বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহামন্দা ও নাৎসি পার্টির উত্থান: বেকারত্ব কীভাবে হিটলারের জনসমর্থন বাড়িয়েছিল?

সিরিজ: নাৎসি জার্মানির উত্থান ও পতন

মহামন্দা ও নাৎসি পার্টির উত্থান: বেকারত্ব কীভাবে হিটলারের জনসমর্থন বাড়িয়েছিল?
অর্থনৈতিক হতাশা থেকে নাৎসি উত্থান

১৯২৮ সালের জার্মানিতে নাৎসি পার্টি তখনো একটি প্রান্তিক উগ্রবাদী রাজনৈতিক শক্তি। সেই বছরের রাইখস্টাগ নির্বাচনে দলটি মাত্র ২.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ১২টি আসন লাভ করেছিল। জার্মানির অধিকাংশ ভোটার অ্যাডলফ হিটলারের চরম জাতীয়তাবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ ও গণতন্ত্রবিরোধী রাজনীতিকে গ্রহণ করেনি। কিন্তু মাত্র চার বছরের মধ্যে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ১৯৩২ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে নাৎসি পার্টি ৩৭.৩ শতাংশ ভোট এবং ২৩০টি আসন নিয়ে রাইখস্টাগের বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। এই বিস্ময়কর উত্থানের কেন্দ্রে ছিল মহামন্দায় বিধ্বস্ত অর্থনীতি, ব্যাপক বেকারত্ব, দুর্বল হয়ে পড়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের হতাশাকে কাজে লাগানো সুপরিকল্পিত নাৎসি প্রচার।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান অর্থনীতি আগে থেকেই ভঙ্গুর ছিল। ১৯২৩ সালের অতিমুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা কাটিয়ে দেশটি ১৯২৪ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে পায়। শিল্পোৎপাদন বাড়ে, শহুরে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে এবং বৈদেশিক সম্পর্কের উন্নতি হয়। কিন্তু এই আপাত সমৃদ্ধি অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। জার্মান ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ করছিল, অথচ ঋণ প্রত্যাহার করা হলে তা সামাল দেওয়ার মতো স্থায়ী আর্থিক ভিত্তি তাদের ছিল না। কৃষকেরাও উৎপাদিত পণ্যের কম দাম, ঋণ ও করের চাপে আগে থেকেই অসন্তুষ্ট ছিল।

১৯২৯ সালের অক্টোবরে মার্কিন শেয়ারবাজার ধসে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলো বিদেশে দেওয়া ঋণ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। এর সরাসরি আঘাত পড়ে জার্মানির ওপর। নতুন ঋণপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ে এবং বিনিয়োগ সংকুচিত হয়। কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে শুরু করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়, ব্যাংকব্যবস্থা সংকটে পড়ে এবং লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারায়। ১৯৩২ সালের শুরুতে নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখে পৌঁছায়; খণ্ডকালীন কর্মী ও নিবন্ধনের বাইরে থাকা মানুষদের ধরলে প্রকৃত দুর্দশা আরও বিস্তৃত ছিল।

বেকারত্বের অভিঘাত শুধু আর্থিক ছিল না। কাজকে সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক দায়িত্বের ভিত্তি হিসেবে দেখা হতো। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা বহু মানুষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে। তরুণেরা শিক্ষা শেষ করেও চাকরি পাচ্ছিল না, যুদ্ধফেরত পুরুষেরা নিজেদের পরিত্যক্ত মনে করছিল এবং পরিবারের সঞ্চয় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। শহরে খাদ্য বিতরণের সারি দীর্ঘ হতে থাকে। ভাড়া দিতে না পেরে অনেকে বাসস্থান হারায়। একটি প্রজন্মের কাছে গণতন্ত্র মানে হয়ে ওঠে অন্তহীন আলোচনা, অকার্যকর সরকার এবং প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা।

সংকট মোকাবিলায় চ্যান্সেলর হাইনরিখ ব্র্যুনিংয়ের সরকার সরকারি ব্যয়, মজুরি ও সামাজিক সহায়তা কমানোর নীতি গ্রহণ করে। সরকারের ধারণা ছিল, বাজেট নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য কমানোর মাধ্যমে জার্মানি আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষতিপূরণের বোঝা বহনে নিজের অক্ষমতা প্রমাণ করতে পারবে এবং অর্থনীতির প্রতিযোগিতা বাড়াবে। কিন্তু চাহিদা সংকুচিত থাকা অবস্থায় এই নীতি সাধারণ মানুষের দুর্দশা আরও বাড়ায়। কর বৃদ্ধি ও ব্যয় কমানোর ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমে যায়, ব্যবসা আরও দুর্বল হয় এবং বেকারত্ব বাড়তে থাকে। মানুষ এমন একটি সরকার দেখছিল, যা সংকটের সময় সহায়তা বাড়ানোর বদলে তাদের সুবিধা ও আয় কমাচ্ছিল।

এদিকে রাইখস্টাগে স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন ক্রমে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্র্যুনিং এবং তার পরবর্তী চ্যান্সেলররা সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি পল ফন হিন্ডেনবুর্গের জরুরি আদেশের ওপর নির্ভর করতে থাকেন। সংসদকে পাশ কাটিয়ে শাসন পরিচালনার এই প্রবণতা ভাইমার গণতন্ত্রের বৈধতা দুর্বল করে দেয়। সাধারণ মানুষ দেখতে পায়, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি, চ্যান্সেলর ও তাদের ঘনিষ্ঠ অভিজাতরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমার সঙ্গে সঙ্গে এমন দলগুলোর সমর্থন বাড়ে, যারা সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটিকেই ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল।

এই পরিস্থিতিতে নাৎসি পার্টি নিজেদের একটি সর্বজনীন জাতীয় আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে। তারা বেকার শ্রমিককে কাজ, কৃষককে ঋণ থেকে মুক্তি, মধ্যবিত্তকে স্থিতিশীলতা, ব্যবসায়ীকে কমিউনিজম থেকে সুরক্ষা এবং জাতীয়তাবাদীদের ভার্সাই চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়। এসব প্রতিশ্রুতির অনেকটাই ছিল অস্পষ্ট, পরস্পরবিরোধী কিংবা বাস্তব পরিকল্পনাবিহীন। কিন্তু তার অস্পষ্টতাই রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হয়েছিল। ভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষ নাৎসিদের বক্তব্যে নিজের প্রত্যাশিত সমাধান খুঁজে নিতে পারত। নাৎসিরা বিস্তারিত অর্থনৈতিক কর্মসূচির বদলে শক্তিশালী নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং পুনর্জাগরণের আবেগ বিক্রি করেছিল।

হিটলার নিজেকে প্রচলিত রাজনীতিবিদদের বাইরে থাকা এক দৃঢ় নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। নাৎসি প্রচার তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে নির্মাণ করে, যিনি দলীয় বিভাজন দূর করে সমগ্র জাতির ইচ্ছাকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। জোসেফ গোয়েবলসের পরিচালনায় পোস্টার, সংবাদপত্র, চলচ্চিত্র, শোভাযাত্রা, মশালমিছিল ও বিশাল জনসভা ব্যবহার করা হয়। সংক্ষিপ্ত স্লোগান, নাটকীয় প্রতীক এবং বারবার প্রচারিত একই বার্তা মানুষের মনে প্রভাব সৃষ্টি করত। ১৯৩২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারণায় হিটলার বিমানযোগে একের পর এক শহরে সভা করে নিজেকে আধুনিক, গতিশীল ও সর্বত্র উপস্থিত নেতা হিসেবে তুলে ধরেন।

নাৎসি প্রচার শুধু আশা দেখায়নি; উদ্দেশ্যমূলকভাবে শত্রুও নির্মাণ করেছিল। জার্মানির জটিল অর্থনৈতিক সংকটের জন্য ইহুদি, কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী এবং ভাইমার প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিবিদদের অন্যায়ভাবে দায়ী করা হয়। ইহুদিরা জার্মান সমাজের ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও নাৎসিরা তাদের একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ ও বলশেভিক বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত করার পরস্পরবিরোধী মিথ্যা প্রচার চালায়। বাস্তব সমস্যার সহজ ব্যাখ্যা এবং দৃশ্যমান শত্রু তৈরি করা তাদের প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ছিল। মানুষের ভয়কে রাজনৈতিক ঘৃণায় রূপান্তর করাই ছিল নাৎসি সাফল্যের অন্যতম অন্ধকার দিক।

দলের সাংগঠনিক বিস্তারও তাদের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জার্মানিকে অসংখ্য আঞ্চলিক শাখায় ভাগ করে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মী, প্রচারক ও বক্তা নিয়োগ করা হয়। কৃষিপ্রধান এলাকায় কৃষকের সমস্যা, শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান এবং মধ্যবিত্ত এলাকায় শৃঙ্খলা ও কমিউনিজমের বিপদকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। নাৎসিরা শ্রোতাভেদে বক্তব্য পরিবর্তন করলেও হিটলারের নেতৃত্ব, জাতীয় পুনরুত্থান ও গণতন্ত্রবিরোধিতা ছিল তাদের মূল বার্তা। যুব, নারী, ছাত্র, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের জন্য পৃথক সংগঠনের মাধ্যমে দলটি দৈনন্দিন সামাজিক পরিসরেও প্রবেশ করে।

এসএ বা বাদামি শার্টধারী আধা-সামরিক বাহিনী সভা পাহারা দেওয়া, বিরোধীদের ভয় দেখানো এবং রাস্তায় শক্তি প্রদর্শনের কাজ করত। কমিউনিস্ট আধা-সামরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ রাজনৈতিক সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। আশ্চর্যজনকভাবে, নাৎসিরা এই বিশৃঙ্খলা তৈরিতে ভূমিকা রেখেও নিজেদের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একমাত্র শক্তি হিসেবে প্রচার করত। রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত ও সম্পদশালী গোষ্ঠীর অনেকে কমিউনিস্ট বিপ্লবের আশঙ্কায় নাৎসিদের সহিংসতাকে উপেক্ষা বা সমর্থন করতে শুরু করে। শিল্পপতিদের একটি অংশ দলটিকে অর্থ দিয়েছিল, যদিও নাৎসিদের উত্থানকে কেবল বৃহৎ ব্যবসায়ীদের অর্থায়নের ফল বলা সঠিক নয়; তাদের সংগঠন ছোট অনুদান, সদস্য চাঁদা ও প্রবেশমূল্য থেকেও অর্থ সংগ্রহ করত।

১৯৩০ সালের নির্বাচনে নাৎসি পার্টি ১৮.৩ শতাংশ ভোট ও ১০৭টি আসন পায়। দুই বছর পর জুলাই ১৯৩২-এর নির্বাচনে তাদের ভোট বেড়ে ৩৭.৩ শতাংশ হয়। তবে জার্মান জনগণের সবাই নাৎসিদের সমর্থন করেনি এবং দলটি কখনো অবাধ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। শিল্পশ্রমিকদের বড় অংশ সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট দলগুলোর প্রতি অনুগত ছিল; অনেক ক্যাথলিক ভোটারও নাৎসিদের বদলে সেন্টার পার্টিকে সমর্থন করেছিল। নাৎসিদের সাফল্য বিশেষভাবে দৃশ্যমান ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট গ্রামাঞ্চল, ছোট শহর, নিম্নমধ্যবিত্ত, কৃষক এবং প্রচলিত দলগুলোর ওপর আস্থা হারানো নতুন ভোটারদের মধ্যে।

জুলাই ১৯৩২-এ সর্বোচ্চ সাফল্যের পর নভেম্বরের নির্বাচনে নাৎসিদের ভোট ৩৩.১ শতাংশে নেমে আসে এবং আসন কমে ১৯৬ হয়। দলটি আর্থিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ চাপেও পড়েছিল। অর্থাৎ তাদের ক্ষমতায় আসা অবধারিত ছিল না। কিন্তু রাইখস্টাগের অচলাবস্থা, বারবার নির্বাচন এবং রক্ষণশীল নেতাদের ষড়যন্ত্র রাজনৈতিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করে। ফ্রানৎস ফন পাপেনসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মনে করেছিলেন, হিটলারকে চ্যান্সেলর করে মন্ত্রিসভায় সংখ্যালঘু নাৎসি সদস্য রাখলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তাদের এই ভুল হিসাবেই ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিটলার চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন।

মহামন্দা হিটলারকে সৃষ্টি করেনি, কিন্তু এটি নাৎসিবাদকে প্রান্তিক অবস্থান থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছিল। বেকারত্ব মানুষের নিরাপত্তা কেড়ে নিয়েছিল, সরকারি ব্যয়সংকোচন রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ বাড়িয়েছিল, সংসদীয় অচলাবস্থা গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছিল এবং নাৎসি প্রচার সেই হতাশাকে ঘৃণা ও কর্তৃত্ববাদী আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তর করেছিল। এই ইতিহাস দেখায়, অর্থনৈতিক বিপর্যয় যখন দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সহিংসতা, মিথ্যা প্রচার ও সুবিধাবাদী অভিজাতদের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন গণতান্ত্রিক সমাজ কত দ্রুত বিপজ্জনক উগ্রবাদের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।


আপনার পছন্দ হতে পারে