বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হিটলারের ক্ষমতা দখল: চ্যান্সেলর থেকে নাৎসি একনায়ক হওয়ার ইতিহাস

সিরিজ: নাৎসি জার্মানির উত্থান ও পতন

হিটলারের ক্ষমতা দখল: চ্যান্সেলর থেকে নাৎসি একনায়ক হওয়ার ইতিহাস
গণতন্ত্র ধ্বংস করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। ঘটনাটি নাৎসি প্রচারে একটি জাতীয় বিপ্লব হিসেবে উপস্থাপিত হলেও হিটলার নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অর্জন করেননি। ১৯৩২ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে নাৎসি পার্টির ভোট আগের তুলনায় কমে ৩৩.১ শতাংশে নেমেছিল এবং দলটি সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেক দূরে ছিল। রাষ্ট্রপতি পল ফন হিন্ডেনবুর্গও দীর্ঘদিন হিটলারকে চ্যান্সেলর করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ ফ্রানৎস ফন পাপেন এবং তার সহযোগীরা হিন্ডেনবুর্গকে বোঝান যে হিটলারকে সরকারপ্রধান করলেও মন্ত্রিসভায় রক্ষণশীলদের সংখ্যাধিক্যের মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তাদের এই আত্মঘাতী ভুল হিসাবই হিটলারকে বৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার দরজায় পৌঁছে দেয়।

হিটলারের প্রথম মন্ত্রিসভায় নাৎসি সদস্য ছিলেন মাত্র তিনজন—হিটলার, ভিলহেল্ম ফ্রিক এবং হারমান গ্যোরিং। কিন্তু তাদের হাতে থাকা পদগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ফ্রিক জাতীয় প্রশাসন ও পুলিশের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান। প্রুশিয়ার স্বরাষ্ট্রব্যবস্থায় গ্যোরিংয়ের কর্তৃত্ব ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ প্রুশিয়া জার্মানির বৃহত্তম রাজ্য এবং সেখানে দেশের অধিকাংশ মানুষ বাস করত। গ্যোরিং দ্রুত পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নাৎসি অনুগত ব্যক্তিদের বসান এবং এসএ ও এসএস সদস্যদের সহায়ক পুলিশ হিসেবে নিয়োগ করেন। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত নাৎসি বাহিনীই রাষ্ট্রের আইনপ্রয়োগকারী শক্তির অংশ হয়ে যায়।

চ্যান্সেলর হওয়ার পর হিটলার রাইখস্টাগ ভেঙে দিয়ে ১৯৩৩ সালের ৫ মার্চ নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। তার লক্ষ্য ছিল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নিজের অবস্থান শক্ত করা। নির্বাচনী প্রচারে নাৎসিরা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতা, বেতার ও পুলিশকে ব্যবহার করে। কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক সভায় হামলা চালানো হয়, বিরোধী সংবাদপত্র বন্ধ করা হয় এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে ভয় দেখানো বা গ্রেপ্তার করা হয়। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও নাৎসিরা বড় অঙ্কের নির্বাচনী অনুদান সংগ্রহ করে। নির্বাচনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বহুদলীয় হলেও স্বাধীন ও ন্যায্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

১৯৩৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বার্লিনের রাইখস্টাগ ভবনে আগুন লাগে। ঘটনাস্থল থেকে ডাচ বংশোদ্ভূত কমিউনিস্ট মারিনুস ফান ডার লুবেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আগুন লাগানোর দায় স্বীকার করেছিলেন, কিন্তু তিনি একা কাজ করেছিলেন নাকি বৃহত্তর কোনো ষড়যন্ত্র ছিল—তা নিয়ে দীর্ঘকাল বিতর্ক চলেছে। নাৎসি নেতৃত্ব প্রমাণের অপেক্ষা না করেই অগ্নিকাণ্ডটিকে আসন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লবের সূচনা হিসেবে ঘোষণা করে। হিটলার দাবি করেন, রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাইখস্টাগের আগুন নাৎসিদের হাতে এমন একটি অজুহাত তুলে দেয়, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

পরদিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি হিন্ডেনবুর্গ “জনগণ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতির আদেশে” স্বাক্ষর করেন। রাইখস্টাগ ফায়ার ডিক্রি নামে পরিচিত এই আদেশ মতপ্রকাশ, সংবাদপত্র, সমাবেশ, সংগঠন, ডাক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তাসহ ভাইমার সংবিধানে নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে। পুলিশকে অভিযোগ ছাড়াই মানুষকে আটক, বাড়িতে তল্লাশি এবং প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে জারি হলেও আদেশটি নাৎসি শাসনের পুরো সময় কার্যকর ছিল। এর মাধ্যমে আইনের সুরক্ষা সরিয়ে রেখে সন্ত্রাসকে প্রশাসনিক বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।

অগ্নিকাণ্ডের পর কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, কর্মী ও সংসদ সদস্যদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়। সমাজতান্ত্রিক, উদারপন্থী এবং অন্যান্য বিরোধীরাও নিপীড়নের শিকার হন। আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য অস্থায়ী বন্দিশিবির তৈরি হতে থাকে। ১৯৩৩ সালের মার্চে মিউনিখের কাছে ডাকাউয়ে প্রথম স্থায়ী নাৎসি বন্দিশিবির প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে শুরুতে প্রধানত রাজনৈতিক বন্দীদের রাখা হতো। এসএ সদস্যদের পরিচালিত অনানুষ্ঠানিক আটককেন্দ্রে নির্যাতন চলত। এভাবে নাৎসিরা বিরোধী রাজনীতিকে শুধু নির্বাচনে পরাজিত করার চেষ্টা করেনি; তারা বিরোধীদের সাংগঠনিকভাবে অক্ষম এবং শারীরিকভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছিল।

এত দমন-পীড়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রচারের পরও ৫ মার্চের নির্বাচনে নাৎসি পার্টি ৪৩.৯ শতাংশ ভোট পায়—অর্থাৎ তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। জাতীয়তাবাদী মিত্রদের সহায়তায় সরকার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও হিটলার এমন ক্ষমতা চাইছিলেন, যাতে রাইখস্টাগকে পাশ কাটিয়ে আইন প্রণয়ন করা যায়। এজন্য সংবিধান পরিবর্তনের সমতুল্য দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন ছিল। গ্রেপ্তার হওয়া বা আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্ট সদস্যদের সংসদে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং সমাজতান্ত্রিক সদস্যদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হয়।

১৯৩৩ সালের ২৩ মার্চ বার্লিনের ক্রোল অপেরা হাউসে এনাবলিং অ্যাক্টের ওপর ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভবনের ভেতরে ও বাইরে এসএ ও এসএস সদস্যরা উপস্থিত থেকে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিল। হিটলার ক্যাথলিক সেন্টার পার্টিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গির্জার অধিকার রক্ষার আশ্বাস দিয়ে তাদের সমর্থন আদায় করেন। কেবল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির উপস্থিত সদস্যরা প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ভোট দেন। তাদের নেতা অটো ভেলস সাহসী বক্তব্যে স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার নীতিকে রক্ষা করেন, যদিও ভোটের ফল পরিবর্তন করার ক্ষমতা তাদের ছিল না।

এনাবলিং অ্যাক্ট হিটলারের একনায়কতন্ত্রের আইনি ভিত্তি তৈরি করে। এই আইনে মন্ত্রিসভাকে রাইখস্টাগ বা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়াই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়, এমনকি সেই আইন সংবিধানের পরিপন্থী হলেও। কাগজে-কলমে সংসদ ও রাষ্ট্রপতি বহাল ছিল, কিন্তু কার্যকর আইনপ্রণয়ন ক্ষমতা হিটলারের সরকারের হাতে চলে যায়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক কাঠামো ব্যবহার করেই সেই প্রতিষ্ঠানের মূল ক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করা হয়। ফলে একনায়কতন্ত্র কেবল সহিংস অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নয়, ভীতি ও প্রতারণার পরিবেশে পাস হওয়া একটি আইনের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর শুরু হয় জার্মান সমাজ ও রাষ্ট্রকে নাৎসি নিয়ন্ত্রণে একীভূত করার প্রক্রিয়া, যা গ্লাইখশালটুং নামে পরিচিত। জার্মানির রাজ্য সরকারগুলোতে নাৎসি প্রতিনিধি ও রাইখ গভর্নর বসানো হয় এবং তাদের স্বায়ত্তশাসন ক্রমে বিলোপ করা হয়। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমকে নাৎসি নীতির অধীন করা হয়। ১৯৩৩ সালের এপ্রিলে পেশাদার সরকারি চাকরি পুনর্গঠনের আইনের মাধ্যমে ইহুদি এবং রাজনৈতিকভাবে অবিশ্বস্ত বহু সরকারি কর্মচারীকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এটি ছিল বর্ণবাদী নিপীড়নকে আইনের কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠার প্রথম বড় পদক্ষেপগুলোর একটি।

১ মে নাৎসিরা শ্রমিকদের আকৃষ্ট করতে জাতীয় শ্রমদিবস উদ্‌যাপন করে। কিন্তু পরদিন এসএ ও পুলিশ স্বাধীন শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যালয় দখল করে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে এবং নেতাদের গ্রেপ্তার করে। সব স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নের পরিবর্তে নাৎসি নিয়ন্ত্রিত জার্মান লেবার ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। শ্রমিকদের ধর্মঘট ও স্বাধীন দর-কষাকষির অধিকার বিলুপ্ত হয়। একইভাবে পেশাজীবী, ছাত্র, শিক্ষক, লেখক ও শিল্পীদের সংগঠনও নাৎসি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। জাতীয় ঐক্যের নামে সমাজের প্রতিটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্র ও দলের অধীন করা হচ্ছিল।

রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টি কার্যত ধ্বংস হয়ে যায় এবং জুন মাসে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নিষিদ্ধ হয়। অন্যান্য দল ভীতি ও চাপের মুখে নিজেরাই বিলুপ্ত হয়। ১৯৩৩ সালের ১৪ জুলাই নতুন রাজনৈতিক দল গঠনবিরোধী আইন পাস করে নাৎসি পার্টিকে জার্মানির একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে সংবাদপত্র, বেতার, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও শিল্পকে জোসেফ গোয়েবলসের প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বিরোধী মতামত প্রকাশ ক্রমেই অপরাধে পরিণত হয় এবং গেস্টাপো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শত্রুদের অনুসরণ করতে শুরু করে।

তবু ১৯৩৩ সালের শেষে হিটলারের ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল না। এসএ নেতা আর্নস্ট রোম তার বিশাল আধা-সামরিক বাহিনীকে নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করে একটি “দ্বিতীয় বিপ্লব” চালানোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছিলেন। এতে সেনাবাহিনী, শিল্পপতি ও রক্ষণশীল অভিজাতরা আতঙ্কিত হয়। ১৯৩৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত হিটলারের নির্দেশে এসএস বাহিনী রোমসহ এসএর শীর্ষ নেতা এবং আরও বহু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করে। “দীর্ঘ ছুরির রাত” নামে পরিচিত এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে হিটলার সেনাবাহিনীর আস্থা অর্জন করেন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকেও রাষ্ট্রের আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বৈধ ঘোষণা করেন।

১৯৩৪ সালের ২ আগস্ট হিন্ডেনবুর্গ মারা গেলে হিটলার রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের পদ একত্র করে নিজেকে “ফ্যুরার ও রাইখ চ্যান্সেলর” ঘোষণা করেন। সেনাবাহিনীর সদস্যদের সংবিধান বা রাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্যক্তিগতভাবে হিটলারের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করা হয়। মাত্র উনিশ মাসে একটি সাংবিধানিক সরকার একদলীয়, সন্ত্রাসনির্ভর ব্যক্তিকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়। এই রূপান্তর কোনো একটি ঘটনার ফল ছিল না; রক্ষণশীলদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, জরুরি ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধীদের ওপর সহিংসতা, নাগরিক অধিকার স্থগিত, আইনসভাকে নিষ্ক্রিয় করা এবং সমাজের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই হিটলারের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে