং সামাজিক সুবিধা গ্রহণযোগ্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমর্থন তৈরি করেছিল। একই সময়ে সমাজের নির্বাচিত অংশকে অধিকারহীন করে নিপীড়নের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এই ইতিহাস দেখায়, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সত্যভিত্তিক সংবাদ, ব্যক্তিগত অধিকার ও বিরোধী মত ধীরে ধীরে বিলোপ পেলে দৈনন্দিন জীবনও কীভাবে একটি একনায়ক রাষ্ট্রের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।


আপনার পছন্দ হতে পারে